মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবন ও কর্ম একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। মুস্তাফা মনোয়ার তেমনই একজন বিরল প্রতিভা। তাঁর মৃত্যুতে আমরা হারালাম একজন বরেণ্য চিত্রশিল্পী, পাপেট শিল্পের পথিকৃৎ, শিশু-সংস্কৃতির নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক এবং একজন আলোকিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে। তাঁর চলে যাওয়া শুধু একজন শিল্পীর মৃত্যু নয়; এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছে।
কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান হিসেবে তিনি এমন এক সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে উঠেছিলেন, যেখানে সাহিত্য, শিল্প ও মানবিক মূল্যবোধ ছিল পারিবারিক শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে তিনি কখনোই পিতার পরিচয়ের ছায়ায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং নিজের মেধা, অধ্যবসায় ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে তিনি নির্মাণ করেছেন এক স্বতন্ত্র পরিচয়। তাঁর শিল্পীজীবন প্রমাণ করে—প্রকৃত শিল্পীর পরিচয় তাঁর কর্মেই নিহিত।
মুস্তাফা মনোয়ারের চিত্রকলা ছিল বাংলাদেশের প্রকৃতি, মানুষ, লোকজ ঐতিহ্য এবং জীবনবোধের এক নান্দনিক ভাষ্য। রঙের ব্যবহারে ছিল স্বতঃস্ফূর্ততা, রেখার বিন্যাসে ছিল গভীর ভাবনার ছাপ। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্প মানুষের আত্মাকে জাগ্রত করে এবং একটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে সুদৃঢ় করে। তাঁর ছবিতে যেমন নান্দনিকতার প্রকাশ ঘটেছে, তেমনি প্রতিফলিত হয়েছে মানুষের জীবন, সংগ্রাম, স্বপ্ন ও আশার গল্প।
তবে মুস্তাফা মনোয়ারকে শুধু একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে মূল্যায়ন করলে তাঁর অবদানকে ছোট করা হবে। বাংলাদেশের পাপেট শিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক ও জনপ্রিয় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ঐতিহাসিক। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, পাপেট কেবল শিশুদের বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি শিক্ষা, নৈতিকতা, সামাজিক সচেতনতা এবং সাংস্কৃতিক চেতনা গড়ে তোলার শক্তিশালী মাধ্যম। তাঁর উদ্যোগে পাপেট শিল্প নতুন প্রাণ পায় এবং দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান অর্জন করে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বিশেষ করে শিশুদের জন্য নির্মিত অনুষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাঁর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি শিশুদের কল্পনাশক্তিকে বিকশিত করতে চেয়েছেন আনন্দ, সৌন্দর্য ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে। বর্তমান সময়ে যখন শিশুদের জগৎ প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনে ক্রমেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে, তখন মোস্তফা মনোয়ারের কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিশুদের মানসিক বিকাশে শিল্প ও সংস্কৃতির বিকল্প নেই।
তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠকও। শিল্পচর্চাকে সমাজের বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তাঁর নেতৃত্ব, পরিকল্পনা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শিল্পকে অভিজাত গণ্ডি থেকে সাধারণ মানুষের জীবনের অংশে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে নয়; শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশেও নিহিত।
মুস্তাফা মনোয়ারের জীবন আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—সৃজনশীলতা কখনো একমুখী নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে চিত্রকর, শিক্ষক, সংগঠক, সংস্কৃতিসেবী এবং শিশুদের বন্ধু হতে পারেন। তিনি তাঁর সমগ্র জীবন দিয়ে সেই সত্যেরই উজ্জ্বল উদাহরণ স্থাপন করেছেন। তাঁর কর্মের বিস্তৃতি প্রমাণ করে, শিল্পের কোনো একক সীমানা নেই; শিল্প মানুষের জীবন, সমাজ ও ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
আজকের বাংলাদেশে যখন শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন মোস্তফা মনোয়ারের জীবন ও দর্শন নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। তিনি শিখিয়েছেন, সংস্কৃতি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি জাতির আত্মার ভাষা। শিশুদের হাতে বই, রংতুলি, পাপেট কিংবা সৃজনশীলতার অন্য কোনো মাধ্যম তুলে দেওয়া মানে একটি আলোকিত ভবিষ্যতের ভিত্তি নির্মাণ করা।
একজন শিল্পীর মৃত্যু ঘটে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি কখনো মৃত্যুবরণ করে না। মুস্তাফা মনোয়ার শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর আঁকা ছবি, তাঁর নির্মিত পাপেট, তাঁর সাংস্কৃতিক দর্শন এবং তাঁর সৃজনশীল উত্তরাধিকার যুগের পর যুগ আমাদের অনুপ্রাণিত করবে। নতুন প্রজন্ম যখন বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাস জানবে, তখন শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে তাঁর নাম।
আজ আমরা গভীর বেদনার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছি। তাঁর মৃত্যুতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তবে তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের কাছে এক স্থায়ী প্রেরণা হয়ে থাকবে। তাঁর সৃষ্টির মধ্যেই তিনি বেঁচে থাকবেন—রঙে, রেখায়, কল্পনায়, শিশুদের হাসিতে এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রতিটি উজ্জ্বল অধ্যায়ে।
আমরা মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন মোস্তফা মনোয়ারকে তাঁর অসীম রহমতে আচ্ছাদিত করেন এবং জান্নাতুল ফেরদৌসে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন।
পরিশেষে বলতে চাই, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি মরহুম মুস্তাফা মনোয়ারকে। তাঁর সৃষ্টিশীল কর্ম, শিল্পদর্শন ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আকাশে চিরকাল এক উজ্জ্বল আলোকধারা হয়ে দীপ্তি ছড়াবে।
লেখক:
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
mahbubhossain786@yahoo.com







