তায়েফ আহমাদ
শুধুমাত্র মুজিববর্ষ উপলক্ষে এদেশে দশ হাজারের মত ছোট-বড় ভাষ্কর্য বানানো হয়েছিল। আর এজন্য খরচ হয়েছিল প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। এদের বেশিরভাগের শৈল্পিক মান কেমন ছিল, তা আমরা সবাই জানি।
এর আগে ২০১৮ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মানুষ ও গবাদি পশু রক্ষায় সাড়ে পাঁচশ আশ্রয় কেন্দ্র নির্মান করা হয়। এ কেন্দ্রগুলোর নাম দেয়া হয় ‘মুজিব কিল্লা’। এজন্য প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। নিম্নমানের নির্মানের কারণে বেশিরভাগ মুজিব কিল্লাই পরিত্যক্ত, ভঙ্গুর, এমনকি নদী ভাঙনের শিকার।
তালিকাটা অনেক বড়, আমরা সবাই জানি।
এ সব হরিলুটে জনগণের কোন ফায়দা হয় না। কিন্তু, ‘মুক্তিযুদ্ধ ইন্ডাস্ট্রি’ খেয়ে পরে বেঁচে থাকে।
ঝিনাইদহের ঘটনাটিই দেখুন।
২০১৯ সালে ঝিনাইদহ পৌরসভার টাকা-পয়সা হরিলুটের অংশ হিসেবে একটা মুক্তিযুদ্ধের ভাষ্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়।
তৎকালীন জেলা প্রশাসক আর পৌর মেয়র মিলে এটি ভাগ-বাটোয়ারা করেছেন- বলে অভিযোগ আছে।
যাই হোক, শহরের বাসস্ট্যান্ডের পাশের চত্বরে ৩০ ফুট উঁচু আর ১০ ফুট চওড়া ভাষ্কর্যটি শেষ পর্যন্ত কেমন হয়েছিল, বোঝার জন্য বছর খানেক আগে তোলা একটা ছবি শেয়ার করলাম।
শিল্পকর্মের চূড়ান্ত।
সে সময়, ঝিনাইদহেরই সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে চত্বরটির নামকরণ করা হয়। আর ভাষ্কর্যটির কোন নাম দেয়া হয়েছিল কিনা নিশ্চিত হতে পারি নি। সম্ভবত জানা যাবেও না। সম্প্রতি জানা গেছে, পৌরসভা থেকে এ কাজের ফাইলও গায়েব হয়ে গেছে।
তবে, এটি যে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাষ্কর্য ছিল না- তা চোখের দেখাতেই নিশ্চিত হওয়া যায়। কয়েকটি মানবমূর্তির মধ্যে একটি বঙ্গবন্ধুর বলে মনে হয়। অবশ্য, তখনকার বাস্তবতায় মুক্তিযুদ্ধের কোন ভাষ্কর্যের সাথে শেখ মুজিবের টাচ না থাকলে সেটি হারাম ঘোষিত হওয়ার কথা। এটিই ছিল তখন ‘নিউ-নরমাল’। তবে, এখানে তাও নিশ্চিত করে বোঝা যায় না। সত্যিকার অর্থে, ভাষ্কর্যটির কাজ কোনদিন শেষই করা হয় নি।
বরং, বাসস্ট্যান্ডের পাশেই ঝিনাইদহ-ঢাকা-কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক ও বাইপাসেরর সংযোগস্থলে সড়কের ঠিক মাঝখানে ট্রায়াঙ্গেল চত্বরের উপরে দাঁড়ানো এই অসম্পূর্ণ অবয়বটি গাড়িচালকদের জন্য একটা উটকো ঝামেলা তৈরি করছিল।
নিয়মিত দূর্ঘটনা ঘটছে। ব্যস্ততম সড়কটি চত্বরে কাছে সরু হয়ে যাওয়ায় যানজটও লেগে থাকছে। এছাড়া, অসম্পূর্ণ স্থাপনায় কোন রক্ষণাবেক্ষণ নাই। ফলে, সন্ধার পরে উটকো লোকজনের আনাগোনার কথাও শোনা যায়।
এ সব কারণে, সম্প্রতি প্রশাসন এটি ভেঙ্গে ফেলার উদ্যোগে নিয়েছে।
আর এতেই ‘মুক্তিযুদ্ধ ইন্ডাস্ট্রি’র বেনেফিশিয়ারিদের মধ্যে মাতম শুরু হয়ে গেছে!
প্রিন্ট মিডিয়া আর সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগ আর বিলাপের সুর- বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের ভাষ্কর্য ভেঙে ফেলা হচ্ছে! এই জন্যই কি আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, হ্যাঁ? ক্ষমা কর, হে ভাষ্কর্য!
চু*তিয়ার দল!
আসল ব্যাথাটা কোথায় আমি খোলাসা করে বলি।
এই ঝিনাইদহ শহরেই শহীদ মিনারের সাথে লাগানো চত্বরটিতে শেখ মুজিবের আরেকটি ভাষ্কর্য তৈরি করা হয়েছিল। নাম দেয়া হয়েছিল ‘প্রেরণা ৭১’। তবে, এই ভাষ্কর্যের কারণে সাধারণ লোকজন এটিকে ‘মুজিব চত্বর’ নামে চিনত।
গত বছর নভেম্বরে এটি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে একদম মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। এ সময় চত্বরটির নাম দেয়া হয় ‘স্বাধীন চত্বর’।
আমাদের সবার চোখের সামনে রক্তক্ষয়ী জুলাই ঘটেছে। ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা স্বতঃস্ফুর্তভাবে দেশে ফ্যাসিবাদের সকল আইকন ভেঙ্গেচুরে গুড়িয়ে দিয়েছিল। এতে ‘মুক্তিযুদ্ধ ইন্ডাস্ট্রি’র বেনেফিশিয়ারি ব্যাপক চাপে পড়ে গেছে।
মাজার নাই, ভক্তও নাই, হাদিয়াও নাই। কিন্তু, হাদিয়া হারানোর বেদনা আছে।
সে বেদনা মাঝেমাঝেই এভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে।
রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এদেশের জন্ম হয়েছে। কিন্তু, খোদার কসম, ‘মুক্তিযুদ্ধ ইন্ডাস্ট্রি’ বারবার এদেশে ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে।
তাই, মুক্তিযুদ্ধের নাম দিয়ে এদেশের মিডিয়া/চু*তিয়ারা মাতম শুরু করলেই নগদে মুখে ঝামা ঘষে দিতে হবে। বেতিয়ে লাল করে দিতে পারলে আরও ভাল হোত। তবে, সভ্য দেশে হাত গুটিয়ে রাখতে হয়।
মনে রাখবেন, আমাদের জুলাই মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় নাই। কিন্তু, ‘মুক্তিযুদ্ধ ইন্ডাস্ট্রি’কে ঠিকই মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে।







