প্রচ্ছদবই নিয়েশুদ্ধতার স্বপ্ন ও প্রতিবাদের সৌরভ

লিখেছেন : সুমন রায়হান

শুদ্ধতার স্বপ্ন ও প্রতিবাদের সৌরভ

সুমন রায়হান

বাংলা কবিতার দীর্ঘ অভিযাত্রায় কবিরা কখনো সৌন্দর্যের সন্ধানী, কখনো প্রেমের কথক, কখনো দ্রোহের সৈনিক, আবার কখনো মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধির পথপ্রদর্শক। কবি জানে আলমের ‘আমরাই ফজরের সুরভিত গোলাপ’ কাব্যগ্রন্থে এই প্রবণতাগুলোর এক আন্তরিক সমন্বয় লক্ষ করা যায়। তাঁর কবিতায় ধর্মীয় ও আত্মিক বিশ্বাস যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সমকালীন সমাজবাস্তবতা, দেশপ্রেম, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, দাম্পত্য মমতা এবং মানুষের নৈতিক জাগরণের আকাঙ্ক্ষাও সমানভাবে উপস্থিত। ফলে জানে আলমকে কেবল ‘ইসলামি ভাবধারার কবি’ বলে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর কাব্যসত্তার পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় না। বরং তাঁকে বলা যায়—শুদ্ধতা, সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার অনুসন্ধানী কবি।
 তাঁর সাহিত্যযাত্রার প্রথম পর্যায়ে প্রেম, সৌন্দর্য, আবেগ ও ব্যক্তিমানসের রোমান্টিক অনুষঙ্গ প্রবল ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর কবিচেতনা ব্যক্তিগত অনুভূতির গণ্ডি অতিক্রম করে সমাজ ও মানুষের দিকে বিস্তৃত হয়েছে। এই বিবর্তনই তাঁর কবিসত্তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।বর্তমানে বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবনের পাশাপাশি তিনি কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প ও শিশুতোষ ছড়াসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় কাজ করছেন। গ্রামীণ জনপদে অবস্থান করেও সাহিত্যসভা ও পত্রপত্রিকার সঙ্গে তাঁর সক্রিয় যোগাযোগ তাঁর সাহিত্যনিষ্ঠার পরিচয় বহন করে। শিক্ষকতা ও সাহিত্যচর্চা—দুটিই মানুষের মন গঠনের কাজ; জানে আলমের সাহিত্যেও এই মননশীল ও নৈতিক দায়িত্ববোধের প্রতিফলন দেখা যায়।
‘আমরাই ফজরের সুরভিত গোলাপ’ নামটিই গ্রন্থের কাব্যদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি। ‘ফজর’ অন্ধকারের অবসান ও নতুন আলোর সূচনার প্রতীক; আর ‘সুরভিত গোলাপ’ সৌন্দর্য, পবিত্রতা ও নবজাগরণের প্রতীক। ফলে শিরোনামের মধ্যেই অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রা, নৈতিক শুদ্ধতা এবং নতুন দিনের স্বপ্ন নিহিত রয়েছে।

এই শুদ্ধতার ধারণা আরও প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে ‘শুদ্ধতার সবক’ কবিতায়। কবির উচ্চারণ—“কবিকেই দিতে হবে আজ শুদ্ধতার সবক।” এখানে ‘সবক’ মানে শিক্ষা; কিন্তু এই শিক্ষা শুধু ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত নৈতিকতার পাঠ নয়। কবির কাছে সাহিত্যিকের দায়িত্ব সমাজের অসুন্দর, মিথ্যা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের ভাষা উচ্চারণ করা। ফলে কবি এখানে সৌন্দর্যের স্রষ্টার পাশাপাশি বিবেকেরও প্রতিনিধি।
এই কবিতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক কবির রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান। তিনি কবিকে কখনো জাতির বিবেক, কখনো প্রতিবাদের কণ্ঠ, কখনো ইতিহাসের দায়বদ্ধ সাক্ষী হিসেবে কল্পনা করেছেন। তাঁর কাছে কবিতা শুধু গোলাপের সুবাস নয়; প্রয়োজন হলে তা শাণিত তরবারিও। ‘গোলাপ’ সৌন্দর্যের প্রতীক, আর ‘তরবারি’ প্রতিবাদের। এই দ্বৈততা জানে আলমের কাব্যদর্শনের অন্যতম কেন্দ্র—সৌন্দর্য ও প্রতিবাদ পাশাপাশি চলবে।
তাই কবি বলেন, 
যখন ফেসিষ্টের সহযোগী হয়ে মিম্বর ছেড়ে পালায় জাতীয় খতিব তখন জাতির সামনে কবিকেই হতে হয় বিশ্বাসের ভাষ্যকার। 
— শুদ্ধতার সবক 

গ্রন্থের শিরোনাম-কবিতা ‘আমরাই ফজরের সুরভিত গোলাপ’ এই কাব্যদর্শনকে সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে ধারণ করেছে। কবি আহ্বান জানান—
“অন্ধ বিদ্বেষের ব্যারিকেড ভেঙে দিয়ে
মনকে উন্মুক্ত অবারিত প্রান্তরের মতো করো।”
এখানে ‘ব্যারিকেড’ শুধু রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা নয়; মানুষের অন্তরের বিদ্বেষ, সংকীর্ণতা ও বিভাজনেরও প্রতীক। বিপরীতে ‘উন্মুক্ত প্রান্তর’ উদারতা, মুক্তচিন্তা ও মানবিকতার প্রতীক। অর্থাৎ কবির বিপ্লবের সূচনা বাহ্যিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের আগে মানুষের অন্তর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।
এই কবিতায় ‘কল্যাণ’ও নিছক পার্থিব সুখ নয়। কবি বলেন, তাদের কল্যাণ মানুষকে ‘সমূহ পঙ্কিলতার গহ্বরে’ নিমজ্জিত হওয়া থেকে মুক্ত করবে। ‘পঙ্কিলতা’ এখানে দুর্নীতি, বিদ্বেষ, হিংসা, অসত্য ও নৈতিক অবক্ষয়ের সম্মিলিত প্রতীক। তাই কবির ফজর কেবল ধর্মীয় ভোর নয়; এটি নৈতিক ও সামাজিক জাগরণেরও ভোর।
‘আমরাই ফজরের সুরভিত গোলাপ’—এই উচ্চারণে কবি একটি সমষ্টিগত আত্মপরিচয় নির্মাণ করেন। “আমরা প্রতিদিন ফুটে উঠি সুবহে সাদিকে”—এই ফুটে ওঠা নতুন দিনের প্রতীক, একই সঙ্গে প্রতিদিনের আত্মশুদ্ধিরও প্রতীক।

এই প্রবণতারই আরেকটি শক্তিশালী প্রকাশ শ্রমিকের ঘামকেন্দ্রিক কবিতায়। এখানে ‘ঘাম’ নিছক শারীরিক পরিশ্রমের ফল নয়; এটি শ্রম, উৎপাদন, আত্মমর্যাদা এবং ন্যায্য অধিকারের প্রতীক। “আমি ঘাম ঝরাই বলেই তুমি দু’দণ্ড নিশ্চিন্ত হয়ে থাকতে পারো”—এই বক্তব্যে শ্রমিক নিজেকে করুণার পাত্র হিসেবে নয়, সভ্যতার নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। শ্রমিক দয়া চায় না; চায় শ্রমের সঠিক মূল্য। ফলে কবিতাটি শ্রমের সৌন্দর্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিও প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।

‘দাতা সংস্থা’ কবিতায় প্রতিবাদের ভাষা আরও ব্যঙ্গাত্মক। খাদ্য, পোশাক ও ঘরের দান দিয়ে সাহায্যপ্রাপ্ত মানুষ প্রথমে মুগ্ধ হলেও পরে বুঝতে পারে, দানের সঙ্গে এসেছে নির্ভরতা, হিসাব ও অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ। “ওদের মান্না সালওয়ার চেয়ে / আমার কচু শাক লবণ ভাতই ভালো ছিল”—এই পঙ্‌ক্তিতে আত্মমর্যাদার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে উঠেছে। আর “ওদের বানিয়ে দেওয়া তাজমহলের চেয়ে / আমার তালপাতার দোচালা ঘরটি ভালো ছিল”—এই বৈপরীত্যে পরের দেওয়া ঐশ্বর্যের চেয়ে নিজের সামান্য স্বাধীনতাকে বড় করে দেখা হয়েছে। কবিতাটি তাই দানের বিরোধিতা নয়; বরং এমন উন্নয়নের সমালোচনা, যা মানুষকে স্বনির্ভর না করে চিরস্থায়ী গ্রহীতায় পরিণত করে।কবি জানে আলমের কবিতায় অলংকার এর চেয়ে বাণীই প্রাধান্য পেয়েছে বেশি।  
কবিতার দুটি পংক্তি এমন 
পরের অনুগ্রহের উন্নত জীবনের স্বাদ নেওয়া মানে 
নিজেকে অভিশাপের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করা 
— দাতা সংস্থা 

কবি জানে আলমের কাব্যে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন কেবল ধর্মীয় অনুকরণের বিষয় নয়; বরং তা ন্যায়, সত্য ও আত্মশুদ্ধির এক নির্মল নৈতিক আদর্শ। ‘আমাদের একটি স্বচ্ছ আয়না আছে’ কবিতায় তিনি রাসুল (সা.)-এর সমগ্র জীবনকে একটি ‘স্বচ্ছ আয়না’ হিসেবে কল্পনা করেছেন। আয়নার ধর্ম হলো—সে অন্যের মুখ দেখানোর আগে নিজের মুখটিই সামনে তুলে ধরে। কবির এই প্রতীকী নির্মাণের মধ্য দিয়ে আত্মসমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দর্শন প্রকাশিত হয়েছে।
কবির বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, আমরা অন্যের অন্যায় শনাক্ত করতে যতটা তৎপর, নিজেদের অন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে ততটাই উদাসীন। অথচ রাসুল (সা.)-এর জীবন সেই আত্মপ্রবঞ্চনার সুযোগ দেয় না। তাঁর জীবনের দিকে তাকালে সত্য ও অসত্য, ন্যায় ও অন্যায়, আদর্শ ও আপসের সীমারেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই কবি প্রশ্ন ছুড়ে দেন—
“আমাদের একটা স্বচ্ছ হয়না আছে।
তেষট্টি বছর জিন্দেগীর সেই আয়নাটির দিকে তাকালে দেখব—অন্যায় ও অসত্যকে সামান্যতম সুযোগ দেওয়া হয়নি। আমরা কেন দেব?”
—‘আমাদের একটি স্বচ্ছ আয়না আছে’

এখানে ‘আয়না’ নিছক একটি উপমা নয়; এটি আত্মজিজ্ঞাসা ও নৈতিক বিচারের প্রতীক। কবি যেন পাঠককে অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজের মুখটি সেই আয়নায় একবার দেখে নিতে বলেন। রাসুল (সা.)-এর জীবনকে সামনে রেখে নিজের বিশ্বাস, আচরণ, নৈতিকতা ও সামাজিক ভূমিকা যাচাই করার আহ্বানই কবিতাটির মূল শক্তি।

‘গণঅভ্যুত্থান নয় বিপ্লব’ কবিতায় স্বাধীন কণ্ঠের ধারণাটি চমৎকার প্রতীকে এসেছে। পোষা ময়না যা শেখানো হয় তাই বলে; কিন্তু ভোরের মুক্ত পাখিকে শেখানো যায় না। ‘ময়না’ নিয়ন্ত্রিত বক্তব্যের প্রতীক, আর ‘মুক্ত পাখি’ স্বাধীন চেতনার। কবির ‘বিপ্লবী’ সত্তা সেই স্বাধীন পাখির কণ্ঠের চেয়েও অধিক বিস্তৃত ও প্রবল। ফলে বিপ্লব এখানে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; মানুষের মুক্ত কণ্ঠেরও নাম।
জুলাই-চেতনা নিয়ে লেখা ‘জুলাই বিপ্লব’ এবং ‘জুলাই যোদ্ধার মা’ কবিতায় কবির সমকালীন ইতিহাসবোধ আরও স্পষ্ট। ‘জুলাই বিপ্লব’-এ প্রতিরোধ, পরিবর্তন ও নতুন ইতিহাস নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। অন্যদিকে ‘জুলাই যোদ্ধার মা’ ব্যক্তিগত শোককে জাতীয় গৌরবে উন্নীত করেছে। “মরে না শহীদ”—এই বিশ্বাসে শহীদের অমরত্ব কেবল মৃত্যুর পরবর্তী কোনো আধ্যাত্মিক ধারণা নয়; আদর্শ, স্মৃতি ও মানুষের চেতনায় বেঁচে থাকার প্রতিশ্রুতি। কবিতার শেষ প্রার্থনা—“ছেলেকে নিয়েছ প্রভু ভালো রেখো দেশ”—ব্যক্তিগত মাতৃবেদনাকে জাতীয় কল্যাণের সঙ্গে একীভূত করেছে। এখানে মা শুধু সন্তানহারা নারী নন; তিনি এক আত্মত্যাগী জাতির প্রতীক।

অন্যদিকে ‘স্ত্রী কাব্য’ কবির কোমল ও অন্তরঙ্গ সত্তাকে সামনে আনে। শীতের গভীর রাতে তাহাজ্জুদের সিজদায় থাকা স্ত্রীর গায়ে চাদর জড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্যের মধ্য দিয়ে দাম্পত্য ভালোবাসাকে তিনি উচ্চকিত আবেগে নয়, যত্নের ক্ষুদ্র অথচ গভীর মুহূর্তে ধরেছেন। চাদর এখানে উষ্ণতার পাশাপাশি ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও সংসারী মমতার প্রতীক।
প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতিও কবির একটি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। ঘাস ও ঘাসফড়িংয়ের সহজাত সম্পর্কের উপমায় মানুষ ও পরিবেশের ভারসাম্যপূর্ণ সহাবস্থানের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। মূল্যবোধের ‘রোদে ফুল ফোটানোর’ কল্পনা তাঁর নৈতিক সৌন্দর্যবোধের সঙ্গে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে এক সূত্রে বেঁধেছে।

কবি জানে আলমের কাব্যচেতনায় সমকালীন ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে ‘জুলাই বিপ্লব’ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। জুলাই বিপ্লব নিয়ে তাঁর পৃথক গ্রন্থ থাকলেও আমরাই ফজরের সুরভিত গোলাপ কাব্যগ্রন্থেও এই চেতনার একাধিক শক্তিশালী প্রতিফলন রয়েছে। ফলে জুলাই তাঁর কাছে কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; বরং অন্যায়, জুলুম, নিপীড়ন ও অসত্যের বিরুদ্ধে মানুষের জেগে ওঠার এক প্রতীকী নাম। তাঁর কবিতায় জুলাই হয়ে উঠেছে প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ, স্বাধীনচেতনা এবং নতুন ইতিহাস নির্মাণের প্রত্যয়ের সমার্থক।
‘হাজার বছর এই কবিতা’ কবিতায় কবি জুলাই বিপ্লবকে একটি দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক ও নৈতিক কবিতা হিসেবে কল্পনা করেছেন। তাঁর উচ্চারণ—
“জুলাই বিপ্লব একটি কবিতা
হাজার বছর এই কবিতা পঠিত হতে থাকবে

পৃথিবীর বুকে যদি একটি প্রজাপতিও বেঁচে থাকে। আর সে তার শৈল্পিক দু ডানা ছড়িয়ে ফুলের উপর বসে বিনোদিত হতে চায়। তবে সে প্রজাপতিও বলবে—জুলাই মানে জুলুমের বিরুদ্ধে এক অনঘ অবস্থান।”
—‘হাজার বছর এই কবিতা’

আমরাই ফজরের সুরভিত গোলাপ কেবল কবিতার গ্রন্থ নয়; এর মধ্যে জানে আলমের কিছু ছড়া ও পদ্যও স্থান পেয়েছে। ছড়াগুলোর ভাষা তুলনামূলকভাবে সরল, ছন্দময় এবং সহজে স্মরণযোগ্য। তবে বিষয়বৈচিত্র্য ও বক্তব্যের দিক থেকে এগুলো নিছক শিশুমনোরঞ্জনের ছড়া নয়; কোথাও ধর্মীয় আবেগ, কোথাও প্রেম, কোথাও নৈতিক শিক্ষা, আবার কোথাও দেশ ও জাতির প্রতি দায়বোধ প্রকাশ পেয়েছে।
‘মদিনা চলো’ ছড়ায় ধর্মীয় আবেগ ও মদিনার প্রতি গভীর ভালোবাসা সহজ ছন্দে প্রকাশিত হয়েছে—
“আমাকে আকুল করে / মদিনার ঘ্রাণ
মদিনার প্রেমে আজ / সুরভিত প্রাণ।”
এখানে ‘ঘ্রাণ’ ও ‘সুরভিত প্রাণ’—এই দুটি শব্দবন্ধ মদিনার প্রতি কবির আধ্যাত্মিক আকর্ষণকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতিতে রূপ দিয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিকে জটিল ভাষায় না এনে সরল ছন্দে প্রকাশ করাই এই ছড়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য।
‘ফাগুন ফাগুন’ ছড়ায় নারীকে ঘিরে কবির সৌন্দর্যবোধ ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে—
“নারী হলো মায়াবতী / মধুর কালাম
নারী হলো প্রেম প্রীতি / সালাম সালাম।”
এখানে নারীকে প্রেম, মমতা ও সৌন্দর্যের প্রতীকে দেখা হয়েছে। ছড়ার ছন্দ ও অন্ত্যমিল বক্তব্যকে সহজে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
অন্যদিকে ‘আপনাকেই বলছি’ ছড়ায় কবির নৈতিক ও দেশাত্মবোধী কণ্ঠটি স্পষ্ট—
“আপনি যদি টাকার কাছে / বিক্রি হয়ে যান
দেশ ও জাতির জন্য হবে / বড় অপমান।”
এখানে ছড়ার সরলতা পরিণত হয়েছে সরাসরি নৈতিক উচ্চারণে। অর্থের কাছে বিবেক বিকিয়ে দেওয়া যে ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, বরং তা দেশ ও জাতির জন্যও অপমানজনক—কবি সেই বোধটিই সহজ ভাষায় পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।

তবে জানে আলমের কবিতার একটি শিল্পগত সীমাবদ্ধতাও উল্লেখ করা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যের স্বচ্ছতা অনেক সময় কবিতাকে প্রত্যক্ষ উপদেশের কাছাকাছি নিয়ে যায়। ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিক আহ্বান ও রাজনৈতিক প্রতিবাদ যখন সরাসরি ঘোষণামূলক হয়ে ওঠে, তখন কবিতার অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত, বহুস্তরীয় ব্যঞ্জনা ও নান্দনিক রহস্য কিছুটা কমে যেতে পারে। ভবিষ্যৎ কাব্যচর্চায় যদি তিনি তাঁর শক্তিশালী বক্তব্যের সঙ্গে আরও সূক্ষ্ম চিত্রকল্প, অন্তর্মুখী মনস্তত্ত্ব, প্রতীকী নির্মাণ ও ভাষার ঘনত্ব যুক্ত করেন, তাহলে তাঁর কবিতার শিল্পমূল্য আরও সমৃদ্ধ হবে।
সব মিলিয়ে আমরাই ফজরের সুরভিত গোলাপ এমন একটি কাব্যগ্রন্থ, যেখানে কবি জানে আলম সৌন্দর্যকে প্রতিবাদ থেকে, ধর্মকে নৈতিকতা থেকে, ব্যক্তিমানসকে সমাজচেতনা থেকে এবং ব্যক্তিগত বেদনাকে সমষ্টিগত স্বপ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। তাঁর কবিতায় গোলাপ আছে, কিন্তু সেই গোলাপের পাশে শাণিত তরবারিও আছে; ফজরের আলো আছে, আবার অন্ধকার ভাঙার সংগ্রামও আছে; প্রার্থনা আছে, আবার প্রতিবাদের উচ্চারণও আছে।
এই বহুমাত্রিকতাই জানে আলমের কবিসত্তার মূল শক্তি। তিনি প্রেম ও রোমান্টিকতার কোমল অঞ্চল থেকে সমাজ, মানুষ, শ্রম, নৈতিকতা ও প্রতিবাদের বৃহত্তর ভূগোলে প্রবেশ করেছেন। তাঁর কাব্যের কেন্দ্রীয় স্বপ্ন—একটি শুদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও আলোকিত সমাজ। সেই অর্থে আমরাই ফজরের সুরভিত গোলাপ কেবল একটি কাব্যগ্রন্থের নাম নয়; এটি অন্ধকারের ভিতর থেকে নতুন ভোরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক কাব্যিক প্রত্যয়।

জানে আলমের কবিতার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা সম্ভবত এখানেই—মানুষ যেন শুধু বেঁচে না থাকে, বরং শুদ্ধ হয়ে বাঁচে; শুধু সৌন্দর্য উপভোগ না করে অসুন্দরের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়; শুধু নিজের মুক্তি না চেয়ে অন্যের মুক্তির কথাও ভাবে। তাঁর কবিসত্তা তাই একদিকে সুবাসিত গোলাপ, অন্যদিকে প্রয়োজনের মুহূর্তে প্রতিবাদের শাণিত অস্ত্র। বাংলা কবিতার ভুবনে এই দ্বৈত আকাঙ্ক্ষাই তাঁর স্বাতন্ত্র্যের প্রধান পরিচয়।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা