প্রচ্ছদগদ্যধ্রুব এষ

লিখেছেন : কাজী যুবাইর মাহমুদ

ধ্রুব এষ


কাজী যুবাইর মাহমুদ

ধ্রুব এষের কালো আর অন্য পৃথিবীর কালো এক নয়; ধ্রুব এষের নীল আকাশ আর অন্য পৃথিবীর নীল আকাশ কখনোই এক নয়। কতরকম কতরকম কতরকম। শুধু রঙ দিয়ে যে প্রচ্ছদের সিগনেচার তৈরি করা যায় তা ধ্রুব এষ দেখিয়েছেন। ধ্রুবপূর্ব ধ্রুবউত্তর অনেক শিল্পী, ডিজাইনার ও প্রচ্ছদশিল্পীর কাল রয়েছে, কিন্তু ধ্রুব এষ একজন। বাংলাদেশে দুইজন চরিত্র আছেন, এই পৃথিবীর কোনো কিছু তাদের ভার বহন করতে পারে না। একজন ধ্রুব এষ, আরেকজন জেমস। আমার জ্ঞানে, উপমহাদেশে ধ্রুব এষের মত মহান কোনো শিল্পী নাই। উপমহাদেশে জেমসের চাইতে বড় কোনো রকস্টার নাই।

এই দ্রুততম প্রযুক্তির যুগে এসেও, বহু টেকনোলজি, সফটওয়ার ঘেটে। সারা পৃথিবীর ডিজাইন ট্রেন্ড এবং কম্পোজিশন থিউরি জেনেটেনে আমরা যখন কাজ করতে যাই, যখন ছয় বাই নয় ইঞ্চিকে যতভাবে গোছাতে যাই, যত রূপ দিতে যাই… দেখি সমস্ত রূপ ধ্রুব এষ করে গেছেন ৩০ বছর আগে। টাইপোগ্রাফি দিয়ে ছয় বাই নয়, ফটোগ্রাফি দিয়ে ছয় বাই নয়; রং দিয়ে, কোলাজ করা, ইমেজ ম্যানিপুলেশন; সমস্ত খেলা ধ্রুব এষ খেলে গেছেন বহুকাল আগে। ছয় বাই নয়ের সকল আইডিয়া ধ্রুব এষের পরিচিত। আমি ভাবি, নতুন কিছু করি, একেবারে আলাদা কিছু। একবার দুটি শুকনো কাঁঠালপাতার ছবি তুলে একটা প্রচ্ছদ করেছিলাম। করে মনে হয়েছিল পৃথিবীতে নতুন ঘটনার আবিষ্কার করলাম। এরপর একদিন দেখি, “আহমদ ছফার ডায়েরি”র প্রচ্ছদে বহু আগেই এই খেলা ধ্রুবদা খেলে ফেলেছেন।

একবার আমাকে একজন জিজ্ঞাসা করলেন, বাংলাদেশে বড় ডিজাইনার কে? তার প্রশ্নের মধ্যে উত্তরের অপেক্ষা ছিল, ধ্রুব এষ কী না!
না, ধ্রুব এষকে শুধু ‘বড় ডিজাইনারের’ মত ক্ষুদ্রতায় ধারণ করা সম্ভব নয়। ধ্রুব এষের চাইতে ভালো ডিজাইনার অনেক আছে, বড় ডিজাইনার অনেক আছে, বড় শিল্পীও আছে। কিন্তু ধ্রুব এইসব কিছুর অনেক অনেক উর্ধ্বে। ধ্রুব এষ বাংলা প্রচ্ছদশিল্পের গার্জিয়ান। ধ্রুব এষ সকল ধারা শিল্পীদের মা। আমরা যারা প্রচ্ছদ ডিজাইন করি, আমাদের সকলকে তিনি জায়গা দেন কথা বলার, দাওয়াত দেন বাসায় যাওয়ার। আমি অনেক বিখ্যাত বিশালাকার ডিজাইনারদের চিনি, তারা কেবল বিখ্যাত হওয়ার চাপে কখনো মাটিতে পা ফেলতে পারেন না। ধ্রুব এষ রেগুলার চটি পায়ে ফুটপাতে চা খান দৈনিক সংবাদের নিচে।

শুভ জন্মদিন ধ্রুব এষ।

………….

( ৫ বছর আগে ধ্রুবদাকে নিয়ে নিম্নের লেখাটি লিখেছিলাম )

ধ্রুব এষকে চিনতে হলে আপনাকে অন্তত তেত্রিশ বছর বাংলা ব‌ইয়ের সঙ্গে সংসার করতে হবে
……………..

বর্তমানকাল ধ্রুব এষকে নিয়ে একটা ডায়ালগ বাজারে চালু আছে যে, ধ্রুব এষ এখন নিজে কোনো কাজ করেন না, তার হাউজ করে, তার অ্যাসিস্টেন্ট করে।
একটা সিনেমার স্টোরি লিখে একজন, স্ক্রিনপ্লে আরেকজন, এডিটিং, মিউজিক, সবই আলাদা আলাদা জনের। তবু কেন নাম হয় অ্যা ফিল্ম বাই স্টিভেন স্পিলবার্গ?
সৃষ্টিকর্তার কাজ মানে যে কর্তার ধরে ধরে কাজ করার নাম না, তা অনেকেরই বোধদয় হয় না। আমি বাংলাদেশের বিখ্যাত একজন ডিজাইনারের নাম জানি যিনি কম্পিউটারের ডিজাইন বেজড কোনো প্রোগ্রাম জানেন না। তবু দেশের বিখ্যাত ডিজাইনগুলি তাঁর।
হাউজ বা সহকারি দিয়ে কাজ করালে সে কাজ ধ্রুব এষের হইতে আপত্তি কেন, সব কি তার ডিরেকশন আর নির্দেশনায় না? অবশ্যই তার নির্দেশনায় তার হাত লাগানো ছাড়াই কাজ হয়ে থাকে। কোনো কোনো সময় তার ডিরেকশন ছাড়াও যদি সহকারি বা হাউজ কোনো কাজ করে থাকে, সে কাজও ধ্রুব এষেরই।
আবছা মনে থাকা একটা গল্প বলি, ডার্কনাইট সিনেমায় হিথ লেজার যখন তার চরিত্রের অনেক গভীরে ঢুকে পড়ে, যা নোলান নিজেই ধরতে পারে লেজারের গভীরতা। নোলান এইটাও জানতো হিথ লেজারেরও ডিরেকশনের যোগ্যতা আছে। তো, ডার্কনাইটের কোনো সিকোয়েন্সে নোলান ডিরেকশনের দায়িত্ব দিলেন লেজারকে। নোলানের অনুপস্থিতিতেই লেজার শট নিয়ে তার যোগ্যতার প্রমাণ দিছেন। নোলান জানতেনই না এইরকম স্ক্রিপ্টের বাইরে গিয়ে লেজার কিছু শট নিছেন, যখন দেখা গেল, স্ক্রিপ্টের বাইরে গিয়ে হিথ লেজারের নেয়া শটগুলি যখন চরিত্রের ভিতরে আরও বেশি গভীরতা প্রকাশ ঘটাচ্ছিল, নোলান সেইসব চিত্রায়নগুলাও বাদ দেন নাই। এবং অ্যা ফিল্ম বাই ক্রিস্টোফার নোলান।
ধ্রুব এষের কালো রং আর অন্য সবার কালো রঙের মত না। ধ্রুব এষের নীল, তার লাল, তার হলুদ, তার ফন্ট, তার কম্পোজিশন সবকিছুতেই তার সিগনেচার থাকে। এইসব সিগনেচারের ব্যতিক্রম না করে ধ্রুব এষের ডিরেকশন ব্যতীতও, যেখানে ধ্রুব এষ শুধু বলবেন “ঠিক আছে”, অর্থাৎ ওকে এটা ধ্রুব, সে কাজ ধ্রুব এষের।
ওদিন কাকে যেন বলেছিলাম, ধ্রুবদার কাজের সৌন্দর্য খুঁজে পাবেন দুই শ্রেণির লোক, শিল্প না বোঝা সাধারণ সৌন্দর্য চেনা লোক এবং চূড়ান্ত শিল্প বোঝা ও সৌন্দর্য চেনা লোক, মিডলক্লাস কোনদিন ধ্রুব এষের কাজের ভিতর শিল্প খুঁজে পাবে না, পাবে না।
তবে যে সত্য এখনও কেউ ছড়ায় নাই তা হইলো ধ্রুব এষের কোনো হাউজ নাই, তার কোনো অ্যাসিস্টেন্টও নাই। ধ্রুব এষের অ্যাসিস্টেন্ট হওয়ার জন্য আরেকজন ধ্রুব এষ লাগবে। ক্রিস্টোফার নোলানের অ্যাসিস্টেন্ট থাকলেও ধ্রুব এষের অ্যাসিস্টেন্ট এখনও তৈরি হয় নাই কোথাও।
.
নাসির আলী মামুনের ফটোগ্রাফি দিয়ে আল মাহমুদের একটা বইয়ের কাভার ধ্রুব এষ করছিলেন, যেইখানে কাভার বলতে শুধু নাসির আলী মামুনের ফটোগ্রাফিটাই, আর কিছু না, তার উপর শুধু পায়রা ফন্টে বইয়ের নাম লেখা। এই দেখে লোকেরা হতাশ হয়ে বলে, কীভাবে এটা ধ্রুব এষের কাভার হয়, যেটার পুরাটাজুড়েই নাসির আলী মামুন?
উত্তর হলো, নাসির আলী মামুনের সেই ফটোগ্রাফি দিয়ে আপনি নিজের মত ফন্ট ব্যবহার করে কভার তৈরি করে দেখেন, তাহলেই বোঝা যাইবে একটা ফটোগ্রাফির উপর কেবল ফন্টে বইয়ের নাম লেখার ভিতর কী রহস্য!

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা