সেলিনা আক্তার
কবিতা যখন কেবল শব্দের কারিগরি না হয়ে অস্তিত্বের জবানবন্দি হয়ে ওঠে, তখন তা হয়ে ওঠে এক একটি দহনবিন্দু। এইচ বি রিতার ‘অপেক্ষা: পঞ্চান্ন বছরের তৃষ্ণা’ কবিতাটি পাঠ করতে গিয়ে মনে হল, কবি এখানে কোনো অলীক নক্ষত্র খুঁজছেন না, বরং জীবনের সেই রূঢ় বাস্তবতাকে বিচারহীন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন, যেখানে স্বাধীনতা আর দারিদ্র্যের ক্ষত আজও অমিলিত। এটি মূলত একটি আধুনিক সামাজিক-প্রতিবাদধর্মী কবিতা,
যেখানে ঐতিহ্যগত রোমান্টিকতা নেই, বরং বাস্তববাদ ও মানবতাবাদের মিশ্রণ আছে। এক কথায় এই কবিতাকে সমকালীন সামাজিক বাস্তববাদী কবিতা বলাই সবচেয়ে উপযুক্ত।
এইচ বি রিতা সম্পর্কে বলতেই হয়, তাঁর সৃজনশীল সত্তা কোনো নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা নয়। তাঁর সাহিত্যিক বিচরণ যেমন বিস্তৃত, তাঁর পর্যবেক্ষণ তেমনি তীক্ষ্ণ ও গূঢ়। ‘অপেক্ষা: পঞ্চান্ন বছরের তৃষ্ণা’ কবিতাটির ব্যবচ্ছেদ করলে আমরা দেখতে পাই, কবি এখানে স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়েও সমাজে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, বৈষম্য ও অবমাননার চিত্র তুলে ধরেছেন।
“পঞ্চান্নটি শীত গেল…”-এই পঙ্ক্তিটি সময়ের এক দীর্ঘ যাত্রা, যা বোঝায় স্বাধীনতার পরও জনগণের মুক্তি অধরা রয়ে গেছে। কবির “আমি খুঁজি সেই দেশ”-এই পুনরাবৃত্তি একটি আকুল প্রত্যাশা ও আক্ষেপের সুরকে জোরালো করেছে। কবি এমন এক দেশ খোঁজেন যেখানে কেউ ক্ষুধায় বা ঋণে আত্মহত্যা করবে না, চিকিৎসার অভাবে মানুষ মেঝেতে পড়ে থাকবে না,মেয়েদের লজ্জা রক্ষার চেয়ে অন্ন জোগানোর সংগ্রাম বড় হবে না। সহজ অথচ কত গভীর বেদনাদায়ক বাস্তবতা।
“পঞ্চান্নটি শীত গেল, বসন্তের রক্তিম পলাশ ঝরল কত / তবুও এ বঙ্গে কেন দারিদ্র্যের ক্ষত আজও অমিলিত?”
এই প্রারম্ভিক স্তবকে কবি সময়ের এক বিশাল ক্যানভাস উন্মোচন করেছেন। প্রকৃতি তার নিয়মে আবর্তিত হয়-শীত যায়, পলাশ ফোটে; কিন্তু মানুষের ললাটে দারিদ্র্যের যে লিখন, তা অপরিবর্তিত থাকে। এখানে ‘বসন্তের রক্তিম পলাশ’ ঋতু পরিবর্তনের প্রতীক নয়, বরং তা আমাদের বিপ্লব ও ত্যাগের স্মারক। কবি প্রশ্ন তুলেছেন সেই ত্যাগের সার্থকতা নিয়ে, যা আজও সাধারণ মানুষের ক্ষুধার ক্ষতে প্রলেপ দিতে পারেনি।
“আমি খুঁজি সেই দেশ, যেখানে ভাতের ঘ্রাণে ঘাম নেই / ক্ষুধার্ত শিশুর চোখে ডাস্টবিনের ঐ উচ্ছিষ্ট নাম নেই। / একুশ কি বাহান্ন- সবই কি তবে মিথ্যে কোনো ইতিহাস? / যদি পথের কুকুরে আর মানুষে মেটে আজো এক ই গ্লাস!”
এই স্তবকটি যেন আমাদ্রকে এক অমোঘ ‘অসংগতি’র মুখোমুখি দাঁড় করায়। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরেও যখন ‘মানুষ এবং কুকুর’ একই ডাস্টবিনে ভাগ বসায়, তখন কবির কাছে জাতীয় ইতিহাস এক নিদারুণ পরিহাস বলে মনে হয়। ‘ভাতের ঘ্রাণে ঘাম নেই’-এই চরণে কবি সেই শোষনহীন সাম্যবাদী সমাজকে খুঁজেছেন, যেখানে শ্রমের মূল্য কেবল ঘামে ভেজা শরীর নয়, বরং এক সম্মানজনক অস্তিত্ব।
“যেখানে ঘন কুয়াশার হিম শাদা চাদরের নিচে- / ছেঁড়া কাপড়ে উঁকি দেবে না কোনো কিশোরীর কুণ্ঠিত যৌবন। / যেখানে লজ্জা নিবারণের চেয়ে অন্ন জোগানোর লড়াই বড় হবে না…”
এই স্তবকটি কবিতার সবচেয়ে সংবেদনশীল ও রূঢ় অংশ। দারিদ্র্য যখন কেবল ক্ষুধা নয়, বরং মানুষের সম্মান ও শ্লীলতার ওপর হানা দেয়, তখন কবির কলম হয়ে ওঠে শাণিত কুঠার। ‘কুণ্ঠিত যৌবন’ আর ‘অন্ন জোগানোর লড়াই’-এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে মানুষের জৈবিক ক্ষুধার যে আদিম ও নৃশংস রূপ ফুটে উঠেছে, তা পাঠকের বিবেককে বিচারহীন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।
এইচ বি রিতার সার্বিক লেখনশৈলী কোনো পরিকল্পিত অলঙ্কারশাস্ত্রের অনুগামী নয়, বরং তা এক আদিম ও অদম্য স্রোতের মতো। তাঁর কবিতায় এক ধরণের ‘বৌদ্ধিক নগ্নতা’ বিদ্যমান, যেখানে তিনি রূপকের আড়ালে সত্যকে গোপন না করে সরাসরি জখমের ওপর আঙুল রাখেন।
রিতার শব্দচয়ন অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং সরাসরি-যেমন ‘উচ্ছিষ্ট’, ‘গলায় দড়ি’, বা ‘বিষাক্ত তপ্তঋণ’-যা প্রমাণ করে তিনি শব্দ খুঁজেন না, বরং জীবনের চরম সংকটময় মুহূর্তগুলোই তাঁকে খুঁজে নেয় তাদের নিজস্ব ‘প্রচারক’ হিসেবে।
সার্বিকভাবে বলতে গেলে, এইচ বি রিতার লেখনশৈলী কোনো সুপরিকল্পিত কারিগরি নয়, বরং তা এক আদিম ও অদম্য স্রোতের মতো। তাঁর কবিতার বাইরেও রয়েছে এক বিশাল বৌদ্ধিক জগৎ। তাঁর শৈলীতে একদিকে আছে সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে এক মার্ক্সীয় চেতনার দ্রোহ, অন্যদিকে আছে এক মরমী হাহাকার, যা মানুষের মর্যাদাকে জীবনের চেয়েও বড় করে দেখে।
তিনি যখন শিশুযত্ন বা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রবন্ধ লিখেন, তখন সেখানে ফুটে ওঠে এক গভীর সমাজতাত্ত্বিক দায়বদ্ধতা। তাঁর প্রবন্ধে মননশীলতা, দর্শন আর বিজ্ঞানের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটে, যা আধুনিক পাঠকদের চিন্তার খোরাক যোগায়।
আবার তাঁর কথাসাহিত্যে-উপন্যাস ও ছোটগল্পে, আমরা এক ভিন্ন এইচ বি রিতাকে খুঁজে পাই। সেখানে তিনি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যবচ্ছেদ করেন। নাগরিক একাকিত্ব, পথের মানুষ, বৈষম্যময় সমাজে ন্যায়ের অনুপস্থিতি, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং অবচেতন মনের অন্ধকার গলিপথগুলো তাঁর লেখায় এক অনন্য প্রাণ পায়।
এইচ বি রিতার সাহিত্যে প্রকৃতির উপস্থিতি কেবল জড় নিসর্গ বা নিছক পটভূমি হিসেবে নয়, বরং তা মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তিনি যখন শরতের মেঘ, ঝরা পাতা বা হাড়কাঁপানো হিমের বর্ণনা দেন, তখন তা আসলে মানুষের অবচেতন মনেরই এক একটি স্তর। এখানেই রিতার সার্থকতা যে, তিনি প্রকৃতিকে জীবনের এক শাশ্বত ‘মাইন্ডফুলনেস’ বা পূর্ণ সচেতনতার আধার হিসেবে চিত্রিত করেন। রিতার দৃষ্টিতে প্রকৃতির ঋতুচক্র-যেখানে বিনাশের পরেই নতুনের আবাহন ঘটে, তা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক পরম পাঠ। তিনি দেখান যে, প্রকৃতির মতো মানুষের দুঃখ-বোধও চিরস্থায়ী নয়। এই যে ‘বর্তমান মুহূর্তে’ বেঁচে থাকা এবং নিজের আবেগকে বিচার না করে গ্রহণ করা-যা মাইন্ডফুলনেসের মূল কথা; রিতা তাকে প্রকৃতির রূপকের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজভাবে ফুটিয়ে তোলেন।
কখনো ঝোড়ো হাওয়া তাঁর কলমে হয়ে ওঠে মানুষের মনের অবদমিত ক্ষোভ, আবার কখনো নিস্তরঙ্গ নদী হয়ে ওঠে ধ্যানের নিস্তব্ধতা। তিনি পাঠকদের শেখান কীভাবে প্রকৃতির নিস্তব্ধতাকে নিজের ভেতরের কোলাহল থামানোর দাওয়াই হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। রিতার এই ‘মাইন্ডফুল অ্যাপ্রোচ’ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা নিরসনে এক সূক্ষ্ম অথচ শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে।
একজন পাঠক হিসাবে আমি বলবো, রিতা যখন লেখেন, তখন তাঁর কলম আর কেবল ব্যক্তিগত বিলাসিতার আধার থাকে না; তা হয়ে ওঠে সেই সামষ্টিক আর্তনাদের এক নিরবচ্ছিন্ন অনুবাদক। পুঁজিবাদের এই নখদন্তবিস্তৃত যুগে, যেখানে মানুষের অস্তিত্ব কেবল পণ্যের দামে নির্ধারিত হয়, সেখানে তাঁর কবিতা এক প্রদীপ্ত জবানবন্দি হয়ে জ্বলে ওঠে। রিতার শব্দরা সময়ের বিচারহীনতাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করে, তাকে বাধ্য করে ‘বিচারহীন কাঠগড়া’র আয়নায় নিজের কদর্য মুখটি দেখতে। ‘পঞ্চান্ন বছরের তৃষ্ণা’ তেমনই এক অমোঘ কবিতা-যা কেবল সময়ের খতিয়ান নয়, বরং অর্ধশতাব্দীর জমাটবদ্ধ বঞ্চনার এক শাণিত দলিল।







