এনামূল হক পলাশ
ভাস্কর্য : ইংরেজি ভাষায় (Sculpture) ত্রি-মাত্রিক শিল্পকর্মকে ভাস্কর্য বলে। অর্থাৎ জ্যামিতি শাস্ত্রের ঘণকের ন্যায় ভাস্কর্যকে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং গভীরতাসহ ত্রি-মাত্রিক হতে হবে। পুতুল , মুখোশ, মাটির জিনিসপত্র ভাস্কর্যের উদাহরণ। এগুলো সৌন্দর্য বর্ধক স্থাপনা, প্রতীক ও খেলনা সামগ্রী হিসেবেই বিবেচিত।
মূর্তি : মূর্তি বলতে দেবতার প্রতিমাকে বোঝায় শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল “অবয়ব”। মূর্তি দেবতার প্রতিনিধি। সাধারণত পাথর, কাঠ, ধাতু অথবা মাটি দিয়ে মূর্তি নির্মাণ করা হয়। মূর্তিপূজারিরা মূর্তির মাধ্যমে দেবতার পূজা করে থাকেন। মূর্তিতে দেবতার আবাহন ও প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার পরই হিন্দুরা বা মূর্তি পূজারকগণ সেই মূর্তিকে পূজার যোগ্য মনে করেন। প্রতিমা হল মানুষ যার আরাধনা, উপাসনা করে, ইহকালে-পরকালে মঙ্গল চায়, ভুলের ক্ষমা চায়। নচেত তা ভাস্কর্য কিংবা সৌন্দর্য বর্ধক স্থাপনা হিসেবেই বিবেচিত হয়। ধর্মীয় সংস্কার বা শাস্ত্রের নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট দেবতার মূর্তি নির্মিত হয়ে থাকে। অন্যথায় সেটি হয় দর্শনীয় সৌন্দর্য কিংবা প্রতীক হিসেবে।
ভাষ্কর্য ও মূর্তির সংজ্ঞা পাওয়া গেল। এবার আসা যাক কোরআন ও হাদীসের আলোচনায়। অনেক আলেম ভাষ্কর্য ও মূর্তিকে একই অর্থে ব্যবহার করেন কিন্তু কোন যুক্তিতে করেন তা বোধগম্য নয়।
কোরআন মাজীদে সূরা হাজ্জ এর ৩০ নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন- –
“তোমরা পরিহার করো অপবিত্র বস্তু অর্থাৎ মূর্তিসমূহ এবং পরিহার করো মিথ্যা।”
সূরা আনকাবুত এর ১৭ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন – “তোমরা তো আল্লাহর পরিবর্তে উপাসনা করো (অসার) মূর্তির এবং তোমরা নির্মাণ করো মিথ্যা।”
উল্লেখিত আয়াতের শানে নুযূল ও ব্যাখ্যা (আয়াত নাযিলের ঘটনা, স্থান, কাল বিবেচনায়) দেখা যায়, মহান আল্লাহ তায়ালা পূজনীয় মূর্তি পরিহার করতে বলেছেন কোন সৌন্দর্য বর্ধক ভাষ্কর্যকে নয়।
সূরা আম্বিয়া – ৫২, সূরা মায়েদা – ৯০, সূরা সাবা – ১৩ প্রভৃতি আয়াতেও আল্লাহ পাক উপাসনার মূর্তিকে নিষিদ্ধ করেছেন।
কাবা’তে রাসূল (সা.) লাত, মানাত, উজ্জা, হোবল, ওয়াদ প্রভৃতির প্রতিমা ভেঙেছিলেন, এগুলোর আরাধনা করা হত বলে।
সহি বুখারি ৮ম খণ্ড হাদিস ১৫১ এ হজরত আয়েশা রাঃ বলেছেন, আমি রাসুলের (সা.) উপস্থিতিতে পুতুলগুলি লইয়া খেলিতাম এবং আমার বান্ধবীরাও আমার সহিত খেলিত। যখন আল্লাহর রাসুল (সা.) আমার খেলার ঘরে প্রবেশ করিতেন, তাহারা লুকাইয়া যাইত, কিন্তু রাসুল (সা.) তাহাদিগকে ডাকিয়া আমার সহিত খেলিতে বলিতেন।
মক্কা বিজয়ের সময় কাবার দেয়ালে ৩৬০টি মূর্তি (বুখারি ৩য় খণ্ড – ৬৫৮) ও অনেক ছবির সঙ্গে ছিল হযরত ঈসা (আ.) ও তাঁর মাতা মরিয়মের (মেরি) ছবি। উদ্ধৃতি দিচ্ছি, “রাসুল (সা.) হযরত ঈসা (আ.) ও মাতা মেরির ছবি বাদে বাকি সব ছবি মুছিয়া ফেলিতে নির্দেশ দিলেন।” (সিরাত — ইবনে হিশাম/ইবনে ইসহাক-এর পৃষ্ঠা ৫৫২)।
বিরোধিতা করার আগে আমাদের ভেবে দেখা দরকার কেন মধ্যপ্রাচ্যের ইমামেরা ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে নন। সৌদি আরবেও বহু ভাস্কর্য আছে। গুগলে সার্চ করুন ‘স্ট্যাচু ইন মুসলিম ওয়ার্ল্ড’ কিংবা ‘স্ট্যাচু ইন সৌদি আরব’– রাস্তার মোড়ে মোড়ে উটের, কবজি থেকে হাতের আঙুলের, মুসলিম বীরদের এবং আরও কত ভাস্কর্য।
সেখানকার মাওলানারা জানেন কোরান ও রাসুল (সা.) সুস্পষ্টভাবে প্রতিমাকে নিষিদ্ধ করেছেন, ভাস্কর্যকে নয়। তাই তাঁরা মুসলিম বিশ্বের অজস্র ভাস্কর্যকে অস্বীকৃতি জানাননি।
আলোচনা সাপেক্ষে এমন আরো অনেক দলিল দেয়া সম্ভব।







