শান্তা মারিয়া
হুমায়ূন আহমেদ এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক। দেশজুড়ে তার অসংখ্য পাঠক। তার উপন্যাস, আত্মজীবনী, নাটক, চলচ্চিত্র, গান প্রতিটিই জনপ্রিয়। লিখেছেন ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘সাজঘর’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’সহ অনেক অবিস্মরণীয় উপন্যাস। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রধান স্তম্ভ ছিলেন তিনি। গত চার দশক ধরে তিনি ছিলেন বইমেলায় সর্বাধিক বিক্রীত লেখক।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের জীবন তার চেয়ে সার্থকভাবে আর কোনো লেখকের কলমে উঠে আসেনি। তার উপন্যাসের চরিত্র ‘হিমু’, ‘মিসির আলি’, ‘শুভ্র’ পেয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। হুমায়ূন আহমেদ সমকালে কতটা জনপ্রিয় তা শুধু হিমু চরিত্রের প্রতি তরুণদের ভালোবাসা দেখলেই বোঝা যায়। হলুদ পাঞ্জাবি পরা এক খেয়ালি যুবক যে জীবনের সব ছকবাঁধা হিসেবনিকেশ পাল্টে দিতে পারে তার প্রতি তরুণদের আকর্ষণ অনিবার্য । ‘হিমু-প্রেমী’দের সংগঠনও রয়েছে। সারাদেশে রয়েছে তাদের সদস্য। এরা হিমু ও তার প্রেমিকা রূপার মতো হলুদ পাঞ্জাবি ও নীলশাড়ি পরে, সমাবেশ করে, বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে। কোনো লেখকের সৃষ্ট চরিত্র নিয়ে এমন আয়োজন তার সর্বব্যাপী জনপ্রিয়তার প্রমাণ নিঃসন্দেহে। হুমায়ূন আহমেদ যে জনপ্রিয়তা ও ভালোবাসা পেয়েছেন তার পাঠকদের কাছ থেকে সারা বিশ্বে তেমন নজির খুব বেশি নেই।
তারপরও সাহিত্যের ইতিহাস যে পাঠকের জানা আছে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারেন এ কথা ভেবে যে হুমায়ূন আহমেদ টিকে থাকবেন তো? তার সময়ের পাঠককে মোহাবিষ্ট করতে পারলেও ভাবীকালের পাঠকদের মধ্যে তিনি কতটুকু জনপ্রিয় থাকবেন? সচেতন পাঠক মাত্রই জানেন সাহিত্যে জনপ্রিয়তা ও স্থায়ীত্ব পরস্পরবিরোধী না হলেও এ দুয়ের পথ কিছুটা আলাদা। অনেক জনপ্রিয় গ্রন্থ কালের বিচারে ধূসর হয়ে যায়, চলে যায় বিস্মৃতির আড়ালে। আবার অনেক গ্রন্থ সমকালে জনপ্রিয় না হলেও স্থায়ীত্বের বিচারে বনস্পতি হয়ে ওঠে। শতবর্ষী বৃক্ষের মতো তার ফুলও আকৃষ্ট করে পরবর্তী কালের পাঠককে। হুমায়ূন আহমেদের লেখা প্রকাশিত হওয়ামাত্র পাঠক গ্রহণ করেছেন সাদরে। তার কোনো বই তা সে উপন্যাস হোক, হোক আত্মজীবনী কিংবা ছোটগল্প তা পাঠকের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়নি। কিন্তু কালের বিচারে তা কতটুকু স্থায়ীত্ব পাবে? দুশ’র বেশি বই যিনি পাঠককে উপহার দিয়েছেন তার সৃষ্টিকর্মের সবটুকু না হলেও কালের সোনার তরীতে তার কিছু কিছু টিকে থাকবে এমন আশা তো করাই যায়। অন্তত তার ছোটগল্পের বেলায় এ কথা বলা চলে নির্দ্বিধায়।
তিনি মূলত উপন্যাস লেখক হিসেবেই তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন কিন্তু উপন্যাস লেখক হিসেবে তার বিপুল জনপ্রিয়তা সম্পর্কে নির্মোহ হয়ে যদি একবার তাকানো যায় তার ছোটগল্পভাণ্ডারের দিকে তাহলে দেখা যায় কি অসামান্য ছোটগল্পকার ছিলেন তিনি। তার ছোটগল্পের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে অতিপ্রাকৃত বিষয়। না, চিরাচরিত ভূতের গল্প নয়, তার অতিপ্রাকৃত গল্প গড়ে উঠেছে এমন সব ঘটনাকে ঘিরে যা সাধারণ হিসেবের একটু বাইরে। ‘ছায়াসঙ্গী’, ‘অচিন বৃক্ষ’, ‘ভয়’,’শবযাত্রা’, ‘অসুখ’, ‘লিপি’,’দ্বিতীয়জন’, ‘বীণার অসুখ’ ‘বেয়ারিং চিঠি’, ‘ওইজা বোর্ড’, ‘মৃত্যুগন্ধ’ এমনি কয়েকটি অতিপ্রাকৃত গল্প। ‘ছায়াসঙ্গী’র গ্রামীণ অবহেলিত বালক মন্তাজ যে কবরের মধ্যে বেঁচে ওঠে এবং এক শ্যাওলাগন্ধী সঙ্গীর দেখা পায় কিংবা ‘বীণার অসুখে’ যে প্রত্যাখ্যাত যুবক মৃত্যুর মুহূর্তে হাজির হয় তার ভালোলাগার মেয়েটির কাছে তারা সবাই অতিপ্রাকৃত গল্পের চরিত্র হয়েও একান্ত মানবিক। হুমায়ূন আহমেদ অতিপ্রাকৃত গল্পে কোনো চূড়ান্ত বা বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেননি কারণ ব্যাখ্যা করা যায় না বলেই তো তা অতিপ্রাকৃত। প্রচলিত ভূতের গল্প থেকে তার অতিপ্রাকৃত গল্পগুলোর মৌলিক পার্থক্য হলো অতিপ্রাকৃত গল্পগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি পাঠককে ভয় দেখাতে চাননি কখনও বরং তাকে ভাবাতে চেয়েছেন, তার দৃষ্টি ফেরাতে চেয়েছেন ছকবাঁধা জীবনের বাইরে। আর এর ভিতর দিয়ে তিনি নিজেই দেখতে চেয়েছেন জীবনকে, আবিষ্কার করতে চেয়েছেন তার স্বরূপ। মানুষের জীবন যে সবসময় বিজ্ঞানের সূত্র অনুসারে চলে না তার বাইরেও পা ফেলে অচিন জমিনে সেই অন্যভুবনের ছবি তিনি এঁকেছেন তার অতিপ্রাকৃত গল্পগুলোতে।
বিষয়বস্তুর দিক থেকে প্রতিটি গল্পই অভিনব অথচ তা ঘটছে কোনো গহীন অরণ্যে বা নির্জন প্রাচীন প্রাসাদে নয়, তা ঘটছে আমাদের চির পরিচিত শহরে ও জনবহুল গ্রামে। এখানেই তার গল্পের সঙ্গে অন্য ভূতের গল্পের যোজন যোজন ফারাক। ঢাকার সাধারণ ফ্ল্যাট, গ্রামের বাড়ি, মফস্বল শহর তার অধিকাংশ অতিপ্রাকৃত গল্পের পটভূমি। গল্পগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভয়াবহ বা ভয়ংকর কিছু নয় তবে বিষণ্ন এক জগতের আভাস বহণকারী। রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা যেমন রহস্যময় ‘ছায়াজগতে’র ছবি নিয়ে আসে চোখের সামনে, খুলে দেয় অন্যভুবনের প্রবেশপথ তেমনি হুমায়ূন আহমেদও তার অতিপ্রাকৃত গল্পের মধ্য দিয়ে যেন সেই ভুবনের আভাস দিতে চান। সেগুলো অ্যাডগার অ্যালেন পোর গল্পের মতো অতটা ভয়াবহ বা বিষন্ন নয়, তাকে একেবারে অশুভ বা মাটির পৃথিবীর বাইরে বলা চলে না। এখানেই বিশ্ব সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের নিজস্ব জায়গা। তার অতিপ্রাকৃত গল্পের শক্তি সর্বক্ষেত্রে অশুভ নয়, তেমন শক্তিধরও নয় তা শুধু আলোহীন অন্ধকারহীন ছায়া জগতের প্রতিভূ। অতিপ্রাকৃত গল্পে শুধু ঘটনাই বলা হয়নি, সেই সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদ বিশ্লেষণ করেছেন মনস্তত্ব। অতিপ্রাকৃতের বাইরে তার অন্য যে ছোটগল্পগুলো আছে তাতেও এই মনোবিশ্লেষণ রয়েছে।
মানবজীবনের আনন্দ-বেদনার অসামান্য রূপরেখা হয়ে আছে তার কিছু ছোটগল্প। ‘একটি নীল বোতাম’, ‘একজন সুখী মানুষ’, ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’, ‘আনন্দ বেদনার কাব্য’, ‘খেলা’, ‘সুলেখার বাবা’, ‘সাদা গাড়ি’,’অয়োময়’ ‘কুদ্দুসের একদিন’, ‘জিন কফিল’, ‘চোখ’,’রহস্য’ অসাধারণ কয়েকটি সৃষ্টিকর্ম।
‘জিন কফিল’ গল্পে এমন এক নারীর ছবি আঁকা হয়েছে যে একই সঙ্গে নিজের স্বামীকে ভালোওবাসে এবং তীব্র ঘৃণাও করে। এই ঘৃণা তাকে সন্তান-হত্যায় প্ররোচনা দেয়। একই মানুষের মধ্যে দ্বৈত চরিত্রের এমন চিত্র অসাধারণ। এ গল্পে মিসির আলি মনোবিশ্লেষক। ‘একটি নীল বোতাম’ এমন এক যুবকের গল্প যে কোনো দিন তার ভালোলাগার মেয়েটিকে পাবে না যেনেও তাকে ভালোবেসে যায়। ‘সাদা গাড়ি’ গল্পে হৃদরোগে আক্রান্ত এক ধনী যুবক আর এক মধ্যবিত্ত সাধারণ যুবকের ছবি আঁকা হয়েছে। ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘ঊনিশশ’ একাত্তর’ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প। ‘শীত’ গল্পটি গ্রামের এক দরিদ্র বৃদ্ধের যার ছেলে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মেছের আলি। একমাত্র সন্তান মেছের আলিকে যুদ্ধে হারিয়ে বৃদ্ধ বাবা শুধু একটি কম্বল প্রত্যাশা করে। সেই কম্বল তাকে সন্তানের কথা মনে পড়িয়ে দেয়, শীতের রাতকে উষ্ণ করে তোলে। অসাধারণ মানবিক একটি গল্প। অথচ তা বলা হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের আপাত সাদাসিধে অথচ দুর্দান্ত শক্তিশালী ভাষায়।
‘আনন্দবেদনার কাব্য’ এক সাধারণ কবির গল্প। গ্রামের সেই অখ্যাত কবি যিনি শেষ সম্বল ব্যয় করে কবিতার বই প্রকাশ করেন, তার সন্তানের মৃত্যু, কবিতার প্রতি ভালোবাসা অসাধারণভাবে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
‘অয়োময়’ গল্পটি মনে পড়িয়ে দিতে পারে জ্যাক লন্ডনের গল্পের সেইসব মানুষের কথা যারা শত প্রতিকূলতাতেও বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করে চলে। ‘অয়োময়’ গল্পের পটভূমি গ্রামীণ। মৃত্যুপথযাত্রী এক নগণ্য মানুষের অসামান্য জীবনতৃষ্ণা পাঠককে মুগ্ধ করে। ‘খেলা’ গল্পে গ্রামের স্কুলের দরিদ্র শিক্ষক ও অপরাজেয় বৃদ্ধ দাবাড়ুর যে ইতিবৃত্ত তা আসলে মানুষের প্রবল আত্মমর্যাদারই উপাখ্যান। দারিদ্র্য ও নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও যে জীবন পরাজিত হয় না তার অসাধারণ দলিল ‘খেলা’।
তার কয়েকটি ছোটগল্পের মেজাজ আলাদা। স্যাটায়ারধর্মী। ‘মন্ত্রীর হেলিকপ্টার’, ‘ফজলুল করিম সাহেবের ত্রাণকার্য’ এ ধরনের।
হুমায়ূন আহমেদ ছোটগল্পে মানুষের জীবনের ছবি এঁকেছেন অসামান্য মমতায়। মানব চরিত্রের বৈচিত্র্য, সম্পর্কের টানাপোড়েন, আপাত সুখী জীবনের অন্তর্গত বিষাদ, ব্যর্থতা, ক্লান্তি, মধ্যবিত্তের নিগূঢ় যন্ত্রণা তিনি তার লেখায় তুলে ধরেছেন একই সঙ্গে দরদে ও নির্লিপ্ততায়। আর এখানেই সেটি হয়ে ওঠে সার্থক শিল্প। তিনি মানব মনের সাধারণ অনুভূতির রূপকার যা অসামান্য হয়ে ফুটে ওটে তার লেখনীর শক্তিতে।
হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্পগুলো এই নন্দিত কথাশিল্পীর অসাধারণ প্রতিভার চিহ্ন বুকে নিয়ে মলাটবন্দী হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ তার সাহিত্যকীর্তির জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, একুশে পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার। কিন্তু তার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার তো অগণিত মানুষের ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার মধ্যেই তো তিনি বেঁচে আছেন এবং চিরদিন বেঁচে থাকবেন।







