প্রচ্ছদকবিতাজুলাইয়ের কবিতা

লিখেছেন : মিলন মাহমুদ

জুলাইয়ের কবিতা


মিলন মাহমুদ

১. আয়না ঘর

প্রথমে ভেবেছি — আয়নাঘরে
নিদারুণ আমার মুখ দেখা যাবে
দেখতে পারবো পরিপাটি সন্দর্শন 
পোশাকের পরিমার্জিত অবয়ব।

আমার ভেতরে বহুদিনের একটা শখ ছিলো
নিজেকে ভাবতে থাকলাম এমন করে
যেনো আমি ইতিহাস থেকে
উঠে আসা প্রাচীন গ্রীক পুরাণের নায়ক। 

কিন্তু আয়নাঘরে ঢোকা মাত্র 
আমি বুঝতে পারি —
আমি অন্য এক ইতিহাসে প্রবেশ করেছি,
নরকের সমস্ত ঋতু ফুটে আছে 
বিষাদের নীল চাবুক ছড়িয়ে পড়ছে
আমার ধমনীর শিরা – উপশিরায়।

আয়নাঘরে কণ্ঠস্বর শুনে বোঝা গেলো :
আমাকে প্রেরণ করা হয়েছিলো
হাবিয়ার জ্বলন্ত এক কামরায়।

২. ৩৬ জুলাই 

আজ ৩৬ জুলাই, 
ক্যালেন্ডারে এই তারিখ বলে কোনো দিন নাই
কিন্তু ইতিহাসে আছে।

একটি গণঅভ্যুত্থান হাঁটছে
তার পেছনেই হাঁটছে ভবিষ্যৎ 
উষ্ণ আলোর মতো 
দাঁড়িয়ে আছে মানুষের কাবাঘর।

রক্তস্নাত বুকের পাশে 
বয়ে চলছে খরস্রোতা নদী
তাতে আবাবিল পাখির মতো 
উড়ে আসছে গেরিলা,

মৃত্যুর রেজিস্ট্রারে নথিবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে 
প্রতিটি গুলির জবাব।

আজ ৩৬ জুলাই, 
এমন ঘোরগ্রস্ত সকালে 
সাইরেনে কেঁপে উঠছে আকাশ
বজ্রপাতের মতো জ্বলে উঠছে চোখ
জবা ফুলের লাল পরশ
আক্রান্ত করছে শহীদের নিষ্পাপ মুখগুলো।

তবুও তারা হাঁটছে —
ঘুরে দাঁড়াচ্ছে পাথরের ধ্বনি 
যদি আবার কখনো 
নেমে আসে অন্ধকারের শ্বাস
যদি আবার কখনো 
বাকশালের কঙ্কাল ফেরত চায় স্বাধীনতা, 

তখন ওরা আবার হাঁটবে
প্রতি ফোঁটা রক্তের কসমে যাদের পাঁজর গড়া
ওরা এভাবে 
হারাতে দিবে না কাঙ্ক্ষিত সবুজ মশাল।

আবার ফিরবে ৩৬ জুলাই
পঞ্জিকার কোনো দিনক্ষণে না আসলেও
ইতিহাসে ফিরবে তা প্রবলভাবে।

৩. ইতিহাস

আমি বুঝে গেছি 
আমার পিছিয়ে যাওয়ার উপায় নাই
সামনে ক্রমাগত মৃত্যু 
সামনে প্রবল ইতিহাস
আমি ইতিহাস ভালোবাসি

কারণ —
আমার দ্বিতীয় কোনো রাস্তা জানা নাই
আমি বুঝে গেছি স্পষ্ট 
এই জালিমের চোখে চোখ রেখে
এই বাকশালের মুখের উপর মুখ রেখে
আমাকে বলতে হবে
শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবিতা 

বলতে হবে 
এই ঘোর মাতাল সময়ের ইশতেহার 
আমাকে চাইতে হবে 
ভাই হত্যার প্রতিশোধ, বোন হত্যার প্রতিশোধ 
আর যদি আমি তা না চাইতে পারি
তাহলে গুলি খাওয়া লাশগুলো
আমার মুখোমুখি দাঁড়াবে একদিন।

আমি বুঝে গেছি আলবাৎ 
আমার পেছনে থাকার আর কোনো উপায় নাই
সামনে ক্রমাগত হত্যা 
সামনে নতুন ইতিহাস 
আমি ইতিহাস ভালোবাসি 

কারণ —
আমার দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা নাই
যদি আমি ভয় পাই 
যদি আমি মুষড়ে পড়ি 
যদি আমি পালিয়ে বেড়াই,

তবে জেনে রেখো ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল
এই ভূমির একবিন্দু মাটিও
আমাকে করবে না ক্ষমা
তাই এখনই আমাকে বলতে হবে 
সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা। 

৪. খোয়াজ খিজির

জলে তুমি প্রচন্ড সাহস 
সমস্ত গহিন জলের চরাচরে —

তুমি বসে থাকো উদ্ধতস্বভাবে
যেনো একা নিঃসঙ্গ ধূমকেতু
যখন প্রয়োজন হলো স্থলে 
তুমি জিজ্ঞেস করো মিছিলে,

‘পানি লাগবে কারো, পানি, পানি!!’

তখন জলের ফোয়ারার মতো
একটা বুলেট এসে আলিঙ্গন করে,
তোমার মৃত্যু থেকে নিশ্চিত হওয়া গেলো
তুমি ছিলে মুগ্ধ খোয়াজ খিজির। 

৫. মর্গে

আমি শুনবো তোমার কথা
এমন এক মৃত লাশ 
এনে আমাকে দেখাও? 
যার পাঁজরে বা মাথায় গুলি লাগেনি!

মর্গে যারা ছিলো একাকী ঘুমে
মর্গে যারা ছিলো —
নিথর চোখে রগরগে স্বপ্ন নিয়ে,

আমি শুনবো তোমার কথা
আমাকে এনে দেখাও? 
যার কপালে বিদ্ধ হয়নি শপথ
যার পিঠে চিহ্নিত হয়নি কালপুরুষ,

মর্গে যে ছিলো শীতল স্ট্রেচারে 
মর্গে যে ছিলো যুদ্ধের ফয়সালায় —

আমাকে তার কাছে নিয়ে যাও
আমি শুনবো তার অমীমাংসিত কথা।

৬. মুখোমুখি হও

কিছু একটা ঘটার আগেই
তুমি মুখোমুখি হও —
যারা কেবল খামচে ধরে দৃশ্য 
তারা কখনো দেখে না —
না দেখার ভিতর জন্ম নেয় জিজ্ঞাসা 
কয়েকশো পদাতিক 
আর লাল পিঁপড়ের দল 
এলোমেলো রাস্তা ধরে মার্চ করছে
অথচ এখন বিপ্লবের বৃষ্টি নামবে না
পীড়িত অক্ষরগুলো 
নিজ গন্তব্যে আটকে থাকবে বহুকাল। 

তাই কিছু একটা ঘটার পূর্বেই
তুমি বিরত দাও —
স্থির হয়ে দেখতে থাকো ঘূর্ণন
প্রেমিকার চুম্বন
ঠোঁটের শিরায় রক্তের ছাপ
আর বেয়োনেটের যুদ্ধ 
তুমি এক করে ফেলো না 
কারণ ইতিহাস তোমার দিকেই ক্রন্দনরত 
হতবিহ্বল মানুষের দুর্গ
যারা পৌঁছাতে পারেনি নিজস্ব মোকামে
তারা ব্যর্থতার সমস্ত দায় নিয়ে
জংশন ছেড়ে গছে বহুকাল আগেই।

তাই কিছু একটা ঘটার মুহূর্তে 
তুমি বিচলিত হয়ো না —
কারণ নৈঃশব্দের কাছে ফিরে যায়
সমুদ্রের উচ্ছ্বল ঢেউগুলো 
অদূরে শাল বৃক্ষের নিচে
জড়ো হতে থাকে ভীষণ রৌদ্রদগ্ধ সকাল
এবং নতুন কোরাস ফুলের উত্থান
তাই কিছু একটা ঘটার আগেই 
তুমি নিজেকে মুখোমুখি করো।

৭. পরিসংখ্যান 

আমরা মৃতরাই পরিসংখ্যান
আমাদের পক্ষে কোনো 
নোটিশ ছিলো না।
তবুও আমরা লিপিবদ্ধ হয়ে যাচ্ছি 
গ্রন্থিবদ্ধ হয়ে যাচ্ছি —
যুদ্ধের প্রতিটি অক্ষরে, ইতিবৃত্তে।

আর যারা বেঁচে আছে 
নতুন সকালের জন্য 
উপত্যকায় নরম রৌদ্রে হাঁটার জন্য 
তারা নিজেরাই লিখে রাখলো
নিজেদের এপিটাফ।

ধ্বংস স্তূপের ভিতরেও 
যা সাক্ষী দিবে আগামীকাল।

৮. রেকি

আপাত নিজেকে চাষ করি
তল্লাশি চালিয়ে —
যখন পেয়ে যাই অন্তে নীল ঘুঘু
রক্তবীজের মতো প্রকট
নৈরাজ্যের ফুলগুলো ফুটতে থাকে।

একটা বসন্ত হাওয়া 
আসবে বলে নিদারুণ প্রবলতায়
কাঁপতে থাকে যৌবন।

আপাত নিজকে খুঁড়ে দেখি
মগজের উল্লাস আর বুলেটের দ্রোহ
বুকের সন্নিকটে —
একা একা পায়চারি করে যাচ্ছে … 
কিন্তু কোনো গ্রাউন্ড খুঁজে পাচ্ছে না।

৯. সবুর করো

সবুর করো 
নতুন কুঁড়ি ফুটবে,
এইযে বসন্ত —
বাতাসের প্লাবনে
উড়ে আসে চিঠি।

আততায়ীর মতো
পতিত কোলাহল ছেড়ে 
কারা যেন ঢুকে পড়ে জাহান্নামে।

স্তন ফেটে —

বেরিয়ে আসে নবাগত চোখ
তারা বর্তমান 
আর অতীতের যমজ সহোদর
মাঝখানে শুধুই পুলসিরাত।

গিটারে ছিলেন কবি
পাথরের বিরুদ্ধে তাই
পাথর লিখে 
তৈরি হয় শূন্য মাঠ।

সবুর করো 
বসন্ত টোকা দিলে 
কোনো ফুলই আর মৃত থাকে না।

১০. ও গেরিলা ও বসন্ত

আমার হাত শূন্য ছিলো না
প্রেমিকার চুম্বন ছাড়াও 
হাতে ছিলো অপ্রতিম বসন্ত।

যারা ভাবছে এই অস্থির সময়
এইসব মর্মাহত আঁধার জড়িয়ে 
কি করে বেড়ে ওঠে স্পর্ধা? 

তারা কখনো টের পাইনি
রক্ত আর ঘামের সঙ্গমের কথা।

গেরিলার চোখ অপহৃত হলে
আহত হলে প্রতিটি ফুলের ইতিহাস,

তখন অতল পাঁজরের কাছে
প্রত্যেকে রেখে দেয় একটি ছোরা,
তাতে ফুল না ফুটলেও —
নিজেই বন্ধক রাখে নিজের মস্তক 
শত্রুদের চিহ্নিত ডেরায়।

আমার হাত শূন্য ছিলো না 
তাই বসন্তের কানাগলি জুড়ে 
নেমে পড়ে অতন্দ্র প্রহরী।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা