ইসরাইল খান
১৯৩৩ সালে প্রকাশিত “ছায়াবীথি” পত্রিকার একটি দুষ্প্রাপ্য রচনা উদ্ধৃত করে বাংলা সাহিত্যের অমর কবি জসীমউদদীন স্মরণে— শ্রদ্ধার্ঘ্য
[ এই রচনাটির প্রতি সুস্থির দৃষ্টিপাতে আমি খানিকক্ষণ বিহব্বল হয়ে পড়েছিলাম। কলকাতা থেকে প্রকাশিত নাজিরুল ইসলাম সম্পাদিত যে ‘ছায়াবীথি’ পত্রিকায় সমালোচক শ্রীবিনয়কুমার সরকার ‘নকসী কাঁথার মাঠ’-কে “মহাকাব্য“ বলে উল্লেখ করেছিলেন, সেই ছায়াবীথি ছিল নজরুলের আশীর্বাদপুষ্ট। তখন জসীমউদদীন তিরিশ বৎসর বয়োক্রম অতিক্রম করেন নি। রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যজগতের সম্রাটরূপে অধিষ্ঠিত। আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসুরা দোর্দণ্ড প্রতাপশালী কুশিলব। খানিকক্ষণ ভেবে আমি আলোচক বিনয়কুমার সরকারের সাথে ঐকমত্য পোষণ করে ভাবি–ঠিকইতো বিষাদ সিন্ধু যেমন মহাকাব্যিক গুণবিশিষ্ট উপন্যাস, তেমনি বাংলা লোকজীবনের কাহিনী অবলম্বনে লিখিত নকসী কাঁথার মাঠে ও তো রয়েছে মহাকব্যিক উপাদান। আলোচক সাহস করে তরুণ কবি জসীমউদদীনের সৃষ্টিকে স্পষ্ট করেই মহাকাব্য বলার মধ্যদিয়ে প্রকারান্তরে জসীমউদদীনকে ‘মহাকবি’-ই বলে দিয়েছেন। কিন্তু রবীন্দ্র-নজরুলের যুগে মধুসূদন-হেম-নবীন-কায়কোবাদের পরে নতুন কোনো মহাকবিকে চিহ্নিত করার প্রয়াস গ্রহণ করা সম্ভব হয় নি। কিন্ত জসীমউদ্দীনের দীর্ঘতম কবিতাগুলোর সমন্বয়ে একটি ‘‘মহাবাঙ্গালা’’ মহাকাব্য তো হয়েই যায়,— নয় কি?
কবির প্রতি গভীর ভালোবাসার আবেগ-উচ্ছ্বাসে আমার কথা ভেসে যেতে পারে, তাতে কিছুই এসে যাবে না। কিন্তু আমার চিন্তাতে এসব অলস ভাবনা সৃষ্টিতে যে লেখাটি ক্রিয়া করেছিল– তার গুরুত্ব নিশ্চয়ই হ্রাস পাবে না।]
নকসী কাঁথার মাঠ//শ্রীবিনয়কুমার সরকার
অনেক দিন পর বাংলা ভাষায় লেখা একটা “মহাকাব্য” পড়িলাম । মহাকাব্যটার বহর হাজার লাইনের মাত্রা
ছাড়াইয়া যায় না ইহা জসীমউদদীনের “নক্সী কাঁথার মাঠ” । চোদ্দটা ছোট ছোট সর্গে এই মহাকাব্য গঠিত।
ইহার ভিতর গল্প আছে, ইতিহাস আছে। তাহা ছাড়া আরও অনেক কিছু আছে, – হিংসা আছে, ভালবাসা আছে । দৃশ্য বর্ণনায় কবি সিদ্ধহস্ত। মানুষ গড়িতেও তিনি কম ওস্তাদ নন। অধিকন্তু সমাজের গোড়ার কথাটাও তাঁহার কবজার ভিতর আছে । এই জন্যই দেখিতেছি,—
“এ গাঁর লোক করতে খরব
ও গাঁর লোকের বল
অনেক বারই লাল করেছে
জলীর বীলের জল ।”
কবি অবশ্য পল্লীজীবনের সৌন্দর্য্য দেখিতে অভ্যস্ত। যে কবির কলমে বাহির হইয়াছে “লাল মোরগের পাখার
মত ওড়ে তাহার শাড়ী” তাহাকে বঙ্গসাহিত্য ভুলিবেন না। আর যে বাঙালী জাত আজও ভাঁড়ু দত্তের রসে মশগুল সেই বাঙালী জাত জসীমউদদীনের দুখাই ঘটককে চিরকালই নিজের করিয়া রাখিবে। এই ঘটকের অভিযান আঁকিয়াছেন কবি নিম্নরূপে,—
“দুখাই ঘটক নেচে চলে,
নাচে তাহার দাড়ী,
বুড়ো বটের শিকড় যেন
চলেছে গড়ি’ গড়ি’।”
জোর জবরদস্তি করিয়া বঙ্গ পল্লীর খাল বিল আর মিঞা সাহেব গুলিকে ছন্দের ভিতর আনিয়া খাড়া করার মতলবে “নক্সী কাঁথার মাঠ” যুবক বাঙলায় দেখা দেয় নাই। ইহার জন্ম হইয়াছে একসঙ্গে রকমারি রস চাখিবার ও চাখাইবার ক্ষমতাওয়ালা স্বাভাবিক কবিত্ব সম্পন্ন চোখ কান খোলা দরদী লেখকের আত্মপ্রকাশের তাড়নায় ৷ জসীমউদদীন স্রষ্টা,—একটা জগৎ সৃষ্টি করিবার শক্তি লইয়া জন্মিয়াছেন । অন্যান্য অনেক বাংলা কবিতা মরিয়া ভূত হইয়া যাইবার পরও “নক্সী কাঁথার মাঠ” টিকিয়া থাকিবে ।
এই কবি রূপ দেখিতে পারেন, শব্দ শুনিতে পারেন, গন্ধ শুঁকিতে পারেন। স্পর্শের তড়িতেও তাঁর জীবন
সাড়া দেয় ৷ এই সবেই তাজা ব্যক্তিত্ব আর অকপট সত্যনিষ্ঠা ধরিতে পারিতেছি। বিশেষ কথা—এই সব
ছাড়াইয়া উঠিবার ক্ষমতাও তাঁহার আছে। বিষাদের রসে ভিজাইয়া তিনি এই “এপিক” খানার প্রাণ প্রতিষ্ঠা
করিয়াছেন। যখন পড়িলাম,—
“মোর যত ব্যথা, মোর যত কাঁদা
এরি বুকে লিখে যাই,
আমি গেলে মোর কবরের গায়
এরে মেলে দিও তাই ।
মোর ব্যথা—সাথে তার ব্যথা খানি
দেখে যেন মিল ক’রে,
জনমের মত সব কাঁদা আমি
লিখে গেনু কাঁথা ভরে।”
তখন বুঝিলাম যে, জীবনের নিবিড়তর পরদায় ঘা মারিতেও কবি বেশ কিছু পাকা। যাঁহারা পল্লী-বিষয়ক প্রপাগাণ্ডা মাত্রের কবি অথবা ম্যালেরিয়া নিবারণী সভা জন্য কিম্বা নৃতত্ত্ব গবেষণার উদ্দেশ্যে পল্লীপথের বই লিখিয়া থাকেন, তাঁহাদের হাড়ে এই সুর বাহির হইতে পারে না । জসীমউদদীন হাজার লাইনের ভিতর বিভিন্ন রকমের ওস্তাদি দেখাইয়াছেন । এমন কি কাঁদাইতেও পারিয়াছেন। এই কথাটার কিম্মৎ ঢের ।
বস্তুতঃ নেহাৎ কাঠ খোট্টা বস্তুনিষ্ঠার কবি জসীমউদদীন দিল ছাড়িয়া দিতে প্রস্তুত নন। কল্পনার খোরাক জোগাইবার ক্ষমতাও তাঁহার আছে। তাই “ধানখেত” বইয়ের সব কয়টা কথাই একদম ধান-ভানার ব্যবসা অথবা খেত খামারের হিসাবে ভরপূর নয় । পড়িতেছি,—
“হয়ত সে কোনো শস্যের খেতে ঘুমায়ে রয়েছে আজ
হিজলের বনে ছড়ায়ে তাহার গায়ের রঙীন সাজ, –
হয়ত সে কোনো বেগানা-গাঁয়ের কৃষাণ ছেলের সনে,
বেথুল কুড়ায়ে ডুমকি বাজায়ে ফিরিছে বিজন বনে।’’
আর বুঝিতেছি যে এই কবির নিকট ফরিদপুরের পল্লী-প্রকৃতি ফরিদপুরকে অতিক্রম করিয়াও মানুষের সঙ্গে
প্রকৃতির সমপৌতা কায়েম করিতে সমর্থ। কবি চামড়ার চোখ দিয়া দুনিয়াটাকে দেখিয়াই চুপ করিয়া বসিয়া থাকেন নাই। হিজল আর বেথুল গুলা তাঁহার চোখের ভিতর দিয়া চিত্তে গিয়া ঘর করিয়া বসিয়াছে ।
অপর দিকে মামুলি দৃশ্য বর্ণনায়ও জসীমউদদীন নিজের পথ কাটিয়া বাহির করিতেছেন। একটা পুরাণা পুকুর দেখিয়া কবি বলিতেছেন :—
“সন্ধ্যা সকালে আসিত যাহারা
কলসী লইয়া ঘাটে,
তারা সবে আজি বিদায় নিয়েছে
মরূণ পারের হাটে ।
বক্ষমুকুরে সোণা মুখখানি
দেখিবারে কেহ নাই,
কচুরী পানায় আধ বুকখানি
ঢাকিয়া রেখেছে তাই।”
এই কয় লাইনে একটা ছোট খাটো নাটকই যেন দেখিতেছি। এক কথায় অতীত, আর এক কথায় বর্তমান
জ্বঅপর দিকে মামুলি দৃশ্য বর্ণনায়ও জসীম উদ্দীন নিজের জ্বলজ্বল্ করিতেছে। বিপরীত রসওয়ালা এই দৃশ্য পাশাপাশি বসাইবার ক্ষমতাটা বঙ্গ-কাব্যে যারপর নাই তারিফ যোগ্য ।
অল্প কথায় বেশী বলিবার বুঝাইবার বা ইঙ্গিত করিবার শক্তি জসীমউদদীনের নানা রচনায় দেখিতে পাইলাম।
কাব্য-শিল্পে এইরূপ সংযমপ্রিয়তা যুবক বাঙালার একটা নবীন সাহিত্য-শক্তি। কবি বাঙালীর জীবন আর বাঙলাকে শিল্পের সামগ্রী মাত্র রূপে ব্যবহার করিবার,—এক কথায় খেয়াল মাফিক মূর্ত্তি দিবার বাহাদুরিও বিশেষরূপেই উল্লেখযোগ্য । এই বাহাদুরির পরিচয় পাইতেছি বলিয়াই ভাবিতেছি যে বাংলা কাব্যের আর মার নাই ।#
মণি-মঞ্জুষা/ছায়াবীথি পৌষ ১৩৪০







