শিকদার বাসির
মফস্বলের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে বহু বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন জহির স্যার। দীর্ঘ শিক্ষকজীবনে তিনি একটি বিষয় বারবার লক্ষ্য করেছেন—পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে তরুণেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সমাজের অবক্ষয় নিয়ে তর্ক করে। কারও অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে, কারও শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে, কারও বা প্রতিবেশীর প্রতি। কিন্তু নিজেদের দৈনন্দিন আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলে খুব কম মানুষই।
একদিন বাংলা ক্লাসে পড়াতে পড়াতে জহির স্যার হঠাৎ থেমে গেলেন। চকটা টেবিলে রেখে তিনি ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
— তোমরা প্রায়ই বলো, সমাজ দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। বলো তো, এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী কে?
প্রায় পুরো শ্রেণিই একসঙ্গে উত্তর দিল,
— রাজনীতিবিদরা, স্যার। প্রশাসন। বড়লোকেরা।
জহির স্যার মৃদু হেসে আবার প্রশ্ন করলেন,
— আচ্ছা, গতকাল তোমাদের মধ্যে কে কে হাতের ময়লা রাস্তায় ফেলেছ?
মুহূর্তেই শ্রেণিকক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কয়েকটি মাথা নীরবে নিচু হয়ে এল।
তিনি আবার বললেন,
— বাসে কোনো বৃদ্ধ মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন, অথচ তোমরা মোবাইলের পর্দায় চোখ রেখে সিট ছেড়ে দাওনি—এমন কেউ আছ?
আরও কয়েকটি মুখ সংকোচে নত হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে তিনি শেষ প্রশ্নটি করলেন,
— পরীক্ষায় নকল করেছ কখনো? অথচ মনে করো, দেশের দুর্নীতির জন্য শুধু অন্যরাই দায়ী?
এবার নীরবতা যেন পুরো শ্রেণিকক্ষকে ঢেকে ফেলল।
জহির স্যার ধীরে ধীরে বোর্ডের দিকে এগিয়ে গেলেন। বড় অক্ষরে লিখলেন—
‘সমাজ বদলাতে চাইলে, আগে বদলাতে হবে নিজেকে।’
তারপর ছাত্রদের দিকে ফিরে বললেন,
— আমরা প্রায়ই আয়নার সামনে দাঁড়িয়েও নিজের মুখ দেখি না; দেখি অন্যের দোষের প্রতিবিম্ব। অথচ সমাজ কোনো বিমূর্ত শব্দ নয়—সমাজ গড়ে ওঠে আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণে। তুমি যদি রাস্তায় ময়লা না ফেলো, আরেকজনও সংকোচ বোধ করবে। তুমি যদি পরীক্ষায় অসততার পথ এড়িয়ে চলো, তোমার সততা অন্য কাউকে সাহস জোগাবে। পরিবর্তনের শুরু কখনো জনসমুদ্র থেকে হয় না; হয় একজন মানুষের বিবেক থেকে।
সেদিনের ক্লাসটি শেষ হলেও কথাগুলো ছাত্রদের ভেতরে রয়ে গেল।
এরপর থেকে প্রতি সপ্তাহে তারা নিজেরাই একটি ছোট বৈঠকে বসতে শুরু করল। সেখানে কেউ অন্যের ভুল নিয়ে আলোচনা করত না; বরং বলত, গত সপ্তাহে নিজের কোন অভ্যাসটি বদলাতে পেরেছে। কেউ মিথ্যা বলা কমিয়েছে, কেউ রাস্তায় ময়লা ফেলা ছেড়েছে, কেউ ছোট ভাইবোনের সঙ্গে রূঢ় আচরণ পরিহার করেছে। পরিবর্তনগুলো ছিল ক্ষুদ্র, কিন্তু আন্তরিক।
এক বছর পর সেই স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে পুরো মহল্লায় এক নতুন পরিচয় তৈরি হলো। মানুষ তাদের চিনতে শুরু করল শৃঙ্খলা, সততা ও সৌজন্যের জন্য।
জহির স্যার তখন আরও একবার নিশ্চিত হলেন—বড় পরিবর্তনের জন্য সব সময় বিপ্লবের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটি সমাজ বদলে যাওয়ার সূচনা ঘটে নিঃশব্দে; যখন একজন মানুষ সাহস করে প্রথমবারের মতো নিজের মুখোমুখি দাঁড়ায়।
ঠিকানা.
বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
ই-মেইল. shikderb95@gmail.com







