প্রচ্ছদসাম্প্রতিকহাসিনার ফিরে আসা, গৃহযুদ্ধের হুমকি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

লিখেছেন : তাজ ইসলাম

হাসিনার ফিরে আসা, গৃহযুদ্ধের হুমকি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

তাজ ইসলাম

ডিসেম্বরে ফিরব বলে পলাতক শেখ হাসিনা একটা দীর্ঘ সময় নিলেন। কর্মীদের ফেলে দিলেন এই দীর্ঘ সময়ের টোপে। এই লম্বা সময় আশান্বিত হয়ে অপতৎপরতা চালিয়ে যাবেন।
হাসিনার ম্যাজিক ডেট হওয়ার কথা ৫ আগস্ট। জুলাইয়ের ১ তারিখ, জুলাইয়ের ৩০ তারিখও হতে পারত। আল্টিমেটাম টাইম দ্রুত ফুরিয়ে যাবে এজন্য হয়তো দেননি। কেন দিতে পারতেন এই সময়ে আল্টিমেটাম, কারণ তিনি চ্যালেঞ্জ দিতে পারতেন জুলাইকে। ‘ জুলাইয়ে আন্দোলন শুরু হয়েছিল কাজেই জুলাইয়ের ১ তারিখেই ফিরব, পারলে ঠেকাও।বা জুলাই শেষ হতে দিব না ৩০ তারিখেই ফিরব কিংবা ৫ আগস্টে আমাকে ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে দেশ থেকে তাড়িয়েছে আমি চ্যালেঞ্চ নিলাম, এই ৫ আগস্টেই দেশে ফিরব।’
এর কোনটাই নেননি, কারণ সময় অতি নিকটে। টুপ করে শেখ হাসিনা কতবার ঢুকলেন তার হিসাব নাই। ঢুকব, ঢুকব করে বিরোধী শিবিরে, গণমাধ্যমে যথারীতি হাস্যরস তৈরী করেছেন। নিজের দলের লোকদের ট্রলের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছেন। শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কথা মানেই নতুন কমেডি, আবার হাসি,আবার ট্রল।অথচ দলীয় কর্মীদের একটু প্রাণ দেওয়া দরকার। এজন্য ডিসেম্বরকে বেছে নিলেন। আসবে কি আসবে না এই তর্কের আগে পরে ছয় মাস দলীয় কর্মীরা বলতে থাকবে আসবে, এই বুঝি আসবে,অবশ্যই আসবে। ছয় মাসের জোরটাও কম কথা না। চলুক আসবে আসবে স্লোগান।

এখানে আরও একাধিক রাজনীতি আছে।
এর একটা হল জুলাই মাসে জুলাই নিয়ে সরব থাকবে জুলাই পক্ষ। এই সরব থাকাকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করতে নানা তৎপরতা চলমান। এর একটি ছিল শাওন ও অন্যদের কর্তৃক জুলাইকে কটাক্ষ করা। শাওন কর্তৃক তৈরী করা ইস্যুতে জুলাইর কার্যক্রম বাদ দিয়ে তাকে কাউন্টারে লিপ্ত ছিল অনেকেই।
হাসিনা আসবে ইস্যুতে আবার সরব হবে জুলাই পক্ষ। এই সুযোগে জুলাই নিয়ে নানা আয়োজনের প্রচার প্রচারণা সহজেই আড়ালে চলে যাবে।

ভারতের নিজস্ব কিছু চাল আছে।
হাসিনাকে দিয়ে ভারতের আর কোন স্বার্থ হাসিলের কোন সম্ভাবনা নাই। কাজেই তাকে পেলে পোষে অণ্ণ ক্ষয়ের কোন লাভ নাই। তাকে এখন ফেরত দিতে পারলেই ভারত নিস্কৃতি পায়।
হাসিনার বর্তমান বয়স প্রায় ৮০ বছর। একজন বাঙালি নারী হিসেবে যথেষ্ট বয়স হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে বলা যায় তার সময় ফুরিয়ে এসেছে। এমতাবস্থায় তার মৃত্যু হলে ভারতের মাটিতেই হবে তার শেষ ঠিকানা। কাজেই জীবিত হাসিনাকে মৃত হাসিনার আগে ফেরত পাঠাতে পারলে ভাল হয়।
হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠালে বা পাঠিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তোলা সহজ। এরপর এর সুবাদে ভারতের ফায়দা লোটা আরও সহজ।

নিষিদ্ধ ঘোষিত ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগ প্রচার করছে এখন আর জুলাইয়ের মতো সাধারণ নাগরিক রাজপথে নামবে না। সাধারণ নাগরিক কারা? রাজনৈতিক নাগরিকরাই সাধারণ নাগরিক। হাসিনা বা আওয়ামীলীগকে প্রতিরোধ করতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা মাঠে নামবে না? অবশ্যই নামবে। জামায়াত-বিএনপি অবশ্যই আওয়ামীলীগের জন্য বড় প্রতিরোধকারী। যে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থেকে নিজের কর্মীবাহিনী ও সরকারী বাহিনী দিয়ে নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি তারাই পালিয়ে গিয়ে দেয় হুমকি। এই হুমকিকে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এবার তারা মাঠে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণে আশ্রয় নিতে পারে দুভাবে।

প্রথমত নির্বাচিত সরকার ও একটি দেশের শান্ত পরিবেশকে অস্থিতিশীল করতে তাদের কর্মীবাহিনী হতে পারে সশস্ত্র, গেরিলা ও জঙ্গি। যেমনটা আওয়ামী কালচারাল মুখগুলো বারবার বয়ান পেশ করে গৃহযুদ্ধের। লীগের পলাতক, আত্মগোপনে থাকা কর্মীরা মরণ কামড়ে অঘোষিত যুদ্ধে নামতে পারে। এইখানে অবশিষ্ট খেলাটা খেলবে ভারত। ভারত সকল প্রকার সহযোগিতা করতে পারে। যেমনটা খালেদ মহিউদ্দিনের টকশোতে আওয়ামীলীগের হয়ে সাংবাদিক আনিস আলমগীর খোলামেলা বলেছেন ‘ কী করতে হবে তা ঠিক করে দেবে হাসিনা যে দেশে আছেন সে দেশ।’

এছাড়া হাসিনা ডিসেম্বরে ফিরবে বলে আহামরি তেমন কিছু হওয়ার কথা না। ভারত হাসিনাকে ফেরত দিতে চায়, বাংলাদেশ সরকারও একজন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীকে ফেরত নিতে চায়। হাসিনা আসবে দু দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বন্দি বিনিময় চুক্তির ভিত্তিতে। এখানে হাসিনার আত্মসমর্পণের কিছু নাই।

হাসিনা বনে জঙ্গলে বা অজ্ঞাত কোন রাষ্ট্রে পলাতক না যে সে এসে সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করবে। হাসিনা চেনাজানা, প্রকাশ্য, নিকটবর্তী রাষ্ট্রের হেফাজতে আছে। হাসিনা নিজের ইচ্ছায় ফেরার কোন সুযোগ আছে? হাসিনাকে ফিরতে হবে দু দেশের আইনি প্রক্রিয়ায়। আইন মোতাবেক হাসিনা ফিরবেই মৃত্যু পরোয়ানা মাথায় নিয়ে।

হ্যাঁ হাসিনা যেভাবেই ফিরুক তার ফেরাতে তার দলীয় নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হবে। রাজনীতি হল অন্ধ আবেগের বিষয়। চোখকান খোলা মানুষের কাজ হলে একজন খুনি, ফ্যাসিস্টের জন্য বিবেকবানদের মায়া থাকত না। তার উপর যেই নেত্রী তার লক্ষ লক্ষ তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ঘোরতর বিপদে রেখে নিজের সকল আত্মীয় স্বজন নিয়ে নিরাপদে পালিয়ে যায় তার জন্য পরবর্তীতে ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকার কথা না।

স্বপরিবারে শুধু পালায় নাই। স্ববংশে,স্বনেতা পরিষদে, স্বসংসদে পালিয়েছে হাসিনা। যে নেতার কিছু টাকা ছিল সেই পালিয়েছে। ইউনিয়নের চেয়ারম্যন থেকে শুরু করে সংসদের এমপি, শেখ পরিবারের কুল্লে সদস্যরা আগেভাগেই পালিয়ে গেছে। দেশে রয়েছে যারা তাদের একটু মাথা বড় গুলো জেলে আর তৃণমূল পলাতক। কিছু আছে সমঝোতায়। এরপরও অন্ধ আবেগীরা হাসিনার ফেরাতে মরণঘাতী হবে। এর জন্য প্রথম ক্ষতির মুখে পড়বে ক্ষমতাসীন সরকার। হাসিনার লীগ টিকলে, জুলাই ব্যর্থ হলে ৫ আগস্ট পরবর্তী সবকিছু হুমকিতে পড়বে। কাজেই বাধ্য হয়েই মাঠে নামবে বিএনপি। বিএনপিকে নামতেই হবে। হাসিনার শত্রু জুলাইর আন্দোলনকারীরা। কেউ বলুক আর না বলুক জুলাই পক্ষ মাঠে থাকবে। মাঠে থাকবে জামায়াতসহ অন্য রাজনৈতিক দল ও দলীয় কর্মীরা।

যে হাসিনা ক্ষমতায় থেকে তাদের সামনে দাঁড়াতে পারেনি, সে হাসিনা তার পলাতক শত শত নেতাকর্মী নিয়ে আহামরি কিছু করবে এই শঙ্কা নাই বললেই চলে। তবে অস্থিরতা বাড়াতে চেষ্টা করবে তাদের প্রভু রাষ্ট্রের সহায়তায়।
কাজেই হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নড়েচড়ে বসার বিষয়। হাসিনা, তার দল ও ভারত মনে করে এমন ঘোষণা মাঝে মাঝে দিলে দলীয় কর্মীদের উৎসাহিত করা যায়। এই ঘোষণা হাসিনা বিরোধী, জুলাই পক্ষের জন্যও উপকারী। তারাও সুযোগ পায় সতর্ক হওয়ার।

এতসবের পরে আরও একটি কথা রাজনীতিতে চালু আছে। তা হল হাসিনা আদৌ দেশে ফিরবে না। এগুলো শুধুই কথার কথা। সারা পৃথিবীতে বিপ্লবে,গণ বিক্ষোভে, গণআন্দোলনে যত দেশের যত সরকার প্রধান পালিয়ে গেছে তারা আর কেউ ফেরে নাই, ফিরতে পারে নাই, ফেরার নজির নাই বললেই চলে। এইতো কদিন আগে ইরানের পলাতক শাহের পুত্র এই ফিরছি, এই ফিরছি বলে আর ফেরেননি। ফিরতে পারেনি শাহ, ফিরতে পারেনি শাহ পুত্র। পুনঃ ক্ষমতাতো স্বপ্ন বিলাস, ফিরতেই পারেনি। হাসিনার বয়স ৮০ বছর,তার বংশের পুত্র কন্যারা অন্যদেশের নাগরিক,অন্য দেশের এমপি মন্ত্রী। দেশে লীগের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো পারিবারিক যোগ্য কোন সদস্যই নাই। ক্ষমতাহীন ৮০ বছরের বৃদ্ধার প্রতি আক্ষরিক অর্থে কতটুকু নির্ভর করা যায় তাও ভাবার বিষয়।
আরও একটি কথা চালু, হাসিনা মারা গেছেন। কেন এমন কথা চালু ভিডিও বার্তায় ভগ্ন স্বাস্থ্যের পলাতক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে দেখা যায়,ওবায়দুল কাদেরকে দেখা যায়, অন্য অনেকের হাল সময়ের ভিডিও চেহারা দেখা যায়, হাসিনাকে দেখা যায় না। অডিও বার্তা আছে ভিডিও বার্তা নাই। অনেকেই অনুমান করে আদতে হাসিনা জীবিতই নাই। ভিডিও বার্তায় মাঝে মাঝে কথা ছেড়ে বাজার গরম রাখাই হয়তো কৌশল। তবে আন্তর্জাতিক মিডিয়া যেহেতু প্রচার করে হাসিনার বার্তা তাই এটিকে আমরা হাসিনার জীবিত থাকার প্রমাণ হিসেবে ধরে নিয়েও হাসিনার ফেরাকে কথার কথা হিসেবেই ধরে নিতে পারি। আর যদি ফেরে গন্তব্যও আমরা নিশ্চিত হতে পারি।
হাসিনা ফিরবে বা ফিরাতে ৫ আগস্টে যা হয়নি, যে সব লীগ কর্মীরা দেশে নিরাপদে ছিল সম্ভবত তাদের ঘুমও হারিয়ে যেতে পারে। হাসিনা না ফিরলে আওয়ামীলীগ ফিরে আসতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। হাসিনা ফিরলে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে চিরতরে নির্মূল হবে আওয়ামীলীগের রাজনীতি। আর যদি কোন কারণে আওয়ামীলীগ টিকে যায় তাহলে সমূলে ধ্বংস হবে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি। সোজা কথা হাসিনা ফিরলে কোন কারণে আওয়ামীলীগ টিকে গেলে বাংলাদেশে ফিরে আসবে একদলীয় বাকশাল। এবং ফিরে আসবে পলাশীর ট্রাজেডি। হাসিনার ফিরে আসার পর টিকে যাওয়া আওয়ামীলীগের হাত ধরেই অস্তমিত হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য।

এটি হতে দেওয়া যায় না।

……………
লেখক : কবি, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা