প্রচ্ছদকবিতাজুলাইয়ের কবিতা

লিখেছেন : তাসনীম মাহমুদ

জুলাইয়ের কবিতা

তাসনীম মাহমুদ

অনিবার্য প্রতিজ্ঞার দস্তখত
………………………….

সুখআনন্দ কিংবা মার্সিয়া নয়—
একাত্মতার ঘোষণা নিয়ে আজ আমরা
আমাদের বিবাহের পঞ্চ বার্ষিকীর ‘উপল’
ছাত্রশহীদদের মাগফিরাত কামনায় উৎসর্গ করছি…।

যে বিষণ্ণঘন রাত তাদেরকে করে তুলেছে অকুতোভয়
তার প্রতিটি পদক্ষেপকে জানাই লাল সালাম।
তাদের টগবগে রক্তের শপথ করে বলছি—
আমরা আমাদের আনন্দের স’বটুকু; আসন্ন বিপ্লবের
বিজয় মিছিলের জন্য ইতিহাসের ডায়েরিতে লিখে রাখছি।

টিয়ারসেলের ব্যাগ, সাউন্ড গ্রেনেড, গুলির খোসা
আর রাজপথে দাপিয়ে বেড়ানো গামবুট, যন্ত্রদানব
সাক্ষী থেকো: ‘কীভাবে তোমাদের ব্যবহার করা হয়েছে
অধিকার আদায়ের সুষম দাবীর বর্ণিল বাগানে— আর কীভাবে
তছনছ করতে চাওয়া হয়েছে একটি মেধাবী প্রজন্মের স্বপ্নসমেত’!

প্রতিটি জিম্মি জীবন; প্রতিটি ক্যাম্পাসের
ইঁটকাঠ, টেবিল-বেঞ্চ, বৃক্ষরাজি জেনে রেখো;
‘আমার নিষ্পাপ মেয়েকে সাক্ষী রেখে
দস্তখত দিয়ে রাখছি প্রতিজ্ঞাঅলিন্দের সবুজ মালঞ্চে—
ছাত্র-বন্ধুদের অসীম সাহসের তুমুল আয়োজন/
কখনো; না কখনোই পথ হারাতে দেবে না /
রক্তের উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে কেনা; সাড়ে তিন হাত মাতৃভূমির’!

এ আমার এবং আমাদেরই প্রতিজ্ঞার এক অনিবার্য দস্তখত।

পাঁচ আগস্ট ২০২৪
…………………..

একটি গণবিপ্লবের অপেক্ষায়—
গ্রীষ্মের তৃষ্ণার মতো চৌচির চোখে চেয়ে ছিলো
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গকিলোমিটার; পনেরোটি বছর।—
হ্যাঁ, পনেরোটি বছর ধরে কত মিছিল ফুরিয়ে গেলো রাজপথে—
কত স্বপ্ন গুম হলো; কত প্রাণ খুনে খুনে লাল হলো কালো পিচে—
কত বোন বিধবা হলো আর কত মা কেঁদে কেঁদে অন্ধ হলো!

খুনের নেশায় যার চরমতৃপ্তি ঘটে— তাকে কি
সাধারণ ভাষায় প্যাথলজিক্যাল সাইকোপ্যাথ বলা যায়?

গাছের পাতারা হুহু করে কেঁদে ওঠে; পথের ধূলো/
নিরবে উড়ে যায় বেদনার সরোবরে। আজদাহা তঞ্চক
রুখবে কে? সাধ্য কার— দাঁড়িয়ে যায় বুক চেতিয়ে!

শুকিয়ে ঝরে পড়ছে যখন সম্ভাবনার সকল পাতা
হঠাৎ! হঠাৎ; দু’হাত প্রসারিত করে, সিনা টানটান—
উঠে এলো; দ্বিগবিজয়ী বীর তরুণ-অরুণ— ‘আবু সাঈদ’।

ঘাতকবুলেট ভেদ করে গেলো বুকের পাজর!
তবু উঠে দাঁড়ালো সে বীর— আর সহসা জেগে উঠলো বাংলাদেশ।

কলকল ঝর্ণার সুরে, রিনিঝিনি উদ্দাম তালে
কার্নিশে দেয়ালে মেঠোপথ, অলিগলি রাজপথে,
ক্যাম্পাস অফিস-আদালত, প্রতিটি জীবনের বহ্নি ঘরে
রক্তের স্রোত সাঁতরে নেমে এলো বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ…

পানি নামে কবিতার রেজালায় নেমে এলো মুগ্ধ
সিয়াম সাধনায় ইয়ামিন আর লক্ষ-কোটি ফুটন্ত রক্তকরবী…।

নীল মেরুন জলপাই রঙের পোশাকীর ঘাতকবুলেট
একে একে ভেদ করে গেছে শিশু কিশোর যুবক বৃদ্ধ, নারীর শরীর…
তবু দমে যায়নি বিপ্লব; দমে যায়নি জেন-জেড সমন্বয়।

এপিসি সাঁজোয়া যান উপেক্ষা করে অত:পর
মঞ্জরিত মৌমাছির গুঞ্জনে
বেজে উঠলো গণহত্যার মসনদ ভাঙার ঢাক— আর ধুনিত তুলার মতো
অগণন ছাত্র-জনতা আয়নাবাজির আয়নাঘর গুড়িয়ে ছিনিয়ে নিয়ে এলো
সেই দুর্বিনীত মাহেন্দ্রক্ষণ— পাঁচ আগস্ট ২০২৪, স্বাধীনতা বিজয় সার্বোভৌমত্ব।

রক্তাক্ত পাখি
…………….

একটা শাদা পাখি, উড়ে যাচ্ছে— পালক রক্তাক্ত…
সেই কবে; রাশান বিপ্লবের যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়েছে!
গন্তব্যের পথে, একটা পাহাড়ী অরণ্য অপেক্ষায়—
জন্ম অবধি কুচো শামুক, পোকামাকড় যার খাদ্য
যে ছিনিয়ে নেয়নি মানুষের ব্রেকফাস্ট কিংবা লাঞ্চ।

একটা শাদা পাখি, যার পালক বেয়ে রক্ত ঝরছে—
যার ওমে ঘুমিয়ে পড়ে নতুন দম্পতি, আলুথালু
পৃথিবীর ডিনার— যার সুরের শত্রু আব্রাহার হস্তী;
তাঁর জন্যে; ভোরের আলোড়নে মিছিলের ঠোঁট
গেয়ে উঠবে কী সমন্বিত দাউদের (আ.) যবুর…!

আহা মানুষ— স্রষ্টার মানুষ! কেন রাঙাও হাত
ক্ষমতার খঞ্জরে? আস্তিন গুটায়ে চেয়ে দেখো
বিপ্লব ছিঁড়ে টুকরো টুকরো… মতবাদের ফাঙ্গাস
পাহাড়, অরণ্য, জলাশয়, লোকালয়— কোথাও নেই
অথচ নিশঙ্ক উড়ে যাচ্ছে; পালক রক্তাক্ত একটা শাদা পাখি।

যুগান্তরের চিঠি
………………

ক্যালেন্ডারের পাতায় চব্বিশের রক্ত মাখা
জুলাই—, একসমুদ্র বিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে
আছে শহীদের চোখ; বাঙলার পথে…।
বাটোয়ারা, দরকষাকষির উৎসব শুরু হয়েছে
রাজ পাঠাদের দরবারে। মগডালে বনশকুন…।
সমবেত সভ্যগণ; প্রিয় ভূমির বন্ধুগণ!
দেয়ালে সেঁটে দিয়েছি যুগান্তরের চিঠি—
ফ্যাসিবাদ খতমের সংগ্রামী সময়ের সার্কিটে
নামে-বেনামের যুবক দীর্ঘজীবী হও…।
শ্বেত পতাকার মিছিল টিএসসি, শাহবাগ,
পল্টন হয়ে পৌঁছে যাক— শনিরআখড়া,
উত্তরা, মোহাম্মদপুর আর পৌঁছে যাক—
আন্দরকিল্লা, মতিহার, গল্লামারি, পার্কের মোড়,
কর্ণকাঠী, কুমারগাঁও, ময়মনসিংহ। প্রতিরোধ গড়ে
জ্বালিয়ে দাও— পালানোর সবকটি দরজা।
মৃত্যু অথবা অফুরান্ত জীবনের হাতছানি;
ডাকে ওই! কুহেলী রাতের অন্ধকারে
ওঁৎ পেতে আছে শ্বাপদ, কালনাগিনী…।
সালাহউদ্দিন! উঠে দাঁড়াও; ঝাড়লণ্ঠন জ্বেলে
লুসিফেরিনের বাহিনী নিয়ে সিনা টানটান;
এগিয়ে যাও— হয়তো এবার অথবা
আর কখনো নয় ইতিহাস তোমার…।

বিরল প্রজাতির বিপ্লব
……………………..

জালে আটকে যাওয়া একঝাঁক
বিরল প্রজাতি মাছের মতো
আমরা একটি আসমানী বিপ্লব পেয়েছি—
যেভাবে পেয়েছিলাম অন্যসব বিপ্লবের মতো
১৯৪৭ এবং ‘৭১…। হ্যাঁ;
ফিঁকে হয়ে যাওয়া স্বপ্নের দ্যূতি
ফিরিয়ে এনেছে যে মাহেন্দ্রক্ষণ—
আমরা তার নাম দিয়েছি ‘জুলাই বিপ্লব’। এবং
সেই বরাবরের মতোই কাকডাকা ভোরে
রাজনীতিবিদদের অসাধুতা জনগণের ভাগ্য নিয়ে
শুরু করেছে তুমুল তামাশা… কেননা
তাদের পেট ও মস্তিষ্ক এতোটা কাছাকাছি যে—
রিফর্মের এজমালি ভাষাকে তারা
একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইতি টানতে চায়…
অথচ জনগণের চোখ
আরোও কিছু আকাঙ্খা নিয়ে চেয়ে আছে
ক্ষমতার রেসে দৌঁড়ানো
লাল কালো সাদা সাঁ সাঁ শব্দের গতির দিকে…
আহ! আহ! শঠ তঞ্চকের রাজনীতি—
এমন বিরল সময়ে আমাদের ভাগ্যকে
কীভাবে বিকিয়ে দিতে পারো! এই
এতোশত সুগন্ধি ফুলের সমাহার এবং
রং বেরঙের সমন্বয় উৎসব; তবে কি
তোমাদের গোলামীর গর্দানে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে?
ইতিহাস তো বারবার ফিরে আসে— অতএব
মনে রেখো হে প্রবঞ্চক—
মুটে মজুর শ্রমিক, ছাত্রজনতার
রক্তঘাম- জীবনের সাথে ছলচাতুরী
তোমাদের ভুঁড়ি আর নিতম্বের জন্য
প্রস্তুত করবে যে বেয়নেট—
তার ফলা হবে চমৎকার তীক্ষ্ণ…!

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা