মুসা আল হাফিজ
মা প্রায়ই বলতেন, “বাবা, সন্ধ্যার পর গ্রামের পথকে হালকা করে দেখিস না। দিনের পথ আর রাতের পথ এক জিনিস নয়।”
কথাটা শুনে মুখ লুকিয়ে হাসতাম । তখন আমার বয়স অল্প। মনে হতো, পথের আবার দিন-রাত কী! পথ তো পথই। মানুষ যদি সাহস করে হাঁটতে পারে, তবে পৃথিবীর কোনো রাস্তা তাকে আটকে রাখতে পারে না।
কিন্তু ২০০১ সালের এক বর্ষার রাত আমার সেই ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দিলো।
সেদিন গিয়েছিলাম সিলেট শহরে। ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। তারপর ঘন রাত।
পশ্চিম আকাশে বিকাল থেকেই জমায়েত হচ্ছিলো কালোমেঘ। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। দোকানের বারান্দায় লোকজন দাঁড়িয়ে। তাদের চোখ বলছে, আজ ঝড় হবে।
মনের ভেতর কেউ যেন বলছিলো, শহরে থেকে যা। রাস্তার হালত ভালো নয়।
আমি হেসে বলেছিলাম, চেনা- জানা পথ! কিচ্ছু হবে না।
বৃষ্টি ও বদমেজাজ হাওয়ার সাথে কথা বলতে বলতে শহর থেকে লামাকাজি এলাম। অনেক রাত। এখানে নেই কোনো গাড়ী।
কী আর করা! পায়ে পায়ে যেতে হবে। সড়কটা সুরমা নদীর পার দিয়ে রেলপথ মাড়িয়ে হাওরের সিনায় ঢুকে গেছে। যখন রেলপথ পার হলাম, পৃথিবী যেন আচানক বদলে গেল।
দুপাশে যতদূর চোখ যায়, সেরেফ পানি। বর্ষার হাওর। স্থির নয়, উত্তালও নয়। বাতাসের আঙুলের স্পর্শে তার বুকজুড়ে জন্ম নিচ্ছে অসংখ্য ক্ষুদ্র ঢেউ। দূরের আকাশ আর পানির রং একাকার হয়ে এক ধাঁধাময় দুনিয়া তৈরী করেছে।
এরই মধ্যে ঝড় নেমে এল।
প্রথমে রাগী বাতাস। তারপর বৃষ্টি। সুরমা নদীর বুক থেকে যেন একদল উন্মত্ত ঘোড়া ছুটে এলো। বাতাস যেন আমাকে রাস্তা থেকে ঠেলে হাওরের পানিতে ফেলে দিতে চায়। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা বাঁকানো ফলার মতো একগুয়ে।
রাস্তাটা কাদায় পিচ্ছিল। একেকবার পা ফেলি, স্যান্ডেল আঁকড়ে ধরে কাঁদা। শেষে স্যান্ডেল খুলে হাতে নিলাম। খালি পায়ে ভেজা মাটির স্পর্শে কেমন শীতল একটা অনুভূতি হচ্ছিল। কিন্তু সেই শীতলতার গভীরে ধীরে ধীরে জমছিল আজব এক ডর। যার কোনো নাম নেই, চেনা চেহারা নেই।
চারপাশে আদিম নির্জনতা। যেন পৃথিবীতে আর কোনো মানুষ নেই। না কোনো গরুর গাড়ি, না কোনো সাইকেল, না কোনো পথচারী। শুধু আমি, ঝড়, আর হাওর।
বিদ্যুৎ চমকালে দূরের নারকোল গাছগুলো বলতো, আমরা আছি! তাদের দেখলে মনে হতো, বিশাল দেহের কেউ মাথা নাড়ছে। বাঁশঝাড়গুলো ঝড়ে এমনভাবে দুলছিল, যেন অন্ধকারে তারা পরস্পরের সঙ্গে গোপন সল্লা করছে। কোথাও কোনো বক হঠাৎ ডানা ঝাপটালে বুক ধড়ফড় করতো। যখন বুঝতাম, ও তো পাখি,তখনও ভয়টা কমত না।
অন্ধকারেরও যে একটি শব্দ আছে, সেদিন পয়লা শুনেছিলাম। ঝড়ের গর্জনের ফাঁকে ফাঁকে সেই শব্দ ভেসে আসছিল। মনে হচ্ছিল, হাওরের বুকজুড়ে কেউ যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।
এওলারপাড়ে বিরাট বটগাছটির পাশে এলাম ।
এখানে এসে মনে হলো, শুধু আমি হাঁটছি না। আরও একটি পদশব্দ আমার সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে চলেছে।
প্রথমে গুরুত্ব দিলাম না। ভাবলাম, ভেজা রাস্তায় আমার নিজের পায়ের শব্দই নিজের কানে ফিরে আসছে।
কিন্তু কয়েক মিনিট পর হঠাৎ যেন জমে গেলাম।
আমার পা থেমে গেল।
কারো চলার স্পষ্ট আওয়াজ।
ধীরে ধীরে পেছনে তাকালাম।
সামনে শুধু ঝড়।
পেছনে শুধু অন্ধকার।
পেছনে আর তাকাইনি।
যত জোরে পারি দৌড়াতে লাগলাম।
বৃষ্টি তখন আরও বেশামাল। কাদায় পা পিছলে যাচ্ছে। কখনো সামলে নিচ্ছি, কখনো হোঁচট খাচ্ছি। রাস্তার ওপর জমে থাকা পানি ছিটকে গিয়ে আবার চোখ-মুখ ভিজিয়ে দিচ্ছে।
কিন্তু পেছনের শব্দটা থামছে না।
সে-ও দৌড়াচ্ছে।
আমার মতোই।
মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, একেবারে ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছে।
হঠাৎ সাহস করে আরেকবার পেছনে তাকালাম।
বিদ্যুতের আলো ঠিক তখনই ছড়িয়ে পড়েছে আসমানে।
দেখলাম, লোকটা সত্যিই আমার পেছনে ছুটছে।
চুলগুলো এলোমেলো।
মুখে কাদা।
শরীর ভিজে একাকার।
কিন্তু তার চোখে এমন এক অদ্ভুত উন্মাদনা, যা কোনো ভাষায় বোঝানো যায় না। সে দৌড়াতে দৌড়াতে কখনো হাসছে, কখনো কীসব অস্পষ্ট কথা বলছে। মনে হচ্ছিল, সে আমাকে দেখছে ঠিকই, কিন্তু চিনছে না।
সেই মুহূর্তে আমার ভয়ের চরিত্র বদলে গেলো।
কারণ বুঝলাম, সে কোনো ভূত নয়, একজন পাগল।
ভূতের চেয়ে উন্মত্ত মানুষকে বোঝা মুশকিল।
সে কী করবে, তা সে নিজেও জানে না।
আমি আবার দৌড় শুরু করলাম।
বুকটা কাঁপছে।
শ্বাস যেন গলার কাছে আটকে আছে।
মনে হচ্ছিল, আর এক পা-ও এগুতে পারব না।
ঠিক তখনই পা পিছলে গেলো। এমনভাবে পড়ে গেলাম যে, কয়েক হাত গড়িয়ে গেলাম কাদার ভেতর। হাতের তালু কেটে রক্ত বেরুচ্ছে। কনুইয়ে চামড়া উঠে গেছে । উঠে দাঁড়াতে গিয়ে দেখলাম, পা রাজি হচ্ছে না।
পেছন থেকে ধাওয়া করছে সেই হাসি।
পাগলটি এবার আরো কাছে।
আমি আর দৌড়ালাম না।
হাঁটু গেড়ে বসে রইলাম। আয়াতুল কুরসি তেলাওত করছি আর মনে মনে বলছি–
হে আল্লাহ, তুমি ছাড়া আজ আমাকে আর কেউ বাঁচাতে পারবে না।
ঠিক তখনই ঘটলো ঘটনাটি। দূরে একটা ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠল।
প্রথমে মনে হলো, বিদ্যুতের ঝলকানি।
কিন্তু না।
ঝড়ের মধ্যে সেই আলো অদ্ভুত স্থির। বাতাসে দুলছে, কিন্তু নিভছে না।
আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম।
আলোর পেছনে একজন বৃদ্ধ।
সাদা দাড়ি।
মাথায় সফেদ ভেজা গামছা।
হাতে হারিকেন।
তিনি এমনভাবে হাঁটছেন, যেন ঝড়-বৃষ্টি তাঁর কাছে নতুন কিছু নয়।
মুরুব্বির পায়ে কোনো তাড়া নেই।
যেন তিনি জানেন, আমি এখানেই আছি।
আমার কাছে এসে তিনি থামলেন।
হারিকেনটা একটু উঁচু করে আমার মুখের দিকে তাকালেন।
চোখ দুটো শান্ত।
অদ্ভুত শান্ত।
তিনি শুধু বললেন,
— এত রাতে একা?
আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম,
— “একজন পাগল… অনেকক্ষণ ধরে আমার পিছু নিয়েছে।”
বৃদ্ধ পেছনে তাকালেন।
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন,
— “চলো। আল্লাহর নাম নিতে নিতে হাঁটো। পেছনে তাকিয়ো না।”
কথাগুলো তিনি এমন নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বললেন যে, আমার বুকের অর্ধেক পাথর যেন তখনই নেমে গেল।
হারিকেনের হলুদ আলোয় রাস্তার কাদা, জমে থাকা পানি আর বৃষ্টির রেখাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, এই সামান্য আলোটুকুই পুরো পৃথিবীর অন্ধকারকে ঠেকিয়ে রেখেছে।
পাগলের ঠা ঠা হাসির সুর ধীরে ধীরে দূরবর্তী মনে হচ্ছে। পাগলটি তবে দিক পরিবর্তন করেছে! তাড়া করছে নিজের কল্পনা বা বাস্তবের অন্য কোনো অস্তিত্বকে! আমি তার কাছে কী ছিলাম; বাস্তব না কল্পনা?
আমি বৃদ্ধের পিছু পিছু হাঁটছি।
তিনি যেন আমার কত আপন! কখনো বলছেন,
— ধীরে চলো।
কখনো বলছেন,
— এখানে রাস্তাটা ভাঙা।
আবার কোথাও বলছেন,
— ডান দিক দিয়ে এসো।
অবাক হচ্ছিলাম।
এই অন্ধকারে তিনি কীভাবে সবকিছু এত নিখুঁতভাবে চিনছেন?
একবার সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম,
:চাচা, আপনি কোথায় থাকেন?
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
:পথের মানুষ পথেই থাকে, বাছা।
আমি আর কোনো সওয়াল করিনি তাঁকে।
আমরা পাশাপাশি হাঁটছিলাম।
ঠিক পাশাপাশি নয়, আমি তাঁর কয়েক কদম পেছনে।
হারিকেনের হলুদ আলোটুকু আমাদের দুজনের চোখে জ্বলছিলো। না, সে আলো ছিলো আমার দিশারী। বৃদ্ধের আলো ছিলো তার নিজস্ব ভুবনে। যেন হারিকেন ছাড়াই তিনি দেখছিলেন।
অন্ধকার তখনো রাজত্ব করছে সদর্পে। চারধারে এমন আন্ধার, যেখানে হাত বাড়ালে নিজের আঙুলও দেখা যায় না।
ঝড় তখনও ছিল, বৃষ্টিও ছিল, কিন্তু ভয়টা যেন পালিয়ে গেছে ।
আমি বৃদ্ধকে জানতে উদগ্রীব। কিন্তু তিনি খুব কম কথা বলছেন।
শুধু একবার বললেন,
— রাতের পথকে কখনো তুচ্ছ মনে করো না। আর পথে বের হলে আল্লাহকে সঙ্গে নিয়েই বের হবে।
কথাগুলো তিনি কি নসিহতের ভঙ্গিতে বলেছিলেন? না। তিনি যেন নিজের জীবন থেকেই অভিজ্ঞতার খোলাসা শুনাচ্ছিলেন।
সামনে খেউয়ারপারের বিপজ্জনক পুল। বৃদ্ধের পা অনুসরণ করে পার হয়ে গেলাম। এই সেতু পারাপার কখনো আমার কাছে সহজ ছিলো না।
এরপর কিছু দূর হেঁটে মাখরগাঁও। বন্দরবাড়ীর কুপির আলো দেখা গেল। আমার বুক হালকা হয়ে এল। এতক্ষণে মনে হলো, আজ রাতে জান হাতে নিয়ে পথ চলার শেষ কিনারে এসেছি ।
হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের ভেতরে দাখিল হলাম।
বললাম,
— জনাব, এবার তো এসেই গেলাম। আপনার নামটা অন্তত বলুন।
কোনো উত্তর এল না।
আমি তাঁর একেবারে কাছে গিয়ে দাঁড়াতে চাইলাম।
আশপাশে কোথাও শেয়ালের হুক্কাহুয়া শোনা গেলো। আমি একটু সেদিকে মনোযোগী হলাম।
তারপর যখন সামনে নজর দিলাম, বৃদ্ধ নেই।
সামনে কেউ নেই।
হারিকেনের আলোও নেই।
আমি থমকে দাঁড়ালাম।
যে মানুষটিকে এতক্ষণ ধরে অনুসরণ করেছি, তিনি যেন বাতাসের ভেতর মিশে গেছেন।
চারদিকে তাকালাম।
মুহূর্তের মধ্যে কীভাবে মানুষ চোখের আড়াল হতে পারে?
আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।
তারপর প্রায় দৌড়ে বাড়ি পৌঁছালাম।
মা ঘুমাননি সেই রাতে। কখনো ঘরে, কখনো বাইরে পায়চারি করছেন। যেই মাত্র উঠানে পা রেখেছি, মা বললেন, হায় আল্লাহ! তোমার শুকরিয়া, তাকে এনে দিয়েছো।
রাতের ঘড়ি তখন দুইটা পেরিয়ে অনেক দূরে।
আমি সেদিন কাউকে ঘটনাটি বলিনি।
পরদিন থেকে খোঁজ করলাম সেই বৃদ্ধকে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে সুযোগ পেলেই সওয়াল করেছি— এমন একজন বৃদ্ধকে কেউ চেনে কি না।
কেউ চিনল না।
বছর কেটে গেল।
ঘটনাটা ধীরে ধীরে স্মৃতি হয়ে গেল। তবে আমার মাথায় থেকে গেলো লোকটার হাঁটার ভঙ্গি। মাথা সামান্য নত। ডান হাতে হারিকেন। ধীর, নিশ্চিন্ত পদক্ষেপ। আর সেই শান্ত কণ্ঠস্বর।
অনেক বছর পরে গ্রামের এক প্রবীণের কাছে ঘটনাটি বলছিলাম। আমি শুধু বৃদ্ধের চেহারা, হাঁটার ভঙ্গি আর কথা বলার ধরন বর্ণনা করেছিলাম।
তিনি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর তিনি বললেন, তোমার বিবরণ শুনে মনে পড়ছে একজনের কথা। গ্রামের মানুষ পুরনো সেই বুজুর্গের কথা জানত, যিনি গভীর রাতে পথহারা মানুষকে পথ দেখাতেন। তাঁর নাম ছিল কালা হাজি। তার কত আজিব ঘটনার খুশবু এখনো স্থানীয় বাতাসে ! তিনি বহু আগেই ইন্তেকাল করেছেন।”
আজও জানি না, সেই ঝড়ের রাতে আমার পথপ্রদর্শক কে ছিলেন।
হয়তো কোনো অচেনা মানুষ, যাঁকে আর কখনো খুঁজে পাইনি।
হয়তো আল্লাহর এমন এক সাহায্য, যার ব্যাখ্যা মানুষের জ্ঞানের সীমার বাইরে।
তবে একটি বিষয় আমি নিশ্চিত জানি—
২০০১ সালের সেই ঝড়ের রাতে, আমি একা ছিলাম না।
আর আজও জীবনের গভীর রাতে মুসিবতের বুক থেকে যখন তুফানী হাওয়া উঠে আসে, আমার কানে ভেসে আসে সেই শান্ত কণ্ঠ—
“চলো বাছা, … আল্লাহর নাম নিতে নিতে হাঁটো।”
লামাকাজির পথ দেখেছে সেই রাতের লড়াই। তবে সে যা দেখেনি,তা হলো, নিজের ভেতরের কোন অচেনা রাত্রি পাড়ি দিয়ে আমি কোথায় ফিরছিলাম!







