পলিয়ার ওয়াহিদ
‘কৌশিকের পায়ে গুলি লেগেছে। অবস্থা বেহাল। হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।’ এভাবে শুরু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ওপর লেখা ছোট্ট উপন্যাস ‘চৌহাট্টার লাল বৃষ্টি’। নাঈমুল ইসলাম গুলজার মূলত কবি। স্বভাব কবিই বলা যায়। ফলে জুলাইয়ে সে ঘরে বসে থাকতে পারেনি। নিজে অংশগ্রহণ করেছে এবং লিখে ফেলেছে পুরো সিলেটের অভ্যুত্থানের ইতিহাস।
উপন্যাসে দেখা যায় সিলেটের কানাইঘাট গ্রামে একই সঙ্গে বড় হয়েছে দুই বন্ধু কৌশিক আর গল্পকথক। শহরে তাদের বন্ধু-কাম চা দোকানি সৈকত দা। হেন কোনো জ্ঞান নাই যা তিনি জানেন না! আড্ডা-চা-গল্পে সৈকদাও তাদের প্রধান সঙ্গী।
কৌশিক আর গল্পকথকের জুলাইয়ের অংশগ্রহণের মধ্যে হাজির হয় ইলা। ইলা হচ্ছে গুলজারের ফুফুতো বোন। কখনো কখনো নায়ক ইলার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে! মুখে হাত দিয়ে ভাবুক বেশে তার ভাতখাওয়া দেখে! তখন পাঠক বুঝে নেয় ডাল মে কুচ কালা হ্যায়! প্রেম এমনই। ভাষার চেয়ে অনুভূমি সেখানে প্রবল!
তারপর আরেক চরিত্র পাই। আকবর চাচা। পথের মানুষ। কিন্তু জুলাই তো আমাদের অচেনাকে চিরচেনা করেছে। ফলে জমাটবাধা রক্তের মতো শক্তি জুগিয়েছে।
চৌহাট্টা মূলত সিলেটের পুরনো নাম। ফলে জুলাইকে ঘিরে উপন্যাসের এই নাম ঐত্যিহাসিকও বটে। উত্তম পুরুষে বর্ণিত এই উপন্যাসে গুলজারই মূলত নায়ক। কিন্তু তার চরিত্র নির্মাণে কৌশিকই উজ্জ্বল বেশি। কারণ সেই-ই জুলাই অভ্যুত্থানে মিছিলে নেমে আহত হয়। গুলি লাগে। হাসপাতালে ভর্তি হয়। আর কৌশকের সঙ্গে জোকের মতো লেগে থাকে কথক।
মাত্র কয়েকটি চরিত্র দিয়েই সে পুরো সিলেটের জুলাইয়ের আখ্যান তুলে ধরবার চেষ্টা করেছে। এখানে এসেছে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমসি কলেজ। আলেয়া ফুফুর বাসা। টিলাগড় থেকে আম্বরখানা। তারপর মদিনা মার্কেট আখালিয়া। উপন্যাসের পুরোটা জুড়ে আন্দোলনে তাদের নৈতিক অংশগ্রহণ-ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন জুম্মবারে মসজিদের ইমাম জুলাই নিয়ে কোনো বয়ান না দেওয়ায় তাদের ক্ষোভ বাড়ে। একই সঙ্গে দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজকে গালি দেওয়া। কারণ তারা খুনি সরকারের দালালি করতেছে। সাংবাদিক তোরাবকে বন্দরবাজার কোটপয়েন্টে পুলিশ অফিসার এডিসি দস্তিগীর নিজ হাতে গুলি করে। সেটা যখন উপন্যাসে তুলে ধরা হয় তখন এটা আর উপন্যাস থাকে না জুলাইয়ের দলিল হিসেবে হাজির হয়।
উপন্যাসটি পড়লে পুরো সিলেট শহরের চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নাওয়েরপুল থেকে টিলাগড়, মেজরটিলা দেখা যায়। আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসা ও মুজিববাদী বয়ানে মানুষকেও হত্যা করাও যেন জায়েজ করে তুলতে চেয়েছিল।
উপন্যাসে শুধু সিলেট কেন? ঢাকা থেকে আন্দোলনের ঘোষণার সঙ্গে তাদের বাস্তবায়ন করা। নাহিদ ইসলামকে তুলে নেওয়া। আব্দুল কাদেরের নয় দফা। আসিফ মাহমুদ, আবুল বাকের চলে আসে। প্রবাসীরা যে রেমিটেন্স না পাঠিয়ে সরকারকে বিপদে ফেলে সেটার আলাপ।
উপন্যাসে স্বয়ং তুলে ধরা হয় শেখ হাসিনার নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি। নূর হোসেনকে তিনি ডেকে ছিলেন। তখন নূর হোসেন বলে– আপা আপনি আমাকে দোয়া করেন আমি গণতন্ত্র রক্ষার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত! ফলে হাসিনা তার বয়ানে কট খায়। নৈতিকতা হারায়।
পর্ব করে সাজানো উপন্যাসে আমরা সিলেটের জুলাই অভ্যুত্থানকে ছবির মতো সাজাতে পারব। টিলাগড় থেকে শিবগঞ্জ-মিরাবাজার হয়ে চৌহাট্টায় পৌছানোর গল্প আছে।







