মীর সালমান শামিল
এক:
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মত একটা ফেডারেল স্টেট করার প্রস্তাব দেন। মোট প্রদেশ হবে ৫ টি এরমধ্যে ৩ টি থাকবে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ আর ২ টিতে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ। এতে একটা অরগানিক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় থাকবে। শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, অর্থ মন্ত্রণালয় থাকবে কেন্দ্রের অধীনে বাকী সব কিছু থাকবে প্রাদেশিক সরকারের অধীনে। দেশের নাম হবে ইউনাইটেড স্টেটস অব ইন্ডিয়া বা ভারত যুক্তরাষ্ট্র।
কিন্তু কংগ্রেস এই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে। উল্টো জিন্নাহকে প্রলোভন দেখায় তাকে প্রধানমন্ত্রী করা হবে, তিনি হবেন পৃথিবীর বৃহত্তম গনতান্ত্রিক দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সব রকম প্রচেষ্টা চালিয়েও কংগ্রেসকে বোঝাতে ব্যর্থ হন। দেরিতে হলেও বুঝতে পারেন হিন্দুত্ববাদীরা চায় ‘অখন্ড ভারত’ তত্ত্বের আলোকে ইংরেজদের রেখে যাওয়া সাম্রাজ্যের নতুন সম্রাট হতে।
এই অবস্থাতে জিন্নাহ কংগ্রেস ত্যাগ করে যোগ দেন মুসলিম লীগে এবং এরপরই আল্লামা ইকবালের সেই দ্বিজাতিতত্ত্ব গ্রহন করেন।
দুই:
আলী জিন্নাহর দ্বিতীয় পরিকল্পনা ছিল ভারতের পশ্চিম অঞ্চলের প্রদেশগুলো নিয়ে একটা দেশ হবে এবং আসাম-বাংলা মিলে একটি দেশ হবে।
এই দেশের ব্যাপারে জিন্নাহর পরিকল্পনা ছিল গনতান্ত্রিক, আন্তরিক, ইনসাফ পূর্ণ, এবং মর্যাদাকর। প্রায় ৬৫% মুসলমান অধ্যুষিত হবার পরেও কায়েদে আজম নতুন দেশের সংহতি রক্ষা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে একটা ভারসাম্যপূর্ণ ক্যাবিনেট প্রস্তাব করেছিলেন। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া লিখেছেন,
❝ কায়েদে আজম শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ‘স্বাধীন বাংলা’ পরিকল্পনার অনুমতি প্রদান করেন । উক্ত পরিকল্পনায় এই ব্যবস্থা থাকে যে, বাংলাদেশের প্রধান-মন্ত্রী একজন মুসলমান থাকিবেন এবং মন্ত্রিসভায় অন্য সদস্যদের শতকরা পঞ্চাশ ভাগ মুসলমান ও পঞ্চাশ ভাগ অনুসলমান থাকিবেন।
আলী জিন্নাহ মাউন্টব্যাটেনকে এই ব্যাপারে রাজি করিয়ে ফেলেন। এরপর তিনি গান্ধীকে বাংলা-আসাম দেশের ব্যাপারে বলেন। গান্ধী কায়েদে আজমকে জানান এই প্রস্তাবে তার পূর্ণ সমর্থন আছে। সেকুলার বুদ্ধিজীবী সলিমুল্লাহ খান, এই প্রসঙ্গে একটা টকশোতে বলেছিলেন, গান্ধীর রাজনৈতিক ব্রেণ ছিল খুবই প্রখর। তিনি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে বলেছিলেন বাংলা-আসাম নিয়ে দেশ করার ব্যাপারে তার সমর্থন আছে কারন তিনি ভাল করেই জানতেন পশ্চিম বাংলার সংখ্যা গরিষ্ঠ এমপি কংগ্রেসের হিন্দু। তারাই বাংলা ভাগ করবে। যখন কংগ্রেস বাংলা ভাগ করতে প্রচারণা চালাচ্ছিলো তিনি তাতে বাঁধা দেন নাই।
সেটাই হয়। কোলকাতার কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভা বাংলা ভাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। বাঙালি হিন্দুদের দাবির প্রতি কংগ্রেসের সেন্ট্রাল লিডারশীপ সমর্থন দেয়। গান্ধী মনোব্রত অবলম্বন করেন।
জয়া চ্যাটার্জি লেখেন,
❝ বাংলা ভাগের দাবিতে ৭৬টি জনসভার আয়োজন করা হয় বলে জানা যায়। এর মধ্যে কংগ্রেস একাই কমপক্ষে ৫৯টি জনসভার আয়োজন করে। ১২টা জনসভা হয় হিন্দু মহাসভার উদ্যোগে। আর ৫টা জনসভা হয় কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার যৌথ উদ্যোগে। ❞
একদিকে কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভার আন্দোলন অন্যদিকে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নেহেরু এবং প্যাটেলের তাতে সমর্থন দানের ফলে শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় যে, বাংলার পশ্চিমাংশের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোর আইন প্রণেতাদের নিয়ে একটা ভোটাভুটি হবে, আর পূর্ব দিকের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোর আইন প্রণেতাদের নিয়ে আরেকটা ভোটাভুটি হবে।
বাংলার পশ্চিমাংশের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোর সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৫৮ জন বাংলা ভাগের পক্ষে ভোট দেন এবং মুসলিম লীগের ২১ জন বিপক্ষে ভোট দেন। ৫৮ জনের সংখ্যাগরিষ্ঠ পক্ষ আরো সিদ্ধান্ত নেয় যে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলো ভারতে যোগদান করবে।
অন্যদিকে, পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রধান জেলাগুলোর সংসদ সদস্যদের মধ্যে ১০৬ জন (এর মধ্যে ১০০ জন মুসলিম লীগের) বাঙলা ভাগের বিপক্ষে ভোট দেন। বাকি ৩৫ জন পক্ষে ভোট দেন।
এই পর্যায়ে হিন্দু প্রধান এলাকাগুলোর আইনপ্রণেতাদের সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরে ১০৭-৩৪ ভোটে মুসলিম প্রধান এলাকার আইনপ্রণেতারা প্রস্তাবিত পাকিস্তানে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তিন:
জিন্নাহ শুধু উপমহাদেশের মুসলমানেরা না, সারাবিশ্বের মুসলমানের মধ্যে জিন্নাহ আলোড়ন তৈরি করেন। পুরো মুসলমান বিশ্ব জন্মের আগেই পাকিস্তানের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিলো। ফিলিস্তিনের বিপদ তখনো শুরু হয়নি তবে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ আশু বিপদ টের পেয়ে ফিলিস্তিন ইস্যুতে ছিলেন ভোকাল৷
১৯৪৬ সালে কায়েদে আজম কায়রো সফরে গেলে ফিলিস্তিনের গ্রান্ড মুফতি মুহাম্মদ আমিন আল হুসাইনি, মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল বান্না, আরব লীগের সেক্রেটারি আব্দুল রহমান আযামসহ পুরা আরব বিশ্বের প্রতিনিধি আসেন কায়েদে আজমের সাথে দেখা করতে।
চার:
এই সময়ে জিন্নাহ ছিলেন জটিল রোগে আক্রান্ত। মৃত্যু সময়ের ব্যাপার মাত্র। শুধুমাত্র উনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং বোন ফাতেমা জিন্নাহ ছাড়া আর কেউ জানতো না এটা। ঠিকমত চিকিৎসাও নিতে পারেন নাই যদি খবর ফাঁস হয়ে যায় সে ভয়ে। কারন এই খবর প্রকাশ পেলে মুসলিম লীগ দুর্বল হয়ে যেত এবং কংগ্রেসও পাকিস্তানের দাবি মেনে নিতো না। মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহর পরে মুসলিম লীগে কোন নেতৃত্ব ছিল না যে দুই ফ্রন্টে লড়তে পারবে। এই ভয়াবহ অসুস্থতা নিয়ে তিনি রাওয়ালপিন্ডি থেকে সিলেট, পুরো উপমহাদেশ চষে বেড়িয়েছেন, একত্রিত করেন হিন্দুস্তানি মুসলমানদের, এবং আদায় করেন পাকিস্তানের দাবি।
বিবিসি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য তিলক দেভেশরকে এক সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করেন, যদি এটা জানাজানি হয়ে যেত যে মি. জিন্নাহর আয়ু আর খুব বেশী দিন নেই, তাহলে কি দেশভাগ আটকানো যেত? দেভেশর উত্তরে বলেছিল,
❝ যদি গান্ধী, নেহেরু বা সর্দার প্যাটেলদের কাছে জিন্নাহর অসুস্থতার খবর পৌঁছাত, ওঁরাও হয়তো নিজেদের নীতি বদলে ফেলে বিভাজনের জন্য আরও বেশী সময় চাইতেন। পাকিস্তান আন্দোলন আর পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা একজন মাত্র ব্যক্তির ওপরেই নির্ভরশীল ছিল – তিনি হলেন মি. জিন্নাহ। লিয়াকত আলি আর মুসলিম লীগের অন্য নেতাদের সেই ক্ষমতাই ছিল না যে পাকিস্তানের দাবী নিয়ে এগিয়ে যাবেন।”
অন্নদা শংকর রায় এই সম্পর্কে বলেছিলেন,
❝ …গান্ধী না থাকলেও ভারত একদিন না একদিন স্বাধীন হতো। কিন্তু জিন্না না থাকলে পাকিস্তান কি আদৌ সম্ভব হতো? ভারতকে স্বাধীন করার দাবীদার আরো একজন কি দু’জনের নাম শোনা যায়, কিন্তু পাকিস্তানকে স্বতন্ত্র করার দাবীদার আর একজনও নেই। লা শরিক জিন্নাহ। ❞
………….
লেখক : গবেষক
ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়া। আমেরিকা।







