প্রচ্ছদসাম্প্রতিকস্বৈরাচার যখন নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারে

লিখেছেন : শামসুল আরেফীন

স্বৈরাচার যখন নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারে

শামসুল আরেফীন

একটা মজার প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। একটা সরকার যদি বিরোধী দল ভেঙে দেয়, সমালোচক গুম করে, আদালত-নির্বাচন কমিশন নিজের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলে—তাহলে কি জনগণ চুপসে যায়, নাকি উল্টো ফুঁসে ওঠে? গত কয়েক দশকের বেশিরভাগ গবেষণা বলছে প্রথমটা—ক্ষমতা যত কেন্দ্রীভূত হয়, প্রতিবাদের জায়গা তত সংকুচিত হয়। কিন্তু থাইল্যান্ড আর বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, গল্পটা আসলে উল্টোও হতে পারে।

এই বিতর্কটাই তুলেছেন গবেষক জাঞ্জিরা সোমবাটপুনসিরি, জার্মানির GIGA ইনস্টিটিউট আর থাইল্যান্ডের চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক, যিনি নিজেই থাইল্যান্ডের রাজনীতি নিয়ে বছরের পর বছর কাজ করছেন। তাঁর প্রবন্ধ “When autocratization backfires” ছাপা হয়েছে Globalizations জার্নালে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে। শিরোনামটাই আসলে পুরো যুক্তিটা বলে দেয়: স্বৈরাচারীকরণ (মানে ধীরে ধীরে বা হঠাৎ করে গণতন্ত্রকে খাদে ফেলে দেওয়ার প্রক্রিয়া) মাঝেমধ্যে নিজেই নিজের কবর খুঁড়ে ফেলে।

পুরনো তত্ত্ব বনাম নতুন তর্ক

প্রচলিত ধারণাটা অনেকটা এরকম: কল্পনা করুন একটা বেলুন থেকে বাতাস বের করে দেওয়া হচ্ছে—চাপ যত বাড়বে, বেলুন তত চুপসে যাবে। রাজনীতি বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে বলে আসছেন, স্বৈরাচার যত শক্ত হয়, নাগরিক সমাজ তত দুর্বল হয়ে পড়ে, মিডিয়া চুপ হয়ে যায়, মানুষ ভয়ে রাস্তায় নামা বন্ধ করে দেয়। V-Dem ইনস্টিটিউটের সবশেষ হিসাব বলছে, পৃথিবীর প্রতি ১০ জনের ৪ জন এখন এমন দেশে থাকেন যেখানে গণতন্ত্র পিছু হটছে—গড় হিসেবে বিশ্ব এখন ১৯৮৫ সালের মতো স্বৈরাচারী।

কিন্তু সোমবাটপুনসিরি বলছেন—থামুন, এই ছবিটা অর্ধেক সত্যি। বেলুনের চাপ একটা পর্যায়ে গিয়ে ফেটেও যেতে পারে। তাঁর যুক্তি: স্বৈরাচারী শাসকরা যখন লোভে পড়ে বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলে—মানে আদালত দিয়ে জনপ্রিয় বিরোধী দল ভেঙে দেয়, বা রাস্তায় নির্বিচারে গুলি চালায়—তখন সেটাই উল্টো তাদের কাল হয়ে দাঁড়ায়। ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া, পোল্যান্ডের মতো দেশে মানুষ ঠিক এভাবেই পাল্টা লড়াই করে গণতন্ত্র উদ্ধার করেছে।

এখানে দুটো জিনিস কাজ করে, আর দুটোই আমাদের রোজকার জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে বোঝা যায়:

এক নম্বর, অতিরিক্ত লোভ বা “ওভাররিচ”। ধরুন প্রতিবেশী একটু একটু করে আপনার জমি দখল করছিল, আপনি চুপ ছিলেন। কিন্তু একদিন সে হুট করে আপনার ঘরের উঠানেই বেড়া দিয়ে দিলো—এবার আপনি আর চুপ থাকবেন না। ঠিক এভাবেই যখন কোনো সরকার একটা জনপ্রিয় দল কোর্ট দিয়ে ভেঙে দেয়, বা একটা কোটা ব্যবস্থা নিজেদের লোকজনের সুবিধার জন্য আবার চালু করে দেয়, মানুষ সেই মুহূর্তে বুঝে যায়—এটা আর সহ্য করা যায় না।

দুই নম্বর, নির্মম দমন। এখানেও সহজ যুক্তি—আগুনে পানি ঢাললে আগুন নেভে, কিন্তু কখনো কখনো পানির বদলে তেল ঢেলে ফেলা হয়। পুলিশ-সেনাবাহিনী দিয়ে নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালালে, মানুষ ভয় পাওয়ার বদলে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, কারণ তখন লড়াইটা আর নীতির প্রশ্ন থাকে না—থাকে সম্মান আর প্রতিশোধের প্রশ্ন। বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলে “ব্যাকফায়ার এফেক্ট”—আপনি যাকে থামাতে চাইছেন, আপনার হাতিয়ারই তাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।

এই তত্ত্ব যাচাই করতে লেখক থাইল্যান্ডের অ্যাক্টিভিস্টদের সঙ্গে ১০টি এবং বাংলাদেশে সমসংখ্যক সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, আর প্রতিবাদ-দমনের প্রতিটা ঘটনা দিনক্ষণ ধরে ধরে ডেটাবেসে (ACLED, Mob Data Thailand) মিলিয়ে দেখেছেন—নিছক অনুমান নয়, সংখ্যা দিয়েও প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন।

থাইল্যান্ড আর বাংলাদেশ: একই রোগ, আলাদা উপসর্গ

দুই দেশের গল্প একেবারে ভিন্ন জায়গা থেকে শুরু, কিন্তু শেষটা অদ্ভুতভাবে মিলে যায়।

থাইল্যান্ডে ভিলেন হলো রাজতন্ত্র আর সেনাবাহিনীর পুরনো জোট—যারা ১৯৩২ সাল থেকেই একরকম না একরকমভাবে ক্ষমতার আসল লাগাম ধরে রেখেছে। ২০১৪ সালের সেনা অভ্যুত্থানের পর জান্তা একটা নতুন সংবিধান লিখে সিনেট, নির্বাচন কমিশন, সবকিছু নিজেদের লোক দিয়ে ভরে ফেলে। আর যারা রাজতন্ত্রের সমালোচনা করে, তাদের জন্য আছে কুখ্যাত “লেজ-মাজেস্তে” আইন—১১ বছরে ৪৪৮ জনকে এই আইনে ফাঁসানো হয়েছে।

বাংলাদেশে গল্পটা আলাদা—এখানে ভিলেন কোনো রাজা বা জেনারেল নয়, একটা রাজনৈতিক দল, যেটা নির্বাচনের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র—আদালত, প্রশাসন, পুলিশ—দখল করে ফেলে। ২০১৮ সালের ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট দিয়ে সমালোচকদের চুপ করানো, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা—সবকিছুই একটা সিস্টেমের অংশ হয়ে ওঠে। ২০২৩ সালেই V-Dem বাংলাদেশকে “ইলেক্টোরাল অটোক্রেসি” আখ্যা দেয়।

তাহলে মিলটা কোথায়? দুই জায়গাতেই ক্ষমতাসীনরা এমন একটা কাজ করে ফেলে যেটা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়—থাইল্যান্ডে আদালত দিয়ে তরুণদের প্রিয় দল ভেঙে দেওয়া, বাংলাদেশে আদালত দিয়ে বিতর্কিত কোটা আবার চালু করা। দুটো ক্ষেত্রেই বার্তাটা এক—”আদালতও এখন আমাদের হাতের পুতুল”। আর ঠিক এই বার্তাটাই মানুষকে রাস্তায় নামায়।

তরুণরাই কেন সামনের কাতারে?

দুই দেশেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল তরুণরা, আর কারণটা একদম যুক্তিসঙ্গত—তারাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী।

থাইল্যান্ডে ২০২০ সালে যখন আদালত ফিউচার ফরোয়ার্ড পার্টি ভেঙে দিলো—যে দলে তরুণরা তাদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল—তখন ৫০টির বেশি ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর যোগ হয় এক নির্বাসিত অ্যাক্টিভিস্টের গুম হয়ে যাওয়ার খবর। তরুণরা তখন পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে মজার মজার কৌশল বের করে—হ্যারি পটারের পোশাক পরে “প্যাট্রোনাস চার্ম” দিয়ে “অন্ধকার শক্তি” তাড়ানোর নাটক, বা জাপানি কার্টুন চরিত্র সেজে রাস্তায় দৌড়ানো, দাবি করে তারা নাকি শুধু “ব্যায়াম” করছে। হাসির আড়ালে লুকানো ছিল ভয়ংকর গুরুতর একটা বার্তা—রাজতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা, যেটা থাইল্যান্ডে চিরকালের নিষিদ্ধ বিষয় ছিল।

বাংলাদেশে ট্রিগার ছিল কোটা। ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট মুক্তিযোদ্ধা কোটা আবার ফিরিয়ে আনার রায় দিলে, বেসরকারি চাকরির বাজারে যেই তরুণরা সরকারি চাকরিকেই একমাত্র ভরসা মনে করত, তাদের কাছে এটা ছিল সরাসরি হুমকি। ফেসবুক মিম, হ্যাশট্যাগ, আর “কোটা না মেধা?” স্লোগান দিয়ে তারা আন্দোলনকে একটা অরাজনৈতিক, ন্যায্যতার প্রশ্নে পরিণত করে ফেলে—যেটা বিএনপির ছাত্র সংগঠন বছরের পর বছর চেষ্টা করেও পারেনি, কারণ দলীয় ট্যাগ লাগানো আন্দোলনে সাধারণ মানুষ ভয়ে যোগ দেয় না।

মজার বিষয় হলো, দুই জায়গাতেই তরুণরা প্রথাগত রাজনৈতিক দলের বাইরে থেকে, নিজেদের মতো করে একটা নতুন নৈতিক ভাষা তৈরি করেছে—আর সেটাই পুরনো রাজনীতিকে ছাড়িয়ে গেছে।

দমনপীড়ন: থামাতে গিয়ে উল্টো আগুন জ্বালানো

এবার সবচেয়ে নাটকীয় অংশ। দুই দেশের সরকারই ভেবেছিল শক্তি দেখালে আন্দোলন থেমে যাবে। বাস্তবে হয়েছে ঠিক উল্টো।

থাইল্যান্ডে ১৪ অক্টোবর ২০২০—রাজকীয় শোভাযাত্রার সামনে প্রতিবাদকারীরা তিন আঙুলের স্যালুট দেখানোর পর সরকার “জরুরি অবস্থা” জারি করে, নেতাদের রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় ফাঁসায়। ফল কী হলো? পরদিনই ২০ হাজার মানুষ রাস্তায় নামে। অক্টোবর মাসেই রেকর্ড ২৭৯টা বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে—সেই বছরের সর্বোচ্চ। মানুষ তখন টুইটারে ট্রেন্ড করাচ্ছে #RepublicOfThailand—যেটা কয়েক বছর আগেও কল্পনা করা যেত না।

বাংলাদেশে দৃশ্যটা আরও ভয়ংকর। ১৪ জুলাই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন দিয়ে ক্যাম্পাসে হামলা, তারপর র‍্যাব-বিজিবি নামিয়ে দেওয়া। ১৬ জুলাই ঘটে সেই ঘটনা যা পুরো দেশকে কাঁপিয়ে দেয়—আবু সাঈদ হাত দুটো ছড়িয়ে পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়ে যান, আর পুলিশ তাঁকে গুলি করে মেরে ফেলে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের রিপোর্ট বলছে, এই একটা ছবিই আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়—তার আগে দিনে দশটার কম বিক্ষোভ হতো, তার পরের চার দিনে সেটা হয়ে যায় ৫৩টা। কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ, হাজার হাজার গ্রেপ্তার—কিছুই কাজ করেনি। উল্টো সাধারণ মানুষ, এমনকি আওয়ামী লীগের পুরনো সমর্থকরাও রাস্তায় নেমে আসে, কেউ কেউ বারান্দা থেকে গরম পানি ঢেলে পুলিশকে বাধা দেয়। শেষমেশ ৫ আগস্ট, যখন সেনাবাহিনী ও বিজিবি গুলি না চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তখনই বোঝা যায় খেলা শেষ—শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন।

লেখকের সবচেয়ে ধারালো পর্যবেক্ষণ এখানেই: দুই সরকারই একই ভুল করেছে। তারা প্রতিবাদকারীদের জেদ কম আন্দাজ করেছিল, আর নিজেদের পুলিশ-সেনাবাহিনীর আনুগত্য বেশি আন্দাজ করেছিল।

ফলাফল একরকম হয়নি কেন?

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা দরকার—যদি দুটো আন্দোলনের প্যাটার্ন এত মিলে যায়, তাহলে ফলাফল কেন আলাদা হলো? থাইল্যান্ডে তো সরকার পড়ে যায়নি, অথচ বাংলাদেশে হাসিনা সরকার সরাসরি পতন হলো।

উত্তরটা লুকিয়ে আছে দমনের ধরনে আর প্রতিষ্ঠানের গঠনে। থাই সরকার প্রকাশ্যে বড় ধরনের রক্তপাত এড়িয়ে গিয়েছিল, বরং আইনি হয়রানির পথে হেঁটেছিল—যেটা ধীরে ধীরে আন্দোলনকে ক্লান্ত করে দিয়েছে, কিন্তু সরকার বা রাজতন্ত্রকে সরাসরি হুমকিতে ফেলেনি। বাংলাদেশে দমন ছিল এত প্রকাশ্য আর প্রাণঘাতী যে সেনাবাহিনী নিজেই আর সরকারের পাশে দাঁড়াতে রাজি হয়নি—আর যেকোনো সরকারের পতনের জন্য এটাই সবচেয়ে জরুরি শর্ত।

তাই থাইল্যান্ডে গল্পটা হলো ধীরগতির, দীর্ঘমেয়াদী জয়—আন্দোলন তাৎক্ষণিক সরকার ফেলতে পারেনি, কিন্তু একটা “গণতান্ত্রিক পুঁজি” জমা করে গেছে, যা পরে ভোটবাক্সে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশে গল্পটা আকস্মিক, নাটকীয় জয়—কিন্তু লেখক নিজেই সতর্ক করে দিয়েছেন, আকস্মিক জয় মানেই স্থায়ী গণতন্ত্র নয়।

থাই মডেল: ভাঙা দল থেকে ভোটের রাজা হওয়া

থাইল্যান্ডের ফিউচার ফরোয়ার্ড পার্টি ২০১৮ সালে তৈরি হয়ে ২০১৯ সালের নির্বাচনে ৮১ আসন আর ৬৩ লাখ ভোট পেয়ে তৃতীয় বৃহত্তম দল হয়ে যায়—কোনো বড় জোটের ছায়া ছাড়াই, একদম নিজস্ব পরিচয়ে। ২০২০ সালে আদালত দলটা ভেঙে দিলেও, তরুণ কর্মীরা হাল ছাড়েনি—তারা রাস্তার আন্দোলনকে সংগঠিত রাখে, পরে সেই একই নেটওয়ার্ক দিয়ে গড়ে তোলে মুভ ফরোয়ার্ড পার্টি, যেটা ২০২৩ সালে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ভোট পায়। যদিও পরে আদালত আবারও এই দলটাও ভেঙে দেয়, তবু বার্তাটা স্পষ্ট—আন্দোলনের নৈতিক শক্তিকে যদি ধৈর্য ধরে সংগঠনে রূপান্তর করা যায়, তাহলে বারবার আঘাত খেয়েও ভোটের মাঠে জেতা সম্ভব।

এবার আসল প্রশ্নে আসা যাক: জাতীয় নাগরিক পার্টি কী করবে?

জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী ছাত্র-অ্যাক্টিভিস্টরা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গড়ে তোলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP), নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে। স্বপ্নটা ছিল বড়—আওয়ামী লীগ-বিএনপির পুরনো দ্বিদলীয় বৃত্ত ভেঙে একটা “দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র” গড়ার।

কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের ফলাফল আশানুরূপ হয়নি। বিএনপি ভূমিধস জয় পেয়ে ২০৯ আসনে সরকার গঠন করে। জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসন পেয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দল হয়ে ওঠে। আর NCP, যারা মাত্র ৩০টি আসনে লড়েছিল, জিতেছে মোটে ৬টিতে। নাহিদ ইসলাম নিজে ঢাকা-১১ আসনে কোনোমতে জিতে সংসদের সবচেয়ে তরুণ সদস্যদের একজন হয়েছেন, যদিও দলটি ভোট গণনায় কারচুপির অভিযোগ তুলেছে।

এখন প্রশ্ন হলো—থাই তরুণদের যে গল্প এত সাফল্যের, বাংলাদেশের তরুণদের গল্প কেন এখনো সেভাবে জমছে না? এখানেই একটা সৎ, খোলামেলা বিতর্ক দরকার, কোনো একতরফা রায় না দিয়ে।

একদিকে যুক্তি আছে—NCP-র সবচেয়ে বড় ভুল ছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়া। এটা অনেকটা এমন, যেন একটা সেকুলার, বৈষম্যবিরোধী চেতনা নিয়ে জন্ম নেওয়া দল হঠাৎ এমন একটা শক্তির সাথে হাত মেলাল যাদের রাজনৈতিক ইতিহাস ও আদর্শ সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে দলের ভেতর থেকেই তসনিম জারা, তসনুভা জাবীনের মতো নেতৃস্থানীয় মুখ পদত্যাগ করেন। আসন-বণ্টনেও তারা দুর্বল অবস্থানে পড়ে যায়—১২৫ আসন চাইলেও পায় মাত্র ৩০টা। থাই তরুণরা যেখানে নিজেদের পরিচয় নিয়ে কখনো আপস করেনি, NCP সেখানে কৌশলগত বাধ্যবাধকতার চাপে নিজের ব্র্যান্ডকেই ঝাপসা করে ফেলেছে বলে সমালোচকরা বলছেন।

অন্যদিকে ন্যায্য পাল্টা যুক্তিও আছে—বাংলাদেশের বাস্তবতা থাইল্যান্ডের চেয়ে আলাদা। থাইল্যান্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত দ্বিমুখী ছিল (জান্তাপন্থী বনাম সংস্কারপন্থী), কিন্তু বাংলাদেশে এখন ত্রিমুখী লড়াই—বিএনপি, জামায়াত, আর NCP। জামায়াতের কয়েক দশকের সুসংগঠিত মাঠ-নেটওয়ার্ক আর অর্থবল আছে, যা এক বছর বয়সী একটা নতুন দলের নেই। এমতাবস্থায় একা লড়ে ভরাডুবি হওয়ার চেয়ে জোটে গিয়ে অন্তত সংসদে ঢোকা—এটাও একটা বাস্তবসম্মত হিসাব হতে পারে। প্রশ্ন হলো, এই স্বল্পমেয়াদী হিসাব দীর্ঘমেয়াদে দলের পরিচয়ের কতটা ক্ষতি করল, সেটাই আসল বিতর্কের জায়গা।

তাহলে NCP সামনে কী করতে পারে?

থাই অভিজ্ঞতা থেকে কিছু সৎ পরামর্শ বের করা যায়, তবে সবগুলোই একরকম সহজ নয়—

নিজের পরিচয়টা স্পষ্ট রাখা। ভোটাররা যদি বুঝতে না পারে একটা দল আসলে কী চায়, সেই দল টিকে থাকতে পারে না। মুভ ফরোয়ার্ড পার্টি যত ঝুঁকিই থাকুক, রাজতন্ত্র সংস্কারের প্রশ্নে কখনো নরম হয়নি। NCP-কেও ঠিক করতে হবে—তারা কি সত্যিই সেকুলার, বৈষম্যবিরোধী রাজনীতির প্রতিনিধি, নাকি নির্বাচনী সমীকরণের একটা অংশ মাত্র। দুটো একসাথে হয় না।

রাস্তার শক্তিকে সংগঠনে বদলানো। আন্দোলনের সময়ের উত্তেজনা এক জিনিস, নির্বাচনের মাঠে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কর্মী বসিয়ে রাখা আরেক জিনিস। থাই তরুণরা রাস্তার আন্দোলন থেকে ভোট পর্যবেক্ষকে রূপান্তরিত হয়েছিল—শুধু স্লোগান দিয়ে না, কারচুপি ঠেকানোর কাজেও নেমেছিল।

জোট নয়, নিজস্ব শক্তি বাড়ানো। জোটে যাওয়া হয়তো মাঝেমধ্যে বাধ্যবাধকতা, কিন্তু আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন সাংগঠনিক আর অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে কারো ছায়ায় না দাঁড়িয়ে নিজের শর্তে দর কষাকষি করা যায়।

তাড়াহুড়ো না করা। এই বোধহয় সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা। থাই তরুণদের তিন বছর লেগেছিল রাস্তার আন্দোলনকে ভোটের সাফল্যে বদলাতে। NCP মাত্র এক বছর বয়সী একটা দল—৬টা আসন কোনো চূড়ান্ত পরাজয় নয়, বরং এটা প্রথম ধাপ হতে পারে, যদি তারা ধৈর্য ধরে, নিজের ভুল স্বীকার করে, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় স্থির থাকতে পারে।

শেষ কথা: প্রবন্ধটা কতটা জোরালো, কোথায় দুর্বল

এই প্রবন্ধের সবচেয়ে ভালো দিক হলো, এটা একটা সাহসী তর্ক তুলেছে—স্বৈরাচার আর প্রতিরোধকে আলাদা আলাদা বিষয় হিসেবে না দেখে, দুটোকে একসাথে, একে অপরকে প্রভাবিত করা একটা চলমান খেলা হিসেবে দেখিয়েছে। শুধু গল্প বলে থামেনি, সংখ্যা দিয়ে (কবে কতগুলো বিক্ষোভ হয়েছে, কবে দমন বেড়েছে) প্রমাণও দিয়েছে।

তবে কিছু দুর্বলতাও চোখে পড়ে। বাংলাদেশের অংশে মাত্র কয়েকজনের সাক্ষাৎকার, তাও ঘটনার আট-নয় মাস পরে নেওয়া—এত অল্প সময়ে মানুষের স্মৃতি আর আবেগ কতটা নির্ভরযোগ্য থাকে, সেটা একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, যদিও লেখক নিজেই এটা স্বীকার করেছেন। থাইল্যান্ডের গবেষণায় আবার কোনো নীতিগত (ইথিক্স) অনুমোদনই নেওয়া হয়নি, রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে—যেটা বাস্তবসম্মত হলেও গবেষণার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা লেখক নিজেই দিয়েছেন শেষে—ভবিষ্যতের স্বৈরাচারীরা হয়তো আর প্রকাশ্যে গুলি চালাবে না, বরং আরও চালাক, আরও “নিরীহ দেখানো” আইনি ফাঁদ পাতবে, যাতে কোনো আবু সাঈদের ছবি তৈরি না হয়, কোনো ব্যাকফায়ার না ঘটে। বাংলাদেশের নতুন গণতন্ত্রের জন্য এই সতর্কবার্তাটাই আসলে সবচেয়ে জরুরি হয়ে দাঁড়ায়।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা