রবি হাসান
জয়া আহসান মুজিবকে খুব নরমভাবে স্মরণ করেন। লিখেন, “বিনম্র শ্রদ্ধা”। চঞ্চল চৌধুরী করেন। পরিমণি-নাজিফা তুষিরাও বিনম্র স্মরণ করেন। স্যাটায়ারের নামে সবাইকে ধুয়ে দেওয়া eআরকিও মুজিবের বেলায় এসে লেখে—“শ্রদ্ধায়, বেদনায়, অগাধ ভালোবাসায়—মহানায়ক বঙ্গবন্ধু।”
সমস্যা এইসব শ্রদ্ধা করায় না। একজন নিহত রাজনৈতিক নেতাকে যে কেউ শ্রদ্ধা করতেই পারেন।
সমস্যা হচ্ছে—এই শ্রদ্ধার সঙ্গে মুজিবের ইতিহাসটা থাকে না। বরং সেই ইতিহাস মুছে দেওয়ার চেষ্টা থাকে।
আওমি লীগ আর তথাকথিত সেক্যুলার-বালচাড়াল সুশীল সমাজের একটা কমন জায়গা আছে। এরা নিজেদের নেতা-নেত্রীকে এমন এক পবিত্র জায়গায় তুলে রাখে, যেখানে তার রাজনৈতিক অপরাধের আলোচনা প্রায় ধর্মদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়ে।
হাসিনার সময়ও আমরা শুনেছি—হাসিনা খারাপ না, আশপাশের লোক খারাপ।
মুজিবের বেলায়ও একই—মুজিব মহান, কিন্তু সময়টা খারাপ ছিল; লোকজন খারাপ ছিল; পরিস্থিতি খারাপ ছিল।
শুধু নেতা কখনো খারাপ ছিলেন না!
বাংলাদেশের সেক্যুলার-লিবারেলদের একটা বড় অংশ মুজিবকে একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখে না। তারা মুজিবকে বাংলাদেশের প্রতীক হিসেবে দেখে।
একাত্তর, স্বাধীনতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সংস্কৃতি, ধর্মনিরপেক্ষতা—সবকিছুকে বছরের পর বছর এমনভাবে মুজিবের সঙ্গে প্যাকেজ করা হয়েছে যে, মুজিবকে প্রশ্ন করলেই তাদের মনে হয় আপনি পুরো প্যাকেজটাকেই প্রশ্ন করছেন।
ফলে বাংলাদেশে খুব সফলভাবে একটা বাইনারি বানানো গেছে—
মুজিব মানলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ।
মুজিবকে প্রশ্ন করলে পাকিস্তানের পক্ষ।
এই একটা বাইনারি দিয়ে ইতিহাসের বারোটা বাজানো হয়েছে!
কারণ তখন আর প্রশ্ন করতে হয় না—স্বাধীনতার পর ক্ষমতা কে এত কেন্দ্রীভূত করল? বিরোধী রাজনীতি কে কীভাবে দমন করল? রক্ষীবাহিনী নিয়ে এত অভিযোগ কেন? ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দায় কার? এবং শেষ পর্যন্ত কেন বহুদলীয় ব্যবস্থা সরিয়ে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করতে হলো? বাকশাল যে একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছিল, সেটি বিতর্কের বিষয়ও না তাদের কাছে।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যারা নিজেদের সবচেয়ে বেশি লিবারেল বলেন, ব্যক্তিস্বাধীনতা আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলেন—নিজের পছন্দের নেতার কাছে এসেই তাদের লিবারেলিজমের দম ফুরায় যায়।
তারা গণতন্ত্র চান, কিন্তু নিজেদের স্বৈরাচারী নেতার ইতিহাসটা শুনতে চান না।
এর পেছনে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনেরও বিশাল ভূমিকা আছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪—টানা প্রায় ষোলো বছর রাষ্ট্র, পাঠ্যবই, সরকারি প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক পরিসরে মুজিবকে এতটাই সর্বব্যাপী করা হয়েছিল যে রাজনৈতিক নেতা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় পবিত্র প্রতীকে পরিণত হন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণেও এই নির্মাণকে “cult of personality” বা ব্যক্তিপূজার রাজনীতি হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে।
ফলে অনেকের কাছে মুজিবকে ডিফেন্ড করা মানে আসলে নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ডিফেন্ড করা।
তাদের ভয়—মুজিব দুর্বল হলে সেক্যুলার বাংলাদেশ দুর্বল হবে।
কারণ পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার বিপরীতে ভাষা, সংস্কৃতি ও বাঙালি পরিচয়ের রাজনীতিতে মুজিব সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। আর বাংলাদেশি সেক্যুলারিজমের একটা অংশের সমস্যা হচ্ছে—ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তাদের কঠোরতা প্রায়ই ইসলামকে ঘিরে যতটা দেখা যায়, অন্য ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্রে ততটা দেখা যায় না।
এই জায়গাতেই ইতিহাসের সবচেয়ে মজার আয়রনি।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ডিএনএ খুঁজতে গেলে আমরা পৌঁছে যাই মুসলিম লীগেই। ১৯৪৯ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগ তৈরি হয়েছিল মূলত বঙ্গীয় মুসলিম লীগেরই একটি ভিন্নমতাবলম্বী অংশ থেকে। শেখ মুজিব নিজেও ১৯৪৩ সাল থেকে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম কাউন্সিল-এর সদস্য ছিলেন। পরে ১৯৫৫ সালে দলটির নাম থেকে “মুসলিম” বাদ যায়।
অর্থাৎ ইতিহাসটা “মুসলিম লীগ বনাম আওয়ামী লীগ”—এরকম সোজা না।
আর আজকের ভারতকে দেখুন। যেই শঙ্কায় ১৯০৬ সালে ঢাকায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ তৈরি হয়েছিল, তা আজ আমাদের সবার চোখের সামনে। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির অধীনে মুসলিমসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, বিদ্বেষমূলক রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় চাপ তৈরিতে ইন্ডিয়া এখন ইসরাইলের মতোই কট্টর। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখন নিয়মিত উদ্বেগ জানাচ্ছে।
তবু আমাদের অনেক সেক্যুলারের চোখে ইসলামপন্থা দেখলেই বিপদ, কিন্তু হিন্দুত্ববাদী ভারতের রাষ্ট্রীয় আধিপত্যের প্রশ্নে সেই বিপদবোধ আশ্চর্যজনকভাবে দুর্বল।
তারা ধর্মের বিপক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে আরেকটা ধর্মই বানিয়েছেন। সেই ধর্মের নাম আওমি লীগ।
এক খোদার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে আরেক খোদা বানিয়েছেন। সেই খোদার নাম মুজিব।
ফলে তারা রাজনীতি করেন না, ধর্ম চর্চা করেন।
এই কারণেই তারা মুজিব নিয়ে বড় বড় কথা বলবে। কিন্তু তাদের যখন জিজ্ঞেস করা হয় রাজনীতি করেন কি না, তখন মিষ্টি হেসে বলেন, “আমি রাজনীতি করি না।”
তারা সত্যি কথাই বলেন। তারা রাজনীতি করেন না, তারা ধর্ম চর্চা করেন।
তাই ১৫ আগস্ট জয়া থেকে eআরকি সব অরাজনৈতিকদের আমরা নরম নরম শ্রদ্ধা দিতে দেখি।







