প্রচ্ছদগদ্য'এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়' : কবিতা ও পটভূমি...

অনুলিখন : সালেম সুলেরী

‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ : কবিতা ও পটভূমি : হেলাল হাফিজ

‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়..’: কবিতা ও পটভূমি : হেলাল হাফিজ

অনুলিখন : সালেম সুলেরী

[‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি দিয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন হেলাল হাফিজ। ১৯৬৯ সালের অগ্নিঝরা দিনের কথা। তরুণ কবি থেকে ‘যৌবনের কবি’ আখ্যা পেয়েছিলেন। সেই ঐতিহাসিক কবিতাটির নেপথ্য গল্প বেশ রোমাঞ্চকর। প্রথম প্রকাশের কাহিনীটিও অবাক করার মতোই।

ষাট দশকের সাহিত্যচর্চার অনেক অজানা দিক উন্মোচিত তাতে। যেমন ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বলে যিনি আখ্যা দিয়েছিলেন। সেই ঋদ্ধ কবি-সম্পাদক আহসান হাবীব কবিতাটি ছাপেননি। পরে লেখক আহমদ ছফা, হুমায়ূন কবির দেওয়ালে চিকা মারেন। সেই থেকে ‘এখন যৌবন যার…’ ছড়িয়ে যায় সর্বত্র। কবিতাটির নেপথ্য কাহিনী প্রথম ছাপা হয় ‘সাদাকালো’ পত্রিকায়। ১৯৯২-এর ডিসেম্বর মাসের ঘটনা। কবির বয়ানে পুরো গল্পটি অনুলিখন করেন সম্পাদক স্বয়ং। তিনি কবি-কথাকার-সম্পাদক সালেম সুলেরী। কবি হেলাল হাফিজের জন্ম ১৯৪৮-এর ৭ অক্টোবর। পুনঃপ্রকাশ করা হলো স্মৃতিময় কাহিনীটি ]


এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়,
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।

এই পংক্তিদ্বয় ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতা থেকে উদ্ধৃত। এই কবিতাটির সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান জড়িয়ে রয়েছে। ১৯৬৮-৬৯-এর রাজনৈতিক পরিবেশ ছিলো আন্দোলনমুখর। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র-ছাত্রীরা ছিলো অগ্নিতপ্ত। রাজপথেও প্রায়শ জে. আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে মিছিলের ঢল। ব্যানারে-ফেস্টুনে-প্ল্যাকার্ডে সামরিক শাসনবিরোধী লাল প্রতিবাদ। বামপন্থীরাও লাল টুপি পরে আন্দোলনে সামিল। পাকিস্তানী শাসকদের হাত থেকে ভূখন্ডকে মুক্ত করার দৃপ্ত পদচারণা।

🎄প্রতিবাদী পরিস্থিতির কারণে আমাদের হৃদয়ে তখন উনুন-উত্তাপ। ফলে, কবিতা লিখতে গিয়ে যেন আন্দোলন লিখে ফেলি। ভাবনা আর শব্দমালা হয়ে ওঠে অবিনাশী শ্লোগান। আলোড়িত ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটির নেপথ্য গল্প এমনটিই।

🎄আমার তখন এলোমেলো হলজীবন। ঢাকায় নতুন জীবনের হালখাতার শুরু। ১৯৬৭-তে নেত্রকোণা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করি। এরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বাংলায় ভর্তি হলাম। কিন্তু যেন বিদ্যায়তনে নয়, আন্দোলনায়তনের শিক্ষার্থী আমি। মধুর ক্যান্টিন-এর চা-সিঙ্গারার শরীরে উদ্দীপনার মন্ত্র। এফ এইচ হল, ইকবাল হলে আড্ডার প্রধান বিষয় রাজনীতি। আমি ছন্দপ্রধান, হৃদয়প্রধান কবিতায় আগ্রহী। কিন্তু পরিবেশ আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় গণপদ্য। প্রতিবাদ, শ্লোগানের দ্রোহপদ্য আমাকে ক্রমশ দখল করে।

🎄অতঃপর, হঠাৎ করেই লেখা হয়ে যায় কবিতাটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতায় আমি ঢেলে দেই টগবগে আবেগ। তারপর ঝরঝরে হাতের লেখায় কপি করি। ঘনিষ্ঠজনদের দেখাই তবে ভীষণ সন্তর্পণে। সিদ্ধান্ত নেই, কবিতাটি ভালো কোন কাগজে ছাপতে হবে। সাহায্যের মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসেন দুই প্রথাবিরোধী লেখক। বিরলপ্রজ আহমদ ছফা আর কবি-অধ্যাপক হুমায়ূন কবির। ছফা ভাই আমাকে নিয়ে যান দৈনিক পাকিস্তানে।
🎄তখন তরুণ লেখকদের প্রধান আকর্ষণ কবি আহসান হাবীব। চল্লিশ দশকের খ্যাতিমান আধুনিক কবি। প্রবাদ-প্রতিম সাহিত্য সম্পাদকও। দৈনিক পাকিস্তান (যা পরবর্তীতে দৈনিক বাংলা)-এর সাহিত্য সম্পাদক। পল্টনে বায়তুল মোকররম পেরুলেই সেই পত্রিকা অফিস। ছফা ভাইসহ কবিতা হাতে গিয়ে পৌঁছলাম। ভীষণ রাশভারি মানুষ হাবীব ভাই। কবিতাটি হাতে নিয়ে পড়তে থাকলেন। আমাকে দয়া করে বসতেও বললেন না।

🎄হাবীব ভাই-এর হাতে সিগারেট, ধূমায়িত পরিবেশ। মন লাগিয়ে একাধিকবার কবিতাটি পড়লেন। অতঃপর চশমা থেকে চোখ বের করে তাকালেন। একবার নয়, একাধিকবার। অবশেষে মেলে দিলেন দুই শব্দের প্রশ্ন : বাড়ি কোথায়?
কাঁপা কণ্ঠে উত্তর করলাম : ‘ন্যাত্রকোণা’!
জ্বি না, ‘ন্যাত্রকোণা’ নয়, নেত্রকোণা। বুঝলে, ‘নেত্র’ মানে চোখ। শহরে এসেছো, কবিতা লিখছো ভালো কথা। চোখ-কান খুলে রেখে উচ্চারণ করবে। কবিদের কবিতার পাশাপাশি উচ্চারণ-শুদ্ধতার গুরুত্বও অনেক। বুঝলে?

জ্বি, বুঝেছি। তো, আমার কবিতাটি, দেখলেন তো?
জ্বি, দেখলাম মানে পড়লাম। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা। তা তুমি কি করো, লেখাপড়া?
জ্বি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাংলায় সেকেন্ড ইয়ারে।
বুঝলাম। শোন, তুমি তোমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতাটি লিখে ফেলেছো। এরপর যদি আর লিখতে না পারো, অসুবিধে নেই। এই কবিতাটিই তোমাকে দীর্ঘকাল বাঁচিয়ে রাখবে।

🎄কবি আহসান হাবীব-এর এমন প্রশংসা কল্পনার অতীত। যেন বিমুগ্ধতায় আকাশ থেকে পড়লাম। পূর্ণ আস্থা নিয়ে বললাম, তাহলে কবিতাটি ছাপা হচ্ছে?
আমার মুখে এক আকাশ হতাশা ছড়িয়ে দিলেন। বললেন, না, এটা এখানে ছাপানো যাবে না।

🎄এবার ছফা ভাই আমার দিকে তাকালেন। বললেন, ওতো অনেক ছোট মানুষ। সবকিছু বুঝতে অনেক সময় লাগবে। অতঃপর কবি আহসান হাবীব তাকালেন আমার দিকে। বললেন, বুঝলে, আমাদের পত্রিকাটি ট্রাস্টের প্রকাশনা। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। নীতিমালা মোতাবেক আমরা এটা ছাপতে পারি না। ছাপলে পরদিন আমার চাকরি চলে যাবে। পুরো কাগজটিও বন্ধ করে দিতে পারে সরকার। তবে এতে হতাশ হয়ো না। কবিতাটি অন্য যে কোন কাগজে ছাপাতে পারো। একবার ছাপা হয়ে গেলে আর পেছনের দিকে তাকাতে হবে না।

🎄এরপরের কাহিনী অনেকেরই জানা। একুশের একটি সংকলনে ছাপা হলো উনসত্তরে। ছফা ভাই, হুমায়ূন কবির ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করলেন প্রচারে। চিকা মারার কাজে নিজেরাই ভূমিকা রাখলেন। তারপর দেওয়ালে দেওয়ালে, পোস্টারে পোস্টারে। কবিতাটি অতিদ্রুত ছাপা হয়ে গেলো হৃদয়ের পাতায় পাতায়।

🎄আমার প্রথম কাব্যগন্থ বেরোয় ১৯৮৬ তে। শিরোনাম : ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। তাতেই স্থান পেয়েছিলো আলোড়িত কবিতা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’। অনেকেই ‘যৌবনের কবি’ বিশেষণে অভিহিত করলেন আমাকে। সত্যিকার অর্থে আমি ঋণী আমার অগ্নিঝরা সময়ের কাছে। আমার চিরদুখিনী বিপ্লবী বাংলার কাছে। ছাত্রজীবনেই আমি একটি দৈনিকে চাকরি পেয়েছিলাম। সরাসরি সাহিত্য সম্পাদকের সম্মানজনক পদ। যোগ্যতা বলতে সেই আলোড়িত কবিতার সৃষ্টিময়তা । ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়…’। অক্ষরবৃত্ত ছন্দে আমার তারুণ্যের কাব্য-অহংকার!

♦ অনুলিখন : সালেম সুলেরী ॥ সাদাকালো, ১৯৯২

নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় ♦ হেলাল হাফিজ

এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
মিছিলের সব হাত
কন্ঠ
পা এক নয় ।

সেখানে সংসারী থাকে, সংসার বিরাগী থাকে,
কেউ আসে রাজপথে সাজাতে সংসার ।
কেউ আসে জ্বালিয়ে বা জ্বালাতে সংসার
শাশ্বত শান্তির যারা তারাও যুদ্ধে আসে
অবশ্য আসতে হয় মাঝে মধ্যে
অস্তিত্বের প্রগাঢ় আহ্বানে,
কেউ আবার যুদ্ধবাজ হয়ে যায় মোহরের প্রিয় প্রলোভনে
কোনো কোনো প্রেম আছে প্রেমিককে খুনী হতে হয়।

যদি কেউ ভালোবেসে খুনী হতে চান
তাই হয়ে যান
উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায় ।

এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় ।

……………
ঢাকা, ১৯৬৯ ॥ যে জলে আগুন জ্বলে

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা