নাবিল নিশাত
নির্বাসিত সূর্য
………………..
এই যে আকাশের বুকে প্রতিদিনের আগুন, লক্ষ কোটি বছরের একাকী দহন,
নিজের শরীরে নিজেই জ্বলে যাওয়া, আত্মদাহের অনন্ত যন্ত্রণা।
চারপাশে শূন্যতার মহাসমুদ্র, আলোকবর্ষের দূরত্বে কোনো সাথী নেই,
শুধু অন্ধকারের বিরুদ্ধে একক যুদ্ধ, কখনো শেষ না হওয়া প্রতিরোধ।
প্রতিটি রশ্মি একেকটি আর্তনাদ, যোগাযোগের ব্যর্থ প্রচেষ্টা,
লক্ষ কোটি মাইল ভ্রমণ, তারপর কোনো শীতল পাথরে আছড়ে পড়া।
পৃথিবীর মানুষ সূর্যের উষ্ণতায় উল্লসিত, কিন্তু সূর্যের একাকীত্ব কে বোঝে?
কে শোনে তার নিঃশব্দ চিৎকার, কে দেখে তার অদৃশ্য অশ্রু?
আমরা সবাই সূর্য, নিজেদের শক্তিতে নিজেরাই পুড়ে যাওয়া,
অন্যদের উষ্ণতা দিতে দিতে নিজেদের নিঃশেষ হতে থাকা।
চারপাশে ভিড়, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে সেই একই শূন্যতা,
সেই একই অনন্ত দূরত্ব, সেই একই অস্বীকৃত একাকীত্ব।
প্রতিটি সকাল নতুন প্রতিশ্রুতি, প্রতিটি সন্ধ্যা ক্লান্তির আত্মসমর্পণ,
কিন্তু পরদিন আবার উদিত হওয়া, আবার সেই একই পথ, সেই একই ভার।
কোনো বিশ্রাম নেই, কোনো পলায়ন নেই,
দায়িত্বের শিকল, অস্তিত্বের অভিশাপ, মুক্তিহীন বন্দিত্ব।
আলো দিতে দিতে একদিন নিভে যাওয়াই নিয়তি,
একাকী জ্বলে যাওয়া ছাড়া সূর্যের আর কোনো পরিচয় নেই, মানুষ-ও কি তাই?…
নিঃসঙ্গ সন্ধ্যা
………………..
ওল্ড হোমের করিডোরে হুইলচেয়ারের সারি, নিথর মুখ
জানালার ধারে বসা বুড়ো, সারাদিন রাস্তার দিকে তাকিয়ে
কারো আসার অপেক্ষা, পোস্টম্যানের পদধ্বনি, ফোনের রিং
কিন্তু নীরবতা ছাড়া কিছুই নয়।
দেয়ালে ঝোলানো পুরনো ছবি, সাদাকালো যৌবন
সন্তানদের শৈশবের মুহূর্ত, এখন তারা ব্যস্ত অন্য শহরে,
বার্ষিকী ও জন্মদিনে কার্ড, কর্তব্যের মোড়কে মোড়ানো
সাপ্তাহিক ফোন কল, পাঁচ মিনিট, “আপনি কেমন আছেন বাবা?”
ডাইনিং টেবিলে নির্ধারিত আসন, চারপাশে অচেনা মুখ
একসময়ের রান্নাঘরের রাজা, এখন পরিবেশিত খাবারের প্রাপক।
নিজের বাড়ির চাবি হারিয়ে, ভাড়াটে এক কক্ষে
স্মৃতি ছাড়া নিজের বলে কিছু নেই
রাতে ঘুমের ওষুধ, দিনে রক্তচাপের পিল
নার্সের যান্ত্রিক হাসি, ডাক্তারের রুটিন পরীক্ষা!
তরুণ প্রজন্মের জন্য অপ্রয়োজনীয় বোঝা
পেনশনের টাকায় কেনা নিঃসঙ্গতা
হাতের শিরায় বয়ে চলা ইতিহাস, চোখে দেখা স্বাধীনতা
কপালের ভাঁজে লুকানো সংগ্রাম, কিন্তু কারো শোনার আগ্রহ নেই।
একসময়ের শক্ত কাঁধ, এখন কাঁপা হাত
যে হাত ধরে সন্তানকে হাঁটা শেখানো, সেই হাত এখন লাঠির ওপর নির্ভরশীল
মৃত্যুর অপেক্ষায় দিনগুলো, ক্যালেন্ডারে কাটা তারিখ!
শেষ ইচ্ছা নয়, শুধু একবার নিজের ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা
কিন্তু সেই ঘর এখন অন্যের, সেই বিছানায় অন্যের ঘুম
মৃত্যুও মুক্তি, এই প্রতীক্ষার চেয়ে।
শিকড়হীন বৃক্ষ
………………….
শহরের অসংখ্য জানালায় জ্বলন্ত আলো, প্রতিটি আলোর পেছনে একটি জীবন,
একটি কাহিনী, একটি স্বপ্ন, একটি হাহাকার।
কিন্তু শিকড়? মাটির গভীরে যে অদৃশ্য সংযোগ, সে তো কোথাও নেই,
আমরা ভাসমান মানুষ, উড়ন্ত বীজ, কখনো অঙ্কুরিত না হওয়া সম্ভাবনা।
দাদুর গ্রাম, বাবার শৈশবের গলি, মায়ের স্মৃতির আঙিনা—
সব কিছু ভূগোলের বইয়ের পাতায় বন্দি, গুগল ম্যাপের পিনপয়েন্ট।
কোথায় সেই মাটির গন্ধ যা রক্তে মিশে আছে, কিন্তু নাকে নেই?
কোথায় সেই ভাষা যা স্বপ্নে আসে, কিন্তু জিহ্বায় জড়িয়ে যায়?
এয়ারপোর্টে এয়ারপোর্টে জীবন কাটানো, প্রতিটি শহর একটি ট্রানজিট লাউঞ্জ,
অস্থায়ীতার নিরন্তর স্থায়িত্ব, অপরিচিত হওয়ার ভয়াবহ পরিচয়।
পাসপোর্টে অনেক স্ট্যাম্প, কিন্তু কোনো ঠিকানা নেই,
ভিসার মেয়াদ আছে, কিন্তু সম্পর্কের মেয়াদ কোথায়?
বাচ্চারা দুই ভাষায় কথা বলে, কিন্তু কোনোটাই মাতৃভাষা নয়,
পরিচয় জিজ্ঞাসায় তারা থমকে যায়, উত্তর খুঁজে পায় না।
আমরা তাদের দিয়েছি পৃথিবী, কিন্তু কেড়ে নিয়েছি মাটি,
দিয়েছি ডানা, কিন্তু কেড়ে নিয়েছি বাসা।
প্রতি রাতে ঘুমের আগে মনে হয়—কোথাও একটি গ্রাম আছে যেখানে আমাদের ফিরে যাওয়া উচিত,
কিন্তু সকালে জেগে উঠে মনে পড়ে—সেই গ্রাম হয়তো আর নেই, বা কখনো ছিলই না।
শিকড় ছাড়া বৃক্ষ শুধু কাঠের টুকরো, প্রাণহীন সৌন্দর্য,
আমরা সুন্দর বিদেশি আসবাব, কারো ঘরে শোভা, কারো হৃদয়ে নয়।
দেহপঞ্জি
………….
নিস্তরঙ্গ দিগন্তে, এক দেহ—
রক্তে মৃদু সান্ধ্যলাল, অস্থিতে শীতল ছায়া।
চোখে জমাট নীল, ঠোঁটে গোধূলি-ধূলা।
মুখে অচেনা উপকূল, নাভিতে হারানো ভূগোল।
ত্বকে লবণাক্ত সময়,
বুকে নিঃশব্দ নদী, শিরায় শিরায় রাতের আঁধার।
হাড়ে এক শূন্য মন্ত্র,
মাংসে ধীরে ধীরে নামহীন আহ্বান।
চুলের ভিতর ঘুম ঘুম সমুদ্র,
দূরের কোনো তরঙ্গের অনুকৃতি।
কানের কাছে, নীরবতার গীতিকা—
তিন বিন্দু, তারপর শূন্যতার স্পর্শ।
বুকের নিচে, অস্ফুট প্রতিধ্বনি।
ফুসফুসে কাচের মতো ভোর,
আঙুলে ধরা নিঃশেষিত নক্ষত্রের ধুলো।
চোখের তলায় ছায়াপথ,
এক চিরস্থায়ী ধ্যানের বৃত্তে গাঁথা মুখ।
দেহ— শব্দহীন গৃহ।
ভেতরে নিঃশ্বাসের মতো স্থির প্রতীক,
বাইরে সময়ের মতো স্বচ্ছ পাথর।
রক্ত এক চিত্রফলক,
যেখানে জৈব স্মৃতি ঘন ঘন রঙ।
দেহ— চাবিহীন দরজা,
চামড়ায় ক্যালেন্ডারের মতো খোদিত দিনরাত্রি।
ঘামের ভেতর অতীতের মিহি ছাই,
হৃদয়ের কাছে মৃত জ্যোৎস্নার নীল ছাপ।
জিহ্বায় অব্যক্ত ভাষা,
কণ্ঠে ধুলোর মতো কণ্ঠস্বপ্ন।
দাঁতের ফাঁকে অন্ধকারের টুকরো,
অস্থিতে ইতিহাসের নীরব লিপি।
সবই এক অনুপস্থিত গতি,
অভ্যন্তরে ধীর ধূসর স্থিরতা।
তবু প্রতিটি ছিদ্রে— অস্তিত্বের চিহ্ন,
প্রত্যেক রেখায়— ক্ষয়ের পরিপূর্ণতা।
এক দেহ,
না চলা, না বলা,
কেবল থাকা—
থাকা নয়, থাকা-সম্ভবতার মতো থাকা।
শেষে—
এক নাভির বিন্দু,
অস্তিত্বের অনুনাদ,
চুপচাপ পৃথিবীর মতো স্থির।







