সাজ্জাদ সাঈফ সরকার
দ্রাঘিমালন্ঠন : জুলাইপূর্ব, জুলাইপর্ব ও জুলাই পরবর্তী আশংকা পর্ব
১.
সব গৌরব, সব আত্মদানের গরীমা বুকে নিয়ে তুমি কি রোদের মত সুখী?
খুব সকালে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভাপা পিঠা বিক্রেতার হাঁকডাক, গুড় সঞ্চিত হেমন্ত-চাউল, অন্তত তার মত সুখী? অথচ শাহবাগে দেখো মসনদের ক্যাচালে আজ ফুলঘরগুলার চাইতে বেশি ভিড়, মানুষের, অমানুষের, পশুদের ভিড়;
আমার রাষ্ট্র অসুস্থ। আমি আজ কোনো ভিড়ে যাব না বরং জ্বরপট্টি নিয়ে শিয়রে ঠায় দাঁড়িয়ে র’ব রাষ্ট্রের। কোনো কনসার্ট, ব্যাচ ট্যুর, সমাবেশে যাবই না রে ভাই।
পাঁজরে ধ্যানের শিখাটিও নিভুনিভু নির্বাক। ভিতরে তুমুল প্রজ্জ্বলন, আর সেই ব্যথার প্রজ্জলন পাখায় জ্বালিয়ে নাচে চরের ময়ূর, তুমি কি তার মত সুখী এই রাষ্ট্রে?
২.
কেনো এত রাগ জমা রাখো, রোখ তুলে রাখো জামার বোতামে; মিনজিরি গাছের পাশে এক দফা হাওয়ার হাজিরা নিয়ে এত কি যে লিখে টুকে রাখো বলো তো হৃদয়!
এই ঘরদোর, সম্পর্কের ভোর, মিঠাপানি রোদ বুঝি ভালো লাগছে না আজকাল? দরোজায় অচিন শালিক এতখানি চেনা চাহনী কোথায় পেয়েছে জানো?
আজন্ম উচ্ছন্নে গিয়ে জমে-ঘেমে থাকা পাথর-পাথর চোখে এত নদী বাঁধ দিয়েছো কিসের আশায়?
কেউ গেছে পাহাড়ের দিকে, সেখানে প্রশান্তি পায়;
কেউ কেউ সাগর-পাগল, হাত ছুঁলে ঢেউ শোনা যায়;
তুমি আছো আত্মঘাতী সুদূর যাপনে, বন্দী লাগে তোমার?
প্রজাতন্ত্রে আগুন লেগেছে, চোখ ফেটে নদী আছড়ায়!
৩.
মেঘের উপরে বসে আজ সকাল এসেছে ঘরে।
কাহার ছলনা ঢাকা জোড়া ছাতিমের চারা
বেড়ে ওঠে অল্প চেনা শহীদের কবরের ধারে!
ছলনা হাসির গায়ে রক্তারক্তি ছিটিয়েছে কারা?
মেঘেরা জানে না আজ দিনটি কেমন যাবে;
বিক্ষোভ সবল হয়ে রাজপথে রোদ্দুর ছড়াবে
নাকি, রক্তরাঙ্গা ফুল ফুটে, বুকে হবে আলপনা
কেটে ফেলা মূল থেকে গাছেরা গজাবে ফের, আম্মা?
শাসক ছলনা করে রীতিমতো আস্তাকুঁড়ে যাবে;
শহীদ লিখিত হবে হৃদয়ে বেদিতে রবে, যুগান্তরের কিতাবে!
৪.
দরজায় সরে এসে দাঁড়িয়ে সারাটি রাত
দেখছি আমরা আজ সবুজাভ সূর্যোদয়!
হৃদয় বেঁধেছে দিঘি ঘিরে মনোরম বাঁধ
জিতেছি আমরা ক্ষয়, ক্ষতি-জরা-মৃত্যু-ভয়!
ইটে বাঁধা লাল স্মৃতিছোঁয়া গেঁয়ো রাস্তাঘাট
বাগান পেরিয়ে দুর্বা ঝরা সুদূরের মাঠ!
বাংলাদেশের আকাশ কেবলই জনতার;
পালিয়ে গিয়েছে সব নদীর দখলদার!
বাংলাদেশের ছেলেরা জেগে আছে দেশপ্রেমে;
কথায় নয়তো কাজে অবশ্যই বড় তারা!
বাংলাদেশের মায়েরা সবকিছু ভালো জানে;
বিপ্লবীদের পতন চাচ্ছে তারা আসলেই কারা?
সুযোগ পাবে না আর স্বৈরাচার
সাম্প্রদায়িক আঘাত সরে যাবে
বাংলাদেশের বিজয় এইবার
সবার বিজয় সব কিছু বদলাবে!
–
৫.
মিথের নদীতে নেমে, মেঘের ধারালো ঘাই
অনিবার্য ছিপে বধ করে পাহাড়ে চড়াই;
লিখে রাখি চরাচর, গ্রহের বরাত
সীমান্তে জেগেছে ভোর, লড়াকু আয়াত!
পথের দু’ধার ঘেঁষে থাকে
বিপথ অনেক;
হাসির পালক গায়ে রাখে
অশেষ ক্রন্দন;
রাজার প্রাসাদ ঘেরা
সেফটি বুলেট
জনতার অধিকারে বিধে
যদি চালায় দমন
ঢাকার বাতাসে জাগে
শহীদ রফিক;
মিথের তুরাগ টানে
গেরিলা অতীত!
কি করে বাংলাকে তুমি করবে ঘায়েল;
অথবা সীমান্তে রাজ করবে ভারত?
মানুষ দেগেছে বুকে দেশপ্রেমের ফুয়েল!
পতাকা ভাসাবে লাল, ঘিরে সবুজ শপথ!
৬.
তোমাকে মনের মধ্যে জাগ্রত যত পিশাচের মুখ মুছতে হয়, যত নদীর কাঞ্চন আঁকা ফুল ফোটাতে হয় অবেলায়, আর যত বেশি আফসোস গিলে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে হয় যেন আস্ত এক নাগরিক বর্ম তুমি, নিজের মনের মধ্যে ততখানি একাই একটা সড়ক তুমি, রাত হলে কাছের জঙ্গল ফেলে এদিকে তাকায় হন্যে শেয়াল, শীতে পাওয়া গাছের মত থমথমে একটা আবেগ নিয়ে আকাশ মাতম করে বুকে আর ঠিক ততটাই প্রিয় মানুষের ভুল বোঝাবুঝির ধারে নিমগাছ একা, যতখানি একা হলে প্রাচীন নগরী জেগে ওঠে বোধের ভিতর, জুম করে দেখি তোমার হৃদয়, রাঢ়বঙ্গ, লুকানো অসুখ; দিঘিতে পেঁচিয়ে নামা একটি ডাল স্পর্শ করছে পানি, অনন্ত অপেক্ষা তাক করে আছে শিকারী বক নিজ ভাষ্যে, শুধু কবিতাই যেন প্রকৃতির ধ্বনি ও প্রবৃত্তির কথা শুনবার ধৈর্যে অটল, মহিমপ্রাণ;
যেন গাঙ বেয়ে আসে খুরধ্বনি, করতালি, পানাম নগরী ধেয়ে, যেন অন্তেষ্টিক্রিয়া সেরে এসে ফ্যাসিবিরোধী মিছিলে নিহত কন্যার ছবিতে হাত বুলাচ্ছে কেউ; ফ্যাসিস্ট পতনের সেই ফুলচন্দন দৃশ্যের পর কেন এখানে মবের তাড়া আজ, প্রশ্নবিদ্ধ এক সংবিধান নিয়ে উসখুস করে বাংলার ফুসফুস?
কবিতা এখন মৌলিক অধিকার, গেরিলার পাইপগান যাকে ভুলে গেছি আমরা, আজ ভুলে যাব মিসাইল এটাক গতকালকের; রক্তবর্ণ গাজার অদূরে জলপাইঘন গল্পে ঘুমায় প্রাচীন ফিলিস্তিন, অন্তর জুড়ে তার আকসা-মিনার!
৭.
স্বপ্নের ভিতর হতে কেউ আঁকছে চলনবিল, কেউ হাঁটা ভুলে অনেককাল দাঁড়িয়ে থাকছে গানে, এভাবে নিবিড়তা ভর করে। শক্তি ফুরিয়ে নামা সূর্যাস্তকে লাগে কবরী ফুলের সই, সারাদেশে আনাচেকানাচে ঘাম ছুটছে বাজারফেরত মানুষের, কেউ জীবনকে গালি দিয়ে দিনমজুর।
এই ধানী গ্রাম, বইপুস্তক, ভোজ্য তেলের রাগ নিয়ে তুমি আর কথাই বলো না আজ, কাব্যি করে বইমেলা ঘুরে এসো আর সেলফি ফোটাও ফোনে, একটা রোদের শেষে আরেকটা রোদেলা ক্যু জড়ো হচ্ছে ইতিহাসে, ধূলার পর ধূসরতা, জ্বরের পর গা ঝিমঝিম নিয়ে ভালোই আছে দেশ, তুমি আর রক্ত হয়ে গদ্য হয়ে স্বরলিপি হয়ে বেতার কেন্দ্র হয়ে নিঃস্ব করো না তোমার সুশীল হৃদয়টাকে। তোমার পায়তারা শেষে যথারীতি এই দেশে যে জুলাই বিপ্লবে আহত যুবক ক্রমে রিকশা চালাবে না, হাড়ের বারান্দায় শহীদ-মাতারা ফুটিয়ে রাখবে না কর্কটফুল, নিশ্চয়তা কই? তুমি চুপ থাকো বদমাশ!
৮.
ঝিলভর্তি হাবুডুবু শামুক হাঁটার দৃশ্যে শাপলা পাতার শীতনিদ্রা লক্ষ্য করে মৃদু হাসে কোনো পড়ুয়া যুবক; নৌভ্রমণের রচনা লিখে শিশুমনে ওঠানামা করে বইঠা বাওয়া হাত।
বইয়ের পাতায় আঁকানো বটবৃক্ষ, বয়েসী গাছেরা ছায়াময় শুয়ে আছে বোর্ডের বাজার ঘিরে। দূর হতে, সূদুর অতীত হতে, কি যে ইশারা পাঠায় অনন্ত জোনাই পোকা, মানব জনম একা!
এইখানে স্বপ্ন ছিল, নীড় বাঁধা প্রেম ছিল মানুষের। সেখানে এখনো দায়ে কাটা ক্ষতের মতন রাজ করে দ্রব্যমূল্য, প্রকাশ্য খুন-খারাবি। সত্যকে নিরাশ দেখায়। ডানা থামিয়ে নিশ্চল বলাকা নামে বিশ্বাসভঙ্গের মাটিতে। মাঝেমাঝে নশ্বরতা। সব কথা পরিহাস লাগে; সব চোখ মেঘের শিকার।
সমাজ পেরিয়ে এসে, বাজার পেরিয়ে এসে, ঘন কুয়াশার দিকে হেঁটে চলে যায় হতাহত পায়ের ম্যাজিক দূরে। কোনদিকে যাবে তুমি?
৯.
গল্পের ভিতর ঢুকে প্রায়শ্চিত্ত কি-রকম হাই তোলে, আরো আসে আসহাবে কাহাফ, আবাবিল আর চক্রাকারে ওড়া জুল ভার্নের স্বপ্ন!
এ-রকম অজস্র ঘূর্ণীমেঘের তাড়া, আমাদের ইতিহাস ঘিরে প্রাঞ্জল; একেক পথে কত না রক্তপাত! জলদস্যুর কাছে লুট যাওয়া জোছনা-শতাব্দী, পানিপথ বেয়ে আসে পলাশীর প্রান্তরে! যেন শালবন আঁকে ভয়াল যামিনী, ভূতগ্রস্ত রক্তকরবী- আমাদের ঘুমকাতর চোখ ভুলে গেছে উঠানসকাল, চারিদিকে দেয়ালের আস্তর, কল্পিত সবুজে মাখা! সব পথে প্রবৃত্তির পানশালা মনে ও মন্থনে! আর বিপ্লব এখানে সুশীল রাজনীতির খপ্পরে পড়ে কড়কড়ে টাকার ব্যপার যে হবে না তুমি কি সিওর বাংলাদেশ?
তবু দেখবে মানুষই ভুলে যাবে মানুষের আহাজারি; সংঘবদ্ধ হাত, প্রখর মিছিল সব; যেমন ফিলিস্তিন, যেমন হুতির পাল্টা মিসাইল, ভুলে যাবে মুসলিম!
১০.
আমরা স্বপ্নকে নিয়ে বিপদেই আছি, তাকে ডান হাতে নিব নাকি বামে, কলিজায় নাকি হৃদয়ে, স্নায়ুকক্ষে নাকি খুলিতে নিব? বিপদ ঘনিয়ে আসে, পাখিরা গণবিলুপ্তির আগে আগে দলছুট হয় প্রাণের ভয়ে; যে কোনো মব জাস্টিস, যে কোনো মৃত্যুকে বিপর্যয় লাগে, তারকাপুঞ্জ ফিসফিস করে আশংকায়।
এত শত গ্রাম ঝলমলে ড্রেস পরে নগরীর খ্যাতি পেলো আমাদের স্বপ্ন দেখা ফুরালো না। নদীর উজান লক্ষ্য করে কত ক্লেশ গায়ে নিয়ে যে হারিয়ে গিয়েছে স্বপ্ন পূর্ণ হবার গল্প তা শুধু ইতিপূর্বে শ্রেণীসাম্যের নামে, বিপ্লবের নামে, পরিবর্তনের নামে ধোকা খাওয়া গণমানুষ জানেন, চা-শ্রমিকেরা জানেন, শহীদ-মাতারা জানেন!







