সালেহ রিয়াজী
পৃথিবী ভস্মীভূত হয়ে যাক ভিসুভিয়াসের লাভায় কিংবা দুর্ভোগে, অন্যায় যুদ্ধে, জন নিপীড়নে খন্ড বিখন্ড দগ্ধ ভোজ্য মানব শরীরে নামুক ফ্যাসিস্ট শকুন তারপরও শিল্পের বোধিবৃক্ষের নিচে আত্মনিমগ্ন কবির নিমীলিত চোখ ধ্যানগ্রস্ত বুদ্ধের পাথুরে মূর্তির চোখের মত আর খোলা হয় না, নিশ্চুপতাকেই শ্রেয় মনে করে যেসব কবি ও সুকুমারবৃত্তির চর্চাকারীর দাবিদার তাদেরকে মনুষ্যত্ববিবর্জিত পুতিগন্ধময় শিল্পের ভাগাড়ে নিক্ষিপ্ত করে তরুণ কবি তাজ ইসলামের লেখা কাব্যগ্রন্থ ‘বাংলা বসন্ত’র মরুঝড়।
‘মিছিলের কবি’ কবিতার অংশ :
নে শুয়োরের বাচ্চা গুলি কর
এই দেশ আমার, এই দেশ কারো বাপের পৈতৃক সম্পত্তি না।…….
………….
যারা মিছিলে যেতে জানে
যারা স্লোগান দিতে জানে
তারা ময়দানের স্বভাব কবি
দ্রোহ পঙক্তি রচিত হয় তাদের মুখে মুখে।
……..
দালাল কবি, নির্লজ্জ অধ্যাপক,
বদমাইশ ডক্টর বিবেক বন্ধক দেওয়া রাজনৈতিক চ্যালা,
তেলবাজ মিডিয়াকর্মী,
কপালে লাল টিপের নারীবাদীর মতো
তারা পিচ্ছিল কথার ধার ধারে না ।
কিছু কবিতা তামাদি হয় না। প্রোথিত বীজের মত মাটি ভেদ করে ঊর্ধ্বমুখী হয়। আকাশকে স্পর্শের জন্য তাড়িত হয়ে সহস্র শাখায় ছড়িয়ে পড়ে। বইটির প্রথম কবিতাটিতে
কয়টি ছত্র মাটিতে প্রোথিত মাইনের মত বিস্ফোরণ্মুখ :
‘জেনে রেখো রাক্ষসপুরীর রানী
এই আগুনে তোমার শাড়ি ও সিংহাসন
পুড়ে ছাই হয়ে যাবে
আজ অথবা আগামীকাল’
কবির অন্তর্গত বিধ্বংশী দ্রোহের প্রবল শক্তিই এই শব্দগুলোকে সারিবদ্ধ করে। কবিও এক সেনানায়ক। যার অভিপ্রায়ে শব্দরা সুসংবদ্ধ যোদ্ধায় পরিণত হয়। এ উচ্চারণ শুধু স্বদেশে নয় সমগ্র পৃথিবী জুড়ে জালিমের বিরুদ্ধে ছড়িয়ে পড়া মজলুমের উজ্জীবনী সমরাস্ত্র।
স্মৃতি বিলুপ্ততার এক ধারালো ছুরি নিরন্তর হনন করে এ দুর্ভাগা জাতির কৃতজ্ঞতা বোধকে। রাজপথে লক্ষ তারুণ্যের আত্ম বলিদানের জমাট টকটকে রক্ত দ্রুত শুষ্ক ও ধূসর হয়ে ওঠে সুযোগসন্ধানী রাজনীতিক অবিমৃষ্যতায়।
কবি আক্ষেপ করেন ‘রঙিন মাছের শহরে’ কবিতায় :
‘রঙিন মাছের শহর,
মাছেদের মাথা থেকে খুলে ফেলা হয়েছে স্মৃতির এপস
গতকাল ভুলে থাকা তাদের কাছে ডাল ভাত তুল্য।
একুরিয়ামের মাছ,
বন্দী পানিতেই সমস্ত সুখ তার।
দ্রুত ভুলে গেছে জুলাই-আগস্ট
সে এখন রঙিন মাছের শহরে
আনন্দে কাটছে সাঁতার। ‘
সাম্রাজ্যবাদী, আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে যুগ-যুগান্তরের দাসত্ব প্রবণতায় প্রণত রাষ্ট্রিক কাঠামোর ভিতর থেকে একজন কবির কবিতার দূর্বিনীত উক্তির নির্মাণ উদ্বেলিত করে যে কোনো ভূখণ্ডের নিপীড়িত ক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠীর অন্তরাত্মাকে।
‘ভারত, ক্ষমা চাও’ কবিতায় কবি ব্যবচ্ছেদ করেন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সভ্যতা বিবর্জিত ঘাতক সত্তার সমর্থন ও নিষ্ঠতা।
ভারত! তুমি আন্তর্জাতিক সভ্যতা মান, মানতে হবেই
নতুবা বাংলাদেশ তোমার মুখে থুতু নিক্ষেপ করবে।
আমরা রক্ত দিয়ে এই দেশ এনেছি
কোন অসভ্য শুয়োরের বাচ্চাকেই আমরা ভয় করি না।
আমিই বাংলাদেশ
বুকের রক্ত দেব,তবু মাথা নোওয়াব না ।
ভারত! তুমি সভ্য হও
ক্ষমা চাও।
বাংলাদেশ মাথা নোয়াবে না।
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
(কবিতা ‘ভারত, ক্ষমা চাও’ )
এক ধরনের তন্ময়তা গ্রাস করে যখন গোলামের ঘরের গোলামের পুতেরা কবিতার এই অংশটুকু পঠিত হয়:
সে ভাবছে তার আম্মার কথা ।
তার আম্মা নিরেট কিষাণী।
নিরক্ষর মানুষ বর্ণমালার সামনে তিনি অন্ধ ও মুক।
হরফের ভাষা তার কাছে দুর্বোধ্য।
হরফের পথ ‘দুর্গম গিরি কান্তারমরু’ ।
আম্মা কি তবে গণ্ডমূর্খ!
তা কি করে হয়!
আম্মা তো ঠিকঠাক পাঠ করেন
প্রতিনিয়ত আব্বাকে।
আব্বার রাগ অভিমান প্রেম ভালবাসা ভোরের দহলিজে
ক্বারী সাবের কোরান তেলাওয়াতের মত
আম্মা পাঠ করে যান সুরেলা সুরে।
…..
মা রেগে গেলে বলতেন
গোলামের ঘরের গোলাম।
তন্ময়তা ভেঙে যায়। এই কবিতা দৃশ্যমান করে তোলে শতাব্দীর পর শতাব্দী আমাদের গলায় পড়া গোলামীর জিঞ্জির।
বইটির প্রচ্ছদ করেছেন৷ : আল নোমান। প্রকাশ করেছেন : কবি ও সম্পাদক সাজ্জাদ বিপ্লব।
পুরো বইটি আমি কয়েকবার পড়েছি। কবিতার বই হিসাবে এই বইটি পঠনের অনিবার্যতাকে আমি অস্বীকার করতে পারি। কিন্তু একটি নিপীড়িত আত্মবিস্মৃত জনগোষ্ঠীর মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ন্যায্যতায় অধিষ্ঠিত করতে এই বইটির পঠন আমি অনিবার্য মনে করি।








অসাধারণ অনিন্দ্য সুন্দর