সেলিম রেজা নিউটন
প্রখ্যাত অনুবাদক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, এবং আমার একান্ত বন্ধুভাজন মানুষ, জি এইচ হাবীব একটা প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি লিখেছেন: “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান” স্বৈরশাসক কেন হলেন? ১৯৭১-পূর্ব তাঁর জীবনে কি এই পরিবর্তনের ইংগিত, আলামত আছে? হঠাৎ ক’রে এত বড় পরিবর্তন কিভাবে ঘটতে পারে?”
খুবই ইন্টারেস্টিং প্রশ্ন। এবং এটা অনেকেরই প্রশ্ন বটে। এমনকি অনেকের কাছে এই প্রশ্নের একটা রেডিমেড উত্তরও আছে। উত্তরটা অবশ্য “পার্সন ব্লেইম”-এর দিকে যায়। মানে, “আসলে শেখ মুজিবের স্বভাবই খারাপ” জাতীয় ব্যক্তিগত দোষারোপের দিকে যায়।
কিন্তু ঘটনা হলো, সমাজে ব্যক্তির বিপুল ব্যক্তিগত অটোনমি, তথা স্বাধীনতা, থাকার পরও, বিশেষত রাজনৈতিক ব্যক্তি একটা সামাজিক-রাজনৈতিক সত্তাও বটে। কোনো ব্যক্তির স্বভাব খারাপ— নিছক এইটুকু প্রমাণ করতে পারলেই তাঁর রাজনীতির মুশকিলগুলো উপলব্ধি করা যায় না। তাতে করে কর্তৃত্বপরায়ণ রাজনৈতিক ধারা কীভাবে ব্যক্তি-রাষ্ট্রনায়কের রাজনৈতিক ক্রাইম অথবা অসদাচরণকে সংজ্ঞায়িত করে, সেটা আড়ালে থেকে যায়। কর্তৃত্বপরায়ণ রাজনীতি কীভাবে তাঁকে সর্বাত্মক জুলুমবাজ একজন জার, বাদশা, অথবা ফেরাউনে রূপান্তরিত করে, সেটাও বোঝার বাইরে থেকে যায়। কীভাবে চরম কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা ব্যক্তি-নেতাকে চরমভাবে দূষিত করে, সেটা তখন আর দেখা যায় না। ফ্যাসিবাদ, টোটালিটারানিজম বা অথরিটারিয়ানিজমকে তখন নিছক একজন ‘খারাপ’ ব্যক্তির ব্যক্তিগত দোষ হিসেবে দেখার ভ্রান্তি তৈরী হয়। ফলে, একচেটিয়া স্বৈরতন্ত্রের শেকড় মাটির নিচেই থেকে যায়, চোখে পড়ে না। এর পরিণামে ফ্যাসিবাদী সিস্টেমটাকে স্থায়ীভাবে বিলুপ্ত করার মুক্তিপরায়ণ রাজনীতিও শক্ত পায়ে দাঁড়াতে পারে না। বারবার ফ্যাসিবাদের চক্করে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সুতরাং, আসল প্রশ্নটা খোদ কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার স্বভাবের প্রশ্ন। কর্তৃত্বপরায়ণ রাজনীতির প্রশ্ন। কোনো নেতার ব্যক্তিগত স্বভাবের প্রশ্ন এখানে মুখ্য না।
যেমন দ্যাখেন, “যে যায় লঙ্কায়, সে হয় রাবণ” প্রবাদবাক্যটা কিন্তু নিঃসন্দেহে রাম কর্তৃক রাবণকে পরাজিত করে লঙ্কা-বিজয়ের পরবর্তী কালে জনগণের মনে পুঞ্জীভূত অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা সামাজিক উপলব্ধি। এখানে রামের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য মুখ্য না। বরং এখানে লঙ্কা হলো কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্বপরায়ণ ক্ষমতা। সেখানকার সিংহাসনে, ধরেন, এমনকি স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্র আরোহন করলেও তিনি রাবণে পরিণত হন। সমস্যাটা তাই কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্বপরায়ণ ক্ষমতার।
রামের ব্যক্তিগত সদাচরণ নিয়ে তো প্রশ্নই নাই, এমনকি শেখ মুজিবেরও ব্যক্তিগত আদবের এবং দিলখোলা আচরণের গল্প শোনা যায় বৈকি। লেনিনের সাহিত্যানুরাগ অথবা হিটলারের সংগীত-প্রীতির ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য-কথাও অশ্রুত নয়। কিন্তু ঘটনা হলো, “শত্রুবধ কাব্য” রচনা করতে না পারলে পোয়েট অফ পলিটিক্স অথবা একচেটিয়া রাষ্ট্রনায়ক হওয়া যায় না। ফলে, লেনিনেরও একই দশা হয়েছিল। বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখলের পরে তাঁকে ‘চেকা’ নামক খতরনাক গুপ্তঘাতক-বাহিনী বানাতে হয়েছিল। কয়েক বছর মেয়াদি ‘ওয়ার কমিউনিজম’ করতে হয়েছিল। নিজের দেশের মানুষের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করতে হয়েছিল।
লেনিনের লেনিনবাদের মতোই, শেখ মুজিবের মুজিববাদও আসলে চরম কর্তৃত্বপরায়ণ সমাজতন্ত্রের একটা রূপ। (হিটলারের কর্তৃত্বপরায়ণ “জাতীয় সমাজতন্ত্র” নিয়ে এখন আপাতত কথা তুলব না।) আমার ২০১৫ সালে প্রকাশিত “অচেনা দাগ” বইয়ের “মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট: কর্তৃত্বপরায়ণ সমাজতন্ত্রের প্রচ্ছন্ন রূপকল্প” নামের প্রবন্ধে আমি দেখিয়েছিলাম কীভাবে তৎকালীন স্থানিক-বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদানকারী আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী ধারার তথাকথিত বাম-প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর মাথায় মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পথধারা হিসেবে “কর্তৃত্বপরায়ণ সমাজতন্ত্রের প্রচ্ছন্ন রূপকল্প” ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এই সেই কারণ, শেখ মুজিব বাহাত্তরের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে “সমাজতন্ত্র” যোগ করেছিলেন। এই সেই কারণ, বাহাত্তরের মুজিববাদী সংবিধান দিয়েও আর চলছিল না, পঁচাত্তরের বাকশাল-সংশোধনী কায়েম করে তাকে (সমাজতন্ত্র অভিমুখীন) “দ্বিতীয় বিপ্লব” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন স্বয়ং শেখ মুজিব।
রাশিয়ান প্রেসক্রিপশনে শেখ মুজিব, ন্যাপ এবং সিপিবির এই বাকশালি সমাজতন্ত্র ছিল চরম কর্তৃত্বপরায়ণ সমাজতন্ত্র। লেলিনবাদী এবং মুজিববাদী এই সমাজতন্ত্র আসলে ভিন্নমতহীন সমাজতন্ত্র। স্বাধীনতাহীন সমাজতন্ত্র। বিরোধীদলহীন সমাজতন্ত্র। একদলীয় সমাজতন্ত্র। এইটা আসলে ভুয়া সমাজতন্ত্র। সেই আঠারো শতকের প্রথম ইন্টারন্যাশনাল থেকেই সত্যিকারের মুক্তিপরায়ণ সমাজতন্ত্রীরা বলে আসছেন, “স্বাধীনতাবিহীন সমাজতন্ত্র হচ্ছে দাসত্ব”।
বিপদের কথা হলো, বাংলাদেশে বেশিরভাগ মস্কোপন্থী বাম রাজনৈতিক দল কর্তৃত্বপরায়ণ সমাজতান্ত্রিক দল মাত্র। উপরন্তু ভারত ছিল তখনকার কমিউনিস্ট রাশিয়ার বিরাট মিত্র। এই জন্যই মুজিববাদের প্রতি এঁদের ভালোবাসা গভীরভাবে রাজনৈতিক এবং মতাদর্শগত। সুতরাং, বাংলাদেশে মুজিববাদ মানে শুধু আওয়ামী লীগ নয়, অধিকাংশ বামপন্থাই এই দেশে মুজিববাদী (ওরফে লেলিনবাদী) ঘরানার রুশভারতীয় বামপন্থা।
কর্তৃত্বপরায়ণ মুজিববাদ হচ্ছে কর্তৃত্বপরায়ণ লেনিনবাদের স্থানীয় সংস্করণ। খেয়াল করলে দেখবেন, ১৯১৭ সালের অক্টোবর মাসের আগের লেনিন এবং পরের লেনিন সম্পূর্ণ আলাদা। একইভাবে একাত্তর সালের আগের শেখ মুজিব এবং পরের শেখ মুজিব সম্পূর্ণ আলাদা। ব্যাপারটা নিছক ব্যক্তিগত দোষ অথবা গুণের নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বপরায়ণতার।
[এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পিকিংপন্থী কমিউনিস্ট দলগুলোর ভূমিকা আলাদা ছিল। তাঁরাও কর্তৃত্বপরায়ণ সমাজতন্ত্রেরই অন্যতম রূপ। কিন্তু মাওবাদী হিসেবে তাঁরা ছিলেন রুশবিরোধী কেননা চীন তখন ছিল তীব্রভাবে রুশবিরোধী।]
[QUICK AND SIMPLIFIED NOTES. TO BE ELABORATED AND ORGANIZED LATER.]
রচনা: ১৭ই আগস্ট ২০২৫







