প্রচ্ছদগদ্য'আগামিকাল কি বৃষ্টি হবে? '--একটি রক্তস্নাত জিজ্ঞাসার কাব্যিক শারীরতত্ত্ব

লিখেছেন : নাবিল নিশাত

‘আগামিকাল কি বৃষ্টি হবে? ‘–একটি রক্তস্নাত জিজ্ঞাসার কাব্যিক শারীরতত্ত্ব

নাবিল নিশাত

____________

একটা কবিতা যখন শুধু কবিতা থাকে না,  যখন সে হয়ে ওঠে একটা সভ্যতার দলিল, একটা জাতির বিবেকের আর্তনাদ — তখন তাকে পড়তে হয় অন্যভাবে। 
ফরহাদ মজহারের “আগামিকাল কি বৃষ্টি হবে?” ঠিক সেই রকম একটা কবিতা। এই কবিতা পড়লে বুকের ভেতরে কোথাও একটা চিনচিনে ব্যথা জাগে — কারণ এই কবিতা কেবল অতীতের কথা বলে না, সে আজকের দিনেও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কোথায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি।

২০১৩ সালের ৫-৬ মে রাতের কথা। ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে রাষ্ট্রীয় বাহিনী অভিযান চালায় মধ্যরাতে। কত মানুষ মারা গিয়েছিল, তা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি সংখ্যা আজও মেলে না। সরকার বলেছিল হতাহত নগণ্য, বিরোধী পক্ষ বলেছিল শত শত। সত্যটা কোথাও গলে গেছে অন্ধকারে।

ঠিক এই জায়গা থেকেই ফরহাদ মজহার তাঁর কবিতার শুরু করেন — এবং শুরু করেন এক অদ্ভুত ব্যঙ্গের ভাষায়।

কবিতাটির সবচেয়ে চমকে দেওয়া কৌশল হলো — কবি এখানে সরকারি বয়ানকেই তুলে ধরেছেন, কিন্তু এমনভাবে যে সেই বয়ানই নিজেকে ধ্বংস করে দেয়।

“আমি খুঁজছি সেই পাক্কা অভিনেতাদের / মাথায় টুপি, হাতে তসবি আর চিড়াগুড়ের পুঁটুলি / প্রধান মন্ত্রীর স্বরচিত নাটকে অভিনয়ের জন্য যারা / রঙ মেখে শুয়ে ছিল গতবছর”

সরকারপক্ষ দাবি করেছিল, মৃত্যুর সংখ্যা অতিরঞ্জিত — মানুষেরা নাকি অভিনয় করে মরার ভান করেছিল। কবি সেই দাবিকেই হাতিয়ার করেছেন। বলছেন — “আচ্ছা, যদি সত্যিই তারা অভিনেতা হয়, তাহলে সেই অভিনেতারা গেলেন কোথায়?”
এই প্রশ্নটাই ছুরির মতো বিঁধে যায়। কারণ উত্তর নেই। অভিনেতারা নেই। যারা “মরার ভান করেছিল” বলে সরকার দাবি করেছিল — তারা কেউ ঘরে ফেরেনি। তারা নদীতে, সমুদ্রে, গোরস্থানে, মিউনিসিপ্যালিটির বর্জ্য বিভাগে হারিয়ে গেছে।
এটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নিষ্ঠুরতম বিদ্রূপ — কারণ এই বিদ্রূপ হাসায় না, কাঁদায়।

“বুট, বন্দুক ও সাঁজোয়া যানে ভারি মধ্যরাত্রির পালা” — রাষ্ট্রের নগ্ন মুখ
“র‍্যাব পুলিশ বিজিবির গুলি, বুলেট, সাউণ্ড গ্রেনেড ও যৌথ অভিযান / স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী মৃতের অভিনয়ে শুয়ে পড়লো সবাই”

এখানে কবি আক্ষরিক অর্থেই রাষ্ট্রের মুখোশ খুলে দিচ্ছেন। “স্ক্রিপ্ট” শব্দটার ব্যবহার অত্যন্ত সুচিন্তিত — এটা বলছে, এই ঘটনা পরিকল্পিত ছিল। মধ্যরাতে অপারেশন, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, মিডিয়া বন্ধ — এ কি আচমকা? নাকি পাণ্ডুলিপি মেনে চলা?

“প্রধানমন্ত্রীর পাণ্ডুলিপি মেনে অক্ষরে অক্ষরে” — এই লাইনটি রাজনৈতিকভাবে সাহসী, প্রায় বিপজ্জনক। কবি সরাসরি রাষ্ট্রপ্রধানকে একটি গণহত্যার পরিচালক বলছেন — কোনো রাখঢাক ছাড়াই।

“হলুদ লাল টেলিভিশান / সাদাকালো পত্রিকা / রঙ বেরঙের ওয়েব পোর্টাল” 

এই তিনটি লাইন মিলে মিডিয়ার পুরো বর্ণালীকে চিহ্নিত করা হয়েছে — টেলিভিশন, ছাপা পত্রিকা, অনলাইন পোর্টাল। এবং প্রত্যেককে একটাই প্রশ্ন: তোমরা যাদের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলে, তারা কোথায়?

“মুগ্ধ হয়েছিল” — এই ক্রিয়াপদটি চাবুকের মতো। মিডিয়া কেবল সরকারি বয়ান সম্প্রচার করেনি, সে মুগ্ধ হয়েছিল। অর্থাৎ মিডিয়া শুধু নিষ্ক্রিয় নয়, সক্রিয়ভাবে অংশীদার।

“শীতলক্ষ্যায় ধলেশ্বরীতে / নদির তলদেশে, সমুদ্রে ও গোরস্থানে / মিউনিসিপ্যালিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে” 

এই লাইনগুলো পড়লে শ্বাস আটকে আসে।
“মিউনিসিপ্যালিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে” — এই একটি লাইনে সভ্যতার সমস্ত নৃশংসতা আছে। মানুষকে বর্জ্য বানিয়ে ফেলা হয়েছে। যে মানুষ একদিন সন্তান ছিল, বাবা ছিল, ভাই ছিল — রাষ্ট্র তাকে আবর্জনার ট্রাকে ঠাঁই দিয়েছে।

এই ইমেজারি বাংলা কবিতায় বিরল। এটি বীভৎস, কিন্তু সৎ। এবং ঠিক এই সততার কারণেই এটি সহ্য করা কঠিন।

“ঋণ জমেছে বিস্তর / জমাট বেঁধে যাচ্ছে হিমোগ্লোবিন ইতিহাসের চিলেকোঠায়” 

“প্রতিটি তসবিদানার দাম শোধ দিতে হবে / এই বছর / কিম্বা আগামী বছর…”

“হিমোগ্লোবিন ইতিহাসের চিলেকোঠায়” এটি অসাধারণ একটি রূপক। ইতিহাস এখানে একটি পুরনো বাড়ি, চিলেকোঠায় জমে আছে জমাট রক্ত। কেউ পরিষ্কার করেনি। কেউ দাম শোধ করেনি। কিন্তু ঋণ কি কখনো মেলায়?

“এই বছর / কিম্বা আগামী বছর / কিম্বা তার পরের বছর”, এই পুনরাবৃত্তি কবিতার একটি মুক্তিলাভ না করার অনুভূতি তৈরি করে। এটি হতাশার নয়, এটি সতর্কবার্তার। ইতিহাস ভোলে না, এমনকি যখন মানুষ ভোলার চেষ্টা করে।

কবিতার শুরু ও শেষে “বৃষ্টি” প্রশ্নটি ফিরে আসে। প্রথমে এটি আক্ষরিক — গ্রীষ্মের দাবদাহে বৃষ্টির প্রার্থনা। কিন্তু মাঝখানে কবি বলেন:

“কাল যদি বৃষ্টি হয় তবে সেটা হবে রক্তে ভেজা তসবিদানার”

বৃষ্টি এখন আর স্বস্তির বৃষ্টি নয় — এটি রক্তবৃষ্টি। প্রকৃতিও দূষিত হয়ে গেছে। আকাশ থেকে নামবে তসবিদানা, টুপি, চিড়াগুড়ের পুঁটুলি — নিখোঁজ মানুষদের স্মৃতিচিহ্ন।

শেষ লাইনে “শহিদের চত্বরে” কথাটি মর্মান্তিক। কারণ শাপলা চত্বর কখনো সরকারিভাবে “শহিদের চত্বর” হয়নি। কবি এই স্বীকৃতি দিচ্ছেন যা রাষ্ট্র দিতে অস্বীকার করে।

সামগ্রিকাভাবে কবি ফরহাদ মজহারের এই কবিতা কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়। এটি একটি নৈতিক জিজ্ঞাসা — রাষ্ট্র কতটুকু মিথ্যা বলতে পারে? মিডিয়া কতটুকু সহযোগী হতে পারে? এবং আমরা, সাধারণ মানুষ, কতটুকু ভুলতে পারি?

কবিতার ভাষা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভিন্ন স্তরে কাজ করে — কখনো ব্যঙ্গাত্মক, কখনো আইনি নথির মতো শুষ্ক (“র‍্যাব পুলিশ বিজিবি”), কখনো আবার গভীর আবেগময় (“বাংলাদেশ তোমাদের খুঁজছে”)। এই স্বরের পরিবর্তন কবিতাকে একটি বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতায় পরিণত করে।

“কসম কবিতার” — এই শপথটি উল্লেখযোগ্য। কবি কবিতার নামে শপথ নিচ্ছেন। অর্থাৎ কবিতাই এখানে একমাত্র বিশ্বস্ত সাক্ষী -রাষ্ট্র নয়, আদালত নয়, মিডিয়া নয়।

এই কবিতা পড়ে মনে পড়ে পাবলো নেরুদার সেই উচ্চারণ, ‘কবিতা কখনো নিরীহ নয়।’ ফরহাদ মজহারের এই কবিতাও নিরীহ নয়। এটি একটি অভিযোগনামা, একটি শোকগাথা, এবং একটি সতর্কবার্তা।
রক্তের দাম এখনো শোধ হয়নি। ঋণ জমেই আছে…

[ ৫ই মে ২০২৬||জামালপুর ]

আগামিকাল কি বৃষ্টি হবে?
 ~ফরহাদ মজহার
( ৪ মে ২০১৪)
…………………………
দাবদাহে পুড়ে যাচ্ছে দেশ
আগামি কাল মে মাসের পাঁচ তারিখ

কাফন সাদা শাপলা-কুসুম,
আগামি কাল কি বৃষ্টি হবে?

আমি খুঁজছি সেই পাক্কা অভিনেতাদের
মাথায় টুপি, হাতে তসবি আর চিড়াগুড়ের পুঁটুলি
প্রধান মন্ত্রীর স্বরচিত নাটকে অভিনয়ের জন্য যারা
রঙ মেখে  শুয়ে ছিল গতবছর
শাপলা চত্বরে।

বুট, বন্দুক ও সাঁজোয়া যানে ভারি মধ্যরাত্রির পালা
র‍্যাব পুলিশ বিজিবির গুলি, বুলেট, সাউণ্ড গ্রেনেড ও যৌথ অভিযান
স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী মৃতের অভিনয়ে শুয়ে পড়লো সবাই
অতঃপর আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কোমল করস্পর্শে
দৌড়ে পালালো নিখুঁত ভাবে, 
প্রধানমন্ত্রীর পাণ্ডুলিপি মেনে
অক্ষরে অক্ষরে।

আহ্‌, শহর মুক্ত
পড়ে থাকলো ছেঁড়া টুপি, তসবিহ, কাপড়ে বাঁধা চিড়াগুড়ের পুঁটুলি।

কিন্তু কোথায় কোথায়?
কোথায় সেই সকল অভিনেতা, যাদের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছিল
হলুদ লাল টেলিভিশান
সাদাকালো পত্রিকা  
রঙ বেরঙের ওয়েব পোর্টাল?

আর, কোথায় তোমরা সেইসব প্রতিভাবান বালক
পাক্কা একবছর তোমাদের খুঁজছি।
     খুঁজতে থাকব
             আজ
                   কাল
                          পরশু
                               এবং আবার আজ কাল এবং
 পরশু।

বাংলাদেশ তোমাদের খুঁজছে
শীতলক্ষ্যায় ধলেশ্বরীতে
নদির তলদেশে, সমুদ্রে ও গোরস্থানে
মিউনিসিপ্যালিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে।

কসম কবিতার
কাল যদি বৃষ্টি হয় তবে সেটা হবে রক্তে ভেজা তসবিদানার
ঝরে পড়বে টুপি ও চিড়াগুড়ের পুঁটুলি

চতুর্দিকে ব্লাড ব্যাংকের ব্যবসা
কিন্তু কেউই রক্তের দাম শোধ করতে চায় না

ঋণ জমেছে বিস্তর।
জমাট বেঁধে যাচ্ছে হিমোগ্লোবিন
ইতিহাসের চিলেকোঠায়
প্রতিটি তসবিদানার  দাম শোধ দিতে হবে।
এই বছর
            কিম্বা আগামী বছর
                        কিম্বা তার পরের বছর
                                                কিম্বা 
তারও পরের বছর…

শাপলা-কুসুম,
আগামি কাল কি বৃষ্টি হবে
         শহিদের  চত্বরে?

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা