রওশন হক
হাসনাত আব্দুল্লাহ কোনো আরাম-আয়েশের রাজনীতি থেকে উঠে আসা নাম নন। তিনি সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা ভয়কে অতিক্রম করে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল। যখন অনেকেই নীরব ছিল, তখন তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলেছিলেন। যখন দমন-পীড়ন চলছিল, তখন তিনি পিছু হটেননি।
ইতিহাসে নেতৃত্ব কখনো পদবি থেকে জন্ম নেয় না, জন্ম নেয় সংগ্রাম থেকে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে হাসনাত আব্দুল্লাহ সেই সংগ্রামের সামনের সারির একজন মুখ হয়ে উঠেছিলেন। রাজপথের ধুলো, টিয়ারশেল, লাঠিচার্জ, হুমকি এবং নির্যাতনের মধ্য দিয়েই তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নির্মিত হয়েছে।
আজ লন্ডনে তাঁর ওপর হামলা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, হামলা কখনো কোনো আদর্শকে থামাতে পারেনি। বরং প্রতিটি আঘাত নতুন করে মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় কেন এই লড়াই শুরু হয়েছিল।
যারা মনে করে একজন হাসনাতকে লক্ষ্য করে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নকে থামিয়ে দেওয়া যাবে, তারা ইতিহাস বোঝে না। কারণ নেতৃত্ব কোনো একক ব্যক্তি নয়, নেতৃত্ব একটি চেতনা। সেই চেতনা আজ হাজারো তরুণের হৃদয়ে।
বাংলার ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, এই মাটি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না। হাজী শরীয়তুল্লাহ, তিতুমীর,শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী-এর মতো সংগ্রামী নেতাদের উত্তরাধিকার বহন করে এই জাতি। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের রাজপথে উঠে এসেছে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব।
রাজপথের অকুতোভয় সেই তরুণ আজ সংসদে জনগণের প্রতিনিধি। এটাই ইতিহাসের স্বাভাবিক অগ্রযাত্রা। সংগ্রাম থেকে নেতৃত্ব, নেতৃত্ব থেকে রাষ্ট্রগঠন। আর সেই কারণেই হাসনাত আব্দুল্লাহ শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি সময়ের প্রতীক, একটি প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা এবং নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নের অন্যতম বাহক। মনে রাখবেন হামলায় থামানো যায় না ইতিহাসের অগ্রযাত্রা ।
মানুষকে আঘাত করা যায়, আদর্শকে নয়। হাসনাত আব্দুল্লাহ একজন ব্যক্তি নন, তিনি ২০২৪-এর রাজপথ থেকে উঠে আসা একটি প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি।”
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
………….
নিউইয়র্ক
১৬/০৬/২৬
২.
হাসনাতকে ঘিরে এত অস্বস্তি কেন?
লন্ডনে হাসনাতের ওপর ডিম নিক্ষেপের ঘটনায় যতটা উল্লাস আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে দেখা গেছে, তার চেয়েও বেশি উচ্ছ্বাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যেও লক্ষ্য করা গেছে বলে আমার মনে হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, কেন?
হাসনাত, আসিফ, নাহিদদের মতো তরুণরা রাজনীতিতে এসে কী এমন ভুল করেছে? তারা কি একটি দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল বলেই আজ এত আক্রমণের শিকার? তারা কি অন্যায়, গুম, খুন, নিপীড়ন ও জবাবদিহির দাবিতে কথা বলেছিল বলেই আজ তাদের এত অপছন্দ করা হচ্ছে?
আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থকের ক্ষোভ থাকার কারণ রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। তাদের দল ক্ষমতার বাইরে গেছে, তাদের শীর্ষ নেতারা বিচারের মুখোমুখি বা দেশের বাইরে, ফলে তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া থাকাই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের একটি অংশ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে পক্ষপাতের অভিযোগ রয়েছে। অনেকের বিশ্বাস, সেই কারণেও নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সহজভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে না।
কিন্তু যে প্রশ্নটি আরও বড়, তা হলো বিএনপির একটি অংশের এত অস্বস্তি কেন? জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী তারাই , কারণ এবারের মতো এতোটা সুখাসনে বিএনপি তাদের জন্মে পর থেকে কখনোই ছিলো না , তাহলে সেই আন্দোলনের তরুণ মুখগুলোর প্রতি এত বিরূপ মনোভাব কেন? নতুন নেতৃত্ব কি পুরোনো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে অস্বস্তিতে ফেলছে? নাকি তারা এমন একটি বিকল্প রাজনীতির কথা বলছে, যা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোকেই চ্যালেঞ্জ করছে? এসব প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।
ইতিহাস বলছে, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষদের পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। সক্রেটিসকে বিষপান করতে বাধ্য করা হয়েছিল। যিশু খ্রিস্টকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল। মহাত্মা গান্ধী আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে হত্যা করা হয়। নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। প্রথমে তাদের উপহাস করা হয়েছে, অপমান করা হয়েছে, আক্রমণ করা হয়েছে। পরে ইতিহাসই তাদের মূল্যায়ন করেছে।
তাই কোনো তরুণ নেতাকে অপমান করা বা হেনস্তা করা ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। পরিবর্তনের রাজনীতি করতে গেলে প্রতিরোধ আসবেই। কারণ, পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলে তাদের, যারা পুরোনো ব্যবস্থায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
ইতিহাসের শিক্ষা একটাই। সাময়িক উল্লাস, কটূক্তি বা অপমান কোনো মানুষের রাজনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করে না। শেষ পর্যন্ত মানুষের রায়, আদর্শের শক্তি এবং সময়ই ঠিক করে দেয় কে ইতিহাসের সঠিক পাশে ছিল।
………….
১৮/০৬/২৬
নিউইয়র্ক







