প্রচ্ছদগদ্যমোস্তাক আহমাদ দীনের গহন গূঢ় পথ

লিখেছেন : আবু তাহের তারেক

মোস্তাক আহমাদ দীনের গহন গূঢ় পথ


আবু তাহের তারেক


মোস্তাক আহমাদ দীন একবার আমারে কইছিলেন, আগে মানুষ এক জমায়েতে, সকলে মিইলা, কবিতা শুনত। এখনকার কবিতায় সেই আবেদনটা নাই। যত দিন গেছে, কবিতা তত বেশী কইরা কম মানুষের বিনোদনের সামগ্রী হইছে।

উনার এই আলাপের অনেকদিন পরে, খিয়াল করলাম, আব্বা আমার বইয়ের দরাজ হইতে মোস্তাকের কবিতা বাহির কইরা পড়তেছেন। বেশ কিছুদিন এইরকম হইল। বোধ করি, মোস্তাক দীনের যেইসব বই আমার কাছে আছিল, সবগুলাই তিনি পড়লেন।

দরাজে আরো অনেক কবিতার বই আছিল। উপন্যাসও। এইগুলা উনি ছুইয়াও দেখতেন না। (অবশ্য, এইবার যখন দেশে গেলাম, আলাপ কইরা জানতে পারলাম, কিছু ইতিহাসের বইও বাইর কইরা পড়ছেন তিনি। পুরানা ক্লাসিক, যেমন ইউসুফ জোলেখা, বংকীমের নভেল– এইসবও।)

তো, মোস্তাকের কবিতার আলাপে এই জায়গাটা আসবে- তান কবিতার যে আধেয়, তার পরিসরের আলাপটা। তান একটা কবিতার কয়েকটা লাইন টানি–

‘আমার সঙ্গীরা বলো
কাহার গলায় ধরে বলি আজ জননী জননী
এত যে ঘুরেছি ভূমি তবু আমি জীবন চিনি না’

এই যে ‘কাহার গলায় ধরি বলি আজ জননী জননী’ এই লাইন পড়ার পরে বাংগালী মাত্রেরই দিলের ঘর কিছুটা আলুথালু হইবে। মোস্তাকের একটা ঝোঁক আছে, কালেকটিভ আন-কনশাসের দিকে। সেই জায়গায় পৌঁছাইবার জন্য উনার কবিতায় অজস্র চিহ্ন/মই পাইবেন।

আল মাহমুদ এক জায়গায় কইছিলেন, আমরা যতই আধুনিক হই, শহরে থাকি, আমাদের প্যান্ট/লুংগি একটু উপরে উঠাইলে, দেখবেন অইখান থনে প্যাঁকের ভুরভুরা গন্ধ বাইর হইতেছে। এই কথার বহুত মর্মার্থ আছে। এইরকম একটা অর্থ হইল– আমরা এখনো আমাদের যূথবদ্ধ জীবনের ইয়াদ লইয়া শহরে-বন্দরে ঘুরি।

আধুনিকতার অভিঘাত আর আমরার তছনছ হইয়া যাওয়া গ্রামীন যৌথ জীবন লইয়া জীবনানন্দ দাশের কবিতা খুবই মনোহর। মশহুরও। এইগুলা অবশ্য, আংগিকের দিক দিয়া বেশ মডার্নিস্ট। ফলে, এইসব কবিতায় আমের অংশগ্রহণের সুযোগ অল্প। জী. দাশের এপ্রোচের এই এক সমস্যা। তান কবিতা বিষাদ জাগানিয়া। বিষাদের যাতনা ব্যক্তিরে একলা বইতে হয়। আর, বিচ্ছেদ যেইটা, তাতে অনেকের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে। যেমন, গ্রাম-বাংলার বিচ্ছেদী গান।

মোস্তাকের কবিতার অই লাইনখানা আবার পড়ি–
‘কাহার গলায় ধরি বলি আজ জননী জননী’

এই লাইন যে বিলাপ করতে চায়, তা একলা করা প্রায় অসম্ভব। এই যে অসম্ভবের জায়গা, এইটা এমনকি, ব্যক্তির বেদনার/ভাইংগা পড়ার সময়খন্ডেও একটা যোগাযোগের সম্ভাবনা তইয়ার করে।

আমরার আত্মীয় স্বজন কেউ মারা গেলে, আমরারে আত্মীয়রা খাবায়। স্বজনেরা মউতার জানাজায় শরীক হয়। কয়বর খুঁড়ে। এইটা ‘সিমপ্যাথি’ নামক যে শব্দ আছে, তার চাইতে বেশী মিনিং তইয়ার করে। যারে আমরা ‘এমপ্যাথি’ কই। সিমপ্যাথি হইল, কারো দুখে দুক পাওয়া। এমপ্যাথি হইল, কারো দুখে দুক পাইয়া, তার দুখ লাঘব করার লাগি যা করা দরকার, তা করা।

মোস্তাকের কবিতা, বেশীরভাগ সময়েই, এমপ্যাথি তইয়ার করে। অপরদিকে, জী. দাশের কবিতা, যেমন ‘রূপসী বাংলায়’ আমরা জীর্ণ দীর্ণ মলীন বাংলার প্রতি একরকমের সিমপ্যাথি অনুভব করি। এইটা অবশ্য, স্থায়ী কোন বেড়া নায়। (মানে, জী. দাশে কুনু এমপ্যাথি নাই, আর মো. আ. দীনে সিমপ্যাথি নাই, শুধুই এমপ্যাথি– এমন দাবী আমার না।)

মোস্তাকের এই যে শাক্তি, তার প্রকাশ আমরা খনে খনে উনার কবিতায় পাইলেও, এইটারই বহুল, কোথাও অপটু ব্যবহার, আবার উনার কবিতার ব্যপ্তিরে আঠাইয়া আনে। একটা লাইন কই–

‘আমারে নাইওর নিও আগনের বোশেখেরও আগে’

এই কবিতাটি বাংগালী জীবনের কৌর একটা জায়গা– ধান কাটা, ধান মোয়ানি, ধান ঘরে তোলার পরবর্তী আনন্দ উদযাপনরে লইয়া। এইটা খেতারের আর তার বউয়ের, মানে পুরা গ্রাম বাংলার একটা জরুরী চিত্র। তার এই কবিতাও, বিশাল আকাঙ্ক্ষা লইয়া শুরু হয়। কিন্তুক, শেষের দিকের এই যে অপরিচিত, আধুনিক ‘বোশেখ’ শব্দের হামলা, এইটা এই কবিতায়, কওমের একজন হিসাবে, আপনার অবগাহনের পুরা চান্সটারেই অসম্ভব কইরা তোলে। মোস্তাক এইখানে এমপ্যাথি না কইরা, সিমপ্যাথি করেন। আর পাক্কা মডার্নিস্ট (পড়েন, কেতাবী) হইবার কুশিশ করেন। (মানে, কবিতার আত্মাটা আসলে নাইওর। আগন বইশাগের রিচুয়ালটা তার ধ্বজা মাত্র। কিন্তুক, ধ্বজারে ‘বোশেখ’ শব্দ দিয়া অপরিচিত করার ফলে, এইখানে গণের আকাঙ্ক্ষা কমল। ব্যক্তির জার্নিটা থাকল।)

এইটা আসলে, যত না মোস্তাকের ‘অপটুতা’, তার চাইতে বেশী মডার্নিস্ট ‘দ্বিধা’, বা এম্বিভালেন্স। (বইশাখ বা বইশাগ কইলে আপনে যতটা বাংগাল, বা খ্যাত, বোশেখ ততটাই বাংগালি বা পশ একটা ব্যাপার। না?) মডার্নিজমের লগে শিল্প বিপ্লবের যেমন অন্তরের যোগাগোগ, তেমন খ্যাত/গ্রাম্য না হইবারও রিলেশন আছে। অনেকটা এইজন্যই, জসীম উদ্দিন আমাদের অনেকের চউখে ছোট কবি!

যাই হউক, মোস্তাকের পুরা কবিতার সফরেই এইটা পাইবেন– কলকাতার মডার্নিস্ট কবিতার আংগিকের লগে আমাদের দেশজ কাব্য রীতির একটা বুঝাপড়া, মোলাকাত, মারামারি। এইগুলা উনার কবিতার বড় একটা ঘটনা। দু:খজনকভাবে, আমাদের হইয়া উঠাও, এই ঘটনার বাইরের জিনিস নায়। আমরা একটা রাবীন্দ্রিক রাষ্ট্রে বসবাস করি (রিফাত হাসানের রচনা দ্রষ্টব্য)। যেইখানে রবীন্দ্রনাথের মহাভারত আমাদেরকে প্রায় প্রতিদিন বর্ডারে খুন করেন। আমরাও, প্রতিদিনই, ‘আমার সোনার বাংলা’ গাই। ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা’ দেশের কথা কইয়া কাইত চিত হই।

আল মাহমুদ জাতীয় স্পিরিটরে ধারণ কইরা, মানে, আমাদের ‘যৌথ অজ্ঞান’ (কালেক্টিভ আনকনশাস) আর আমাদের রাষ্ট্রধারণারে পুঞ্জি কইরা লিটারেচার করতে পারছেন। মোস্তাকে যৌথ অজ্ঞান থাকলেও, রাষ্ট্রধারণার জায়গা কম পষ্ট। ফলে তিনি বেশী বেশী মৌন, আর গূঢ়।

মোস্তাক আহমাদ দীনের এই গহন গূঢ় জগতে আমাদের জন্য হয়তবা অনেক অনেক সংকেত-লিপি জড়ো করা আছে। আমার আব্বার মোস্তাক পাঠ তারই ইংগিত দেয়।


আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা