চরু হক
এই হাত আমার সর্বনাশ
এই হাতে আমি
ছুঁয়ে ফেলেছি মাটি।
এই চোখ আমার অভিশাপ
এই চোখে আমি
দেখে ফেলেছি মানুষ।
এ হৃদয় আমার মৃত্যুদন্ড
এ হৃদয় দিয়ে আমি
বেঁধে ফেলেছি সারা জগৎ।
(কারণকথা)
কবি নূরুল হক। আমার বাবা। আধুনিক বাংলা কবিতার এক গহীন কবির নাম। চার বছর আগে করোনার নিষ্ঠুর করাল গ্রাসে না ফেরার গহীনতম দেশে চলে গেছেন তিনি।আর পেছনে রেখে গেছেন সজল মেঘে ভেজা তাঁর ভালোবাসার পৃথিবী, চেনামুখ, দোয়েলের ডানা,পৈশাচিক শহরের পথহারা কাক আর প্রিয় মা জননীর নাম। হায় ফেরা আর হবে না কখনো এই মনুষ্যজন্মে,হয়তোবা, তবে সত্যিই কি আর কখনো ফিরবেন না তিনি?ধুলোর ডাকঘরে পাঠানো তার অন্তরতম ডাক পাঠকের রক্তদানায় সূতীব্র আঘাতে আঘাতে ফোটাবেনা রক্তচন্দন?
হাওড়ের গ্রাম এবং গ্রামবাসীর জীবনে মিশে গেছেন তিনি আজ,যে গ্রামের মিষ্টিরাত একটি চাঁদে গিয়ে মিশেছে, যেখানে ‘দূরের স্বপ্ন’ স্বচ্ছজলে খণ্ডবিখণ্ড হয়।
বাবা ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা,প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক, একজন রবীন্দ্র সংগীতজ্ঞ , এককালের বামপন্থী সংগঠক, সম্পাদক, কণ্ঠশিল্পী কিন্তু সব ছাড়িয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল বোধহয় তিনি একজন কবি। তাঁর কণ্ঠে বলতে শুনেছি,” আমি তো মনে করি,কবিতা কোন খেলা নয়,নয় কোন পরীক্ষা নিরীক্ষাও। বিনোদন তো নয়ই। কবিতা হলো জীবন। জীবন নিয়ে তো আর মস্করা করা চলেনা। চলেনা কোন হেলাফেলাও। ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ তাঁর এক শিষ্যকে বলেছিলেন,’যখন বাদ্যযন্ত্রটা ধরবে,লাঠিয়ালের লাঠির মতো ধরবে না,অন্ধের যষ্ঠির মতো ধরবে। ‘কবিতা লেখার বেলায়ও একথাই প্রযোজ্য। অথচ আমরা তো এখন কবিতায় লাঠিয়ালের লাঠি খেলা দেখাতে পছন্দ করি। খেলা শেষে লাঠি ফেলে মাঠ থেকে বেরিয়ে যাই,কিন্তু অন্ধের মতো লাঠির সঙ্গে খোদ জীবনকে জড়িয়ে রাখি না।”
অনেকের মতে, আমার বাবা কবি নূরুল হকের কবিতা “যৌবনজ্বরের ঘোরজনিত প্রলাপ কিংবা অলস বার্ধক্যের খামখেয়াল ‘ছিল না। তাঁর কবিত্ব ছিল মহাভারতের বীরদের সহজাত কবচকুণ্ডলের মতো। শরীর ও সত্তা থেকে অবিচ্ছেদ্য। রক্তপ্রকৃতিতে ওতপ্রোত। দিনযাপনের প্রতিটি মুহূর্তে গুঞ্জরিত ও প্রকাশোন্মুখ; স্বপ্ন ও জাগরণে ব্যাপ্ত এক আমরণ অন্বেষণ। মধ্যযুগের কবি কৃত্তিবাস ওঝা বলেছিলেন: সরস্বতী অধিষ্ঠান আমার শরীরে/নানা ভাষা, নানা কথা আপনা হইতে স্ফুরে।’ এই বক্তব্যের দৈব অনুষঙ্গটুকু বাদ দিলে বাকিটুকু স্বচ্ছন্দে কবি নূরুল হকের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে। নানা ভাষা ও নানা কথার সদাস্ফুরিত ঐশ্বর্যে তিনি সম্পন্ন ছিলেন।” সমসাময়িক অনেক সাহিত্যবোদ্ধা ও পাঠককেই তাঁর সম্পর্কে এরকম মনোভাব ব্যক্ত করতে দেখা যায়।
আমার বাবা কবি নূরুল হকের মর্তলোকে আগমন ২৫ শে নভেম্বর ১৯৪৪,নেত্রকোনার মদন থানার বালালী গ্রামে। পিতা আবু সাইদ মুন্সি, মাতা মজিদা খাতুন। প্রয়াত হন ২২শে জুলাই ২০২১। শিশুকাল থেকেই জ্ঞানপিপাসায় উন্মুখ নূরুল হক বেড়ে উঠেছেন হাওড় অঞ্চলের মাটি, আবহাওয়ার সমৃদ্ধ আবহে। স্কুল জীবন থেকেই সাহিত্য চর্চার হাতেখড়ি। শিক্ষক হিসেবে পেয়েছেন মনস্বী চিন্তবিদ যতীন সরকারকে। অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় নেত্রকোনা থেকে প্রকাশিত ‘নেত্র’ সাহিত্য সংকলনে এবং সে সময়ই তৎকালীন সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক আহূত কবিতা প্রতিযোগিতায় তাঁর ” সবুজ আলোর দেশ”কবিতাটি প্রাদেশিক পর্যায়ে প্রথম স্থান লাভ করে। অতপর শিক্ষাগুরু যতীন সরকার কর্তৃক আয়োজিত ও আহূত স্বরচিত কবিতা প্রতিযোগিতায় তাঁর “রবীন্দ্রনাথকে” কবিতাটি সারা পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে। শিক্ষক যতীন সরকার ছাড়াও কবি নূরুল হকের সাহিত্যচর্চা আরও বহুবিস্তৃত হয়ে ওঠে মরমী কবি জালাল খাঁ’র বাড়ির শিল্পসাহিত্যের আসরগুলোতে।
১৯৬৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ষাটের দশকের বিভিন্ন কাব্যগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত না থাকলেও তাঁর বিশেষ সখ্য গড়ে উঠেছিল সতীর্থ কবি হুমায়ুন কবির, আবুল হাসান, কাশীনাথ রায়, মাহবুব সাদিক প্রমুখের সঙ্গে। কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল ‘দৈনিক পাকিস্তান,’ ‘দৈনিক সংবাদ,’ ‘কণ্ঠস্বর,’ ‘নাগরিক’ ইত্যাদি পত্রিকা ও সাময়িকীতে। এটি ছিল আমাদের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সময়। দেশজুড়ে মুক্তির স্বপ্ন মঞ্জরিত হয়ে উঠেছিল জনচিত্তে। শিল্পের দায় মিটিয়েই কবি নূরুল হক শিল্পীর সামাজিক দায়বোধকে রূপ দিয়েছিলেন সেই সময়ের কবিতায়।
বাবা কবি নূরুল হক ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ হতে কৃতিত্বের সাথে এম এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ত্রিশাল নজরুল কলেজে এবং পরবর্তীতে ১৯৭০এ নেত্রকোনা কলেজে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এর মধ্যে শুরু হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। ১৯৭১ সালে নেত্রকোনা কলেজের শিক্ষক থাকাকালে তিনি আসামের সেলুনবাড়িতে প্রশিক্ষণ নিয়ে একটি বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধা-কোম্পানির কমান্ডার হিসাবে যুদ্ধ সেক্টর এগারোয় যোগ দেন। একাত্তরের গেরিলা নূরুল হকের রাজনৈতিক সক্রিয়তা স্বাধীন বাংলাদেশেও অব্যাহত ছিল। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসাবে নিজের মতো করে কবিতা ও রাজনীতির মধ্যে একটি মিলনসূত্র অন্বেষণ করে যাচ্ছিলেন তিনি। পঁচাত্তরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সামরিক বাহিনীর হাতে আটকও হয়েছিলেন। বেশ কয়েক বছর মোটামুটি নিশ্চুপ থাকার পর আশির দশকে কাব্যকলার নতুন অভিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখিতে ফিরে আসেন। ধীরে ধীরে এক অন্তর্ময় নতুন ভাষা ও গহন বোধের উদ্ভাসনে নিজের কবিসত্তার একটি বিশিষ্ট স্বরূপ স্পষ্ট করে তোলেন তাঁর পাঠকবলয়ে।
বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যাপনা শেষে ২০০৪ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
জীবনের প্রায় শেষাশেষি, একেবারে প্রৌঢ়ত্বের উপান্তে এসে কবি নূরুল হক তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়” প্রকাশ করেন কবি নাঈম হাসানের সম্পাদনায়। ২০০৭ সালে। বাবার বয়স তখন তেষট্টি। বইটি সম্পর্কে বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যবোদ্ধা ও মনীষী জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী মন্তব্য করেছিলেন এভাবে –
“নূরুল হকের কবিতার সঙ্গে এই আমার প্রথম পরিচয় এবং স্বীকার করছি, অজানা ও নতুন কোনো কবির সঙ্গে পরিচয়ের আগ্রহ তেমন একটা করিনা আজকাল। কবিতা যে মনোযোগ দাবি করে, সেই মনোযোগের স্রোতে পড়েছে ভাটির টান। নূরুল হক ও তাঁর কাব্য ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’ আমার সেই অভ্যাসের বন্ধ দরজায় আঘাত করেছে।…(বইয়ের) প্রতিটি কবিতার তন্বী দেহে এত লাবণ্য বাঁধা আছে, কথার অতীত এত অকথিত ভাবনা আছে, স্পষ্টতার সঙ্গে এত রহস্য জড়িয়ে আছে, যে আমি, এই কবিতার পাঠক কতটা বুঝলাম আর কতটা বুঝলাম না সে হিসেব মুলতবি রেখে, ওই লাবণ্যের দিকে চোখ ফেরাই।”
– ‘খেয়া’ সাহিত্য সংকলন,শ্রাবণ, ১৪১৪
যখন জিজ্ঞেস করা হলো এই নীরবতার কারণ কি, তিনি জবাব দিয়েছিলেন,’ বাংলা কবিতায় নতুন কিছু যদি সংযোজন নাই করতে পারলাম তবে আর লিখে দরকার কি।’
এরপর কাছাকাছি সময়েই তিনি কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ বের করেন। এ হিসেবে এটি সহ তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো যথাক্রমে –
ক.সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায় (নিরন্তর ২০০৭)
খ.একটি গাছের পদপ্রান্তে ( বিভাস,২০১০),
গ.,মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা (নান্দনিক, ২০১২),
ঘ..শাহবাগ থেকে মালোপাড়া (খেয়া,২০১৪).
ঙ.,এ জীবন খসড়া জীবন (খেয়া,২০১৫)
চ.শম্ভুনাথ চট্টপাধ্যায়,কবিতার দিকে একজন (বেহুলাবাংলা ২০১৭,গদ্য)এবং
চ.কবিতাসমগ্র( চৈতন্য, ২০২০)।
কবিতাসমগ্র-তে অগ্রন্থিত কবিতা (৩৮টি), কৈশোরক ও প্রস্তুতি পর্বের কবিতা (৩৪টি) নামে আরও কয়েকটি কবিতা সংকলিত হয়েছে।
তাঁর মৃত্যুর পর আমার সম্পাদনায় পেন্ডুলাম প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় আমার বাবা কবি নূরুল হকের নির্বাচিত কবিতা (২০২২) এবং বেহুলাবাংলা প্রকাশ করে তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা(২০২৩)।
১৪১৯ সালে বাংলা কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে প্রদান করা হয় খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার।
২০১৩ সালের সারাদেশের ঘটনাবলির মর্মধ্বণিসম্বলিত শাহবাগ থেকে মালোপাড়া কবিতা-বইটির প্রথম সংস্করণ ২০১৪ -র ফেব্রুয়ারিতেই নিঃশেষিত হয়ে যায়। বইটি সম্পর্কে কবি মারুফ রায়হানের মন্তব্য ছিলো এরূপ :
স্বকাল স্বভূমির দীর্ঘশ্বাস ও দীর্ঘবাদন,অর্জন ও বিসর্জন এবং আর্তি ও আকাঙ্ক্ষার সাথে নিজের আত্মাকে সংযুক্ত করে নূরুল হকের মত সত্যিকারের কবিতা লিখতে পারেন ক’জন? সত্তরোর্ধ সহজিয়া নিভৃতচারীএই কবি এখনও অপঠিত ও না -গৃহীত রয়ে গেছেন কবিতা রাজনীতিতে বিশ্বখেতাব পাওয়ার যোগ্য এই অবাক বাংলায়।
–একুশের সংকলন,বইমেলার নির্বাচিত ৫০/২০১৪।
রাতের আকাশের তারাদের দিকে তাকিয়ে একদা প্রাচীন ঋষি বলেছিলেন -‘পশ্য দেবশ্য কাব্যম’, অর্থাৎ’ ঐ যে দেখ দেবতাদের কবিতা’। দেবতাদের কবিতা যেমন আকাশে রয়েছে ঠিক তেমনিভাবে মানবকূলের কবিতাও জগতে ব্যাপ্ত হয়ে আছে,বাবা তাই বিশ্বাস করতেন। তাঁর ভাষায় “কবিতা হলো সমস্ত মানুষের সত্তার পরিচয়। কবিতা হলো মহাজগতের মাতৃভাষা। ফলে মহাজগৎ থেকে সৃষ্ট সকল অণু পরমাণুতেই কবিতা থাকে।সে ভাষা তিনি কুড়িয়ে নিয়েছিলেন, ঋজু ও সহজ শব্দের মালা গেঁথে বানিয়েছিলেন এমন এক ফুলহার যা গলায় পড়ে নিলে আয়নার মতো স্বচ্ছ হয়ে সামনে চলে আসবে এক উদ্ভাসিত জগৎ যেখানে সুখ-দুঃখ হাসি কান্না ঘৃণা মমতা মানুষ আর পাখপাখালি এমনকি আপাতনিস্প্রাণ সত্তাও বাঙ্ময় হয়ে ধরা দেয়। প্রাণ জেগে ওঠে সবকিছুতে-
কত জিনিসের ভেতরে ও
বাইরে
তোমার ফুল ফোটে।
(তোমার ফুল)
বাবা তাঁর কবিতায় একটি নিজস্ব ভাষা তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তিনি সবসময় বলতেন কবিতা হচ্ছে মানুষের সরাসরি ফিলিংস বা অভিজ্ঞতা অর্থাৎ মানুষ যেটা নিজের মধ্যে অনুভব করছে সেটা তেমনি ভাবে প্রকাশ করাই কবিতা। একদম ডাইরেক্ট তার প্রকাশ,কোন ভাবনাচিন্তার রঙ চড়ানো ছাড়াই। কবিতা হবে নিঃশ্বাসের মতোই সহজ আবার তা জীবনপ্রদায়ী ।
তাঁর কবিতা শান্ত-সমাহিত ভাব-বিশ্বাসের, ধীরগতির এবং বৃষ্টিভেজা মাটির মতো স্নিগ্ধ ও কোমল। আপাতভাবে দুঃখ ও নির্লিপ্ত ভঙ্গিমা কাজ করলেও জীবনবাদী চিন্তাধারাই তাঁর কবিতায় পরিণতি লাভ করেছে।
হতাশ হইনি।
নরকের অভ্যন্তরে
এই অন্ধকারে
ঘোর অন্ধকারে
কলজে জ্বলে
আলোর টুকরোর মতো।
দেখে অবাকই লাগে।
স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝখানে
রাতের গভীর তারা
যে রকম জাগে
আর ধুয়ে দেয়ে জগতের মুখ
তেমনি কোনো দীপায়ন
সঙ্গোপনে পোড়ায় আমাকে।’
( আত্মদীপ ভব)
কবিতা লেখার প্রাপ্তি সম্পর্কে তিনি বলেন-
“কবিতা লিখতে হয় জীবনমান সমৃদ্ধ করার জন্য। দু:খের বা বেদনার কবিতা লিখতে হলেও অন্তর পরিপুষ্ট রাখতে হয়। অন্তর পরিপুষ্ট থাকলেই দু:খে বা বেদনায় বা ঘৃণার সঙ্গে পরিপূর্ণ সাড়া দেওয়া সম্ভব। আমার মতে, পরিপূর্ণভাবে সাড়া দেওয়ার অবস্থাটাই হলো কবিতা লেখার মানসিক অবস্থা। আংশিক সাড়া দিয়ে কোনো কবিতা লেখা যায় না। আর পরিপুষ্ট অন্তরের লোকজন যত দারিদ্র্যে থাকুন তাদের বেঁচে থাকার প্রকৃত মানটির অন্যদের চেয়ে অনেক উপরে অবস্থান। এটাকেই আমি বলি কবিতা লেখার প্রাপ্তি বা পুরস্কার। সেই প্রাপ্তি বা পুরস্কার যিনি না পান তিনি বাইরের বা অন্যের পুরস্কারের জন্য ছুটাছুটি করতে থাকেন।”
শেষপর্বের কবিতায় তিনি যেন খুব সহজ, অনুচ্চ, নিরলঙ্কার ভাষায় জীবনের কিছু অন্তর্গূঢ় সত্যের পাঠোদ্ধার করতে চেয়েছিলেন। দারুণ মিতবাক এইসব কবিতায় ঝলসে উঠেছে জীবন, প্রাণ ও প্রকৃতির প্রতি গভীর মমতা আর তীব্র মরত্বের বোধ। বাক্যের সরল বিন্যাসে ও নিটোল শব্দের ঝংকারে তিনি বয়ন করেন ভালোবাসার সুর-
যে তিনটি কথা আমি
বলে গেছি
গোপনে তোমাকে
জীবনের দাগ ধরে
পথের ধুলোয়
তাই তুমি রুয়ে দিও নানাঘাটে
যদি এরা কোনোদিন বৃক্ষ হয়,
পাতায় পাতায়
জল থাকবে, চোখ থাকবে
আর থাকবে তোমার হৃদয়।
(‘যে তিনটি কথা’)
মৃত শালিকছানার জন্যও তাঁর কণ্ঠে শোনা যায় বুকচাপা হাহাকার:
যেতে যেতে দেখলাম
পথের ধারে পড়ে আছে
একটি শালিকের ছানা।
মৃত।…
কে জানবে আর কেই-বা বুঝবে
কোন ক্ষতি হয়ে গেল
এ জগতে,
কোনখানে,
কার?
(‘সর্বনাশের অভিসার’)
অন্য একটি কবিতায় দেখা যায় নির্বিকার মহাজগতের প্রেক্ষাপটে আমাদের টলটলায়মান জীবনের নশ্বরতার ছবি:
নদীর মতোই যেন দুলছে
জীবন।
আমি সামনের দিকে তাকাই
সামনের দিকে চমকে উঠেছে বিজলি,
পিছন দিকে তাকাই
পিছন দিকে জ্বলে উঠছে আকাশ
চমকে উঠি, ভাবি
কোনদিকে যে যাব?
দেখি,
হাওয়ার ওপর ভাসছে
একটি লতা।
সেই লতাই কি আমি?
(‘লতা’)
তবে এই স্থিতধী নিমগ্নতার মধ্যেও বাবা ছিলেন সদা-অতন্দ্র। দেশ ও পৃথিবীর নানা ভাঙচুর, উপপ্লব এবং রক্তক্ষরণ কখনো তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। আজীবন তিনি হৃদয়ে বহন করেছেন নিজের গ্রাম, দেশ আর জনসমাজকে। বেদনায় নূব্জ হয়ে যাওয়া হৃদয় নিয়ে তিনি উচ্চারণ করেন-
দেশটা এখন আমার কাছে ভীষণ ভারী লাগে।
এর জলধারা ভারী, গাছগাছালি ভারী
পালতোলা নৌকো ভারী, ঘরদরজা ভারী
আর ভারী পাহাড়ের বুক।
আমি এ ভার বইতে পারি না।
যদি মাঠের দিকে যাও, দেখবে নীলছায়া ভারী।
পায়ের দাগ ভারী, দাঁড়-বাওয়া ভারী
চাষিমজুর ভারী, মাটি-ভঙ্গি ভারী
আর ভারী সমুদ্রের তল।
আমি এ ভার সইতে পারি না।
যদি ঘরের মধ্যে থাক, তবে বউ-শিশু ভারী।
স্বপ্নবোঝা ভারী, হারিয়ে আসা ভারী
সুখ-দুঃখ ভারী, জীবন-মৃত্যু ভারী
আর ভারী মা-জননীর নাম।
আমি এ ভার টানতে পারি না।
(‘ছায়াপাথর’)
ব্যক্তিজীবনের কথা বলি। সরল জীবনধারায় অভ্যস্ত ছিলেন আমার বাবা কবি নূরুল হক। প্রতিযোগিতায় যেতেন না কখনোই বরং নিজের আসনটা ছেড়ে দিয়ে অন্যকে সুযোগ করে দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন। Simple living high thinking এ বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ছিলেন নরমস্বভাবের, মিতবাক ও সলজ্জ অথচ সাবলীল। ছিলেন প্রচন্ড মমতাশীল এবং আবেগপ্রবণ একজন মানুষ, যদিও বাইরের মানুষের কাছে তাঁর এই আবেগপ্রবণ দিকটা অতটা প্রকাশিত হতো না। আড্ডায় ছিলেন হাস্যরসে পূর্ণ একজন তরুণের মতো। মনের দিক থেকে চির তরুণ চিরসবুজ থাকায় তরুণদের সাথেও তিনি মিশে যেতেন অনায়াসে। তাই দেখা যেত বাসায় আমাদের কোনো বন্ধুবান্ধব এলে আমাদের সাথে গল্প করা রেখে বাবার সাথে গল্পে মশগুল হয়ে যেতেন।পিতা হিসেবে তিনি একজন অসাধারণ মানুষ। অল্প বয়সে আমি আর আমার দুই ভাই রাইন হক এবং সাব্বিরুল হক আমাদের মা’কে হারিয়েছি। বাবা মায়ের এবং বাবার দুজনের দায়িত্বই একই সাথে পালন করেছেন। সহজিয়া চিন্তাধারার মানুষ আমার বাবা কবি নূরুল হক সাদাসিধা অনাড়ম্বর জীবনের মধ্যেই ফুল ফোটাতে জানতেন।
খ্যাতি কিংবা স্বীকৃতির জন্য লালায়িত ছিলেন না কখনো তিনি। ছিলোনা আত্মপ্রচারের উদ্বেলতা। একান্ত পরিমণ্ডলে এক নিমগ্ন চর্চায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েই যেন তিনি তৃপ্ত ছিলেন। জীবনে অনেক কিছু,অনেক ধন, মান, খ্যাতি পেয়েও বেশির ভাগ মানুষের জীবনে এই পরিতৃপ্তির দেখা মেলেনা।
তৈরি থেকো
আমি ফিরে আসব পথে
হাতের তালুতে করে
নিয়ে আসব
অচেনা পাখির ডাক
জগত-জনের জন্য
যে পাখির ঠোঁটটি চিকণ।
আর
আকাশে ফুটে উঠবে
একটি নতুন তারা
অমল নিভৃতে।
ঘুমঘোর থেকে
জেগে ঊঠব
সঙ্গে নিয়ে
অদেখা কোমল যত দিন।
(জগত-জনের জন্য)
চারদিকে থৈ থৈ নীল জলরাশি দিয়ে বাঁধাই করা বালালী গ্রামে চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে আছেন আমার বাবা কবি নূরুল হক । পাশেই শৈশবের খেলার সাথীর মতো বয়ে চলেছে বালুই নদী, যেখানে,’হাটফেরতা লোকেরা লবণওয়ালাকে ঠকিয়ে আসার কাহিনি/বলাবলি করতে করতে ঝুঁকে পড়বে সামনে/আর হইহই হাসবে’।
ঝরা পাতা আর মরা বাতাসের গভীর বিস্তীর্ণ পথে পবিত্র মৃত্যুর চিহ্ন রচিত হতে থাকে হাওড়ের হাহাকার ভরা বাতাসে।







