প্রচ্ছদহাদি কর্নারওসমান হাদি এবং মজলুমের গালির রাজনৈতিক দর্শন

লিখেছেন : এইচ বি রিতা

ওসমান হাদি এবং মজলুমের গালির রাজনৈতিক দর্শন

এইচ বি রিতা

ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের ময়দান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম—সবখানেই ইদানীং একটি আলোচনা প্রায়ই মাথাচারা দেয়: প্রতিবাদের ভাষা কেমন হওয়া উচিত? স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভাষা কতটা ‘ভদ্র’ বা ‘মার্জিত’ হওয়া প্রয়োজন? জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত তরুণদের মুখে বা স্লোগানে যখন ‘শাওয়া মাওয়া’র মতো অত্যন্ত রূঢ় আঞ্চলিক গালি কিংবা লৌকিক ভাষার ব্যবহার দেখা যায়, তখন তথাকথিত সুশীল সমাজের একটি বড় অংশ একে ‘অশ্লীলতা’ বা ‘সংস্কৃতির অবক্ষয়’ বলে সমালোচনা শুরু করেন। 

কিন্তু ভাষার কি নিজস্ব কোনো রাজনীতি নেই?ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের অকুতোভয় শহীদ ওসমান হাদি এই ভাষার রাজনীতিকে এক লাইনে চূর্ণ করে দিয়ে গেছেন।  

হাদির উক্তি: “প্রচণ্ড গণহত্যাকারীজালেমনমরুদফারাউনের বিপরীতে একজন অস্ত্রহীনশক্তিহীনকণ্ঠহীন মাজলুমেরকি থাকেশুধু জবান। এর মানে হলমজলুমের গালিটাই হল তার মুক্তির মহাকাব্য।

হাদীর এই একটি উক্তি বিশ্ব ইতিহাসের সমস্ত গণ-অভ্যুত্থান এবং শৃঙ্খল ভাঙার ভাষার মূল দর্শনকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়ক্ষমতার বিরুদ্ধে এই ‘জবান‘ বা ভাষাকে হাতিয়ার করার প্রক্রিয়াটি হুট করে তৈরিহয়নি। শোষকের তৈরি করা ব্যাকরণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মজলুম যুগে যুগে তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলেছে।

বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানে গালি কিংবা রূঢ় শব্দের ব্যবহার কোনো আধুনিক বা বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। সমাজ বা রাষ্ট্র সবসময়ই একটি ‘ভদ্র’ বা ‘মার্জিত’ ভাষার কাঠামো তৈরি করে দেয়, যা মূলত শাসকশ্রেণীর নিজেদের সুবিধার্থেই তৈরি। কিন্তু যখন সেই রাষ্ট্র নিজেই চরম বর্বর, খুনি ও গণহত্যাকারী হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত ‘ভদ্রতা’র ঠুনকো ভাষা দিয়ে নিপীড়িত মানুষের বুকচেরা ক্ষোভ, রক্ত আর হাহাকার প্রকাশ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে বিপ্লবী বা নিপীড়িতরা প্রথমেই শাসকের তৈরি করা ভাষার এই শৃঙ্খলটিকে ভেঙে ফেলে। একজন সাধারণ নিরস্ত্র মানুষ রাষ্ট্রযন্ত্রের আধুনিক অস্ত্রধারী শাসকের হাত বা পা হয়তো ভেঙে দিতে পারে না, কিন্তু একটি চরম অবমাননাকর শব্দ বা লোকজ গালির মাধ্যমে সে শাসকের তথাকথিত ‘সম্মান’ এবং ‘অহংকার’-কে এক নিমেষে চূর্ণ করে দেয়। এটিই মজলুমের একমাত্র তাৎক্ষণিক অস্ত্র, যা জালেমের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দেয়।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ওসমান হাদীর এই তত্ত্ব বিশ্বজুড়ে বারেবারে প্রমাণিত হয়েছে। 

*ফরাসি বিপ্লব ও ‘ল্য পের দ্যুশেন’: ফরাসি বিপ্লবের সময় সাঁ-কুলোত এবং জ্যাক হেবার্ট-এর মতো উগ্র-র‍্যাডিকাল বিপ্লবীরা রাজপরিবার, যাজকতন্ত্র এবং অভিজাতদের বিরুদ্ধে যে ভাষা ব্যবহার করতেন, তা ছিল অভিজাত শ্রেণীর “ভদ্র ও মার্জিত” সংস্কৃতির মুখে এক চরম চড়। হেবার্টের বিখ্যাত পত্রিকা “Le Père Duchesne” (ল্য পের দ্যুশেন) এর অনেক অনুচ্ছেদেই “Foutre!” এবং “Bougre”-এই শব্দগুলো থাকতে, যার ইংরেজি অর্থ Fuck বা Fucking। তীব্র ক্ষোভ, বিরক্তি বা উত্তেজনা বোঝাতে ব্যবহৃত হতো—যেমন: “La grande colère du Père Duchesne…” (পের দ্যুশেনের চরম ক্ষুব্ধ রাগ)। “Bougre” শব্দটিও গালি হিসেবে ব্যবহৃত হতো; যা অত্যন্ত তীব্র এবং অবমাননাকর গালি, যা সময়ের সাথে সাথে ফরাসি ভাষায় ইংরেজি “Bastard”, “Motherfucker” বা “Sodomist”-এর সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

*কসাক যোদ্ধাদের চিঠি (১৬৭৬): অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান চতুর্থ মুহাম্মদ যখন ইউক্রেনের স্বাধীনতাকামী ‘কসাক’ যোদ্ধাদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন, জবাবে তারা সুলতানকে চরম গালিগালাজপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক ফিরতি চিঠি পাঠায়। সেই চিঠির কিছু অংশ ছিল এরকম: তুমি তুর্কি শয়তানঅভিশপ্ত ইবলিসের ভাই  কমরেডস্বয়ং লুসিফারেরসেক্রেটারি!… তুমি তোমার পাছা দিয়েও একটা খ্রিষ্টান মুরগিকে মারার যোগ্যতা রাখো না। … আমরা তোমার সেনাবাহিনীরসাথে মাটিতে এবং পানিতে লড়াই করবতোমার মায়ের…” (চিঠিটি পুরোটা গালিগালাজে ভরা ছিল)।

*রুশ বিপ্লবের ‘Mat’ (১৯১৭): রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের সময় জার এবং জারের পেটুয়া বাহিনী ‘হোয়াইট আর্মি’র বিরুদ্ধে সাধারণ শ্রমিক ও বলশেভিকরা অত্যন্ত নোংরা ভাষা ব্যবহার করত। রাশিয়ান ভাষার সবচেয়ে চড়া গালি “Mat”, যা মূলত মা-বোন এবং যৌনতা তুলে চরম অবমাননাকর গালিগালাজ, যার তীব্রতা ইংরেজি ‘Fuck you’-এর চেয়েও অনেক বেশি জঘন্য—তা বিপ্লবীরা রাজকীয় পুলিশ ও শোষকদের উদ্দেশ্যে হরদম ব্যবহার করত।

*আধুনিক গণ-অভ্যুত্থান: ২০১১ সালের আরব বসন্তে মিশর ও তিউনিসিয়ার রাজপথে স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে আরবি ভাষার নিজস্ব “Fuck you” সমার্থক রূঢ় গালি ব্যবহার করা হয়, যা পশ্চিমা মিডিয়ায় “A big ‘Fuck You’ to the regime” হিসেবে শিরোনাম পায়। একইভাবে ২০১৩-২০১৪ সালের ইউক্রেনের ইউরোমাইদান বিপ্লবে ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ও পুতিনের বিরুদ্ধে এবং  ২০২০-২০২১ সালের বেলারুশ বিক্ষোভে আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোর বিরুদ্ধে তরুণ সমাজ সরাসরি প্ল্যাকার্ড ও স্লোগানে ইংরেজি এবং রাশিয়ান ভাষায় “Fuck you” শব্দটিকে প্রতিবাদের মূল হাতিয়ার করে তোলে।

বাংলা এবং ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে বহু খ্যাতিমান কবি ও লেখক তাঁদের কবিতায় এবং সৃষ্টিতে গালি, রূঢ় বা তথাকথিত ‘অশ্লীল’ ভাষা ব্যবহার করেছেন। তাঁরা এটি সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য করেননি; বরং সমাজ, রাষ্ট্র, উপনিবেশবাদ কিংবা ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ এবং ক্ষোভ প্রকাশের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও শৈল্পিক হাতিয়ার হিসেবে একে ব্যবহার করেছেন।

শেকসপিয়রকে আমরা উচ্চাঙ্গের নাট্যকার ও কবি হিসেবে জানলেও, তাঁর নাটক ও সনেটগুলোতে (যা মূলত কাব্যিক ছন্দে রচিত) গালিগালাজ এবং শ্লেষাত্মক রূঢ় শব্দের ছড়াছড়ি ছিল। চরিত্রের বাস্তব রূপ ফুটিয়ে তুলতে এবং মানুষের আদিম রাগ, হিংসা ও ঘৃণা হুবহু তুলে ধরতেই গালিগালাজ ছিল এবং এলিজাবেথান যুগের লোকজ গালিগালাজকে তিনি অনন্য সাহিত্যিক রূপ দিয়েছিলেন।

উদাহরণ: “King Lear” নাটকে কেন্ট চরিত্রটি যখন ওসওয়াল্ডকে গালি দেয়, তা ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম সেরা গালির বহর: “এক্কেরে বদমাশ; একটা হারামজাদা; এঁটো আর কুড়ানো খাবার খাওয়া একটা ছোটলোক; নিচ, অহংকারী, অগভীর, ভিখারি, তিন-প্রস্থের সস্তা পোশাক পরা, একশ পাউন্ডের একটা নোংরা আর ছেঁড়া-মোজা পরা পাজির পা ঝাড়া; একটা কলিজা-ফাটা ভীরু, মামলাবাজ, বেশ্যার পো, সারাদিন আয়না-দেখা, অতিরিক্ত চাটুকার, খুঁতখুঁতে বদমাইশ; এক ট্রাঙ্কের সম্পত্তি পাওয়া একটা গোলাম; যে নিজের স্বার্থের জন্য দালালি করতেও দ্বিধা করবে না এবং যে আসলে একটা বদমাশ, ভিখারি, কাপুরুষ আর দালালের এক কুৎসিত মিশ্রণ ছাড়া আর কিছুই নয়; একটা নেড়ি কুত্তার পেটের জারজ সন্তান! তুই যদি আমার দেওয়া এই উপাধিগুলোর একটা অক্ষরও অস্বীকার করিস, তবে তোকে পিটিয়ে এমন কান্না কাঁদাব যে দুনিয়ার মানুষ তা শুনবে।”

আমেরিকান আন্ডারগ্রাউন্ড সাহিত্যের কবি ও লেখক চার্লস বুকোওস্কিও তাঁর কবিতায় কোনো রাখঢাক রাখেননি। পুঁজিবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষের হতাশা, একাকীত্ব, রাগ এবং সমাজের কৃত্রিম ভদ্রতার প্রতি তীব্র মধ্যমা আঙুল প্রদর্শন করতে তিনি হরদম ‘Fuck’, ‘Shit’, ‘Asshole’ শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন। তাঁর মতে, জীবনটা যখন নোংরা, তখন কবিতার ভাষা ধোয়া-তুলসী পাতা হতে পারে না।

আমেরিকান কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ ছিলেন পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ‘বিট মুভমেন্ট’-এর পুরোধা। আমেরিকার পুঁজিবাদ, যুদ্ধংদেহী নীতি এবং সমকামিতা নিয়ে সমাজের ট্যাবুকে ভাঙতে তিনি কবিতাকে হাতিয়ার করেন। রাষ্ট্র ও সমাজের চাপিয়ে দেওয়া ‘সেন্সরশিপ’ এবং ভণ্ডামির দেয়াল গুঁড়িয়ে দিতে তিনি লিখলেন বিখ্যাত দীর্ঘ কবিতা ‘Howl’– যা ছিল অনুকরণ, দমন, সেন্সরশিপ, পুরিটানবাদ এবং মানুষের প্রকৃত সত্তার বিকাশকে সীমাবদ্ধ করে এমন সব কিছুর বিরুদ্ধে এক প্রবল প্রতিবাদ। এটি একই সঙ্গে জীবন্ত নরক থেকে উঠে আসা পরাজয়ের আর্তনাদ, আবার অবাধ্য হাসির গর্জনও। কবিতাটি তিনটি অংশে বিভক্ত, যার দ্বিতীয় অংশে তিনি তৎকালীন আমেরিকান পুঁজিবাদ, যুদ্ধংদেহী মনোভাব, সামরিকায়ন এবং যান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রাচীন হিব্রু পুরাণের নরবলি নেওয়া নিষ্ঠুর দেবতা মলোখ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কবিতায় “The asshole is holy”-এর মতো পংক্তি অনেকের আপত্তির কারণ হয়েছিল। এই কবিতার জন্য তাঁর প্রকাশকের বিরুদ্ধেও অশ্লীলতার মামলা হয়েছিল, গ্রেফতারও হন; যা পরে গিন্সবার্গ জিতে যান।

আবার আমরা যখন উইলিয়াম কেরির কথোপকথন‘ বা “Dialogues Intended to Facilitate the Acquiring of the Bengalee Language” (1818) গ্রন্থটির দিকে আলোকপাত করি, তখন দেখতে পাই এটি বাংলা গদ্যের ইতিহাসে এবং বিশেষ করে ভাষার সমাজতাত্ত্বিক বিবর্তনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এই গ্রন্থের ‘মাইয়াকন্দল’ (মেয়েদের ঝগড়া) অংশে সমকালীন গ্রামীণ ও শহরতলীর সাধারণ নারীদের মধ্যকার ঝগড়াকে অতি-বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নানা ধরনের গালির উল্লেখ আছে এতে; পুতখাকী, ভাইখাকী, বজ্জাত, ভাতারী, ভালখাকী, ঝাঁটামারা, পেটফালিনি, খানকি, গস্তানী ইত্যাদি গালির সাবলীল ব্যবহার এই অংশে দেখা যায়। তখনকার তথাকথিত সুশীল সমাজের চোখে এসব ‘অশ্লীল’ ঠেকলেও, তা-ই ছিল মূলত সাধারণ মানুষের ভেতরের খাঁটি রাগ ও ক্ষোভ প্রকাশের আসল রূপ।

বিলু কবীরের বাংলা গালির ব্যুৎপত্তিব্যাকরণ– প্রবন্ধের দিকে তাকালেও এর স্পষ্ট প্রমাণ দেখতে পাই আমরা। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে আমাদের সমাজ ও সাহিত্যে লৌকিক শব্দ বা গালিগালাজ বাস্তবতার প্রয়োজনে অবলীলায় স্থান করে নিয়েছে। আধ্যাত্মিক সাধক লালন শাহ তাঁর গানে সমাজে প্রচলিত নারীদের তুচ্ছার্থক গালি ‘মাগি’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে তীব্রাক্ষেপ করে এর গর্হিত রূপটিকেই তুলে ধরেছেন—কারে বলো মাগি মাগি / মাগির হাত এড়াতে পারে / কোন বাসহযোগী…”।

খোদ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর বউঠাকুরাণীর হাট উপন্যাসে চরিত্রের প্রয়োজনে এবং তুচ্ছতাচ্ছিল্য বোঝাতে ‘মাগি’ এবং ‘মিনসে’র মতো রূঢ় লৌকিক শব্দ ব্যবহার করেছেন।

নাগরিক কবি শামসুর রাহমান তাঁর বিখ্যাত এই মাতোয়ালা রাইত কবিতায় সমাজের নগ্ন বাস্তবতাকে হুবহু ফুটিয়ে তুলতে ‘খানকি মাগী’, ‘হালায়’, ‘মাদদির পো’, ‘হোগা’র মতো অত্যন্ত চড়া ও লোকজ গালিগুলোকে অবলীলায় এবং অত্যন্ত লাগসইভাবে ব্যবহার করেছেন।

১৯৭৪ সালের বাংলাদেশে যখন হাজার হাজার মানুষ না খেতে পেয়ে রাস্তায় মারা যাচ্ছিল, চারদিকে খাদ্যের জন্য হাহাকার চলছিল, অথচ রাষ্ট্র ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে ব্যর্থ হয়েছিল, তখন কবি রফিক আজাদ তাঁর কালজয়ী ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতাটি লিখেছিলেন।  স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতাশাসকগোষ্ঠী এবং ব্যর্থ শাসনব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে চরম ক্ষোভ ও হাহাকার থেকে এই ‘হারামজাদা’ শব্দটি উচ্চারণ করেছিলেন। স্বাধীন দেশে সাধারণ মানুষের এই চরম ক্ষুধা ও দুর্দশা কবিকে ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছিল। যে স্বপ্নের বাংলাদেশের জন্য তিনি মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন, সেই দেশের ব্যর্থ রাষ্ট্রযন্ত্রের মুখের ওপর দাঁড়িয়ে কবি ক্ষুধার্ত, বিপন্ন ও কণ্ঠহীন মানুষের প্রতিনিধি হয়ে সরাসরি এই চরম ধমকটি ছুড়ে দিয়েছিলেন। 

এই সব ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক ঘটনা একটি সাধারণ সত্যের দিকেই ইঙ্গিত করে যে-ভাষা কখনো নিরপেক্ষ নয়, এটি ক্ষমতার একটি প্রধান হাতিয়ার। যখন রাষ্ট্র বা শাসকশ্রেণী “শালীনতা” আর “শৃঙ্খলা”র সংজ্ঞা নিজের হাতে কুক্ষিগত করে রাখে, তখন সেই সংজ্ঞা ভাঙাই হয়ে ওঠে বিদ্রোহের প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ। সেটা কখনো স্লোগানে কখনো কলমে। 

হেবার্টের “Foutre”, কসাকদের চিঠি, রুশ শ্রমিকদের “Mat”, তাহরির স্কয়ারের প্ল্যাকার্ড, কেরির সংকলিত লোকজ ‘মাইয়াকন্দল’, লালন সাঁইয়ের আক্ষেপ, রবীন্দ্রনাথের চরিত্র-বাস্তবতা, শামসুর রাহমান ও রফিক আজাদের ক্ষুব্ধ কবিতা কিংবা আজকের বাংলার রাজপথের ‘শাওয়া মাওয়া’র মতো গালিগুলো নিছক কোনো ব্যক্তি-অশ্লীলতা নয়, সংস্কৃতির অবক্ষয় নয়; এগুলো হলো ফ্যাসিবাদের তৈরি করা ভয়ের প্রাচীর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার শব্দ। 

ক্ষমতা প্রায়ই তার বৈধতা টিকিয়ে রাখে এক ধরণের অলঙ্ঘনীয় ভাবমূর্তি ও সুশীল দূরত্বের ধোঁয়াশা তৈরি করে। গালি বা রূঢ় ভাষা সেই সাজানো দূরত্বকে এক ফুৎকারে মুছে দিয়ে শাসককে নামিয়ে আনে সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষের কাতারে। আর তখনই একজন জালিমকে ঘৃণা করা, তার দিকে আঙুল তোলা, তাকে উৎখাত করা মজলুমের জন্য সহজ হয়ে যায়।

তাই ভাষার এই তথাকথিত “নোংরামি” আসলে এক পরম রাজনৈতিক স্বচ্ছতা। যখন শোষিতের কণ্ঠ আর কোনো মধ্যস্থতা বা সুশীল সৌজন্যের বোঝা বহন করতে রাজি হয় না, তখনই তা স্বৈরাচারের বুকে সবচেয়ে সত্য এবং সবচেয়ে শক্তিশালী বুলেটের মতো গিয়ে আঘাত করে।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যারা গণ-অভ্যুত্থানের মাঠ থেকে উঠে আসা রূঢ় ভাষাকে ‘অশ্লীলতা’র তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে দিতে চান, তারা আসলে ক্ষমতার ভেতরের রাজনীতিটাকে বুঝতে ব্যর্থ হন। শহীদ ওসমান হাদি নিজের জীবন দিয়ে আমাদের এই পাঠই শিখিয়ে গেছেন। প্রচণ্ড গণহত্যাকারী ও জালিমের ফারাওনিক অহংকারের বিপরীতে একজন অস্ত্রহীন, শক্তিহীন মাজলুমের ‘জবান’ ছাড়া আর কিছুই থাকে না। আর সেই জবান থেকে যখন শোষকের উদ্দেশ্যে চরম ঘৃণা ও গালি ছুড়ে দেওয়া হয়, তখন তা আর গালি থাকে না—তা হয়ে ওঠে শৃঙ্খলমুক্তির অনন্য মহাকাব্য।

Inline image


আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা