প্রচ্ছদকবিতাগুচ্ছ কবিতা

লিখেছেন : মোস্তফা হক

গুচ্ছ কবিতা

মোস্তফা হক

খোয়াব
………..

লাশকাটা ঘরে এতো এতো মাছি কোথা থেকে আসে?
সন্ধ্যায় স্যাঁতসেঁতে মাছের বাজার থেকে মাছ
কেনার পর, মগজের ভেতর তোমার স্মৃতিরা
ভুতের মতো চেপে বসবে বুঝলে আমি সন্ধ্যায়
মাছই কিনতাম না। মাঝে মাঝে তোমার বিচ্ছেদ
লখিন্দরের সাপ হয়ে পেঁচিয়ে উঠে আসে আমার
মনের ঘরে, শুয়ে থাকে কল্পতরুর বিছানায়।
তোমার ছায়া, তোমার ঘ্রাণ, সন্ধ্যার শরীর ভারী
করে ডুবে যায় পাশের পুকুরে যার তল দেশে
আমার ঘর। সেখানে উনুনে কে রাঁধে তোমার
সুডৌল স্তন? সে গন্ধ মেখে থাকে আমার শরীরে,
নির্গন্ধি সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে তুলে আনি সেই
সুবাস, ছড়িয়ে দেই পুকুরের পানিতে, মাছেরা
গোল হয়ে এসে খায় তোমার শরীরের আতর,
আর মাতাল হয়ে কামনায় মেতে ওঠে পানির
গভীরে। সেই সাবান পানিতে হারিয়ে তুলতে
গেলে কার হাতের ভেতর এই হাত চলে যায়?
এ কার নরম শরীর? মেহেদি রাঙ্গা এ কার হাত?
দশটি আঙ্গুল একটি হাতে? এ কার হাত যাতে
একটি রেখাই নেমে গেছে তালু বরাবর যেমন
শ্মশানের বটের ঝুড়ি নেমে আসে শব পোড়া
ঘ্রাণ ঠেলে অন্ধকার চৌরাস্তায়। সকালে একটু
পুরানো নদীর ধারটায় যাওয়ার কথা ছিল।
ইলিশের বাজারে আব্বার হাত ধরে হাঁটার
সময় হারিয়ে যাওয়ার ভয় মনের ভেতর
এতই বেড়ে উঠত তাতে করে বাজারে যে গেছি
সেই আনন্দই ভুলে যেতাম; একটু আগে কে যেন
বাজারে গেলো? আমার খুব জিলাপি খেতে ইচ্ছে
করত ঐ সময়। কালকে ছানার জিলাপি খেলাম,
ফ্রিজে কাল রাতে মনে হয় কেক দেখেছিলাম।
এখনো কি স্কুলে চালতার আচার বিক্রি হয়?
আমার একটা ইমেইল আসার কথা ছিল সকালে,
ডাক পিয়ন মনে হয় ইমেইল নিয়ে আসে না,
আসে কি? মেঘ করেছে বৃষ্টি হতে পারে, বৃষ্টি কে নিয়ে
আসে? বড় ফুপা মাছ নিয়ে আসেন সন্ধ্যার দিকে,
মা কি ছাদ থেকে কাপড় নামিয়ে আনবেন? রাতে
শহরে একবার যেতে হবে একটা বইয়ের
খোঁজে, তোমার খোঁজে সেবার গিয়েছিলাম তোমার
নতুন শহরটায়। আমরা খুব তিন গোয়েন্দার
বই পড়তাম, কাজে লাগেনি সেই বিদ্যা, তোমার
ঠিকানা কেউ খুঁজে পাইনি। চুলায় কিছু পুড়ছে?
হৃদয় পুড়ে চা হচ্ছে আমিরের চায়ের দোকানে।
বাসে বসে এইসব ভাবতে ভাবতে আমার
শরীর বেয়ে নেমে আসে স্নানের জল, স্নান করতে
এসেছি কখন? তাও এতো রাতে? তোমাকে ভাবতে
ভাবতে কার পিছু পিছু আমি ঘর থেকে বাইরে
যাই? যেন ভোর রাতে কোন এক নিশুতির ডাক
আমাকে বিলের দিকে নিয়ে যায়, তারপর পুঁতে
ফেলে গলা পর্যন্ত। দিনভর কেউ খুঁজল না?
একপাল শকুন আমার মাথা ঠুকরে মগজ
ভর্তি তোমাকে তুলে এনে ফেলে দিয়েছে আমার
মায়ের মাছ রান্নার কড়াইয়ে, পাট শাক ভাজা
হয়ে গেছে, আমি স্নান সেরে এসে মায়ের হাতের
মাছ রান্না, মগজ ভাজা আর পাট শাক দিয়ে
গরম ভাত খেতে খেতে তোমার বুকের গরম
অনুভব করি আর হাত দিয়ে মাছের কাঁটা
বেছে লুকমা তুলে মুখে দেই। তরকারিতে ঝাল
কি একটু বেশি? নিজের মগজ খেতে ভালোই
লাগছে। আমার মগজ আমার পেট থেকে ঘুরে
আবার আমার মাথায় যাবে? যেখানে তুমি থাকো
লক্ষিন্দরের বাসর সাজিয়ে, তারপর আবার
আমাকে নিশুতি ডাক পুঁতে ফেলবে বিলের কালো
কাঁদায়, আবার শকুনেরা ঠুকরে নিয়ে আসবে
আমার মগজ, ফেলে দেবে মায়ের মাছের কড়াইয়ে?
মাথার মগজে তুমি ছিলে জানো? মৃত মানুষের
মগজ কতক্ষণ ঠিক থাকে? অনেক্ষণ তো
হয়েই গেলো লাশকাটা ঘরে, মাছিরা বড্ড বেশি
জ্বালাচ্ছে, শেষবার এক মাতাল ডোম এসে এক
ঝলক দেখে গেছে, জানি না কখন বুক কাটবে?

০৪.০৮.২০২৬ 

সমান্তারাল রেখার কাছে
………………………..

একটি পাতা খুব ভোরে মা গাছের পেট থেকে
জন্ম সুত্র ভুলে মাটিতে পড়ে মৃত্যুর স্বাদ পেল
একটি জন্ম মৃত্যুর মুহূর্ত দেখতে পেলাম।

যে পাখিটি উড়ে গেলো আপন নীড় ভুলে
সে আকাশের নীলকে সঙ্গে নিয়ে যায়নি,
শুধু কয়েকটি বাতাসের সমীকরণ তার বুকে
অপূর্ণতা রেখে দূর সমুদ্রের দিকে চলে গেলো।

তোমার কথা মনে পড়ে ঘোর সন্ধ্যায়
ঠিক যেমন কোন পুরনো খাতার ভাঁজে
একটি অসমাপ্ত হিসাব হঠাৎ চোখে পড়ে।
ভুল নয়, তবু শেষ পর্যন্ত মেলানো যায় না।

বৃষ্টি হলে জানালার কাচে অসংখ্য বিন্দু জন্মায়।
আমি ভাবি, প্রত্যেক বিন্দুই হয়তো একটি করে সম্ভাবনা,
যারা মাটিতে পৌঁছানোর আগে নিজেদের ভাগ্য গণনা করে।

তুমি কাছে নেই, কখনো যে ছিলে সেই অনুভূতি খুঁজে পাই না, 
তবু পৃথিবীর প্রতিটি গাছ তোমার অনুপুস্থিতির দিকে
অল্প অল্প ঝুকে থাকে, আমি কার দিকে যাত্রা করি, ঝুলে থাকি? 

আজ সন্ধ্যায় সব বাধা ভুলে 
আমি একটি প্রদীপ জ্বালাবো।
আলো কত দূর যায়? তার পিছু পিছু যাবো, 
সমান্তারাল রেখা কে অতিক্রম করে, 
তার চেয়ে বড় কথা, অন্ধকার কতখানি
আলোর জন্য অপেক্ষা করতে জানে?
আমার চেয়েও বেশি? 

১০.০৭.২০২৬

উপলব্ধি 
……….

আজ ভোরে একটি শিশিরবিন্দু ডুমুর পাতার 
ডগায় মৃত মানুষের চোখের মতো স্থির ছিল। 
স্থিরতাও এক ধরনের গতি, যার হিসেব নিউটনের সুত্রে ধরা কঠিন। 

দীঘির জল হতে একটি মাছ মুখে নিয়ে
দূরের চিল যখন উড়ল, তার ডানার নিচে 
অল্প কিছু ছায়া জন্ম নিল, বুকের নিচে ধীরে ধীরে 
মৃত্যুর প্রহর গোনা মাছ। আমি সেই ছায়াগুলির
দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, আলোও নিশ্চয়ই নিজের 
অনুপুস্থিতির ভাষা জানে
আর মৃত্যু? যখন সে অন্ধকারে যায়।
গভীর রাতে তোমাকে মনে পড়লে
আমি কোন দীর্ঘশ্বাস ফেলি না, জেগে উঠি না
ঘাম ভেজা শরীরে, বরং একটি কাগজে ক্রমাগত
বৃত্ত আঁকতে থাকি, বৃত্তের ভেতর বৃত্ত, 
দেখি কেন্দ্র কখনও নিজের স্থান পরিবর্তন করে না
পরিবর্তিত হয় কেবল তার পাশের দূরত্ব,
শঠ মানুষের মনের মতো।

নদী আজও সমুদ্রের দিকে যায়।
এতে নতুন কিছু নেই, আমি একাই তোমার দিকে যাই না, 
প্রতিটি ঢেউ নিজের ভাঙনের সংবাদ নিজেই বয়ে চলে
যেমন আমি বহন করি আমার আত্মার শব।

মুসার সত্য বাণীর মতো আমি জানি
তুমি এই মুহূর্তে অন্য আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছো।
তবু সন্ধ্যা নামলে আমার আকাশেও
একই নক্ষত্রের আলো এসে পৌছায়,
যদিও তার যাত্রা শুরু হয়েছিল আমাদের জন্মেরও আগে
আমার দুঃখ কী জন্মে ছিল নক্ষত্রেরও অনেক আগে? 

১৫.০৭.২০২৬

আরও পড়তে পারেন

1 COMMENT

  1. অসাধারণ সব কবিতা। জাদু বাস্তবতা আর stream of consciousness নিয়ে লেখা খোয়াব কবিতাটি অন‍্যরকম সুন্দর!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা