সুপ্রিয় সাহা
হাসিনা পতনের পরে সমাজে একটা প্যারাডাইম শিফট লক্ষ করা যায়৷ সেটার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেল আজকের পবিত্র ঈদ-উল-আযহার দিনে।
খেয়াল করেন, এবার ঈদে ‘প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা’ বিষয়ক রচনার অতো একটা ভাত নাই৷ আপনার নিজের টাইমলাইন দেখলে তার প্রমাণ পাবেন৷ তারপর, মনের পশুকে কুরবানি করার ফাতরামিটাও কমই দেখা যাচ্ছে।
মনের পশু কী? এটা হলো id (ফ্রয়েডমতে)। এটা কি আসলে কুরবান করা যায়? সম্ভব? দরকার আছে? সুপারইগো দ্বারা এটা নিয়ন্ত্রণে থাকে৷ id কুরবানি দেওয়ার চেষ্টা হলো মূলত রিপ্রেশন (অবদমন)৷ এই রিপ্রেশনের ফলেই নানাবিধ বিকৃতি মানবমনে বাসা বাঁধে৷
তাই ধর্মীয় বিধিমোতাবেক পোষা পশুকেই কোরবানি করা বাঞ্ছনীয়৷ মনের পশু মনের মধ্যেই থাক৷ তাকে চেক-এ রাখার জন্য ধর্মীয়, নৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে মজবুত করতে হবে৷
শাহবাগী প্রগতিশীলতা, হুমায়ুনীয় মুক্তমন, রবীন্দ্রবাদী আধুনিকতার যে ককটেল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পাত্রে এতোদিন আমাদের গেলানো হয়েছে তার থেকে মুক্তির একটা দিশা আমরা দেখতে পাচ্ছি৷ সেটা সাস্টেইন করার জন্য জাস্ট দুটো জিনিস দরকার মোটাদাগে।
প্রথমত, যোগ্যতা অর্জন করা৷ অর্থাৎ ইসলামী বইমেলা আয়োজন করা যাবে না— তা না, বরং সেই সাহিত্যের মানোন্নয়ন করে সেক্যুলার স্পেসে নিজেদের হিসসা বুঝে নেওয়া তথা মূলধারায় প্রবেশ করা অধিকতর জরুরি৷
দ্বিতীয়ত, জুলুমবাজ না হয়ে ওঠা। ‘দিল্লি না ঢাকা?’ স্লোগান দিতে দিতে ঢাকাকে দিল্লির মুদ্রার অপর পিঠে পরিণত না করা৷ আজকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় ফেসবুক পেইজ থেকে জনৈক অধ্যাপক মফিজুর রহমানের ‘ঈদে কুরবান’ শীর্ষক একটি লেখা পোস্ট করা হয়৷ তাতে এক জায়গায় তিনি লেখেন, “আমি জানি না, দেব-দেবীদের অশ্লীল ব্যভিচার ও যৌনাচারের কুৎসিত লীলা ও শিব লিঙ্গের পূজা বিকৃত ভগবত গীতার মধ্যেও কি আছে?” এটি স্পষ্টভাবে হিন্দুধর্মের অবমাননা। একই লেখার আরেক জায়গায় হিন্দু জনগোষ্ঠীকে ‘গরুপূজারি’ শব্দের মধ্যে আঁটানোর চেষ্টা করা হয়৷ পরে পোস্টটা ডিলিট করা হয়৷
ঈদ মানে আনন্দ। কিন্তু সেই আনন্দ যদি অন্যকে দুঃখ দিয়ে পালন করা লাগে, তাহলে সেটা স্যাডিস্টিক (ধর্ষকামী) আচরণ। হিন্দুরা যেমন ঠিক করে দেওয়ার অধিকার রাখে না— মুসলমানরা গরু কুরবানি করবে নাকি খাসি; ঠিক তেমন, মুসলমানরাও ঠিক করে দিতে পারে না, হিন্দুদের টোটেম কী হবে এবং তারা কার বা কোন প্রতীকের পূজা করবে। এই বাউন্ডারিগুলো মেনে চলতে হবে।
এই দুটো জায়গা সিকিউর করতে পারলে নতুন প্যারাডাইমটা থাকবে। নতুবা, নানাপ্রকার দেশি-বিদেশি কায়েমী স্বার্থ মোকাবিলার সময় শতধাবিভক্ত জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা যাবে না।







