প্রচ্ছদগদ্য'কসম অপরাহ্ন বেলার' : এক অনন্তযাত্রার কাব্যপাঠ

লিখেছেন : নাবিল নিশাত

‘কসম অপরাহ্ন বেলার’ : এক অনন্তযাত্রার কাব্যপাঠ

নাবিল নিশাত

কেউ শপথ নিচ্ছে। কিন্তু কোনো ঈশ্বরের নামে নয়, কোনো পবিত্র গ্রন্থের নামে নয়। শপথ নিচ্ছে দিনের একটি মুহূর্তের নামে — অপরাহ্নের নামে। এই একটিমাত্র সিদ্ধান্তেই শান্তা মারিয়া জানিয়ে দেন, তাঁর কবিতা প্রচলিত ভক্তি বা প্রেমের ভাষায় চলবে না। এখানে পবিত্রতা আছে, কিন্তু সে পবিত্রতা ধর্মগ্রন্থে নয় — ক্ষণস্থায়ী আলোয়, একটি বিকেলের শরীরে।

“কসম অপরাহ্ন বেলার” — এই নামেই লুকিয়ে আছে কবিতার পুরো দর্শন। অপরাহ্ন মানে দিনের শেষ প্রান্ত, যা আলো ও অন্ধকারের মাঝে ঝুলে আছে — ঠিক যেভাবে এই কবিতার কথক সময়ের মাঝে ঝুলে থাকেন, না অতীতে, না বর্তমানে, না ভবিষ্যতে।

“জীবনের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে / চিরন্তন খুঁজেছি তোমাকে।”

“চৌকাঠ” শব্দটি লক্ষণীয়। দোরগোড়া — ভেতরেও নয়, বাইরেও নয়। এই অবস্থান কবির নিজস্ব ব্যাখ্যা। তিনি জীবনের মধ্যে সম্পূর্ণ ডুবে নেই, আবার দূরে দাঁড়িয়ে দার্শনিকও নন। তিনি থ্রেশহোল্ডে — যেখান থেকে দুটো দিকই দেখা যায়।
এবং “তুমি” কে? কবিতায় এই “তুমি” কখনো স্পষ্ট হয় না, আর এটাই কবিতার সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত। “তুমি” হয়তো প্রেমিক, হয়তো ঈশ্বর, হয়তো স্বয়ং অনন্তকাল — পাঠক নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে এই শূন্যস্থান পূরণ করেন।

“রোদজ্বলা খুব দূর শূন্য ডাঙা এক / নাওডোবা গ্রাম, পুরনো মফস্বল শহরের প্রান্ত ছুঁয়ে / পরিত্যক্ত রেলপথ।”

এই স্তবকটি নিঃসঙ্গতার একটি নিখুঁত চিত্রকল্প। “নাওডোবা” নামটি বাংলার লোকজ স্মৃতি থেকে উঠে আসা — নাও ডুবে যাওয়া জায়গা, অর্থাৎ যেখানে একসময় জীবন ছিল কিন্তু এখন শুধু অবশেষ। “পরিত্যক্ত রেলপথ” — গন্তব্যহীন যাত্রার স্থায়ী রূপক।
কিন্তু এখানেই থামেন না কবি। পরের লাইনে তিনি এক বিস্ময়কর লম্ফ দেন —

“অথবা চাতাল হাইয়ুক, আদিম গ্রামের প্রেম”

মফস্বল থেকে সরাসরি তুরস্কের ৯,০০০ বছর পুরনো নিওলিথিক শহর! এই “অথবা” শব্দটি অসাধারণ কাজ করে — এটি বলছে, স্থান আসলে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাংলার জলাভূমি আর আনাতোলিয়ার প্রাচীন সভ্যতা একই সত্যের দুটো মুখ।

এই কবিতার মেরুদণ্ড তার ঐতিহাসিক যাত্রাপথ। কবি একে একে ডাকেন —
প্রথম কুকুর — মানুষের সভ্যতার প্রথম বন্ধন, প্রথম বিশ্বাস। ভালোবাসার সবচেয়ে আদিম প্রমাণ।
সুমেরিয়া, অগ্নিকুণ্ড — লেখার জন্ম, আইনের জন্ম, শহরের জন্ম। কিন্তু কবি এখানে রাজনীতি বা ইতিহাস খোঁজেন না — খোঁজেন অগ্নিকুণ্ড ঘিরে মানুষের জড়ো হওয়া, সেই উষ্ণতা।
নিনেভা ও গিলগামেশ — পৃথিবীর প্রথম মহাকাব্য, যার কেন্দ্রে আছে মৃত্যুভয় আর বন্ধুহারানোর বেদনা। গিলগামেশ অমরত্ব খুঁজতে গিয়েছিলেন — আর এই কবিও তো চিরন্তনকেই খুঁজছেন!

“অতি বৃদ্ধ কথকের কণ্ঠে / গিলগামেশের বীরগাঁথা শুনতে শুনতে / তোমাকেই দেখেছি রাত্রির আকাশে।”

এই পঙক্তিগুলো কবিতার সবচেয়ে গভীর মুহূর্ত। গল্পের মধ্যে, গানের মধ্যে — সেখানেও “তুমি”! অর্থাৎ চিরন্তন সত্তা শুধু প্রকৃতিতে নয়, মানুষের সৃষ্টিতেও বাস করে।

কর্নওয়াল ও কেল্টিক ডাইনী — ইউরোপের মাটি, যেখানে পুরাণ ও যাদু এখনো মাটির সাথে মিশে আছে। কুমারীরাশির পরম কুমারী — পবিত্রতার এক অন্য সংজ্ঞা, যা পিতৃতান্ত্রিক নয়, কসমিক।

“আমি এক অন্ধ উঁই / নিশ্চিত বিনাশ জেনে / স্মিত হেসে ঝাঁপ দিই উজ্জ্বল আনন্দে।”

এই তিনটি লাইন পুরো কবিতার হৃদয়।
“উঁই” — পতঙ্গ, যে আলোর দিকে ছুটে যায় জেনেবুঝে মৃত্যুর দিকে। কিন্তু শান্তা মারিয়া এখানে “অন্ধ” বিশেষণ ব্যবহার করেন — উঁই যেমন আলো ছাড়া দেখতে পায় না, তেমনি প্রেমিক বা সাধক চিরন্তন ছাড়া জীবনের অর্থ খুঁজে পান না।

“নিশ্চিত বিনাশ জেনে / স্মিত হেসে” —

এখানে ট্র্যাজেডি ও আনন্দ একসাথে বাস করে। এটি রুমির দীওয়ানের আত্মসমর্পণ নয় — এটি একটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। ধ্বংস জেনেও হাসি — এখানে শোক নেই, আছে মহৎ উদযাপন।

“দশ হাজার বছর পরে আবার জন্মেছি আমি / ফসলের গান ভালোবেসে।”

দশ হাজার বছর — নিওলিথিক বিপ্লবের সময়কাল! মানুষ যখন প্রথম কৃষিকাজ শিখেছিল, যখন প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক নতুন রূপ পেয়েছিল। কবি বলছেন, সেই আদিম আনন্দ — মাটির গান, ফসলের উৎসব — এখনো তাঁর কণ্ঠে বাজে।

এই পুনর্জন্মের ধারণা শুধু হিন্দু বা বৌদ্ধ দর্শনের নয়। এটি সার্বজনীন — আমরা সবাই আমাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি বহন করি, ডিএনএতে, ভাষায়, গানে।

“বিস্মরণ আপেক্ষিক / সীমানার ওপারে মহাশূন্যের শ্বাশত নীরবতা / সত্য শুধু অপরাহ্ন বেলা”

“বিস্মরণ আপেক্ষিক” — আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদের ছায়া এখানে। সময় যদি আপেক্ষিক হয়, তাহলে ভুলে যাওয়াও আপেক্ষিক। একটি সভ্যতা ভুলে যায়, অন্যটি মনে রাখে — মহাবিশ্বের স্কেলে সব কিছুই মনে থাকে কোথাও না কোথাও।
“মহাশূন্যের শ্বাশত নীরবতা” — এই চুপ থাকাই হয়তো সব উত্তর। ভাষায় যা ধরা যায় না, নীরবতা তা ধারণ করে।
কিন্তু শেষে কবি ফিরে আসেন অত্যন্ত মানবিক একটি সত্যে —

“সত্য শুধু অপরাহ্ন বেলা / আরেকবার বলি, / চিরন্তন, খুঁজেছি তোমাকে।”

মহাবিশ্বের বিশালতা স্বীকার করে, তারপরও কবি বলেন — সত্য হলো এই মুহূর্ত, এই বিকেল। “আরেকবার বলি” — এই পুনরাবৃত্তি শুধু জোর দেওয়া নয়, এটি প্রার্থনার ভঙ্গিমা। যেন কেউ মন্ত্র উচ্চারণ করছেন, যেন কেউ নাম ধরে ডাকছেন বারবার।

সামগ্রিকভাবে এই কবিতা একটি অতিকালীন প্রেমের মানচিত্র — যেখানে প্রেম মানে শুধু দুজন মানুষের সম্পর্ক নয়, বরং একটি চেতনার সাথে অনন্তকালের যোগাযোগ।

শান্তা মারিয়া যা করেছেন — তিনি ব্যক্তিগত আবেগকে সভ্যতার ইতিহাসের সাথে বেঁধেছেন, কিন্তু কোথাও জ্ঞানের ভার আবেগকে চাপা দেয়নি। চাতাল হাইয়ুক বা গিলগামেশের উল্লেখ কবিতায় পাণ্ডিত্য প্রদর্শন নয় — এগুলো আবেগের সাক্ষী, সময়ের সাক্ষী।

কবিতার শিল্পকৌশলের দিক থেকেও এটি উল্লেখযোগ্য। কোনো ছন্দের খাঁচায় বাঁধা নেই, কিন্তু একটি অভ্যন্তরীণ ছন্দ আছে — দীর্ঘ লাইনের পরে হঠাৎ ছোট লাইন, যা পাঠককে থামিয়ে দেয়। যেমন — দীর্ঘ ঐতিহাসিক যাত্রার পরে হঠাৎ —
“আমি এক অন্ধ উঁই”
এই আকস্মিক ছোটো লাইন পাঠকের বুকে একটি ধাক্কা দেয়।

সবচেয়ে বড় কথা — এই কবিতা পড়ার পরে পাঠক নিজেকেও এই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়: আমিও কি চিরন্তন কিছু একটা খুঁজছি? সেই “তুমি” আমার জীবনে কে?

যে কবিতা পাঠকের নিজের অস্তিত্বকে প্রশ্ন করায় — সেই কবিতাই সত্যিকারের কবিতা।

কবিতাটি

কসম অপরাহ্ন বেলার
শান্তা মারিয়া

কসম অপরাহ্ন বেলার
জীবনের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে
চিরন্তন খুঁজেছি তোমাকে।

রোদজ্বলা খুব দূর শূন্য ডাঙা এক
নাওডোবা গ্রাম, পুরনো মফস্বল শহরের প্রান্ত ছুঁয়ে
পরিত্যক্ত রেলপথ।

অথবা চাতাল হাইয়ুক, আদিম গ্রামের প্রেম
প্রভুভক্ত প্রথম কুকুর
সুমেরিয়া, অগ্নিকুণ্ড ঘিরে
কোন নিবিড় সন্ধ্যায়, নিনেভা নগরে
অতি বৃদ্ধ কথকের কণ্ঠে
গিলগামেশের বীরগাঁথা শুনতে শুনতে
তোমাকেই দেখেছি রাত্রির আকাশে।

কর্নওয়ালে, কেল্টিক ডাইনীর চোখের তারায়
ঝলকায় কন্যারাশির পরম কুমারী।

আমি এক অন্ধ উঁই
নিশ্চিত বিনাশ জেনে
স্মিত হেসে ঝাঁপ দিই উজ্জ্বল আনন্দে।

আর্যাবর্তে আদিম গ্রামের পথে, নিভৃত আশ্রমে
নবান্ন উৎসবে ফিরে আসে পূর্ব জন্ম
দশ হাজার বছর পরে আবার জন্মেছি আমি
ফসলের গান ভালোবেসে।

বিস্মরণ আপেক্ষিক
সীমানার ওপারে মহাশূন্যের শ্বাশত নীরবতা
সত্য শুধু অপরাহ্ন বেলা
আরেকবার বলি,
চিরন্তন, খুঁজেছি তোমাকে।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা