শামসুল আরেফীন
আগের একটা লেখায় আমি চেষ্টা করেছিলাম শেখ মুজিবুর রহমানকে একটা সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে মূল্যায়ন করতে, কিন্তু বিচারের ভাষায় নয় — অর্থাৎ তাকে খারিজ করে দেওয়ার জন্য নয়, বরং তাকে ইতিহাসের একজন জটিল, বহুমাত্রিক চরিত্র হিসেবে বোঝার চেষ্টা করে। সেই চেষ্টাটা আজও বহাল আছে। কিন্তু আজকের দিনটা আরেকটা বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে, যেটা নিয়ে আরেকটু গভীরে যাওয়া দরকার।
আজ পনেরোই আগস্ট। মুজিবের অসংখ্য অনুসারী আজ তাকে স্মরণ করছেন এই কারণেও যে, ঠিক এই দিনেই তাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। এটা কোনো ছোট কথা নয়। একজন মানুষকে তার পরিবারসহ হত্যা করা — সেটা যেই হোন না কেন, যত বড় বিতর্কিত রাজনৈতিক চরিত্রই হোন না কেন — এই ঘটনার মধ্যে একটা অপরিহার্য মানবিক ট্র্যাজেডি আছে, যেটাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। যারা আজ সেই ট্র্যাজেডির স্মরণে দুঃখ প্রকাশ করছেন, তাদের সেই অনুভূতিকে ছোট করে দেখাটা অন্যায্য হবে।
কিন্তু এখানেই একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য টেনে নেওয়া দরকার — মুজিবকে একজন মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধা জানানো, তার নির্মম মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা একটা বিষয়। আর মুজিবকে দিয়ে রাজনীতি বোঝা, মুজিবের নামকে কেন্দ্র করে একটা বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্প — একটা “কাল্ট” বা প্রশ্নাতীত পূজার সংস্কৃতি — তৈরি করা, সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা বিষয়। প্রথমটা মানবিকতা। দ্বিতীয়টা রাজনৈতিক কৌশল। আর এই দুইয়ের মধ্যে যে সীমারেখাটা, সেটা নিয়েই আমাদের সতর্ক হওয়া জরুরি।
শোক আর কাল্টের মধ্যেকার দূরত্ব
একজন মানুষের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা সর্বজনীন একটা মানবিক প্রতিক্রিয়া — এটার জন্য কোনো রাজনৈতিক অবস্থান লাগে না। কিন্তু ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, একটা রাজনৈতিক শক্তি যখন কোনো প্রয়াত নেতার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জাতীয় শোকের একটা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করে, তখন সেই কাঠামোটা ধীরে ধীরে শোক থেকে সরে গিয়ে বৈধতা আদায়ের একটা হাতিয়ারে পরিণত হয়। মৃত্যুর প্রতি শ্রদ্ধা তখন আর শুধু মানবিক থাকে না — সেটা একটা রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়, যেখানে “শ্রদ্ধা জানানো” মানেই দাঁড়ায় একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য দেখানো, আর “প্রশ্ন তোলা” মানেই দাঁড়ায় বেয়াদবি বা বিশ্বাসঘাতকতা।
এটাই মুজিব বন্দনার আসল প্রক্রিয়া। একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে যে কাল্ট তৈরি হয়, সেটা তার মৃত্যুর শোককে পুঁজি করেই শুরু হয়, কিন্তু সেখানেই থেমে থাকে না — সেটা ক্রমশ বিস্তৃত হয়ে একটা গোটা রাজনৈতিক প্রকল্পে পরিণত হয়, যেখানে বর্তমানের প্রতিটা সিদ্ধান্ত, প্রতিটা নীতি, এমনকি প্রতিটা দমন-পীড়নকেও ন্যায্যতা দেওয়া হয় সেই মৃত ব্যক্তির নামে।
বন্দনা যেভাবে অস্ত্র হয়ে ওঠে
গত পনেরো বছরের বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়াটা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। মুজিবের নামে প্রতিষ্ঠিত দল যে সরকার পরিচালনা করেছে, তার শাসনামলে শুধু জুলাই ২০২৪-এই দুই হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে, ত্রিশ হাজারের বেশি আহত হয়েছে। তার আগের বছরগুলোতে গুম, খুন, আয়নাঘরের মতো অন্ধকার প্রতিষ্ঠান, ষাট লাখ মানুষের নামে মামলা-হামলা। ঘরের মধ্যে জঙ্গিবাদের ভয় দেখিয়ে বিরোধী কণ্ঠ দমন করা হয়েছে, বাইরে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের একটা সম্প্রসারিত সংস্করণ হয়ে দেশ পরিচালিত হয়েছে, ব্যাংক খালি হয়ে গেছে, লাখ লাখ টাকা পাচার হয়েছে বিদেশে।
এই পুরো সময়টায় “মুজিব”-এর নামটা কোথায় ব্যবহৃত হয়েছে? প্রতিটা সমালোচনাকে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে” হিসেবে দাগিয়ে দিতে। প্রতিটা বিরোধী কণ্ঠকে রাজাকার বা স্বাধীনতাবিরোধী তকমা দিয়ে চুপ করিয়ে দিতে। একজন প্রতিষ্ঠাতার প্রতি শ্রদ্ধাকে একটা শাসনব্যবস্থার প্রতি আনুগত্যের শর্তে রূপান্তরিত করতে। এটাই বন্দনার আসল কাজ — এটা ইতিহাসকে রক্ষা করে না, এটা বর্তমানের ক্ষমতাকে রক্ষা করে। যে শোক দিয়ে এই কাঠামোর শুরু, সেই শোকই একসময় একটা নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রে পরিণত হয় — আর এখানেই মানবিক শ্রদ্ধা আর রাজনৈতিক বন্দনার মধ্যেকার সীমারেখাটা ঝাপসা হয়ে যায়, ইচ্ছাকৃতভাবে।
জুলাই যা ভেঙে দিয়েছিল
এই দীর্ঘ, প্রশ্নাতীত বন্দনার সংস্কৃতিটা প্রথম বড় ধাক্কা খায় ২০২৪-এর জুলাইয়ে। কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হওয়া একটা ছাত্র আন্দোলন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রূপ নেয় একটা জাতীয় গণজাগরণে। যে সরকার নিজেকে মুজিবের উত্তরাধিকারী দাবি করে প্রতিটা সমালোচনাকে অবৈধ ঘোষণা করত, সেই সরকারই যখন নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাল, তখন বন্দনার মুখোশটা প্রথমবারের মতো খসে পড়ল। পাঁচ আগস্ট পনেরো বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
এই আন্দোলনের গুরুত্ব এখানেই — এটা শুধু একটা সরকারের পতন ঘটায়নি, এটা প্রশ্ন তুলেছিল সেই পুরো রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে, যেখানে একটা নামকে প্রশ্নাতীত রেখে তার আড়ালে যেকোনো অন্যায় জায়েজ করা যেত। জুলাই দেখিয়ে দিয়েছিল যে একটা জাতি চিরকাল একটা মৃত মানুষের নামের ছায়ায় বন্দি থাকতে রাজি নয়।
কাদের সাথে গাদ্দারি করি আমরা
আর এই জায়গা থেকেই আজকের প্রশ্নটা তোলা দরকার। জুলাইয়ের আগে-পরে বাংলাদেশে যত মানুষ প্রাণ দিয়েছে অথবা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়েছে — শাপলা চত্বরের শহীদ, ভারত-বিরোধী আন্দোলনের শহীদ, জুলাইয়ের শহীদ, আয়নাঘরের ভুক্তভোগী — তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে যে দমন-পীড়ন চলেছিল, তার বৈধতা খোঁজা হয়েছিল একটাই নামের আড়ালে। সেই নামটাকে যদি আমরা আজ আবার নিঃশর্তভাবে, প্রশ্নহীনভাবে একটা রাজনৈতিক প্রকল্পের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনি, তাহলে সেটা আসলে কার সাথে গাদ্দারি করা?
এখানে ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো জরুরি — এই প্রশ্ন তোলার অর্থ মুজিবের মানবিক ট্র্যাজেডিকে অস্বীকার করা নয়, তার ঐতিহাসিক অবদানকে মুছে ফেলা নয়। এই প্রশ্ন তোলার অর্থ হলো, একজন মানুষকে তার সম্পূর্ণতায় — সাফল্য, ব্যর্থতা, ট্র্যাজেডি সবকিছু সমেত — বোঝা, আর তাকে একটা রাজনৈতিক দলের প্রশ্নাতীত ঢাল হিসেবে ব্যবহার হতে দেওয়া — এই দুইয়ের মধ্যে সীমারেখা টানা। প্রথমটা ইতিহাসচর্চা আর মানবিক শ্রদ্ধা। দ্বিতীয়টা রাজনৈতিক কৌশল, আর সেই কৌশলের দাম চুকিয়েছে হাজার হাজার মানুষ।
যে প্রশ্নটা সীমানা পেরিয়ে যায়
এই বন্দনার সংস্কৃতির একটা আঞ্চলিক মাত্রাও আছে, যেটা প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। মুজিবের নামে প্রতিষ্ঠিত দল বছরের পর বছর ধরে ভারতীয় রাজনৈতিক স্বার্থের একটা সম্প্রসারিত সংস্করণ হয়ে উঠেছিল — এটা আজ আর ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ভারত কেন এই পরিবর্তনকে সহজে মেনে নিতে পারেনি, কেন একের পর এক প্রোপাগান্ডা চালিয়ে গেছে — এই প্রশ্নগুলোও আসলে একই বন্দনা-রাজনীতির সাথে জড়িত। একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নিজের ভূখণ্ডে আশ্রয় দিয়ে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রাখা — এটা নিছক আশ্রয় নয়, এটা একটা ভূরাজনৈতিক বিনিয়োগ, আর সেই বিনিয়োগের ভিত্তিও একই নাম-নির্ভর বৈধতার রাজনীতি।
তাই যারা এই ভূরাজনীতি বোঝেন না, যাদের চিন্তায় এই জটিলতাগুলো আসে না, তাদের প্রশ্নহীন “বিনম্র শ্রদ্ধা” জানানোর দৃশ্য দেখলে একটা প্রশ্ন এড়ানো যায় না — শ্রদ্ধাটা আসলে কার জন্য, আর কোন রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য?
শেষ কথা নয়, একটা আহ্বান
মুজিব কেমন ছিলেন — এই প্রশ্নের সবচেয়ে ভালো উত্তর দিতে পারবে একাত্তর থেকে পঁচাত্তরের জেনারেশন, যারা সরাসরি সেই সময়টা দেখেছে, শুনেছে মুখে মুখে। আর সৌভাগ্যক্রমে সেই ইতিহাস শুধু মুখে মুখে ঘোরাফেরা করে না — নথিবদ্ধ আছে। আওয়ামী লীগের “মুজিব বন্দনা” যা গিলিয়েছে, আর উল্টো দিকের যারা পুরোপুরি খারিজ করতে চায় তাদের বয়ান — এই দুই মেরুর বাইরেও মুজিবকে বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরের প্রকৃত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ফেলে পড়ার মতো প্রচুর সাহিত্য আছে।
আজকের দিনে তাই দুটো কাজ একসাথে করা সম্ভব, আর সেটাই বোধহয় সবচেয়ে সৎ পথ — তার পরিবারের নির্মম মৃত্যুতে মানবিক শোক প্রকাশ করা, আর একইসাথে সেই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক বন্দনার কাঠামোটাকে প্রশ্ন করা। এই দুটো একে অপরের বিরোধী নয়। বরং দ্বিতীয়টা ছাড়া প্রথমটা অসম্পূর্ণ থেকে যায় — কারণ প্রকৃত শ্রদ্ধা কখনো প্রশ্নহীন হয় না।
তাই আহ্বানটা সহজ — সেই সাহিত্য পড়ুন। ইতিহাসকে ইতিহাস হিসেবে জানুন, আর বন্দনাকে বন্দনা হিসেবে চিনুন। তারপর ঠিক করুন, আজকের দিনে “বিনম্র শ্রদ্ধা” শব্দ দুটো আপনি ঠিক কোন অর্থে, আর কতটা সততার সাথে ব্যবহার করতে পারবেন।
…………
১৫ আগস্ট ২০২৬







