শান্তা মারিয়া
কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথা ভাবলে প্রথমেই মন চলে যায় সুদূর অতীতে। একটি বই। নাম ‘সঞ্চিতা’। শক্ত মলাট। প্রচ্ছদে একটি ফুল ও প্রজাপতির ছবি। বইটি ছিল আমার মায়ের। নজরুলের কবিতা পড়তে হলে তিনি এই বইটি খুলতেন। পাতাগুলো একটু হলদেটে, মোটা কাগজের। আমি নজরুলের কবিতা প্রথম পড়েছি এই বই থেকে। আমার সংগ্রহে নজরুল রচনাবলী আছে। কিন্তু সেটা অনেক পরে কেনা।
বর্ণপরিচয় এবং পড়তে শেখার পর, আমার মূল কাজ ছিল হাতের কাছে পাওয়া সব বইয়ের পাতা উল্টানো এবং পড়ার চেষ্টা করা। ‘খুকী ও কাঠবেড়ালী’, ‘লিচু চোর’, ‘প্রভাতী’, ‘খোকার সাধ’ এসব মুখস্ত ছিল। মা মুখস্ত করিয়ে ছিলেন। কিন্তু আমার নিজের চোখে দেখে বানান করে করে প্রথম পড়া কবিতা হলো ‘বিদ্রোহী’। কারণ সঞ্চিতার প্রথম কবিতাটিই ছিল বিদ্রোহী। তখন চার পাঁচ বছর বয়স। ‘বিদ্রোহী’ পড়ছি। বুঝতে পারছি না। বারো তের বছর বয়সে যখন আবার আবৃত্তির জন্য পড়লাম তখনও যে সব শব্দ বুঝতে পেরেছি তা নয়। কিন্তু এক অদ্ভুত ঘোর লেগেছিল। সেই ঘোর থেকে আজও মুক্তি মেলেনি।
তারপর কত বার পড়েছি, কত বার আবৃত্তি শুনেছি। যতবারই শুনি ততোবারই নতুন করে আবিষ্ট হই। বিদ্রোহী লেখার সময় নজরুলের বয়স কত বছর? তেইশ বছর। কি অসামান্য প্রতিভা থাকলে মাত্র তেইশ বছর বয়সে যুদ্ধফেরত এক তরুণ এমন লিখতে পারেন। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি বিদ্রোহীর একটি শব্দও কেউ পরিবর্তন করতে পারবেন না। কবিতাটি এমনই নিটোল এক শিল্প। এমন এক জড়োয়া অলংকার যার একটি পাথরও যদি সরানো হয়,সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে।
শুধু বিদ্রোহী নয়, সৃষ্টি সুখের উল্লাসের মধ্যেও রয়েছে সেই একই প্রাণপ্রাচুর্য। সঞ্চিতায় যখন কবিতা পড়তাম তখন উৎসর্গপত্রগুলোতে চোখ পড়তো। বিরজা সুন্দরী দেবী, মিসেস এম রহমান। প্রশ্ন জাগতো, এঁরা কারা? পরে অবশ্য জেনেছি। নজরুলের জীবনী পড়ে, তাঁর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা পড়ে এবং বিশেষ করে প্রিয় মোতিহার (কাজী মোতাহার হোসেন)কে লেখা চিঠিগুলো পড়ে আমার কেবলি মনে হয়েছে নজরুল চিরদিনই ছিলেন স্নেহের, ভালোবাসার জন্য তৃষ্ণার্ত এক অশান্ত তরুণ।
নজরুল নার্গিস প্রসঙ্গ জানতে পারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকার সময়। ‘শাওন আসিল ফিরে’, ‘পথ চলিতে’, ‘মোর ঘুমঘোরে কে এলে মনোহর’, ‘আমার যাবার সময় হলো’– নজরুলের যে প্রেমের গানই তখন শুনতাম মনে হতো নার্গিসকে নিয়ে লিখেছেন। আমার মা কোনো এক অদ্ভুত কারণে নার্গিসকে তেমন পছন্দ করতেন না। বলতেন, সারাজীবন পাশে রইলেন, ত্যাগ স্বীকার করলেন প্রমীলা, আর তোরা এখন নার্গিস নিয়ে ব্যস্ত।
নজরুল নার্গিস কাহিনী যত জায়গায় পড়েছি আমারও মনে হয়েছে, অপমানিত অভিমানী নজরুল যখন বাসর রাতে নার্গিসকে বললেন, তার সঙ্গে চলে যেতে তখন কেন তিনি গেলেন না? বাউন্ডুলে তরুণের উপর ভরসা করতে পারেননি, তাই? তিনি যদি সত্যিই ভালোবাসতেন তাহলে অবশ্যই চলে আসতেন নজরুলের হাত ধরে। অত হিসেবে করে ভালোবাসা হয় নাকি? নজরুলের প্রতি নার্গিসের যে প্রেম অমন শখের প্রেম সকলেই করতে পারে। সারাজীবন দিয়ে সকল পাগলামী সহ্য করে এলোমেলো অগোছালো কবিকে নিয়ে ঘর করতে পারে কজন?
আমার মা বলতেন, ছোটবেলায় তিনি নজরুলকে দেখেছেন। অসুস্থ নয়। প্রাণবন্ত। কোথায়? কলকাতায়। পুরো গল্পটি বলছি।
আমার নানা খান বাহাদুর আফাজউদ্দিন আহমেদ শিল্প ও সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন। তাঁর বালিগঞ্জের প্রাসাদোপম বাড়িতে অনেক বিখ্যাত মানুষের সমাগম হতো। এক সাহিত্য মজলিশে নজরুল সে বাড়িতে এসেছিলেন । আমার মায়ের জন্ম ১৯৩৬ সালে। তাহলে ঘটনাটি সম্ভবত ১৯৪০ বা ৪১ সালের দিকে হবে। বিশাল ড্রইংরুমে আসর বসেছিল। সেখানে শিশুদের প্রবেশ বারণ। কিন্তু মা পর্দার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখেছিলেন হারমোনিয়ামের সামনে বসে আছেন নজরুল। হাসছেন প্রাণখুলে। মা বলেন, তার হাসির ঝংকারে যেন বিশাল ঝাড়বাতি আন্দোলিত হচ্ছিল। আমার মায়ের স্মৃতিশক্তি অসামান্য ছিল। আর তিনি কখনও মিথ্যে বলতেন না। ফলে ঘটনাটি সত্যি, এ কথা বলাই যায়।
নজরুলকে অবশ্য আমিও শৈশবে দেখেছি। পিজি হাসপাতালে। বাবা নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে সে দেখাকে আমি দেখা বলে মনে করি না। কারণ তখন নজরুল নিজেকেই ভুলে গেছেন। এ জন্য তাঁর বৃদ্ধ বয়সের অসুস্থ, স্মৃতিহারা অবস্থার ছবিটিকে আমি ‘নজরুলের ছবি’ বলে মনে করি না। নজরুল বেঁচে ছিলেন ওই ১৯৪২ সাল পর্যন্তই। কি প্রাণবন্ত, কি প্রতিভাবান, কি সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কম্পমান একজন কবি।
প্রশ্ন জাগে, বাঙালি তাকে ঠিক কতটুকু ধারণ করতে পেরেছিল? শ্যামাসঙ্গীত আর ইসলামী গান লিখেছিলেন বলেই তাকে নিয়ে যত সীমাবদ্ধ আলোচনা? তিনি যে বাংলার প্রথম যথার্থ সাম্যবাদী মানুষ একথা কেন বলেন না? নজরুল ছাড়া আর কে বলতে পেরেছিলেন?
‘গাহি সাম্যের গান–
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান
যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ মুস্লিম-ক্রীশ্চান।
গাহি সাম্যের গান!
কে তুমি?- পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?
কন্ফুসিয়াস্? চার্বাক-চেলা? ব’লে যাও, বলো আরো!
বন্ধু, যা-খুশি হও,
পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও,
কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক-
জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব প’ড়ে যাও যত সখ,-
কিন্তু, কেন এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?
দোকানে কেন এ দর কশাকশি? -পথে ফুটে তাজা ফুল।
তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,
সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা, খুলে’ দেখ নিজ প্রাণ!’
কি অসামান্য ভাষায় তিনি বলেন ,‘মোরা সবে সমপাপী/ আপন পাপের বাটখারা দিয়ে অন্যের পাপ মাপি’। নজরুলের এই মানবতাবাদী রূপ বাংলা সাহিত্যে কেন, বিশ্বসাহিত্যেই অতি বিরল।
নজরুলের মানবতাবাদ এবং পাশাপাশি নজরুল বিরোধীদের চিন্তাধারা বুঝতে হলে নজরুলের শ্রেণী চরিত্র বোঝা প্রয়োজন। তিনি কে? তিনি লেটোর গানের দলের কবি, রুটির দোকানের কর্মচারী, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সাধারণ সৈনিক। তারমানে ধনিক শ্রেণী থেকে নয়, মধ্যবিত্তও নয়, একেবারে প্রলেতারিয়েত।
কলকাতার শিক্ষিত বাবুসমাজ কখনও সহ্য করতে পারেনি যে একেবারে শ্রমজীবী শ্রেণী থেকে উঠে এসে এক খেয়ালি তরুণ, সাহিত্যের পংক্তিভোজনে একসাথে বসবে আবার প্রতিভায় তাদেরকে ছাড়িয়েও যাবে। নজরুলের মুসলমানীত্বে তাদের আপত্তি হতো না, যদি তিনি অভিজাত, নবাব বা জমিদার শ্রেণী থেকে আসতেন।
আর গোঁড়া মুসলমানরা তাকে কাফের আখ্যা দিয়েছিল তার গোড়ামী মুক্ত মনের দাপট সইতে না পেরে। এই বিদ্রোহী ভৃগুকে সহ্য করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভবই ছিল যে কিনা জিবরাইলের আগুনের ডানা সাঁপটে ধরার দুঃসাহস দেখাতে পারে।
নজরুল চিরদিনই ছিলেন শোষিত, নিপীড়িত শ্রেণীর জীবনযন্ত্রণার রূপকার। মৃত্যুক্ষুধার মতো উপন্যাস তাই তার হাতে সৃষ্টি হয়েছিল।
এই সেদিন ক্লাসে আমার চীনা ছাত্রছাত্রীদের শোনাচ্ছিলাম কাজী সব্যসাচীর কণ্ঠে ‘বিদ্রোহী’। আমিও শুনছিলাম। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই কবিতাটি আমাকে চিরদিনের মতোই শিহরিত করছিল। আবেগ আক্রান্ত করছিল।
চোখে ভেসে উঠছিল জ্যৈষ্ঠের তীব্র দাবদাহের শক্তি নিয়ে জন্ম নেয়া ঝড়ের মতো এক তরুণ কবির অবয়ব। বাংলার গ্রীষ্মের প্রচণ্ডতাকে যেন তিনি ধারণ করেছিলেন তার সৃষ্টিতে। আর একই সঙ্গে ছিলেন বাংলার শ্যামল ভূমির প্রমত্তা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা নদীর মতো প্রেমিক। আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ অবিভক্ত বাঙালি জাতির আবেগ, প্রতিবাদ, দ্রোহ ও প্রেমের যথার্থ ধারক , বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানাই।







