প্রচ্ছদগদ্যমানসুর মুজাম্মিলের মৃত্যু : কিছু প্রীতি, কিছু স্মৃতি

লিখেছেন : মুহাম্মদ নিযামুদ্দীন

মানসুর মুজাম্মিলের মৃত্যু : কিছু প্রীতি, কিছু স্মৃতি

মুহাম্মদ নিযামুদ্দীন 

ছড়াকার মানসুর মুজাম্মিল আর নেই। মর্ত্যের মায়া ত্যাগ করে মহান মাবুদের মেহমান হয়েছেন আজ ভোরে। রোগে আক্রান্ত হয়ে গত কয়েক বছর প্রায় অচলই ছিলেন তিনি। চলার বলার কোনো শক্তিই ছিলোনা বলতে গেলে। হয় হাসপাতাল, কিংবা বাসার বিছানা – এই ছিলো তাঁর ঠিকানা। অবশেষে সেই সব ঠিকানা পরিবর্তন করে – চলে গেলেন চিরতরে পরপারে। 

মৃত্যু এমন এক সত্য, যে সত্যের মৃত্যু নেই। বাংলা কবিতায়ও বলা হয়েছে – ‘জন্মিলে মরিতে হইবে, অমর কে কোথা ভবে’! জন্ম মানে মৃত্যুর কাছ থেকে কিছু সময় ধার নেওয়া। দার্শনিক ঈমাম গাজ্জালী (র.)- কে একজন প্রশ্ন করেছিলেন, মৃত্যুর চিহ্ন কি? তিনি এক শব্দে এর চমৎকার ও চিন্তাযুক্ত জবাব দিয়েছিলেন— জন্ম! ফারসি একটি প্রবাদ আছে— ‘জেন্দেহ – ইম কে বেমিরিম’, যার মানে– ‘মৃত্যুবরণ করার জন্যই তো বেঁচে আছি’। জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য কি, তা নির্ণয় করতে গিয়ে এক উর্দু কবিতায় বলা হয়েছে, “জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য এই –কেউ চোখ খুললো, কেউ চোখ বন্ধ করলো”। আখেরাতের অনন্ত জীবনের কথা চিন্তা করলে দুনিয়ার জীবন মুহূর্তের জীবনের চেয়ে বেশি কিছু নয়। তারপরও কারো নেই ভয়। করছি সময়ের সীমাহীন অপচয়। সময় কিভাবে এত দ্রুত চলে যায়, কেউ বলতে পারেনা হায়!  সেজন্যই একজন বুজুর্গানে দ্বীন জীবনের এই সময় সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, “সময় হচ্ছে বরফখণ্ডে মতো। দ্রুত গলে যায়। সে-ই বুদ্ধিমান, যে তাকে আগে ধরতে পারে”। অর্থাৎ যে কিনা সময় সচেতন। এসব কথা করলে বিবেচনা – মর্ত্য হলো মুসাফিরখানা – আখিরাত হলো মানুষের আসল ঠিকানা। কেউ কেউ মনে করেন, মৃত্যু বুঝি শেষ। না, মৃত্যু শেষ নয়, শুরু। মৃত্যুর পর আর মৃত্যু নেই। কর্মফল অনুযায়ী কেউ যাবে জান্নাতে, কেউ জাহান্নামে। 

বোঝা যায়, কর্মফলই আসল। এই কর্মফল নির্ধারিত হবে জাগতিক জীবনের কর্মের ওপর। অর্থাৎ যেমন কর্ম, তেমন ফল। ভালো কাজ করলে ভালো ফল, খারাপ কাজ করলে খারাপ ফল। জন্ম ও মৃত্যুর মাঝখানে দুনিয়ার এই যে দুদিনের জীবন – কেউ হেলায় খেলায় কাটায়, কেউ ভালো কাজে লাগায়। যেহেতু মানুষ পরম প্রভুর প্রতিনিধি, যারা প্রকৃত প্রতিনিধি, তাদের প্রতিটি মুহুর্ত যায় শিক্ষায়, দীক্ষায় ও পরীক্ষায়। যারা প্রকৃত প্রজ্ঞাবান, তারা সময়কে ঐ তিন ক্ষেত্রে যথাযথভাবে কাজে লাগান। যার ফলে তারা কি পৃথিবীতে, কি পরলোকেও হন লাভবান। মানসুর মুজাম্মিলও ছিলেন তেমনি একজন। রক্তের আত্নীয় না হলেও কথায় ও কাজে ছিলেন তিনি সুজন ও স্বজন। আকাশের মতো উদার ও উজ্জ্বল ছিলো তাঁর মন। আজকের এই অনুদার বিশ্বে এমন হতে পারে ক’জন! 

তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয় – প্রত্যক্ষ নয় – পত্রের মাধ্যমে। সেটা ১৯৯৪ সাল। সেই সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত হয়েছিলো আমার সম্পাদিত সাহিত্যপত্র ‘উপমা’– আল মাহমুদ সংখ্যা। সংখ্যাটি সূর্যালোক দেখার সাথে সাথেই সারা দেশে সাড়া পড়ে যায়। সাড়া পড়ে যায় দেশের বাইরেও। তখন আমার উত্তর পতেঙ্গাস্থ অফিসের ঠিকানায় প্রতিদিন আসতে থাকে প্রাজ্ঞজনদের প্রচুর পত্র। তেমনি একটি পত্র পাই মানসুর মুজাম্মিলের। তাতে ছিলো আমার সম্পাদিত ‘উপমা’– আল মাহমুদ সংখ্যার প্রবল প্রশংসা এবং তিনি যে আল মাহমুদের একজন অন্ধ ভক্ত, সেকথাও ছিলো তাতে ব্যক্ত। এরপর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর সাথে হতো দেখা, যেসব পত্র-পত্রিকায়  প্রকাশিত হতো আমাদের উভয়ের লেখা। এই দেখাকে বলা যায়— লেখার মাঝে দেখা। তখন ‘ছড়া-পত্রিকা’ ছিলো  ছড়া বিষয়ক একটি পাঠক নন্দিত পত্রিকা। মাহবুবুল হাসান সম্পাদিত সেই পত্রিকার প্রায় প্রতিটি সংখ্যায় প্রকাশিত হতো ছড়া বিষয়ক আমার বিভিন্ন প্রবন্ধ নিবন্ধ। মানসুর মুজাম্মিলের ছড়াও প্রকাশিত হতো পত্রিকাটিতে। ছড়ার প্রতি তাঁর ও আমার এই যে প্রীতি – আল মাহমুদ প্রীতির পর এই প্রীতিও মুগ্ধ করে তোলে পরস্পরকে পরস্পরের প্রতি। 

স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে,  তাঁর সাথে আমার প্রথম দেখা হয় চট্টগ্রামের ধনিয়ালাপাড়াস্থ বায়তুশ শরফ-এ। ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালন উপলক্ষে তিনদিনব্যাপী আয়োজনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিলো সম্ভবত সেদিন। কিংবা লেখক সম্মেলন। মাসিক ‘দ্বীন-দুনিয়া’ সম্পাদক ও লেখক মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ’র আমন্ত্রণে আমি সেই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। তাঁর সাথে আমার পরিচয় অনেক আগের। যখন তিনি ইসলামী সংস্কৃতি কেন্দ্র, চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘সাম্পান’ সম্পাদনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, তখন থেকে। কবি ও প্রাবন্ধিক চৌধুরী গোলাম রব্বানীও সম্পৃক্ত ছিলেন। তখন ঐ কেন্দ্রের পরিচালক ছিলেন ভাষাসৈনিক ও তমদ্দুন মজলিসের একসময়ের অন্যতম ত্যাগী নেতা প্রিন্সিপাল আশরাফ ফারুকী। যা বলছিলাম। বায়তুশ শরফে যে বছর  অনুষ্ঠানটি হচ্ছিলো, সে বছর কি পীরে বায়তুশ শরফ মওলানা আবদুল জাব্বার সাহেব জীবিত ছিলেন? সঠিক স্মরণে আসছেনা। তিনি জীবিত থাকলে তিনি, নয়তোবা তাঁর পরবর্তী পীর মওলানা কুতুবউদ্দিন সাহেব অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেছিলেন। অবশ্য দিনলিপি দেখে লিখলে সন্দেহের এই দোলা থাকতোনা। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে কি এক কারণে আমি দাঁড়িয়ে পেছনের দিকে তাকালেই দেখি কয়েক সারি পেছন থেকে একজন আমার দিকে হাত নেড়ে ইশারা করছে। মুহূর্তের মধ্যে মানুষটি আমার সামনে চলে আসেন এবং নিজের পরিচয় প্রদান করেন এই বলে— আমার নাম মানসুর মুজাম্মিল, ছড়া লিখি। অতঃপর আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, আপনি নিশ্চয়ই মুহাম্মদ নিযামুদ্দীন ভাই – ‘উপমা’ সম্পাদক। আমি হ্যা সূচক উত্তর দেওয়ার পর তিনি আন্তরিক উষ্ণতায় আমার দিকে এগিয়ে দেন তাঁর ডান হাত। আমিও ডান হাত এগিয়ে দিলে উভয় হাতের উষ্ণতায় হয় মর্দন, যাতে ভালোবাসায় ভরে ওঠে উভয়ের মন। তারপর তিনি আমার পাশে বসেন। অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি আমার পাশেই ছিলেন। যতক্ষণ অনুষ্ঠানে ছিলাম, অন্তরঙ্গ আলাপে জমিয়ে রেখেছিলেন। আলাপের অধিকাংশ জুড়েই ছিলো সাহিত্য, বিশেষ করে ছড়া। তখন বুঝতে বাকি থাকেনি তিনি কতটা ছড়া-পাগল! নইলে পকেটের পয়সা খরচ করে, সময় নষ্ট করে, কষ্ট করে কে আসবেন সূদুর ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দিতে! তার জন্য আবেগ ও পাগলামি লাগে। আমি তো চট্টগ্রামে বাস করেও চট্টগ্রামের অধিকাংশ অনুষ্ঠানে যেতে পারিনা। হয় এই কাজ, নয় ঐ কাজ। তাছাড়া গেলেও বিপদ। লিখতে একটুআধটু যা পারি, বলতে গেলে ভালো করে বলতে পারিনা। দর্শক শ্রোতারা আমার অন্তহীন অজ্ঞতা দেখে কি ভাববে, এই ভয় কাজ করে মনের মধ্যে। সেদিন অনুষ্ঠানে পাশাপাশি বসা আমাদের দুজনের ছবি ‘দ্বীন-দুনিয়া’র পরবর্তী সংখ্যায় ছাপিয়েও দিয়েছিলেন প্রিয় মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ। 

মানসুর মুজাম্মিলের সাথে আমার সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয় ২০০৫ সালে। তখন আমার ছড়া বিষয়ক প্রবন্ধ নিবন্ধের বই ‘ছড়া-চিন্তা’ বেরিয়েছে সবেমাত্র। ছড়াকার ও ‘নোঙর’ সম্পাদক মুহম্মদ নাসির উদ্দিন ও ছড়ার ছোটকাগজ ‘প্রতীকী’ সম্পাদক মিজানুর রহমান শামীম ‘প্রতীকী’র ব্যানারে আয়োজন করেন বইটির একটি প্রকাশনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানস্থল নগরীর সাগরিকা মোড় সংলগ্ন সাগরিকা ক্লিনিকের অডিটরিয়াম। অনুষ্ঠান আরম্ভ হওয়ার সাথে সাথে যে অডিটোরিয়াম কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যাবে, তা আমি ভাবতেও পারিনি। চট্টগ্রামের  খ্যাতিমান ছড়াকারদের অনেকেই অত্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানকে উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত করেছিলেন। বগুড়া  থেকে এসেছিলেন ‘স্বল্পদৈর্ঘ্য’ সম্পাদক সাজ্জাদ বিপ্লব (বর্তমানে মার্কিন প্রবাসী) এবং ঢাকা থেকে এসেছিলেন ছড়াকার মানসুর মুজাম্মিল। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিলো, উক্ত অনুষ্ঠানে সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত নন এমন কেউ উপস্থিত ছিলেন না। সবাই ছিলেন কোনো না কোনো ভাবে সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত। নতুন বউয়ের ঘোমটা উন্মোচন যেমন হয় তার বরের জন্য বেমেসাল আনন্দের, তেমনি নিজের নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের সেই দিনটিও ছিলো আমার জন্য তেমন আনন্দের। অনেক আলোচকের মতো মানসুর মুজাম্মিলও সেদিন আমার ‘ছড়া-চিন্তা’ বইটির ওপর মনোজ্ঞ আলোচনা করে আমাকে ঋদ্ধ ও মুগ্ধ করেছিলেন। 

এরপর তাঁর সাথে আমার সামনাসামনি দেখা না হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর সাথে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। তিনি আমার লেখা পড়ে প্রতিক্রিয়া জানাতেন, আমিও তাঁর লেখা পড়ে প্রতিক্রিয়া জানাতাম। তবে নিজের ব্যস্ততম বাস্তবতার কারণে সে ক্ষেত্রে আমি ছিলাম তাঁর থেকে পিছিয়ে। সবসময় তাঁর লেখা পড়া, পড়ে প্রতিক্রিয়া জানানো সম্ভব হতোনা। এতে তিনি রাগ করতেন এবং রাখাঢাক না করেই সেই রাগ প্রকাশ করতেন। আমি তাঁর এহেন প্রতিক্রিয়া দেখে রাগ করতাম না। বরং ভাবতাম, রাগ তো অনুরাগেরই অংশ। যার অন্তরে আছে অনুরাগ, সে-ই তো করতে পারে রাগ। তিনি পত্র লিখে ও ফোন করেও আমার সাথে যোগাযোগ রাখতেন। একবার তিনি তাঁর একটি ছড়াগ্রন্থও অটোগ্রাফ  সহকারে আমার জন্য উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন।  সেসব যেন আজ স্মৃতি। সেই প্রীতির মানুষটি বয়সে আমার থেকে ছোট হওয়ার পরও আমার আগে স্মৃতি হয়ে যাবেন, তা কখনো কল্পনাও করিনি। কিন্তু আগে পরে সবাইকে তো কোনো না কোনো ছলে চলে যেতেই হবে। আমি তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং মহান আল্লাহর দরবারে তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করে এই লেখার লাগাম টানছি। আমিন। 

১২/০৪/২০২৬

রাত ৮ টা ৩৮ মিনিট।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা