প্রচ্ছদগল্পউপন্যাসএকজন নৃশংস দুষ্কৃতকারী

ধারাবাহিক উপন্যাস : নেয়ামত ইমাম

একজন নৃশংস দুষ্কৃতকারী

নেয়ামত ইমাম 

প্রথম খণ্ড

৮.

পরদিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠতে উঠতে আটটা বেজে যায়। জানালায় গিয়ে দেখি বাইরে একটি সাধারণ দিন শুরু হয়ে গেছে। রাস্তায় চলছে রিক্সা। দুয়েকটি সিএনজিও চলতে দেখা যায়। মাছ, ডিম বা সবজি বিক্রেতারা নেমে এসেছে। নেমে এসেছে চুড়িওয়ালা। বাড়ির ফাঁক দিয়ে আসছে রোদ। দল বেঁধে মানুষ চলেছে কাজে। কত দ্রুত সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে তা ভেবে আশ্চর্য হই। পাশের কক্ষে গিয়ে দেখি ঝাড়ু দিয়ে মেঝেটি পরিষ্কার করছে মোশাহিদা। কাঁচের টুকরাগুলোকে সে ইতোমধ্যে একটি বালতিতে তুলে নিয়েছে। জানালার পর্দাগুলো টেনে দুপাশে সরিয়ে দেওয়ায় মিষ্টি রোদে গরম হয়ে উঠেছে ঘর। সামিয়ানা বিছানা ছেড়েছে আগেই। কাজে যেতে হবে বলে সে চুল আঁচড়ে তৈরি হচ্ছে। 

মুখ ধুয়ে আসার পর মোশাহিদা আমাদেরকে চিতল পিঠা খেতে দেয়। শরীফ উল্লা পাটোয়ারী আজ ফিরে আসবেন বলে সে জানায়। অর্থাৎ ভাঙ্গা জানালাটি নিয়ে আমাকে চিন্তা করতে হবে না। চুল আঁচড়ানো শেষ হলে সামিয়ানা বসে আমার বিপরীত দিকে। মাথা নিচু করে সে চিতল পিঠা খায়। বাড়িতে চা বানানোর সুযোগ রয়েছে কি না জিজ্ঞেস করলে মোশাহিদা তাকে বলে, “অবশ্যই, অবশ্যই। পানি গরম হচ্ছে। কয়েক মিনিট দিন।” তাতে সে মাথা নাড়ে। দক্ষিণ পাইকপাড়ায় যাওয়ার পথে আমি জিগাতলা হয়ে যেতে পারি কি না সে জিজ্ঞেস করে। সেখানে সে কাজ করে। বাসায় গিয়ে তারপর কাজে যেতে হলে দেরি হয়ে যাবে। “তা করা যাবে,” আমি বলি। “সিএনজি মিরপুর রোড থেকে না হয় একটু ঘুরে যাবে। ভাড়া করার সময় চালকের সঙ্গে তা পাকা করে নেবো। অসুবিধা হবে না।”

আরামবাগ উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে থেকে আমি একটি দৈনিক পত্রিকা কিনি। তারপর সিএনজিতে বসে এর খবরের শিরোনামগুলো দেখি। প্রধান শিরোনাম থাকে ‘নাটোরে আখচাষীদের দুর্ভোগ : প্রধামন্ত্রীর সহযোগিতার আশ্বাস’। তারপর থাকে বেতবুনিয়ায় কেউ বিশাল এক কাতলা মাছ শিকার করে পুরষ্কার স্বরূপ জিতে নিয়েছে আড়াই লাখ টাকা ও অপরিকল্পিত হকার পুনর্বাসন বিষয়ক আইসিটির রিপোর্ট। শাপলা চত্বরে আয়োজিত সরকারবিরোধী জনাসমাবেশ নিয়ে একটি রিপোর্ট শেষ পৃষ্ঠায় ছাপা হয়। তাতে শিরোনাম থাকে ‘রাজধানীতে পৃথক অভিযানে শতাধিক গ্রেপ্তার’, সঙ্গে জনসমাবেশ মঞ্চের একটি ছবি, যাতে দেখা যায় গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য বক্তারা পালিয়ে যেতে চেষ্টা করছেন। সামিয়ানা আমার সঙ্গে শিরোনামগুলো দেখে, আমার হাত থেকে পত্রিকাটি চেয়ে নিয়ে শাপলা চত্বর বিষয়ক রিপোর্টটি শেষ পর্যন্ত পড়ে। তারপর পত্রিকাটি আমার কাছে ফিরিয়ে দিয়ে সে বাইরের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। 

তাকে জিগাতলায় নামিয়ে দিয়ে বাসায় ফেরার পরপরই আমি ফোন করি মোহাম্মদপুর ব্লক সি’র গাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রেতা খান মোটর পার্টস এর কর্ণধার আলী আহমেদ খানকে। তার সঙ্গে আমার আজ দুপুরে দেখা করার কথা। একজন বন্ধুভাবাপন্ন মানুষ তিনি। অন্য একজন কাস্টমারের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে দেখা করতে যেতে হবে বলে অজুহাত দিলে সহজে অ্যাপয়েন্টমেন্টটি পরের দিন দুপুরে নিয়ে যেতে রাজি হন। তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি বিছানায় যাই। গতকাল রাতে আরামবাগে যা দেখেছি তা মাথা থেকে সরিয়ে দেয়া একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে এরপর ফোন করি রফিকুল্লাকে। জরুরি কথা আছে, টেলিফোনে বলা যাবে না বললে সে আমাকে সময় দেয়, বলে, “সোজা বাসায় চলে আসুন। এখানে দুপুরের খাবার খাবেন।” জামাটি গায়ে তুলে আমি রাস্তায় নামি।

কল্যাণপুরে যাবার পথে নতুন বাজারের কাছে দেখা হয়ে যায় বাজার কমিটির সদস্য ও চার মেয়ের বাপ একরামুল হকের সঙ্গে। সামিয়াবাগের গলির মুখে একরামুলের একটি মুদি দোকান রয়েছে। আমি অনেকবার তার কাছ থেকে এটা-ওটা কিনেছি। আমি তাকে একজন ন্যায্য ব্যবসায়ী হিসেবেই জানি। কোনো জিনিশের দাম দুই পয়সা বেড়ে গেলে সে ব্যাখ্যা করে বলে অমুক বা অমুক কারণে দাম না বাড়িয়ে তার উপায় ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা, পরিচিত-অপরিচিত সব ভোক্তার কাছে সে এজন্য ক্ষমা চায়। এই ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারটি তার চলে কখনো কয়েক মাস ধরে। এমনকি মৌসুমি জিনিশের ক্ষেত্রেও সে এমনটি করতে ভোলে না। আমি তাকে কয়েকবার বলতে শুনেছি এটা নতুন আলু। দুই মাস আগে আমরা বিক্রি করতাম হিমঘর থেকে আনা পুরনো আলু। পুরনো আলুর দাম কম হয়। নতুন আলুর দাম বেশি হয়। আলু আগেভাগে না তুলে জমিতে রেখে দিলে তা বড় হবার সুযোগ পায় এবং ওজনে বাড়ে। নতুন আলু তুলে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে ক্ষতি পুষিয়ে নেবার জন্য এর দাম বেশি বলে ধার্য করা হয়। মার্কেটিং সম্পর্কে দুই একটা বই পড়লেও আমি জানি না ঠিক এজন্যই নতুন আলুর দাম বেশি হয় কি না। তবে একজন ব্যবসায়ী হিসাবে ভোক্তাকে বোঝাবার জন্য যে সে নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছে সে ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ থাকে না। আমি আরো বলবো সে ছিল একজন সুখি মানুষ। এলাকার অনেকেই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে প্রলম্বিত সময় ধরে গল্প করে। কেউ কেউ আবার জুতা খুলে বসে যায় পাটির ওপর, তার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করে সময় কাটায়। যদি শোনা যায় পাশের বহুতল বিশিষ্ট আবাসিক ভবনটির মালিক তার ছেলের জন্মদিনে পরিবারের বাইরের অতিথি হিসাবে একমাত্র তাকেই আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, তাহলে আশ্চর্য হবার কিছু থাকবে না। এ হচ্ছে তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধার প্রমাণ। শ্রদ্ধাই তো সুখ। যাকে কেউ শ্রদ্ধা করে না, সে কি করে সুখি মানুষ হতে পারে? তবে সে সুখি মানুষ ‘ছিল’ – একথা আমি বলছি এই জন্য যে এবার আমাকে দেখে সে যা বলে তাতে বোঝা যায় এখন সে সুখের মধ্যে তো নেই-ই, বরং আস্তিত্বিক সঙ্কটে ভুগছে। সে জানে আমি একজন বিক্রয় প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করি। সে জিজ্ঞেস করে আমার কোম্পানি ইদানিং নতুন বিক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগ করছে কি না এবং তার মতো বয়ষ্ক লোক বিক্রয় প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করতে পারবে কি না। 

“আপনার দোকানের কি হলো,” আমি জিজ্ঞেস করি। “কোনো কারণে কি সেটা ছেড়ে দিচ্ছেন?” 

সে জানায় তার দোকানের ভাড়ার চুক্তি শেষ হতে চলেছে এবং চুক্তি নবায়ন করার অধিকার থাকলেও এবং বাজার কমিটিতে তার শক্ত অবস্থান থাকলেও বাজারে ইদানিং পাল্টা একটি কমিটি ঘোষিত হওয়ায় চুক্তিটি নবায়ন করা যাচ্ছে না। দোকানের মালিক বলে দিয়েছেন তিনি নতুন কমিটির যথেষ্ট চাপে আছেন, মুদি দোকানের জায়গায় মিষ্টির দোকান চালু করা হবে বলে তার কাছ থেকে ইতোমধ্যে একটি চুক্তি আদায় করে নেয়া হয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে একরামুলকে তার কয়েক বছরের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হবে। “আপনার জন্য কষ্ট লাগছে, কিন্তু একটু চেষ্টা করলে আপনি অবশ্যই একজন বিক্রয় প্রতিনিধি হতে পারবেন,” আমি বলি। “মানুষের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা তো আপনার রয়েছে, যা আপনাকে ভীষণভাবে সাহায্য করবে। তারপর কোনো জিনিশের গুণাগুণ কিভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়, তাও আপনার জানা। বাকি থাকে প্রশিক্ষণ। কোনো না কোনো কোম্পানি হয়তো আপনাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের যোগ্য করে তুলতে রাজি হবে।” আমি তাকে আরো বলি রফিকুল্লা নামের আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে যে তাকে এই ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে। সে নিজেও একজন বিক্রয় প্রতিনিধি এবং সে অনেক লোক চেনে যার মধ্যে রয়েছে বেশকিছু পরোপকারী ও দয়ালু লোক। আমি এখন তার কাছেই যাচ্ছি, সে চাইলে সময় করে আমি আজই রফিকুল্লার সঙ্গে তার ব্যাপারে কথা বলবো। আমার কথা শুনে একরামুলের চোখে পানি এসে যায়। সামনে এগিয়ে সে আমাকে আলিঙ্গন করে এবং ফিসফিস করে বলে, “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনি আমাকে বাঁচালেন।”

আমাকে বহন করা বাসটি নয়া পল্টন হয়ে মতিঝিলের দিকে যেতে থাকলে আমি আশেপাশে গতকালের জনসমাবেশের চিহ্নমাত্র দেখতে পাই না। রাস্তাটিতে কয়েকটি ব্যারিকেড তোলা হয়েছিল – এমন কোনো নিদর্শনও কোথাও দেখি না। আমার মনে হয় আরামবাগের ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। জনসমাবেশের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। যদি থাকতো, সংবাদপত্রগুলো তা জানতো। তারা তাদের রিপোর্টার পাঠাতো সেখানে, গুলির ঘটনাগুলোর মূল খুঁজে বেড়াতো, পরিষ্কার করে বলতো সেখানে আসলে কি ঘটেছে এবং কেন তা ঘটেছে। এমন হতে পারে যে জনসমাবেশের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত থাকলেও নিহত লোকগুলো ছিল কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত এবং তাদেরকে শায়েস্তা করতে গিয়ে পুলিশ শুধু অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করেছে বা প্রশিক্ষণের বাইরে গিয়ে তাদের প্রতি প্রতিশোধমূলক আচরণ করেছে। এতো সত্য যে আমি সবগুলো দৈনিক পত্রিকা কিনিনি এবং সে জন্য অন্যান্য পত্রিকায় আরামবাগ সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশিত হলেও আমি তা জানি না। আরামবাগের মানুষদের কেউ না কেউ তাদের পরিচিতজনদের সঙ্গে এ নিয়ে ফোনে কথা বলেছে এবং এভাবে খবরটি অবশ্যই পৌঁছে গেছে কোনো না কোনো সংবাদদাতা বা সংবাদ সংস্থার কাছে। একটি পত্রিকা সংবাদটি না ধরলেও অন্যরা হয়তো ঠিকই ধরেছে। আমার আরো মনে হয় চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ করে আগামি দিনগুলোতে এনিয়ে অবশ্যই প্রকাশিত হবে অনেক অনেক রিপোর্ট, আমাকে সে জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এরকম নৃসংশতা তো আর রাতের অন্ধকারে হারিয়ে যাবে না।

দরজা খোলার পর একজন উৎফুল্ল রফিকুল্লা বলে, “আপনার জন্য সারপ্রাইজ আছে।” “তাই নাকি,” আমি বলি। সে সোফার দিকে নির্দেশ করে। আমি সেখানে ডায়নামিক মোটর্সের ডা. শ্যামল দত্তকে বসে থাকতে দেখি। আমাকে দেখে তিনি দাঁড়িয়ে যান, তারপর হাসি মুখে বলেন, “আসুন, আসাদ সাহেব। আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।” আমি তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেই। সোফায় বসার পর রফিকুল্লার সামনেই শ্যামল দত্ত বলেন, “সেদিন আপনি চলে যাবার পর আপনার অফারগুলো নিয়ে ভাবার অনেক সুযোগ আমার হয়। বিষয়টি আপনাকে সহজভাবে বলবো। ডায়নামিক মোটর্স বর্তমানে যে চমৎকার আর্থিক অবস্থায় আছে তাতে আমার মনে হয় আমরা আপনার কমপক্ষে তিনটি অফার সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করতে পারবো। এটাকে আপনি আমাদের ব্যবসায়িক সহযোগিতার প্রারম্ভ বলতে পারেন। এগুলো চলাকালীন আমরা আপনার সঙ্গে আমাদের চাহিদাগুলো নিয়ে আরো বিস্তারিতভাবে আলাপ করবো এবং আমার বিশ্বাস আগামি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমরা এই সহযোগিতার পরিমাণ আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারবো। এমনকি আপনি টায়ার বিপণন বিষয়ে যে প্রস্তাব দিয়েছেন তাও আমাদের পক্ষে অতি সত্বর সম্মান করা সম্ভব হবে বলে মনে করি।” 

আমি বিস্ময়াভিভূত। কী বলছেন উনি! রফিকুল্লার দিকে তাকালে সে বলে, “আপনাকে বলেছিলাম না? এখন খুশি তো?” 

শুধু খুশি নই, এত বড় সুসংবাদ ছিল আমার কল্পনার বাইরে। এগুলোর জন্য যদি আমাকে শ্যামল দত্তের কাছে সকাল-সন্ধ্যায় শতবার যেতে হতো, কারো কাছে ডায়নামিক মোটর্সের সুনাম করতে হতো, তাহলেও সে কষ্ট সার্থক হতো। 

“অবশ্যই,” আমি বলি, “কোনো সন্দেহ নেই। শুধু খুশি নয়। আজ নিজেকে পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে।” আমি শ্যামল দত্তের দিকে তাকাই, বলি, “প্রথমতঃ আমি আপনাকে এখানে আশা করিনি। দ্বিতীয়তঃ এই সুযোগ সত্যিই চুক্তিতে রূপ নিলে তা আর্থিক মূল্যে সুমন এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে করা আমাদের নতুন চুক্তিটিকে ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে হয়। সত্যি বলতে কি, এত বড় কিছু আমি আপনাদের কাছ থেকে আশা করিনি।” 

“এটা আমাদের জন্যও বিরাট সুসংবাদ,” তিনি বলেন। “আমি বলতে পারি আমি এটাকে আর সুযোগ হিসাবে দেখছি না। এটাকে আমি দেখছি চুক্তি হিসাবে, শুধু যার কাগজপত্রগুলো নিয়মানুযায়ী এখনো সম্পন্ন করা হয়নি। আপনি কালই আপনার প্রয়োজনীয় ফাইলপত্র নিয়ে আমাদের অফিসে চলে আসুন। আমি আমাদের হিসাব বিভাগকে প্রস্তুত হয়ে থাকতে বলবো, যাতে কিছুটা সময় লাগলেও এক বৈঠকেই সব নথিপত্র পাকা করে ফেলা যায়।”

আলাপের এক পর্যায়ে রফিকুল্লা নৌবিহারের প্রসঙ্গ তোলে এবং বলে শ্যামল দত্ত তাতে আমন্ত্রিত। সুনির্দিষ্ট সময়ে তাকে তারিখটি জানিয়ে দেওয়া হবে। শ্যামল দত্ত আনন্দের সঙ্গে আমন্ত্রণটি গ্রহণ করেন এবং বলেন তিনি এই আয়োজনের খরচ নির্বাহ করবার জন্য কিছু অর্থের যোগান দিতে চান। ভদ্রতা বশতঃ রফিকুল্লা তাতে সায় না দিলেও তার পীড়াপীড়িতে সে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে যায়। তারপর শ্যামল দত্ত ওঠেন। আমরা হাত মিলাই। রফিকুল্লা তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়, তারপর এসে আমার সামনে বসে। “আপনার সঙ্গে কথা বলবার পর তাকে ফোন করে বলি আপনি এখনই এখানে চলে আসুন,” সে বলে। “তিনি বলেন তিনি এখন বাজারে যাচ্ছেন, বিকেলে আসতে পারবেন। আমি বলি আপনার বাজার রাখুন, এখনই আপনাকে এখানে আসতে হবে এবং আমাদের বিক্রয় প্রতিনিধি আসাদুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাতেই কাজ হয়ে গেল।” 

আমি রফিকুল্লাকে বলি এটি খুবই ভালো কাজ হয়েছে, অনেক পরিশ্রম করলেও আমি শ্যামল দত্তের কাছ থেকে এত দ্রুত কিছু পাবো বলে মনে করিনি, কিন্তু আমি তার সঙ্গে অন্য একটি ব্যাপার নিয়ে আলাপ করতে এসেছি। গতকাল সন্ধ্যার পর কমলাপুর এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল কি না এই প্রশ্ন দিয়ে আমি আলাপটি শুরু করি। “শুধু কমলাপুর কেন,” সে বলে, “বিদ্যুৎ তো সারা শহরেই বা সারা দেশেই কম-বেশি যায় এবং যায় প্রায় প্রতিদিন। কখনো একই দিনে যায় তিন বার। এখন বা একটু পরেই আবার যেতে পারে।” আমি নাছোড়বান্দা। বলি, “আমি শুধু গতকাল রাত আটটার পরের কথা বলছি।” সে বলে, “হ্যাঁ, বিদ্যুৎ গিয়েছে প্রায় দুই ঘন্টার জন্য। তখন আমি ব্যালকনিতে গিয়ে বসি। সেখান থেকে রাস্তাটা দেখা যায়। রাস্তায় কোনো যানবাহন ছিল না। তাতে আমি আশ্চর্য হইনি। আমি জানি শাপলা চত্বরে একটা জনসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে এবং সে জনসমাবেশের প্রভাব পড়বে আশেপাশের পাড়াগুলোতে।” আমরা হঠাৎ করে বিদ্যুৎ নিয়ে কথা বলা শুরু করেছি কেন সে তা জানতে চায়। “নিশ্চয়ই কারণ আছে,” আমি বলি। “বলুন তো দেখি কাল রাতে কমলাপুরে বা মতিঝিল এলাকায় কেউ নিহত হয়েছে কি না।” “এমন কিছু আমি শুনিনি,” সে বলে। “তবে আমি জানি জনসমাবেশে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের হাতাহাতি হয়েছে, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। কয়েকজন আমাকে ফোন করে তা বলেছে। তবে তারা আরো বলেছে সময়মতো পুলিশ হস্তক্ষেপ করায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তা না হলে হয়তো সত্যিই কেউ মারা যেতো।”

আমি আবার বিদ্যুৎ চলে যাবার প্রসঙ্গে ফিরে যাই এবং গত রাতে আরামবাগে যা দেখেছি তার সব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তার কাছে খুলে বলি। সে আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং বিস্ময় প্রকাশ করে। 

“এ তো দেখছি ভয়াবহ ব্যাপার,” সে বলে। “আমি আশ্চর্য হয়ে যাই যে কেউ আমাকে এমন কিছু বলেনি। সকাল থেকে আমি কতজনের সঙ্গে কথা বললাম। আপনার জায়গায় আমি থাকলে আমি হয়তো সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে ফেলতাম। সকালে কেন, এখনো আমি বাসায় ফিরে যাবার কথা চিন্তা করতে পারতাম না। রাস্তায় নামতে আমার ভয় লাগতো। পুলিশ দেখলে সত্যিই আমার খুব ভয় লাগতো।”

আমি তাকে বলি আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে সকাল বেলায় আমি একটি পত্রিকা কিনি, কিন্তু বুঝতে পারি তাদের কাছেও খবরটি পৌঁছেনি। সে তখন উঠে তার টেবিলে যায় এবং সেখান থেকে নেতৃস্থানীয় পাঁচটি দৈনিক পত্রিকা আমার জন্য নিয়ে আসে। 

“দেখেন তো এগুলোতে এ সম্পর্কে কিছু লেখা হয়েছে কি না,” সে বলে। “আমি একটু নেড়ে চেড়ে দেখেছি। আমার চোখে কিছু পড়েনি।” 

বিভিন্ন পত্রিকায় আমি যা দেখতে পাই তাতে আরামবাগের ঘটনার কোনো উল্লেখ থাকে না। তবে সরকারের একজন মন্ত্রীর বক্তব্য থেকে এটুকু জানা যায় যে জনসমাবেশটি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায় সেজন্য পুলিশ এবং অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী খুবই সতর্ক ছিল। জনসামবেশে যোগ দিতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসে হাজার হাজার নেতা-কর্মী। তাদের একটি অংশও যদি নাশকতামূলক কর্মকান্ডে লিপ্ত হতো তাহলে পাল্টে যেতো এই বাণিজ্যিক এলাকার চেহারা। তা ছাড়া এখানে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো গুরুত্বর্পূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান, যা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আরো জানা যায় এক পর্যায়ে মারমুখী পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে ত্বরিৎগতি পুলিশের ধাওয়া খেয়ে সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা মতিঝিল রোডে পড়া বিভিন্ন গলিপথ ধরে পালিয়ে যায়। এসব গলিপথে অভিযান চালিয়ে পুলিশ শখানেক দুষ্কৃতকারীকে আটক করতে পারে। 

পত্রিকাগুলো একপাশে ফেলে সে আমাকে বলে আমি চাইলে দিনের বাকিটা সময় তার সঙ্গে থাকতে পারি, যদি তাতে আমার সাহায্য হয়। তবে সে খুব চায় আমি তাকে আরামবাগে পাটোয়ারী বাড়ির সামনে নিয়ে যাই। বাড়ির জানালাতে যে গুলি লেগেছে সে তা নিজের চোখে দেখতে চায়। 

“আমি এখনই আপনাকে সেখানে নিয়ে যেতে পারি,” আমি বলি। আমার কষ্ট হবে কি না সে জানতে চায়। জবাবে আমি বলি আমার কোনো কষ্ট হবে না। রাতে ভালো ঘুম হয়নি বলে আমি কিছুটা দুর্বল। তবে তা এমন আহা-মরি কিছু নয়। সোফা ছেড়ে সে ওঠে, বলে, “তাহলে চলুন।”

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা