প্রচ্ছদপ্রবন্ধআবুল হাসানের কবিতার পাঠ : বিমুগ্ধ বেদনার শান্তি

লিখেছেন : আমিনুল ইসলাম

আবুল হাসানের কবিতার পাঠ : বিমুগ্ধ বেদনার শান্তি

আমিনুল ইসলাম

কোনো কবিতা বা সংগীত তখনই পাঠক-শ্রোতার আবেগকে নিবিড়ভাবে স্পর্শ করে যখন তা হৃদয়ছোঁয়া কোনো অনুভব নিয়ে রচিত হয়। কবিতা-সংগীত-নাটক-কথাসাহিত্য-চিত্রকর্ম সবধরনের শিল্পেরই রচনারীতি বা নির্মাণ কৌশল আছে। যারা এসব রচনা বা সৃষ্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন, তাদের কাছে এসব নিয়মকানুন অজানা থাকে না। কিন্তু শুধু প্রকরণ বা নির্মাণশৈলীর নিপুণ অনুসরণ কোনো সৃষ্টিকর্মের মনোগ্রাহী বা হৃদয়ছোঁয়া হওয়া ওঠার জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়। কোনো শিল্পকে শিল্পরীতি কমবেশি মেনে চলার পাশাপাশি জীবনসংশ্লিষ্ট হতে হয়। লিওনাদো ভিঞ্চির চিত্রকর্ম মোনালিসা বিশ^জুড়ে গৃহীত ও খ্যাত হওয়ার জন্য সেটির জীবনঘনিষ্ঠতার ভূমিকাই মুখ্য। শেক্সপীয়ারের নাটকসমূহ, কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা কিংবা রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পগুলো অথবা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-হুমায়ূন আহমদের উপন্যাস সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। একইসঙ্গে এটাও সত্য যে, দুঃখের মাধুরীমাখা সৃষ্টিকর্ম মানুষকে স্পশর্ করে বেশি। তার সাথে যদি উপস্থাপনার কৌশলে চমক থাকে তাহলে সেটা হয় সোনায় সোহাগা। মীর্জা গালিব লিখেছেন:

সুরের ফুল নই, নই আমি বীণার আবরণ
আমি শুধুই নিজের ভেঙে যাওয়ার শব্দ।
[জাভেদ হুসেন কৃত বাংলা অনুবাদ]

গালিবের উদ্ধৃত পঙক্তিতে প্রকাশভঙ্গির চমক আছে তবে তারও বেশি আছে যাপিত জীবনের সুগভীর অনুভবের শিল্পায়ন। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ের গভীরে অনুভবের আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মানবসৃষ্ট যেকোনো শিল্প কোনো না কোনো ভাবে জীবন সংশ্লিষ্ট হয়। জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাহীন কোনো শিল্প-সাহিত্য-সংগীত শেষাবধি অবরণ্যে শেষ হয়ে যেতে বাধ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিখ্যাত ‘ঐকতান’ শীর্ষক কবিতায় যথার্থভাবেই বলেছেন: ‘জীবনে জীবন যোগ করা /না হলে, বৃথা পণ্যে ব্যর্থ হয় গানের পসরা।’ প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক-কাহিনিকার-সুরকার-গীতিকবি খান আতাউর রহমানের একটি গীতিকবিতা নিম্নরূপ:

সুরের বাঁধনে তুমি যতই কণ্ঠ সাধ
তাকে আমি বলব না গান
সেতো শুধু নিস্প্রাণ সানিধাপামাগারেসা
নেই তাতে হৃদয়ের দান।।

মরমের ছোয়া যদি শিল্পীর কণ্ঠে না থাকে
গানের কবিতা যদি জীবনের ছবিটি না আঁকে
তাকে আমি বলব না গান
সেতো শুধু নিস্প্রাণ সানিধাপামাগারেসা
নেই তাতে হৃদয়ের দান।।

গান আহা গান যাকে বলে
লক্ষ মনের মধু স্বপ্ন
লক্ষ হারিয়ে যাওয়া লগ্ন
তার বুকে ধিকিধিকি জ্বলে।

সে জ্বালার অনুভূতি যদি ওই অন্তরে থাকে
হৃদয় উজাড় করে সুরে সুরে ঢেলে দিও তাকে
তাহলেই গান হবে গান
না হলে তা নিস্প্রাণ সানিধাপামাগারেসা
নেই তাতে হৃদয়ের দান।।

সকল ধরনের কবিতা সম্পর্কেই খান আতাউর রহমানের উল্লেখিত গীতিকবিতার মর্মবাণী প্রযোজ্য। জীবনকে স্পর্শ করে না মনুষ্যসৃষ্ট এমন সৃষ্টিকর্ম শেষপর্যন্ত সার্থকতা লাভে ব্যর্থ হয়। অকাল প্রয়াত কবি আবুল হাসান ছিলেন জীবনধর্মী শিল্পকর্মের দক্ষ শিল্পী। জন্মগতভাবে পাওয়া শানিত-সংবেদনশীল হৃদয়, শিল্পভাবনায় আধুনিকতার প্রভাব, যাপিত জীবনের অভিজ্ঞান, সেসময়ের স্বদেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এসব মিলে তাঁর কবিসত্তাকে মূলত বেদনার রসে সিক্ত করে তুলেছিল। সেজন্য তাঁর সৃষ্টিকর্মে করুণ রস বা বেদনার স্বাদ বেশি। তিনি তাঁর ‘আবুল হাসান’ নামক কবিতায় নিজের কবিসত্তার স্বরূপটি সেভাবেই উপস্থাপন করে গেছেন। এটি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা। কবিতাটির মধ্যে জন্মসূত্রে পাওয়া বেদনাপ্রধান অনুভবের উত্তরাধিকার, অন্তরঙ্গ যন্ত্রণার হিমে জমে-জমে পাথর হয়ে যাওয়া, ব্যক্তিগত প্রেমের বেদনা, যুদ্ধের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা ইত্যকার প্রাতিস্বিক অভিজ্ঞানের শৈল্পিক ছবি আছে। শব্দ নির্বাচন, উপমা বাছাই ও চিত্রকল্প নির্মাণে স্বকীয়তা ও অনন্যতার স্পষ্ট ছাপও আছে কবিতাটিতে। ব্যক্তি ও কবি আবুল হাসান এবং তাঁর সৃষ্টিকর্মকে সত্যনিষ্ঠ নিবিড়তায় বুঝতে কবিতাটির পাঠগ্রহণ আবশ্যক বলে মনে হয়। কারণ কবিতাটি তাঁর সমগ্র সৃষ্টির মুখাবয়ব সমতুল্য।

সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র,
মায়াবী করুণ
এটা সেই পাথরের নাম নাকি? এটা তাই?
এটা কি পাথর নাকি কোনো নদী? উপগ্রহ? কোনো রাজা?
পৃথিবীর তিনভাগ জলের সমান কারো কান্না ভেজা চোখ?
মহাকাশে ছড়ানো ছয়টি তারা? তীব্র তীক্ষè তমোহর
কী অর্থ বহন করে এই সব মিলিত অক্ষর?

আমি বহুদিন একা একা প্রশ্ন করে দেখেছি নিজেকে,
যারা খুব হৃদয়ের কাছাকাছি থাকে, যারা এঘরে ওঘরে যায়
সময়ের সাহসী সন্তান যারা সভ্যতার সুন্দর প্রহরী
তারা কেউ কেউ বলেছে আমাকে-
এটা তোর জন্মদাতা জনকের জীবনের রুগ্ন রূপান্তর,
একটি নামের মধ্যে নিজেরি বিস্তার ধরে রাখা,
তুই যার অনিচ্ছুক দাস।

হয়তো যুদ্ধের নাম, জ্যোৎস্নায় দুরন্ত চাঁদে ছুঁয়ে যাওয়া,
নীল দীর্ঘশ্বাস কোনো মানুষের!
সত্যিই কি মানুষের?

তবে কি সে মানুষের সাথে সম্পর্কিত ছিল, কোনোদিন
ভালোবেসেছিল সেও যুবতীর বামহাতে পাঁচটি আঙ্গুল?
[‘আবুল হাসান’, রাজ যায় রাজা আসে]

তো আবুল হাসান তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাতেই তাঁর কবিতার সম্ভাব্য ধরন ও গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তাঁর কবিতা হৃদয়ঘেঁষা, জীবনঘনিষ্ঠ এবং সেখানে অন্তরঙ্গ বেদনার সুরের প্রাধান্য বর্তমান। মানুষ সাধারণত বিরহের গান বা ব্যথার কবিতাগুলো বেশি ভালোবাসে। যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ‘কাজলাদিদি’, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘ছিন্নমুকুল’, জসীমউদদীনের ‘কবর’, রবীন্দ্রনাথের ‘যেত নাহি দিব’, রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ‘পোস্টমাস্টার’, ‘ছুটি’, ‘একরাত্রি’, ‘কাবুলীওয়ালা’ প্রভৃতি স্কুলজীবনেই কত মানুষকে ব্যথিত আনন্দে মাতাল করে দিয়ে থাকে। আরও বড়ো হলে পাঠের সিলেবাস বাড়ে, বাড়ে আনন্দের মাত্রা। ‘কবর’ কবিতা পড়তে পাঠকের জানা হয়ে যায় Percy Bysshe Shelley এর বিখ্যাত উক্তি Our sweetest songs are those that tell of saddest thought. একসময় জীবনানন্দ দাশের কবিতায় মন মজে। সঙ্গোপন হতাশা, নিবিড় বেদনা আর শৈল্পিক উচ্চারণ–সব মিলিয়ে একেবারে ভিন্ন স্বাদ।

মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়- প্রেম নয়-কোনো এক বোধ কাজ করে।
আমি সব দেবতারে ছেড়ে
আমার প্রাণের কাছে চ’লে আসি,
বলি আমি এই হৃদয়েরে:
সে কেন জলের মতো ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়!
অবসাদ নাই তার? নাই তার শান্তির সময়?
কোনোদিন ঘুমাবে না? ধীরে শুয়ে থাকিবার স্বাদ
পাবে না কি? পাবে না আহ্লাদ
মানুষের মুখ দেখে কোনোদিন!
মানুষীর মুখ দেখে কোনোদিন!
শিশুদের মুখ দেখে কোনোদিন!
[‘বোধ’, জীবনানন্দ দাশ]

তবে আধুনিক কবিতা মানেই হতাশার শিল্প নয় সবখানি। জীবনানন্দ দাশের হতাশানিবিড় কবিতার পাশাপশি আছে আল মাহমুদের রক্তমাংসের কামনা-বাসনা জাগানিয়া প্রাণবন্ত কবিতা। শহরে বসবাসকারী কবির মন ও মনন জুড়ে বাংলার সচ্ছল প্রকৃতি । কবিতায় প্রকৃতি ও আধুনিকতার সম্মোহননিবিড় সংশ্লেষ। পড়তে পড়তে মন ভরে ওঠে মধুর আনেন্দ। অনেকটা অনুরূপতায় প্রকৃতির সচ্ছলতায় সমৃদ্ধ আবুল হাসানের কবিতা। তিনি দক্ষিণাঞ্চলের সজল সবুজ প্রকৃতির সবখানি বুকপকেটে ভরে নিয়ে এসেছিলেন কংক্রিটের রাজধানীতে। রাজধানীতে বসে কবিতার সাম্প্রতিকতম ধরন অনুসরণপূর্বক লিখে গেছেন আধুনিক কবিতা। সেসব কবিতার রং সবুজ কিন্তু ভেতরে সুখানুভূতির বদলে অনির্বচনীয় অন্তরঙ্গ বেদনা। তিনি কবিজীবনের শুরুতেই শুনিয়েছেন, ‘সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আদ্র, মায়াবী করুণ’।এ এক অভিনব উচ্চারণ। পাথর উজ্জ্বল হতেই পারে কিন্তু তা কেমনে লাবণ্য ধরে এবং সেই লাবণ্য আবার আদ্র , করুণ! আবুল হাসান আমৃত্যু কবিতা লিখে গেছেন এবং সেসবই সৃষ্টি হিসেবে মায়াবী, আদ্র ও করুণ। তাঁর উচ্চারণ বেদনার্ত হওয়ার নানাবিধ কারণ ছিল। তিনি অকালে মারা গেছেন বলে তাঁর কোনো আত্মজীবনী নেই, আত্মকথাও নেই। আজতক তাঁর কোনো জীবনীগ্রন্থ পাওয়া যায় না। তবে বাজারে ছড়িয়ে থাকা গল্প থেকে তাঁর অচরিতার্থ অসম প্রেম, প্রাণঘাতী অসুখ, জীবিকা নিয়ে টানাপোড়েন এবং দেশের সেসময়ের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থার কথা জানা যায়। সৃষ্টিশীল মানুষ মাত্রই নিবিড়ভাবে সংবেদনশীল প্রাণী। তবে আবুল হাসান ছিলেন আরও একটু বেশি সংবেদনশীল। তৎসময়ে বিরাজমান আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক অধঃপতনে তিনি ছিলেন গভীরভাবে ব্যথিত ও বেদনাকণ্ঠ। তার সাথে ভালোবাসার মানুষের জন্য গভীর ও নিবিড় টান এবং তাকে না পাওয়ার বেদনা আবুল হাসানের হৃদয়সমুদ্রকে বেদনার জোয়ারে ভরে তুলতো । তাঁর কবিতা হচ্ছে সেই জোয়ারের ঢেউ, ফেনা, গোঙানি আর রুপালি সৌন্দর্যের মর্মগ্রাহী বয়ান যা রচিত হয়েছে বেদনার বর্ণমালায়। জোয়ার দেখেই ফুরোয় না সবটুকু দেখা, জোয়ারে নিচে যে সমুদ্র যেখানে রয়েছে তোলপাড়ের উৎস, সেখানে তাকাতে হয় গভীরচারী দৃষ্টি মেলে। আবুল হাসান তাঁর এক কবিতায় বলেছেন-

ঝিনুক নীরবে সহো
ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও
ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুঁজে মুক্তা ফলাও!
[ঝিনুক নীরবে সহো’, পৃথক পালঙ্ক]

আবুল হাসানের কবিতা সেই মুক্তা কিন্তু আবুল হাসান নিজেই সেই ঝিনুক যার হৃদয়ভর্তি ক্রিয়াশীল ছিল বিষের বালি। তাই আবুল হাসানকে বুঝতে হলে তাঁর কবিতারাশি (মুক্তা) দেখলেই হয় না, সেই বিষের বালি (হৃদয়-বেদনা) এর সন্ধানও করতে হয়।

আবুল হাসান মনেপ্রাণে ছিলেন আগাগোড়া একজন প্রেমিক মানুষ। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত প্রেমের পরোক্ষ বয়ানও লক্ষ করা যায়। মনে হয় তিনি ঢাকা আসার আগে নিজ এলাকায় কোনো এক যুবতীর প্রেমে পড়েছিলেন। আর রাজধানীতে এসে জুেেটছিল দ্বিতীয় প্রেম। কিন্তু প্রথম প্রেমের কথা রয়ে গিয়েছিল তাঁর হৃদয়ের তলদেশে। অধিকন্তু তাঁর কবিতায় একটা ছিন্নমূল বেদনার মৃদু হাহাকার আছে। শৈশব-কৈশোরের স্রোতেলা নদী, ফুল-ফসলের মাঠ, ঘুড়ি ওড়ানো বিকেল, মারবেল খেলার সাথি, মেঠোপথ ছুঁয়ে ফুটে থাকা ঘাসফুল, রাখাল বালকের মাথার গামছা, বাইসাইকেল চালানোর রাস্তা, সুরভরা কণ্ঠে ফাতিমা ফুফুর কুরআন পাঠ, শীতসকালের আলোর ইস্কুল, তেলওয়াতে মুখর শরতের সকাল, হেমন্তের চাঁদনিরাত, ইস্কুলের সহপাঠীদের সঙ্গে নদীতে গোসল, গ্রামীণ হাওয়ায় উড়তে থাকা কিশোরীর ওড়না ও তার সলজ্জ প্রেমমাখা চাহনি এবং আরও কত ফেলে আসা দিন ও রাত, স্বপ্ন ও ঐশ্বর্য এমবোস ছবি হয়ে ফুটে উঠেছে তাঁর কবিতার ভাঁজে ও খাঁজে, প্রাণে ও পোশাকে। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞানের কবিতা ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে পর্যবসিত হয়নি। একেই তো অনুরূপ জীবন-অভিজ্ঞতা সমাজের হাজারো মানুষের যাপিত জীবন-অভিজ্ঞানের প্রতিনিধিত্ব করে অধিকন্তু হৃদয়স্পর্শী অনুভবের উৎসারণ ও সম্মোহনে সমৃদ্ধ কাব্যভাষার গুণে সেসব সর্বজনীন শিল্পে উন্নীত হয়েছে।[‘আবুল হাসান’, রাজা যায় রাজা আসে]

আবুল হাসান মনের দিক থেকে ঐশ্বর্যবান কবি ছিলেন বলে কবিতায় অতীতচারী ছিলেন না। অতীত হচ্ছে তাঁর বর্তমান সাম্রাজের ভেতরে একটি সিকস্তি ভূগোল যেখানে মাঝে মাঝে ভেসে যায় মন; ভেসে যেতে যেতে স্নাত হয় মনন, সেই স্নানে কিছুটা জুড়ায় দহনজ্বালা। অতীত হচ্ছে তাঁর মনের আকাশের নিচে থাকা দূরবর্তী সবুজ ভূগোল যেখানে মন উড়ে যায় ধার নিয়ে বলাকার পাখা–যেখানে ফ্ল্যাশব্যাক হয়ে বেজে ওঠে ফাতিমা ফুফুর প্রভাতকালীন কোরানের মর্মায়িত গান, বর্নির বাওড়ের পাশ ঘেঁষে জনপদবালাদের স্ফুরিত স্নানের অন্তর্লীন শব্দে মেদুর নদীর কান্না, হরিকীর্তনের নদীভূত বোল, সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি, মহকুমা শহরের যাত্রাগানের আলাপ এবং সেসবের সাথে ছবি হয়ে ভেসে ওঠে সরজু দিদির কপালের লক্ষী চাঁদ তারা, পাখি শিকারের চক্ষু নিয়ে আসা দুলাভাইয়ের চাহনি, একা ঘরে বসে থাকা ছোট বোনের পানের পাতার মতো নমনীয় হয়ে আসা মুখ, দিঘিতে ভাসা ঘনমেঘ, স্মরণের প্রদেশ থেকে উঠে যাওয়া একটি নিবাস আর সরজু দিদিদের ওপারে চলে যাওয়ার ছবি; আরও ভেসে ওঠে জীবনযুদ্ধে পরাজিত সততালগ্ন চাকরিজীবী বাবার ম্লানমুখ, মায়ের টানাপোড়েনের সংসার, অসৎ লোকদের দ্রুত উন্নতির গতি ইত্যাদি। এসবই হয়েছে তাঁর কবিতায় অন্তরঙ্গ আনন্দ-বেদনার সাতরঙা উপকরণ। প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি সমৃদ্ধ গ্রামীণ জীবনের একান্ত স্মৃতি তাঁকে কবিতা লিখিয়েছে আধুনিকতম ভাষায়। সেসব কবিতায় একাকার হয়ে উঠেছে অতীত জীবনের দৃশ্যমান সমৃদ্ধি এবং বর্তমান জীবনের অপ্রদর্শিত শূন্যতা। নগরে বসবাসকারী প্রাণ থেকেছে বাসিন্দা হয়ে নগরের কিন্তু মাঝে মাঝে ছুটে যেতে চেয়েছে ফেলে আসা সবুজের উৎসবমুখর প্রাঙ্গণে। কিন্তু জীবন ও জীবিকার শক্ত বাঁধনে বাঁধা পড়া মানুষ ইচ্ছে করলেই যেতে পারে না বলে কল্পনার পাখি হয়ে ডানা মেলেছে সে। আবুল হাসান তাঁর কবিতায় এমন জীবনের ছবি এঁকেছেন হাতে নিয়ে নগরের ক্যানভাস ও তুলি আর গ্রামীণ প্রকৃতির রং-রূপ-রস-গন্ধ। তাঁর এধরনের কবিতায় আল মাহমুদের প্রথম দিকের কবিতার কিছুটা ঘ্রাণ পাওয়া যায়। কিন্তু দুজন কবির কাব্যভাষায় ভিন্নতা থাকায় আবুল হাসনের কবিতাকে চিনে নিতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। আল মাহমুদের কবিতায় মিথ, যৌনতা, অর্থনৈতিক চেতনা প্রভৃতির প্রাধান্য রয়েছে, পক্ষান্তরে আবুল হাসানের কবিতায় প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধের সাথে মিশেছে ছিন্নমূল বেদনায় ঘন হয়ে ওঠা ভালোবাসা। আল মাহমুদের গ্রামচেতনা হচ্ছে অর্থনৈতিক শ্রেণিচেতনা আর শহর-গ্রামের প্রভেদ উৎসারিত সোচ্চার অভিজ্ঞান; আবুল হাসানের গ্রামচেতনা হচ্ছে ফেলে আসা ও বিকল্পহীন গ্রামীণ শৈশব-বাল্য-কৈশোরের দিনরাতের জন্য প্রথম প্রেমের মতো হৃদয়ে পুষে রাখা অন্তরঙ্গ অনুভব–কিছুটা দুরন্ত–কিছুটা সঙ্গোপন–সবখানি আকুলতাময়। এটা অনেকটা পরদেশী মানুষের স্বদেশের জন্য ভালোবাসার মতো। আবুল হাসানের কবিতায় আকুলতা বেশি, বেদনা বেশি। কিন্তু সেই আকুলতা সবুজ ও অবুঝ, সেই বেদনা সপ্রাণ ও সতেজ।

সবার গোচরহীন আছি আজো সুদূর সন্ধানী!
দূরে বসে প্রবাহের অন্তর্গত আমি, তাই নিজেরই অচেনা নিজে
কেবল দিব্যতাদুষ্ট শোণিতের ভারা ভারা স্বপ্ন বোঝাই মাঠে দেখি,
সেখানেও বসে আছে বৃক্ষের মতোন একা একজন লোক,
ঐ তাকে ঘিরে বিশজন দেবদূত গাইছে কেবলি
শতজীবনের শত কুহেলী ও কুয়াশার গান!

পাখি হয়ে যায় প্রাণ ঐ কুহেলী মাঠের প্রান্তরে হে দেবদূত!
[‘পাখি হয়ে যায় প্রাণ’, রাজা যায় রাজা আসে]

আবুল হাসানের কবিতায় প্রাতিস্বিক অনুভব ও ব্যক্তিগত যাপনের ছাপ প্রাধান্য পেয়েছে বটে তবে তিনি একজন মানবপ্রেমী উদার আত্মার কবি। আধুনিক কবিতার ব্যাকরণের সবগুলো অধ্যায় তাঁর করায়ত্ত। তিনি শিল্পের দাবি ও দায় দুহাতেই মিটায়ে দিয়েছেন প্রায় প্রতিটি লেখায়। শিল্পের সকল দাবি মেনে নিয়েও তাঁর কবিতা মানবপ্রেমমুখী। তাঁর ভাষা প্রাতিস্বিকতায় সমৃদ্ধ, তাঁর শৈলী নিজস্বতার রঙে উজ্জ্বল তবে তাঁর কবিতার আবেদন মানুষের অনুভব, অনুভূতি ও বেদনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে ধর্ম, প্রথা, মূল্যবোধ ও রাজনীতি। তবে সবচেয়ে বেশি শক্তি ধারণ করে রাজনীতি এবং রাজনীতি পরিচালিত রাষ্ট্র। আবুল হাসান তাঁর সময়ের নষ্ট রাজনীতিকে দেখেছিলেন খুব কাছ থেকে, খুব গভীরভাবে, খুব নিবিড়ভাবে,– খুব সূক্ষ্ণভাবে। একদিকে দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার মানুষের সীমাহীন দুর্দশা ও অপমৃত্যু, দুর্ভিক্ষপীড়িত নারীর পেটের ভাত জোগাড়ে শরীর বিক্রয় করতে বাধ্য হওয়া, অন্যদিকে একশ্রেণির রাজনীতিক আর ব্যবসায়ীর লুটপাট ও মুনাফাখোরী, অজ¯্র হত্যা, গুম, খুন, উধাও, রাষ্ট্রীয় উৎপীড়ন ও বিচারহীনতার হাহাকার। অধিকন্তু মানুষের প্রতিবাদের অধিকার ও ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে আটকে যাওয়া। মানুষের জন্য মানুষের কোনো দরদ না থাকা কোনো দায়বোধ না থাকা, এমন অবস্থার রাজত্ব সবখানে। আর মাহমুদের ‘জেলগেটে দেখা’, ‘বোধের উৎস কই, কোনদিকে?’ এবং রফিক আজাদের ‘ভাত দে হারামজাদা’ শীর্ষক কবিতাও একই পটভূমিতে রচিত হয়েছিল। আবুল হাসান একজন মানবপ্রেমী ও সমাজসচেতন কবি হিসেবে সেসব দেখে বেদনায় আকুল হয়েছেন। তাঁর হাতে কোনো ক্ষমতা ছিল না প্রতিকারের অথবা প্রতিরোধের, তবে একটি কলম ছিল । আর ছিল বিধাতা প্রদত্ত কাব্যশক্তি। তাঁর একটা জীবনদর্শনও ছিল। তিনি উদার মানবপ্রেম ও সামাজিক দায়বদ্ধতার পক্ষে জীবন যাপন করেছিলেন। তেমন জীবনের পক্ষে কলম ধরেছিলেন। প্রাণহরণিয়া প্রতিকূল পরিবেশেও তিনি আত্মস্বর্থপরতার কোটরে ডুব দেননি। তিনি শুধু নিজের জন্য বাঁচতে চাননি। তাই প্রবল পরাক্রান্ত রাজনীতির নষ্টামি, ভণ্ডামি ও গোষ্ঠীস্বর্থপরতার বিরুদ্ধে শানিত অস্ত্র করে তুলেছেন কবিতাকে। সাম্প্রতিক শিল্পশৈলীর ওপর প্রবল দখল এবং তার ব্যবহারের ওপর অনন্য দক্ষতা থাকায় তাঁর প্রতিবাদের উচ্চারণগুলোও উৎকৃষ্ট মানের শিল্প হয়ে উঠেছে। তাঁর এসব উচ্চারণ ধারণ করেছে অসীমিত বেদনা ও অনিঃশেষ আকুলতা; একইসঙ্গে ধারণ করেছে বেদনার দানা মাখা অফুরন্ত শিল্পমাধুর্য। আর তাঁর কবিতা রাজনৈতিক শ্লেষ, পরিহাস, ক্ষোভ, স্যাটায়ার ও প্রতিবাদ ধারণ করেও থেকেছে অনুদ্ধতকণ্ঠ ও হৃদয়-অভিমুখী। অনুপম প্রকাশলৈীর ঐশর্য উপভোগ্যতা দান করেছে তাঁর রাজনীতিঘেঁষা কবিতাকেও।

তরুণেরা অধঃপাতে যাচ্ছে তাও রাজনীতি পুনরায়
মারামারি যুদ্ধ আর অত্যাচার, হত্যার আগ্রাসী খুন মানুষের
ছাড়ানো বীর্যের ব্যথা, বিষণ্ন মিথুন
মহিলার রক্তের ভিতরে ভ্রুণ, সমস্যার ছদ্মবেশে আবার আগুন
উর্বর হচ্ছে, রাজনীতি তাও রাজনীতি!

আমি পকেটে দুর্ভিক্ষ নিয়ে একা একা অভাবের রক্তের রাস্তায় ঘুরছি
জীবনের অস্তিত্বে ক্ষুধায় মরছি রাজনীতি, তাও রাজনীতি আর
বেদনার বিষবাষ্পে জর্জরিত সবার চতুর্দিকে খাঁ, খাঁ, খল,
তীব্র এক বেদেনীর সাপ খেলা দেখছি আমি; রাজনীতি তাও কি রাজনীতি?
[‘অসভ্য দর্শন’, রাজা যায় রাজা আসে]

আবুল হাসানের সেই সময়ের রাজনৈতিক চেতনা ও অভিজ্ঞানের কবিতা পরবর্তী সময়েও প্রাসঙ্গিক থেকেছে। ‘ তীব্র এক বেদেনীর সাপ খেলা দেখছি আমি; রাজনীতি তাও কি রাজনীতি?’–এমন বিষময় রাজনীতির হাত থেকে তারপরও রক্ষা পায়নি দেশ– রক্ষা পায়নি পৃথিবী। আধুনিক রাষ্ট্রের রাজনীতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দ্বৈতচারী, এটা তিনি গভীরভাবেই অনুধাবন করেছিলেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রচিত এসব কবিতা অন্যান্য অনেক দেশের ক্ষেত্রেও কমবেশি প্রযোজ্য।

যেকোনো শক্তিমান কবি-শিল্পীকে পঠনপাঠনে, মননে ও অবলোকনে বিশ্বচারী হতে হয়। কূপমণ্ডূকতা হচ্ছে কালজয়ী শিল্পের বড়ো শত্রু। আবুল হাসান তাঁর কাব্যিক অভিজ্ঞানে ও জীবন পর্যবেক্ষণে বিশ্বচারী ছিলেন। তিনি ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন; আধুনিক সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিলো গভীর ও শানিত। অন্যদিকে পেশায় ছিলেন সাংবাদিক; সামাজিক পরিবর্তন এবং মূল্যবোধের ব্যাপক অবক্ষয় সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল নিবিড় ও সূক্ষ্ণ। আবার মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ। শুধু ‘আধুনিক কবি’ হওয়ার লোভে তিনি বিমানবিকীকরণের ক্ষুদ্র কোটরে আশ্রয় নেননি। পঞ্চপাণ্ডবের ধার করা বোধানলের স্রোতে ভেসে যাননি। আধুনিক কবি হওয়ার লোভ তাঁকে আত্মস্বার্থপর করে তুলতে পারেনি। এক্ষেত্রে তিনি অনেকখানি আল মাহমুদের কাব্যভাবনার অনুসারী ছিলেন। বিশ শতকের বৈশ্বিক অগ্রগতির বাইপ্রোডাক্ট হচ্ছে সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় অথবা আমূল পরিবর্তন। সেই পরিবর্তন ব্যাপক ও যুগান্তকারী প্রভাব ফেলেছিল ইউরোপ আমেরিকার শিল্পসাহিত্যে। সামাজিক ও পারিবারিক ভুবনে সেই পরিবর্তন ঘটেনি বললেই চলে তখনকার ভারতীয় উপমহাদেশের দেশগুলোতে যদিও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও ইউরোপীয় সাহিত্যপাঠে অভিজ্ঞতা অর্জনকারী কবিসাহিত্যিকদের ভাবনায় ও কাজে তার ছাপ পড়েছিল। কিন্তু উনিশশো একাত্তরে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠিত হওয়ার অব্যবহিত পরপরই রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে মূল্যবোধের ব্যাপক ধস নেসে আসে। হত্যা, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় অবিচার, সম্পদলিপ্সা, ক্ষমতালিপ্সা, ভোগবাদিতা, আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা, জোর যার মুলুক তার নীতি, গণতন্ত্রহীনতা প্রভৃতি সমাজ জীবনকে গ্রাস করে ফেলে। আর এসকল অবক্ষয়ের আরম্ভবিন্দু ও কেন্দ্র ছিল রাজধানী ঢাকা। আবুল হাসান ঢাকাকেন্দ্রিক শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবন যাপনের সুযোগে অবক্ষয়ের সেসব দৃশ্য অবলোকন করেছিলেন প্রত্যক্ষভাবে। এই অপ্রার্থিত অভিজ্ঞতা ব্যাপকভাবে ছায়া ফেলেছিল তাঁর কবিতাময় দিনরাতের আলোয় ও অন্ধকারে। কবি হিসেবে এসব ঠেকানোর ক্ষমতা তো তাঁর ছিল না, কোনো কবিরই তা থাকে না। নিবিড়ভাবে সংবেদনশীল ও গভীরভাবে মানবপ্রেমী মানুষ হওয়ায় তিনি বহুমুখী যন্ত্রণার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তিনি সমাজের মঙ্গল চাইতেন কিন্তু সেটা করার শক্তি ছিল না তাঁর। এই অক্ষমতা পীড়া দিতো তাকে রাত্রিদিন। তিনি মূল্যবোধের অবক্ষয়ের স্রোতের কিনারে দাঁড়িয়ে দেখেছেন অধঃপতনের উলংগ উৎসব কিন্তু তাকে বুক দিয়ে আটকানো সম্ভব ছিল না তাঁর পক্ষে। মাছের পচন শুরু হয় মাথা থেকে আর সমাজের পতন আরম্ভ হয় রাজনীতি থেকে। সেদিনও অধঃপতনের নেতৃত্বে ছিল রাজনীতি। আর তাতে করে সংঘটিত হয়েছিল ‘প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধ’। তিনি ছিলেন অসহায় ও উপায়হীন দর্শক। সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে সেসব বেমালুম হজম করাও সম্ভব ছিলো না তাঁর পক্ষে। এমন মারাত্মক প্রেক্ষাপটে কবিতা ছিল তাঁর অগত্যা আশ্রয়। তিনি টি এস এলিয়টের পোড়ো জমি অবশ্যই পাঠ করেছিলেন। জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, শামসুর রাহমান প্রমুখ কবির ‘আধুনিক কবিতা’ সম্পর্কে তাঁর পাঠাভিজ্ঞতা ছিল টাটকা ও শানিত। কিন্তু তাঁর কবিতা সেই পোড়ো জমির নকল কপি নয়; তাঁর কবিতা জীবনানন্দ-সুধীন্দ্রনাথ-রাহমান-দের ‘ইউরোপ থেকে ধার করা বোধানলের বানানো’ ফসল নয়। জীবনের ও জগতের নেতিবাচক প্রপঞ্চসমূহ তিরি সর্বাধুনিক শৈলীতে উপস্থাপন করেছেন কবিতায় কিন্তু সেই সৃষ্টি পুরোটাই স্বদেশীয় ও খাঁটি। আরোপিত দুঃখবোধ তাঁর নয়, বানানো নেতিবাচকতার প্রকল্প নয় তাঁর সৃষ্টিকর্ম। আর তিনি মরুভূমি হয়ে ওঠা জীবনের ছবি আঁকলেও সেখানে সঞ্চার করতে পেরেছেন শিল্পের প্রাণরস। সত্যনিষ্ঠ কাব্যভাবনা, স্বদেশীয় উপকরণ, নান্দনিক প্রাণরসের জোগান এবং অন্তরঙ্গময়তায় সচ্ছল উপস্থাপনার নান্দনিক সৌকর্যে তাঁর ক্ষুব্ধ অনুভবের সৃষ্টি হয়ে উঠেছে পাঠে ও উপভোগ্যতায় মোহময়। তিনি বেদনা উপহার দিয়েছেন পাঠকের কাছে সেটা হয়ে উঠেছে মধুর; তিনি গদ্যের বিষয় উপস্থাপন করেছেন পাঠক-শ্রোতার কানে, সেটা হয়েছে উঠেছে সংগীত।

মনে হয় আমি আর একা নই। আমরা সবাই নষ্ট ডিমের খোলস
ভেঙ্গে গেলে ভিতরে কেবল কালিমার লাভাস্রোত। লোলজিভ
শুয়োরের অমানব অবৈধ সংক্রাম!
আমাদের গলগণ্ডে মাংস নয় আমাদেরই অনাচারী দেশ ফলিয়াছে।
এইসব অন্ধকারে আমি আজ- আমিও তো নষ্ট ডিম!
তাই প্রর্থনায় বলি, প্রায়শ্চিত্তে বলে উঠি
কেউ নেবে না যদি হে কাক তোমার চঞ্চুতে ভেঙ্গে ফেলো
আমার খোলস।
টুকরো টুকরো ভাঙ্গো আমার লোভের আত্মা গলিত বিবেক।
তারপর যেখানে মানুষ আজো দেশকে স্বদেশ বলে
আকাশকে আলোর জমি, বনভূমি যাদের নিকট আজো বিলোল উদ্যান।’
[‘নষ্ট ডিমের খোলসের শব্দ’, অগ্রন্থিত কবিতা]

কিন্তু সবচেয়ে বড়ো কথা- তিনি সমাজের নষ্ট হতে থাকার সিরিজ ছবি এঁকেছেন কিন্তু নিশ্ছিদ্র আধুনিক কবি হওয়ার লোভে নেতিবাচকতার খোঁয়াড়ে বন্দি থাকেননি–নষ্টামির রাষ্ট্রদূত হতে চাননি। তিনি সেই নষ্ট সমাজের জমিতেই শুভবাদী সবুজ ফসলের চাষাবাদের স্বপ্নমাখা প্রাক্কলন তুলে ধরেছেন। রোমান্টিকতার হালকা ছোঁয়া দিয়ে তিনি আধুনিক কবিতাকে অবক্ষয়ের সংক্রামক ব্যাধি হওয়া থেকে সরিয়ে এনে সৃষ্টিশীল বসন্ত বাতাস করে তুলেছেন। সেই হাওয়া অক্সিজেন দেয়, নবায়ন করে, পুষ্পিত করে,- ফুল ফোটায়। সেখানে প্রেমানুরাগী হৃদয় খুঁজে পায় অন্তরঙ্গ অনুভবের সুরভিত উঠোন।

নিরীহ প্রাণীর এত মর্মন্তুদ মৃত্যুৎসব যেখানে এখনো নেই-
যেইখানে কোথাও গহন গর্তে অবৈধ শিশুর মতো ফেলে দাও
আমাকে হে কাক!
থ্যাতা ইঁদুরের মতো ঠোঁটে বিঁধে ফেলে দাও
হে কাক, হে সুধাকণ্ঠী কাক!
আমরা দু’জনে এসো সন্ধি করি
তুমি দাও আমাকে নতুন জন্ম,
আমি দেই তোমাকে নুতন ভাবে
কোকিলের কোমল গীতিকা!
[‘নষ্ট ডিমের খোলসের শব্দ’, অগ্রন্থিত কবিতা]

আবুল হাসান তাঁর এক কবিতায় বলেছেন যে, মানুষ তার চিবুকের কাছেও অচেনা ও একা। কিন্তু যাপিত জীবনে অথবা কবিজীবনে তিনি জীবনানন্দ দাশের মতো সবখানি নিভৃতচারী ছিলেন না; তাঁর কিছু বন্ধুবান্ধব ছিল। তাছাড়া সাংবাদিকতা করার জন্য তাঁকে মিশতে হতো নানাজনের সঙ্গে, প্রত্যক্ষদর্শী হতে হতো নানা ঘটনা অথবা দৃশ্যের। তারপরও তাঁর একটা নিজস্ব ভুবন ছিল; আপনার একটা দুনিয়া ছিল। সামাজিক রাজনৈতিক ঘটনাবলি অথবা প্রপঞ্চসমূহ অন্যদের সঙ্গে ভাগ করেও আলোচনা করা যায়। কিন্তু অতি সংবেদনশীল ও হৃদয়বান মানুষের কিছু নিজস্ব বাসনা থাকে, গোপন কামনা থাকে, অঘোষিত ব্যর্থতাবোধ থাকে এবং সেসব থেকে অর্জিত প্রাতিস্বিক অভিজ্ঞান অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি না-করার বেদনা থাকে। আবুল হাসানের তেমন কিছু বেদনা ছিল। অথবা তেমন কিছু বেদনার কথা জানতেন তিনি। বেদনা না হলে চলে না কবির। আবুল হাসান নিবিড়ভাবে সমাজসচেতন ও মানবপ্রেমী কবি হওয়ায় রাষ্ট্রীয় যন্ত্রণা ও সামাজিক বেদনা তাঁর হাতে মেধাকে আলোড়িত করা ও চেতনাকে সোচ্চার করা কবিতা হয়ে উঠেছে। কিন্তু যে ঘটনা ঘটে সামাজিক চক্ষুর আড়ালে, যে ভাঙনের শব্দ পৌঁছায় নাকো ভিড়ের কানে, কিংবা যে গানের সুর ছুঁতে পারে না জনতার বাণী, একজন গহনচারী শক্তিমান কবি সেসবেরও অভিজ্ঞান লাভ করেন স্বসৃষ্ট নিভৃতির ব্যালকনিতে বসে। আবুল হাসান ছিলেন তেমনি একজন কবি। সাধারণত সবার নজর থাকে বাগানের দিকে, আর তাঁর ছিল একটি আপন বৃক্ষ লোকচক্ষুর তৎপরতার আড়ালে। তিনি সেই বৃক্ষটিকেই বাগানে উন্নীত করেছেন– গোড়ায় তার সার দিয়ে মাটি দিয়ে আর শেকড়ে প্রবাহিত করে সংগোপন নদী। সেই নদীর স্রোতে বাজে অন্তরঙ্গ ভাঙনের সুর, সেই বাগানে মরমিয়া গান করে ব্যথার কোকিল। স্রোতের সেই সুরের, কোকিলের সেই গানের বাণীর খোঁজ না নিলেও চলে, তাদের সুর বিসমিল্লাহ খানের বাণীহীন সানাই বাদনের মতো মাতোয়ারা করে দিতে পারে সংগীত পিয়াসী হৃদয়। তাঁর সব কবিতাই সবধরনের পাঠকের জন্য নয়; কিছু কিছু কবিতা তাদের জন্য যারা যাপিত জীবনে পাড়ভাঙা নদীর আঘাত সয়েছেন আপন চিন্ময় জমিনে অথবা প্রত্যাশা শব্দটি যাদের হৃদয়ে আশাভঙ্গের মতো বেজে ওঠে কোনো অন্তরঙ্গ একাকিত্বে।

একটি বিড়াল ভেঙ্গে ফেললো একটি গেলাশ, তার শব্দে ভেঙ্গে গেলো
ঘুম, দুটি চোখ ভাঙ্গলো নক্ষত্রবাড়ির আলো কোমল সবুজ,
অই আমলকি গাছের ডাল, অর্জিত সুখ।
কখনো এমন হয় তুমি খুব গোপনে ভাঙ্গো
সংসারের সব সোনা রুপা,
তাদেরও ভাঙ্গার শব্দ কি রকম ভাবে আমি শুনে ফেলি,
অথচ কপাল ভাঙ্গছে ক্রমাগত ভাঙ্গছে কপাল,
কপাল ভাঙ্গার শব্দ কোনোদিন কেন আমি শুনতে পারিনি?
তার শব্দ কারা শোনে? যারা ভাঙ্গছে আমার কপাল?
[‘খসড়া’, অগ্রন্থিত কবিতা]

কবিমাত্রেই প্রেমভাবনার মুখপাত্র। তারা ব্যক্তিগত জীবনেও কোনো না কোনো ভাবে প্রেমের অনুসারী হয়ে থাকেন। প্রেম মানে শরীর-মনের উজ্জ্বল অন্তরঙ্গ পিপাসা, এমনটাই মূলভাবনা। কিন্তু যুগপৎ নৈসর্গিক ও আধ্যাত্মিক প্রেমের প্রবল প্রবক্তা পারস্যের কবি মাওলানা রুমির দৃষ্টিতে প্রেম হচ্ছে পৃথিবীর সকল রোগ ও সমস্যার সর্বরোগহর ঔষধ বা প্যানাসিয়া। তিনি তাঁর এক প্রেমের কবিতায় বলেছেন:

      স্বাগত ওগো প্রেম

তুমি আমাদের সুন্দর উন্মাদনা
তুমি আমাদের সকল বিকারের প্রতিকার
তুমি আমাদের অহঙ্কার ও অন্তর্নিহিত
রোগের ঔষধ,
তুমি আমাদের জন্য আফলাতুন ও জালীনুস।
[মনিরউদ্দীন ইউসুফ কৃত বঙ্গানুবাদ]

রুমি আরও বলেছেন, ভালোবাসা হলো সুস্থ থাকার উপায়। ভালোবাসা হলো সবকিছু বদলে দেবার জাদু। ভালোবসা হলো স্বর্গীয় সৌন্দর্য দেখার আয়না। তিনি পরামর্শ দেওয়ার ভঙ্গিমায় বলেছেন, ভালোবাসা হচ্ছে একটি প্রবহমান নদী, তার থেকে কিছু চুমুক জল তুমিও পান করে নাও। আবুল হাসানের কবিতায় রুমির প্রেমভাবনার ছাপ দেখা যায়। তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ মাত্র তিনটি কিন্তু আবিস্কৃত অগ্রন্থিত কবিতার সংখ্যাও প্রচুর। মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি সমাজের অনিয়ম অসংগতি, অনাচার, অপশাসন, দুঃশাসন, অপ্রেম ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর মানোত্তীর্ণ কবিতা রচনা করেছেন। সে হিসেবে তাঁকে সমাজসচেতন কবি এবং মানবতার কাছে দায়বদ্ধ কবি হিসেবে শনাক্ত করা যায়। সেটা করলে তা ভুলও হবে না। কিন্তু সবকিছুর আড়ালে আবুল হাসান এক প্রেমাকুল সত্তা, একটি প্রেমকাতর হৃদয়। তাঁর প্রেম গভীরচারী; তাঁর প্রেম হৃদয়গামী; তাঁর প্রেম স্পর্শকামী। একজন যুবক পুরুষ হিসেবে তাঁর কামানবাসনার কেন্দ্র ছিল যৌবনবতী নারী। সে নারী আলোকিত সত্তার অধিকারী। তাঁর দুটি কাব্যগ্রন্থের নাম ‘যে তুমি হরণ করো’ এবং ‘পৃথক পালঙ্ক’। নাম দুটি গভীর ব্যঞ্জনায় নিবিড়ভাবে প্রেমবাচক। সমাজের প্রেমহীন গতি ধরা পড়েছে তাঁর গভীর দৃষ্টিতে । তিনি বলেছেন, ‘এখন প্রেমিক নেই, যারা আছে তারা সব পশুর আকৃতি।’ [সম্পর্ক’, পৃথক পালঙ্ক] আবুল হাসানের প্রেম মানে রক্তমাংসের দাবি; সেটা কোনো নিস্কাম প্রেম (Platonic love) এর ব্যাপার নয়। একজন আধুনিক ও সত্যনিষ্ঠ সাহসী মানুষ হিসেবে তিনি নিজের সকল সবলতা-দুর্বলতা, আলো-অন্ধকার, সৌন্দর্য-সৌন্দর্যহীনতা, দিন-রাত এবং ঐশ্বর্য-অভাব নিয়ে প্রেয়সীর মুখোমুখি হতে চেয়েছেন, তাকে ভালোবেসে জয় করে নিতে চেয়েছেন। কোনো ছলচাতুরী নেই তাঁর প্রেমে, নেই কোনো অভিনয় । তিনি ভালোবাসার মানুষটিকে তার ‘মানবীয় সমগ্রতা’ নিয়েই ভালোবেসেছেন । তিনি মনে করেছেন, বিশ্বাস করেছেন যে, ভালোবাসা হচ্ছে নদী যেখানে স্নান করে শুদ্ধ হওয়া যায় ধুয়ে ফেলে যাবতীয় দুর্বলতার ধুলোময়লা। নিজের মাঝে যা-কিছু অশুদ্ধতা আছে তা শুদ্ধ করে নিতে চেয়েছেন প্রয়সীর ঝরনাধারায় বিছিয়ে দিয়ে আকুল সত্তা। প্রেয়সী কাছে তাঁর আবেদন-আহ্বান তেমনি অকৃত্রিম, খোলামেলা ও আকর্ষণনিবিড়। বাংলা কবিতায় প্রেমের এই ভাষ্য অনেকখানিই নতুন, অভূতপূর্বপ্রায়। বাংলা কবিতায় প্রেমভাবনা এক নতুন মাত্রা এবং অভিনব ব্যঞ্জনা লাভ করেছে তাঁর হাতে। এই মাত্রা– এই ব্যঞ্জনা পুরোটাই ইতিবাচক জীবনদর্শনে সমৃদ্ধ।

এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া
তোমার ওখানে যাবো, তোমার ভেতরে এক অসম্পূর্ণ যাতনা আছেন
তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই শুদ্ধ হ’, শুদ্ধ হবো, কালিমা রাখবো না!


এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া
যে সকল মৌমাছি, নেবুফুল, গাভীর দুধের শাদা, হেলেঞ্চা শাকের ক্ষেত
যে রাখাল আমি আজ কোথাও দেখি না-
তোমার চিবুকে তারা নিশ্চই আছেন!

তোমার চিবুকে সেই গাভীর দুধের শাদা, সুবর্ণ রাখাল
তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই কাছে আয় তৃণভূমি
কাছে আয় পুরনো রাখাল!
আমি কাছে যাবো আমি তোমার চিবুক ছোঁবো, কালিমা ছোঁবো না!’
[‘তোমার চিবুক ছোঁবো, কালিমা ছোঁবো না’, যে তুমি হরণ করো]

আবুল হাসানের কবিতায় অন্তরঙ্গ প্রেমানুভবের প্রাতিস্বিক ছাপ লক্ষণীয়। কবি সমাজের আর দশজন মানুষের প্রতিনিধি বা মুখপাত্র তাই ব্যক্তি আবুল হাসানের প্রেমপিয়াসা আসলে কি ছিল, সেটা মেটেছিল কি না, সেসব আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তাঁর প্রেমবোধ- ভালোবাসার অভিজ্ঞান। আবুল হাসানের ভালোবাসার ভাবনা অবশ্যই মিলনাকাক্সক্ষী; কিন্তু সেটা কেবল মিলনের জন্য মিলন নয়। ভালোবেসে ভালোবাসার মানুষের কাছে বসে তিনি নিজেকে শুদ্ধ করে নিতে চেয়েছেন, তেমনি প্রেয়সী চিবুক ছুঁতে চেয়েছেন, কোনো কালিমা নয়। কিন্তু কেন? আবুল হাসান ছিলেন আলোকিত সত্তার অধিকারী একজন মানুষ । তিনি সন্ন্যাসী ছিলেন না কোনোভাবেই কিন্তু গড়পড়তা সাধারণত্বের ঊর্ধে ওঠা একজন মানুষ। ভীষণভাবে আত্মজাগ্রত ও আত্মসমালোচনাকারী মানুষ হয়েও আবুল হাসান ছিলেন সতত সমাজসচেতন। তিনি তাঁর সমাজ বিনির্মাণের বিশ্বাসের অনুকূলে রচেছেন আরও বহু কবিতা। তাঁর ‘পাতা কুড়োনীর মেয়ে’ ধরিত্রীকে দেখা যায় রাস্তার ধার থেকে সেইসব মানুষদের কুড়োতে যারা আহত নিহত ‘পঙ্গু–তবু পুণ্যেভরা পুষ্প’। ধরিত্রী তার কুলো দিয়ে ঝাড়তে চেয়েছে ভেজাল মানুষদের যেভাবে শস্য মাড়াইয়ের উঠোনে বসে কুলো দিয়ে শস্য ঝাড়ে কৃষাণীরা, বের কের দেয় চিটা মরা দানা, আর যত পাতান। আবুল হাসান নিজেকে শুদ্ধ করে নিতে চেয়েছেন প্রেমের মোহন স্পর্শে, অনুরূপভাবে ভালোবাসার মানুষের মাঝে থাকা দুর্বলতাকে দূর করে শুধরে দিতে চেয়েছেন তার যাবতীয় দোষ। সমাজে সবাই চায় সফল মানুষ; সবাই এড়িয়ে চলতে দর্বল মানুষদের; সবাই উপেক্ষা করে ঘৃণা করে প্রচলিত ভাষায় কলংকিত মানুষদের। কিন্তু আবুল হাসান তাঁর অনন্যসাধারণ মানবপ্রেম, প্রাতিস্বিক মনস্তত্ত্ব আর অভিনব প্রেমভাবনা সহযোগে হয়ে উঠেছেন এক আলাদা কিসিমের মানুষ– অতুলনীয় কবি-ব্যক্তিত্ব। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও তিনি অনাবাদী রাখবেন না। তাঁর দুখ বহুবিধ ও বহুমুখী। যে সব পিছিয়ে পড়ে আছে সমাজে, যে মানুষ ভুল পথে গিয়ে লক্ষ্যহারা হয়ে পড়েছে, যে দোষতাড়িত হয়ে অন্যদেরও কষ্টের কারণ, তাদের প্রত্যেকের দিকে তাকিয়ে কষ্ট হয় তাঁর। তিনি পরিবর্তন চান–মানুষের পরিবর্তন। সে পরিবর্তন ইতিবাচক। তিনি নিজের পরশপাথরীয় স্পর্শে অন্যমানুষদের সোনার মানুষে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেন। এধরনের মানুষই প্রকৃত প্রেমিক হওয়ার যোগ্য– নর অথবা নারীর ব্যক্তিগত প্রেমিক এবং সমাজ অঙ্গনে মানবপ্রেমিক। প্রেমে ব্যর্থ হলেই দোষারোপ, চরিত্রহনন কিংবা প্রতিশোধ গ্রহণের উম্মত্ততার বিপরীতে শুভবাদী জোছনায় আলোকিত অভূতপূর্ব প্রেমচেতনার শিল্পরূপ তাঁর কবিতা।

যদি সে সুগন্ধী শিশি, তবে তাকে নিয়ে যাক অন্য প্রেমিক
আতরের উষ্ণ ঘ্রাণে একটি মানুষ তবু ফিরে পাবে পুষ্পবোধ পুনঃ
কিছুক্ষণ শুভ্র এক ¯িœগ্ধ গন্ধ স্বাস্থ্য ও প্রণয় দেবে তাঁকে।
একটি প্রেমিক খুশি হলে আমি হবো নাকি খুব আনন্দিত?
——— ———-
আর যদি সে কিছু নয়, শুধু মারী, শুধু মহামারী,
ভালোবাসা দিতে গিয়ে দেয় শুধু ভুরুর অনল
তোমরা কেউই আঘাত করো না তাকে, আহত করো না!
যদি সে কেবলি বিষ- ক্ষতি নেই- আমি তাকে বানাবো অমৃত!
[‘কল্যাণ মাধুরী’, পৃথক পালঙ্ক]

মানুষ যখন তার লোভ-লালসা-রিরংসা-লিপ্সাকে জয় করতে সক্ষম হয় সংকল্পে ও সাধনায়, কথায় ও কাজে, তখন সে গড়পড়তা সাধারণত্বকে ছাপিয়ে হয়ে ওঠে আসাধারণ মানুষ, প্রকৃত অর্থে আলোকিত সত্তা। সমাজে এধরনের মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে এবং এধরনের মানুষের হাতে সমাজের ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব থাকলে, সম্মিলিত ব্যঞ্জনায় মানুষের জীবন হয়ে উঠতে পারে আলোকিত উপভোগ্যতায় বসবাসযোগ্য। মানুষের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য থাকে সেটা। কিন্তু অনেক সময় স্বাধীনতা-উত্তর দিনরাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের কপালে জোটে মোহভঙ্গের নিদারুণ যন্ত্রণা। কারণ আলোর জামা পরা অন্ধকার মানুষেরা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন যাদের আগেভাগে চেনা যায় না বলে তাদের প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা স্থাপন করা হয় । তারপরও মানুষের ধারা অব্যাহত যতদিন, ততদিন আশা। রবীন্দ্রনাথ একবার বলেছিলেন যে মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ। আবুল হাসানও তেমনটি মনে করেছেন। তিনি ভেবেছেন যে অতীতের পাহাড়সমান ব্যর্থতা ও অন্ধকারকে একপাশে সরিয়ে রেখে নতুন প্রজন্মকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এমনই ইতিবাচক ভাবনা ও বিশ্বাস ছিল তাঁর। তিনি মানুষের মাঝে সেই বোধ ও চেতনাকে জাগ্রত করতে চেয়েছেন হাতিয়ার করে হৃদয়স্পর্শী আপন কবিতাকে। তিনি যাবতীয় যাতনা ও বিষ স্বকণ্ঠে ধারণ করে হয়ে উঠতে চেয়েছেন নীলকণ্ঠের উপমা। তাই তো তিনি কবিজীবনের এক পর্যায়ে কবিতায় নিজেকে ‘কালো কৃষক’ বলে ঘোষণা করেছেন এবং আপন উদ্দেশ্যকে তুলে ধরতে বলেছেন যে দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও তিনি অনাবাদী রাখবেন না। তিনি সেই আবাদের ব্যঞ্জনাগর্ভ সিলেবাসের বর্ণনা তুলে ধরেছেন। শোককে শক্তিতে পরিণত করা এবং ব্যর্থতাকে রূপায়িত করা সোনালি সাফল্যে,– এই মহামন্ত্র তাঁর নিপুণ কারিগরিত্বে চিরসবুজ শিল্প হয়ে উঠেছে।

বুঝি তাই দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও তুমি অনাবাদী রাখবে না আর
এম্ফিথিয়েটার থেকে ফিরে এসে উষ্ণ চাষে হারাবে নিজেকে, বলবে
ও জল, ও বৃক্ষ, ও রক্তপাত, রাজনীতি ও নিভৃতি, হরিৎ নিভৃতি
পুনর্বার আমাকে হোমার করো, সুনীতিমূলক এক থরোথরো দুঃখের
জমিন আমি চাষ করি এ দেশের অকর্ষিত অমা!’
[‘কালো কৃষকের গান’, যে তুমি হরণ করো]

কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক-সামাজিক অবক্ষয়ে নষ্টপ্রায় পৃথিবীতে একজন কবি একা কিইবা করতে পারেন! আবুল হাসান শাশ্বত শিল্পধর্ম এবং আধুনিক কবিতার সমস্ত টেকনিক কোঁচায় নিয়ে কবিতা রচেছেন । তাঁর কোনো পঙক্তিকেও অশৈল্পিক অভিধা দিয়ে খারিজ করার অথবা সেই মর্মে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আবার একইসঙ্গে এটাও সত্য যে তাঁর কোঁচায় কবিতার ব্যাকরণ ছিল কিন্তু হৃদয়ভর্তি ছিল মানবপ্রেম ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। মহামানবিকতার সম্রাট বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কবিতার প্রকরণের প্রশ্নকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে নিজ কবিতাকে করে তুলতে চেয়েছিলেন পরাধীনতা বিতাড়ন এবং অবিচার-শোষণ-অসাম্য কুশাসন-কুসংস্কারের অন্ধকারকে ঝেটিয়ে দূর করার আলোক-হাতিয়ার। তাঁর ভাবনার ভূগোল বিশাল– পরাধীন ভারতীয় উপমহাদেশ কিন্তু বৃহত্তর অর্থে সমগ্র বিশ্ব। আবুল হাসানও চেয়েছেন শিল্পসাহিত্য জনমুখী হোক– সমাজ পরিবর্তনের প্রেরণা হোক। তিনি নজরুলের মতো করে আধুনিক কবিতার শিল্পগত শর্তাবলিকে অবজ্ঞার হাওয়ায় উড়িয়ে দিতে চাননি । বিরাজিত শিল্পধর্মকে মান্য করেই রচিত কবিতার মাঝে দায়বদ্ধতার শর্তটি পূরণ করে দিতে চেয়েছেন এবং দিয়েছেন তিনি। তাঁর আগে একাজটি ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতায় ও পুরস্কৃত প্রশংসায় করেছেন ‘লোক লোকান্তর’-‘কালের কলস’-সোনালি কাবিন’-এর আল মাহমুদ। আবুল হাসান মোহমুগ্ধতামাখা উচ্চারণে বলেছেন—

উদিত দুঃখের দেশ, হে কবিতা হে দুধভাত তুমি ফিরে এসো!
মানুষের লোকালয়ে ললিতলোভনকান্তি কবিদের মতো
তুমি বেঁচে থাকো।
তুমি ফের ঘুরে ঘুরে ডাকো সুসময়!
রমণীর বুকের স্তনে আজ দুধ নেই প্রেমিক পুরুষ তাই
দুধ আনতে গেছে দূর বনে!
শিমুল ফুলের কাছে শিশির আনতে গেছে সমস্ত সকাল।
সূর্যের ভেতরে আজ সকালের আলো নেই সব্যসাচীরা তাই
চলে গেছে, এখন আকাল
কাঠুরের মতো শুধু কাঠ কাটে ফল পাড়ে আর শুধু খায়!
[‘উদিত দুঃখের দেশ’, যে তুমি হরণ করো]

আবুল হাসান কবি হিসেবে ছিলেন অমৃতের সন্তান। হাজারো বেদনার বিষ গলাঃকরণ করেও প্রাণবান থেকেছেন এবং শুনিয়ে গেছেন ইতিবাচক যাপনের গান। জীবনের নান ক্লেদ-গ্লানি-ব্যর্থতা-অসুখ-বিচ্ছেদ বার বার আঘাত হেনেছে কিন্তু তিনি প্রকৃতির মতো অপরাজিত ও সৃষ্টিশীল থেকে গেছেন। তিনি কখনোই হতাশার প্রশংসাকারী কিংবা মুখপাত্র হতে চাননি। নশ্বর, সংক্ষিপ্ত ও অনিশ্চিত আয়ুর জীবনে বেঁচে থাকাটাই জীবনের প্রধান ধর্ম বলে তিনি জেনেছেন। জীবন যদি বিষও হয় তিনি তাকে পান করতে চেয়েছেন। তিনি প্রতিকূল জীবন থেকে পালিয়ে বেড়াননি, তাকে অনুকূলে আনার জন্য সংগ্রামের পক্ষাবলম্বন করেছেন। তিনি উচ্চারণ করেছেন: ‘ফিরে ফিরে তাই এই নরকেও বেঁচে থাকি, বেঁচে থাকি / বেঁচে থাকতে চাই!’ [‘ফিরে ফিরে এই নরকেও’, অগ্রন্থিত কবিতা]

আবুল হাসান ভাবনায় ও প্রকাশে অভিনবত্ব পিয়াসী কবি। তিনি জন্মগতভাবেই নিবিড় কবিপ্রতিভার অধিকারী ছিলেন বলে তাঁকে অভিনবত্ব আনয়নের জন্য নিরীক্ষাধর্মিতায় রাতদিন পরিশ্রম করতে হয়নি। অক্ষমের দুর্বলতা ছিল না বলে কষ্টকল্পনার কোষ্ঠকাঠিন্য তাঁর সৃষ্টিকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁর সৃজনশীল মেধা ও অনন্য বোধ তাঁকে নিজস্বতার উর্বর মাঠে নিয়ে গেছে বার বার। গতানুগতিকতার একঘেয়েমি তাঁর ভাবনা কিংবা কবিতা কোনোটাকেই দখল করতে পারেনি। অন্তরের গভীর উপলব্ধি ও শানিত মেধা তাঁকে বলিয়েছে: ‘প্রতিটি নতুন কথা বলাটাই আমাদের প্রেম,/ প্রতিটি নতুন শব্দই হলো শিল্পকলার সীমাঃ’[‘জ্যোৎস্নায় তুমি কথা বলছো না কেন’, অগ্রন্থিত কবিতা] এই অভিনবত্ববোধ তাঁর প্রেমভাবনা, প্রকৃতিভাবনা ও রাজনৈতিক চেতনাকে প্রকাশ করতে নতুন শব্দ, নতুন উপমা ও নতুন চিত্রকল্প এনে দিয়েছে। তাঁর কবিতারাজি আবহমান কবিতার সঙ্গে সংগতি রেখেও নতুন রূপে-রসে-রঙে-স্বাদে-গন্ধে আবুল হাসানের সৃষ্টি হয়ে উঠেছে। কুটিলতামুক্ত জীবনবোধ, মানবিক আদর্শ, উদার প্রেমচেতনা, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, শান্তির পক্ষাবলম্বন ইত্যাদির সঙ্গে অনন্য শিল্পবোধ মিলেমিশে হৃদয়গ্রাহী উজ্জ্বল শিল্প সৃষ্টিতে সফল ভূমিকা পালন করেছে।

ক.
মার্কিনী কবিতার মতো নয়! শব্দকে বরং হতে হবে
সন্নাসী ভিক্ষুক পোড়া ভিয়েতনাম! বোমা অগ্নি, আহত আঘাত!
রাজ্যচ্যুত দূরাচারী সিংহাসন, পঙ্গু স্বাধীনতা। পাগলা মেহের আলী।
সব ঝুট হ্যায়।
[‘কবিতা’, অগ্রন্থি কবিতা]

খ.

গণিকার লণ্ঠনের মতো তুমি যখোন দাঁড়াও সেইখানে
চুপে চুপে তার দাগ মেখে নিয়ে চলে আসি নতুন আমার সার্টে
হে গোপন, হে আমার সুখ!
[‘হে আমার সুখ’, অগ্রন্থিত কবিতা]

শুধু সহজাত কবিত্বশক্তির অধিকারী শক্তিমান কবিরাই কঠিন কথা সহজভাবে উপস্থাপন করতে পারেন এবং সহজ কথার শরীরে পরিয়ে দিতে পারেন শৈল্পিক আড়ালের পোশাক। অন্যরা শব্দের সাথে বিফল কুস্তি লড়াই করে যান। আবুল হাসান ছিলেন সহজাত কবিত্বশক্তির অধিকারী একজন কবি। তিনি কঠিন শৈল্পিকতায় লিখেছেন ‘রূপসী হিংসা তার ডোরাকাট বিদ্যুৎগতিতে খ্যাতিমান!’, ‘অশ্রুতে লুকিয়ে ফেলি আরশোলায় আহত শহর।’, ‘শাহী গণিকাদের গোলগাল নাভির অপেরা হাউস!’, ‘কখনো কান্নার কাছে মুখ নিয়ে মানুষ দেখিনি!’, ‘আমি ভুলে গিয়েছিলাম রাজনীতি একটি কালো হরিণের নাম!’, ‘আমি ভুলে গিয়েছিলাম বজ্রপাতের দিনে/ বৃক্ষদের আরও বৃক্ষস্বভাব!’, ‘পথের কাছে পাখিকে দেখে মনে পড়েছিল আমার হারানো কৈশোর!’, ‘অনেক হাত থাকে যারা অন্ধকার থেকেই পরম আলো কুড়ায়’, ‘লিমিটেড কোম্পানীর কোকিল স্বভাবা মেয়ে’, ‘আমরা কেউ চিনি না কাউকে ব্যক্তিগত পোশাক পরলে!’, ‘যুবতীর স্তনের ভিতরে লাবণ্যে লোহা টলটল করে-’ প্রভৃতি আবুল হাসানের গভীর ও গ্রন্থিবহুল জীবনবোধ-শিল্পবোধের পরিচয় বহন করে। তিনি উপমাপ্রধান ভাষায় গভীর অথচ সম্মোহনযুক্ত আড়াল রচনা করেছেন। কবিতা হয়ে উঠেছে হৃদয়ের মতোই আলো-আঁধারিময় এবং অমূল্য।

প্লাস্টিক ক্লিপের মতো সহস্র কোকিল যেই বনভূমি গেঁথে নেয়
সবুজ খোঁপায় ভোরবেলা-ময়ূরের পেখমের মতো খোলা রোদে বসে
ব্লাউজের বোতাম লাগিয়ে মিস্ট্রেস আসে ইশকুলে আর
কয় ঝাঁক বালকের নির্দোষ নিখিল ভরা ক্লাসরুমে এসেও সে শোনে

বনখোঁপা বাঁধা কোকিলের কাজল কুজন তার চুলে, চমৎকার
চিরোল গ্রীবায়, শেষে গৌর লাজুক শিয়রে শিহরিত শুধু
পেতে গিয়ে এক হারানো প্রেমের ঘ্রাণ, বয়ে নেয় সে তখন
কী যে এক আদ্র পরাজয় তার আত্মব্যস্ত অতীতের অথই সীমায়!’
[‘মিসট্রেস ঃ ফ্রি স্কুল স্ট্রীট’, রাজা যায় রাজা আসে]

আবুল হাসানের জীবনবোধ এবং যাপিত জীবনের অভিজ্ঞান দুই-ই ছিল শানিত, সূক্ষè ও গভীর। অন্যদিকে তাঁর কাব্যবোধ ও শিল্পশক্তি ছিল ক্ষুরধার এবং অভিনবত্বে সমৃদ্ধ। ফল এই যে, তিনি জটিল অভিজ্ঞান ও গ্রন্থিবহুল জীবন-জিজ্ঞাসাকে সহজ শব্দের আঁচড়ে নান্দনিতায় উত্তীর্ণ শিল্প করে তুলেছেন। তাঁর সহজ শব্দের শিল্প যাবতীয় তারল্য এড়িয়ে হয়ে উঠেছে অনিঃশেষ উপভোগ্যতার আধার। অনেকটা সহজতায় এসব শিল্পের নান্দনিক রস আস্বাদন করা যায়। অনন্যতা হচ্ছে এই যে সেই রস ফুরিয়ে যায় না, শেষ হয়ে যায় না পাঠকের পাঠ ও পানের পিপাসা। একটি উদাহরণ:

এতটা জীবন চলে গেল, তবু কী আশ্চর্য আজো কি জানলাম ঃ
চড়–ইয়ের ঠোঁটে কেন এত তৃষ্ণা, খড়ের আত্মায় কেন এত অগ্নি
এতটা দহন!

গোলাপ নিজেই কেন এত কীট, এত মলিনতা নিয়ে তবুও গোলাপ
একটি ফুলের কেন এত গাঢ় ঘুম আর
তখোন আমরা কেন তার মতো ঘুমুতে পারি না!
[‘অসহায় মুহূর্ত’, পৃথক পালঙ্ক]

শতবছর কবিতা লেখার মতো শক্তি নিয়ে আবুল হাসান স্বল্পায়ু ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি জীবদ্দশায় তাঁর স্বপ্ন পূরণ হওয়ার কোনো প্রশ্ন তো দূরের কথা, এতটুকু সম্ভাবনাও দেখতে পাননি। আমৃত্যু দেখেছেন শুধু বছর ফুরোলে নতুন বছরে নব হতাশার আবরণ উন্মোচন। তিনি হাতাশায় ভেঙে পড়েননি, মনের দিক থেকে হাল ছেড়ে দেননি। কিন্তু রাষ্ট্র-সমাজ-মানুষের পুঞ্জিভূত ব্যর্থতা তাঁর অন্তরঙ্গ বেদনাকেও বাড়িয়ে চলেছিল ক্রমপুঞ্জিভূত মাত্রায়। আশা-নিরাশার দোলা তাঁকে দুলিয়ে যাচ্ছিলো বেশি বেশি করে। তথাপি তিনি আনন্দ-বেদনার ভাষায় কবিতা লেখায় বিরতি দেননি একটি দিনের জন্যও। তিনি যেসকল স্বপ্নের কথা কবিতায় তুলে ধরেছেন, সেসব স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের, তাঁর নয়। সেগুলো বাস্তবায়িত না হওয়া তাঁর ব্যক্তিগত কোনো ব্যর্থতা ছিল না। তাঁর কবিতারও কোনো ব্যর্থতা কিংবা ঊনতা নয় সেসব অনার্জন। কিন্তু একটা সার্বিক ও সামগ্রিক হতাশা তো ছিলই কবির প্রাণে। তিনি সেই হতাশার আগুনে পুড়ে ছাই হননি, হয়েছেন পরিশুদ্ধ সোনা। তাঁর সৃজনশীলতা পেয়েছে বিষয়ভাবনার নতুন নতুন উঠোন। সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে দক্ষ মালীর হাতে তিনি রোপেছেন নতুন নতুন চারা, ফুটিয়েছেন নতুন নতুন ফুল, ফলিয়েছেন বহুবিধ সোনালি ফসল। সৃষ্টিশীল মানুষেরা বেদনার সংস্পর্শে বেশি করে জেগে ওঠেন, তাদের সৃজনশীলতা নবায়িত হয় বেগবান হয়ে ওঠে নানা ধারায়। আবুল হাসানের ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটেছে। তিনি অকালে চলে গেছেন কিন্তু রেখে গেছেন সর্বকালের কদরযোগ্যতায় উত্তীর্ণ ফুল-ফসলের অনুপম বাগান। একজন শক্তিমান কবি হিসেবে তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন নিজের সৃষ্টিশীল কাজের মনোত্তীর্ণতা ও কালোত্তীর্ণতার যোগ্যতা সম্পর্কে। কোনো সৃজনশীল ব্যক্তিই মহৎ কবি হতে পারেন না যদি তার নিজস্ব একটা জীবন দর্শন না থাকে। আবুল হাাসনের নিজস্ব জীবনদর্শন ছিল। তিনি প্রেমে শুদ্ধতাগামী, সৃজনশীলতায় মানবকল্যাণমুখী। তাঁর বেদনার প্রকাশ অন্তরঙ্গ হলেও সেটা সবখানি ব্যক্তিগত লাভক্ষতির হিসাবজনিত নয়: সেসব বেদনার উৎসমূল একইসঙ্গে ব্যাপক মানবিক বিপর্যয়, সামাজিক অবক্ষয় ও রাষ্ট্রীয় আধঃপতন। তাঁর কবিতা এসমস্ত বেদনাকে ধারণ করেছে প্রাণে ও শরীরে। আর প্রাতিস্বিক কাব্যশৈলীর গুণে তারা রূপে-রসে-গন্ধে-প্রাণে হয়ে ইঠেছে সৃজনশীলতার বাগান। তিনি বিদগ্ধ পাঠকের জন্য বেদনার সৌরভ ম-ম একখানি অপরূপ বাগান রেখে গেছেন।

‘চলে গেলে- তবু কিছু থাকবে আমার: আমি রেখে যাবো
আমার একলা ছায়া, হারানো চিবুক, চোখ, আমার নিয়তি।
জল নেমে গেলে ডাঙ্গা ধরে রাখে খড়কুটো, শালুকের ফুল ঃ
নদীর প্রবাহপলি, হয়তো জন্মেও বীজ, অলঙ্কার-অনড় শামুক!


ফিরে যাবো সংগোপনে, জানবে না, চিনবে না কেউ;
উঠানে জন্মাবে কিছু হাহাকার, অনিদ্রার গান-
আর লোকে দেখে ভাববে-বিরহবাগান ঐ উঠানে বেশ তো মানিয়েছে!’
[‘অপরূপ বাগান’, পৃথক পালঙ্ক]

আবুল হাসান রচিত কবিতার বাগান রূপ ও অরূপ উভয় সৌন্দর্যকে ধারণ করে শাশ^ত মহিমায় বিরাজমান রয়েছে। সেই বাগানের ফুলে বেদনার ঘ্রাণ, সেই বৃক্ষরাজির পাতায়-শাখায় অন্তরঙ্গ ব্যথার সুর। আবুল হাসান যখন যে-বিষয় নিয়েই কবিতা লিখেছেন, অনুপম শৈল্পিকতায় তা উপভোগ্য শিল্পে উন্নীত হয়েছে। তাঁর কবিতার ঐশর্য হয়েছে জুতসই শব্দ, উপমা ও চিত্রকল্পে সৃষ্ট অভিনবত্ব আর নান্দনিক রসের অফুরান সচ্ছলতা। তাঁর কবিতার বাঁশিতে বেজে ওঠা বাঁশির সুর বারবার মীর তকী মীর-মীর্জা গালিবের গজলের কথা মনে করিয়ে দেয়। তকী-গালিব বিশেষত তাঁদের গজলে হৃদয়ের নিবিড় বেদনাকে শিল্পের বাগান করে তুলেছেন। সেখানে প্রবেশ করামাত্র বিদগ্ধ পাঠকহৃদয় তার প্রত্যাশিত সুধা পেয়ে যান। বিদেশী আগ্রাসনে বিধ্বস্ত প্রিয় দিল্লি শহর, উজাড়প্রায় সুখ-আনন্দের যাবতীয় বাগান,– মীর তকী মীর সেই ছবি এঁকে গেছেন অপরূপসুন্দর শৈল্পিকতায়। তাঁর সেই বর্ণনা পাঠে পাঠককুল কষ্ট পান বটে কিন্তু সেই কষ্ট তাঁদেরকে উজাড় হৃদয় বা বিধ্বস্ত শহর থেকে দূরে সরিয়ে না দিয়ে আরো কাছে টানে।

দিল ও দিল্লি দোনো আগার হ্যায় খারাব
পর কুছ লুতফ ইস উজড়ে ঘর মে ভি হ্যায়

জাভেদ হুসেন কৃত বাংলা অনুবাদ:

হৃদয় ও দিল্লি যদিও দুটোই নষ্ট হয়েছে
তবু এই উজাড় ঘরেও কেমন শান্তি!

আবুল হাসান ব্যক্তি, সামষ্টিক, বৈশ্বিক যাবতীয় দুঃখের বিষকে আপন কণ্ঠে নিয়েছেন এবং বিষজর্জরিত কণ্ঠে শুনিয়েছেন মর্মস্পর্শী গান। তিনি প্রাতিস্বিক দুঃখকে কবিতায় রূপ দিয়েছেন, সামাজিক ব্যাধি ও রাজনৈতিক নষ্টামিকে পঙক্তিমালায় সাজিয়েছেন; তিনি নর-নারীর প্রেমের আকুলতাকে শিল্পে রূপান্তর করেছেন। মানুষ তো এমনিতেই বহুবিধ বেদনার সাথে পরিচিত, হৃদয়বান মানুষেরা নানামুখী বেদনা উপভোগ করতে অভ্যস্ত। পিবি শেলীর সূত্রমতে বেদনার গান যদি মধুরতম হয়, তবে সমভাবে মধুরতম বেদনার কবিতাও। আবুল হাসান দিয়ে গেছেন অন্তরঙ্গ বেদনার অন্তরঙ্গ কবিতারাশি। সেসব কবিতা রচনার সময় তাঁর হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ঘটেছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু পাঠ করার সময় সেই রক্তক্ষরণের কথা মনে থাকে না সুহৃদ পাঠকের। আবুল হাসানের শৈল্পিক হাতে বেদনা মধুর হয়ে গেছে যা পাঠ করে “উজাড় ঘরেও কেমন শান্তি!”– এমনতর অনুভূতির সৃষ্টি হয়। পাঠক কবিতার নান্দনিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন, তার শৈল্পিক রস আস্বাদনে তৃপ্তি লাভ করেন এবং অন্তরঙ্গতার স্পর্শে নতুন অনুভবে জেগে ওঠেন। নিবিড় বেদনার অনুপম পঙক্তিমালা কণ্ঠে ধারণ করে সমর্থ পাঠক বলে ওঠেন, বাহ্ কী সুন্দর! এই হচ্ছেন আবুল হাসান।

আরও পড়তে পারেন

4 COMMENTS

  1. খুবই সমৃদ্ধ ও অসাধারণ বিশ্লেষণমূলক লেখনি। ধন্যবাদ ও শুভকামনা জানাই।

  2. আবুল হাসানের সেই সময়ের রাজনৈতিক চেতনা ও অভিজ্ঞানের কবিতা পরবর্তী সময়েও প্রাসঙ্গিক থেকেছে।

    সঠিক মূল্যায়ন ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা