শাহীন রেজা
জোনাকির মেয়ে
পিছু ফিরে দেখে নেই ফেলে আসা পথ
ধুলোর বনে পড়ে থাকা টুকরো চুরুট
বাদামের খোসা আর বিষন্ন বটের পাতা;
বিবর্ণ হলুদ কাছে ডাকে চুপিসারে
মৃত্যুর আঁচড় লাগা হরিণের চোখ
করুণ বীণায় তোলে দাদরা-ঠুমরি আর তুমি জোনাকির মেয়ে কেমন উড়াও চাঁদ
মধুসূদনের মোহে ; ডাকো মেঘদূত–
আমি যতটা জোনাক জ্বালি
তুমি ততটাই ছড়াও এসে
আসমানী মেঘের ঝালর
এ-ই হয়
পৃথিবীটা পথ হলে নারী হয় নদীদের মোহ,
ক্রমশঃ দরাজ থামে
তারপর ছোটাছুটি স্বলাজ উজানে
আমি তো মুদ্রা এক জলের পকেটে
কখনও ডাহুক হই, কখনও বা ঘাস চিকচিক
বাদুড়ের ডানা হয়ে চেনা ভঙ্গিতে
কখনও খামচে ধরি ছায়া ধোয়া রাত।
দুপুরের গল্প
ডানার নিচে একটা দুপুর লুকিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সে। সে মানে আমার শৈশব।
যখন তারাদের গল্প শুনে চোখে রাত নামতো।
জোড়া শালিকের ওম খুঁজতে খুঁজতে পার হয়ে যেতো কাকধোয়া সন্ধ্যাগুলো।
রাবু খালার ছেঁড়া আঁচলের নীচে লুকিয়ে থাকা ঘামেভেজা ভাতের স্বপ্নগুলো কাঁদাতো যখনতখন।
একটা সাইকেলের জন্য ঝুমুর বিয়েটা ভেঙ্গে গেলে তিনদিনের উপোস।
চুপিচুপি চোখের জল মুছিয়ে বলেছিলাম, কাঁদিস না ঝুমু আমি বড় হয়ে তোকে বিয়ে করবো দেখিস।
ঝুমু বেঁচে থাকলে ওর নিশ্চিত তিন কুড়ি হতো।
দুপুর হেঁটে যাচ্ছে বিকালের দিকে
দুপুরেরা ঝিম মারে ঘুঘুদের মতো
আমি কি তবে ঠিকঠাক পৌঁছে যাচ্ছি সায়াহ্নে?
বৃষ্টিতে বর্ষায়
শিরীষ ভেঙ্গে যখন জল নামে-
তুমি তখন নিশ্চয়ই পাতাপিঁপড়ের ঘরে,
ওমের টানে এগিয়ে দিয়েছো ঠোঁট।
উষ্ণতা, সে তো এক তড়িৎ প্রবাহ-
তোমাকে গ্রাস করে ক্রমশঃ আমার দিকেও…
বৃষ্টিতে বর্ষায় ডানা মেলে কদম কুমারী,
আরাধ্য দরোজা খোলে কামনার গুপ্ত হরিণ।
জল দাও জল দাও
জলে জলে উত্থান বীর্য বালকের।
বৃষ্টিতে জন্মের ঋণ,
বর্ষায় কদমের কাম চালাচালি।
ফিরিয়ে দিয়েছ জল
ফিরিয়ে দিয়েছ জল তবু পিছুপিছু নদী
যদি জলজস্পর্শ ঘটে ; যদি
প্রাণের অনলে বাজে ধূপছায়া বাঁশি
রাতের অধরে সুখ জোনাকের হাসি
শ্রাবণকিশোরী নাচে ময়ূরীর তাল
বর্ষা বৃষ্টিতে কাঁপে ধীবরের জাল
ফসলমালতি ঠোঁটে কৃষাণীর ভাষা
কোজাগরী রাত আঁকে চাঁদোয়ার আশা
ফিরাতে ফিরাতে দিন রাত্রির কাছে
তবু নীল লেখা হয় মাধবীর গাছে।
ছায়ার নামতা পড়ি
ছায়ার নামতা পড়ি, এসো–
বুকের মধ্যে ঘনঘোর
ফড়িং দিনের শেষে
কে যেন ডাকে–
রাতের গামছা হাতে
কইতরী মুখ
নদীকে খোঁজে
ছায়াতে কেমন ভয়
কিসের বিষ্ময়!
ডাহুকী কাঁদে।
এক ঝড়ের রাতে
এক ঝড়ের রাতে মৃত্যু হবে আমার
কাঠের জানালায় আছড়ে পড়বে বজ্র আর টিনের চালে বাতাস ও বৃষ্টির মাতম
খই ভাজা শব্দে ডুবে যেতে যেতে আমার কন্ঠ দিয়ে বেরুবে–আলহামদুলিল্লাহ
চলে যাওয়ার পথে
কাদা ও জলের মধ্যে খাবি খাবে আমার বিশ্বাস:
হিসাব নিকাশের মুহূর্তগুলো–
পুরু লেন্সের চশমায় প্রতিফলিত হবে অতীত; ফেলে আসা কর্ম এবং প্রতিশ্রুতি
তোমার নিরাভরণ মুখ, মসৃণ ঠোঁট আর মাতাল চাহনি আমাকে ছায়ার দিকে টানলেও আমি থেকে যাব স্হির; অচঞ্চল
মোহমুক্তির জোয়ারে ভেসে যাওয়া মুহূর্তের আনন্দ রাঙাবে সমস্ত সকাল আর রাতগুলো–
উড়ন্ত চিলের ঠিকানা জানে ফেরারী রোদ
আমি উড়তে উড়তে পৌঁছে যাব গোধূলিতে
একটু পরেই সন্ধ্যার অবসরে আমাকে কাছে টেনে নেবেন মহান আজরাইল
শার্সিতে ঝাঁপিয়ে পড়া মুগ্ধ মৌনতায়
আমিও আলিঙ্গনে লীন হব তাঁর সাথে
পরম শীতল গভীরতায়।







