প্রচ্ছদগদ্য'পাহাড় সমান বোঝা' রেখে চলে গেলেন ছড়াকার মানসুর মুজাম্মিল

লিখেছেন : তাজ ইসলাম

‘পাহাড় সমান বোঝা’ রেখে চলে গেলেন ছড়াকার মানসুর মুজাম্মিল


তাজ ইসলাম

‘পাখি রে তোর জীবন বড় সোজা
আমার জীবন আমার কাছে পাহাড় সমান বোঝা’-
তার জীবন তার কাছে পাহাড় সমান বোঝা হয়েই ছিল। জীবনের বোঝা বয়ে বেরিয়েছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। উল্লেখিত ছড়া পঙক্তি জনপ্রিয় ছড়াকার মানসুর মুজাম্মিলের। মানসুর মুজাম্মিল মারা গেছেন অল্প ক’দিন আগে।
১২ এপ্রিল ভোরে রাজধানীর হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের বিছানায় এই জীবনের ভারি বোঝা রেখে দুনিয়া ত্যাগ করেন। তার আগে রোগশয্যায় ছিলেন বছর দশেক। এই দীর্ঘ সময়ে মানসুর মুজাম্মিল জীবিত থেকে মৃতবৎ পড়ে ছিলেন। মুষ্টিমেয় হাতেগোনা দু একজন বন্ধু বান্ধব ছাড়া তার বিশাল পরিচিত জগত সংকোচিত হয়ে গিয়েছিল। তার এই দীর্ঘ সময়ে কে কতটা সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে ছিলেন তা জানা নাই। পৃথিবীতে কেউ কারও না। যতক্ষণ সচল আছেন বন্ধু সজনের দরদ ও ভীড় ততক্ষণই। একজন মানসুর মুজাম্মিল বলে কথা না।গোটা জগতই এমন। হয়ত মানসুর মুজাম্মিলের দীর্ঘ এই দুঃসময়ে অনেকেই পাশে ছিলেন।তবে মনে হয় না যতটুকু প্রয়োজন ছিল ততটুকু প্রশস্ত হাতের দেখা তিনি পেয়েছেন!
মানসুর মুজাম্মিল যে পরিসরে সচল ছিলেন সেখানে একটা সংকীর্ণ পক্ষ আছে। তাদের কাছে বিদ্যা,বুদ্ধি, কাজ, প্রতিভা সব মূল্যায়িত হয় দলীয় পরিচয়ে। দলের দাসানুদাস হলে তারা মহত্তম বলে মান্য করে। এর বাইরে শুভাকাঙ্ক্ষী বা সহমতের কেউ তাদের চিন্তার কাছাকাছি কাজে নিবেদিত থাকলেও ফিরে থাকায় না এই সংকীর্ণরা। এই কথা শুধু মানসুর মুজাম্মিলের বেলায় না সার্বিক অর্থেই তা প্রযোজ্য। মানসুর মুজাম্মিল জনপ্রিয় ছড়াকার ছিলেন। তার বহু ছড়া পঙক্তি ছড়াকার ও পাঠকদের মুখে মুখে উচ্চারিত হত। সমগ্র সমাজে কবি লেখকদের মূল্যায়ন যেভাবে হয়নি মানসুর মুজাম্মিলও সে পথেরই পথিক হয়ে রইলেন।
আমার মধ্য বয়সে মানসুর মুজাম্মিলের সাথে পরিচয়। তখনও আমার লেখাপত্র পত্র পত্রিকায় তেমন ছাপাটাপা হয় না। মানসুর মুজাম্মিল তখন আমাদের চোখে কাব্য ঈর্ষার পাত্র। পোষাকে চলনে কেতাদুরস্ত মানসুর মুজাম্মিল তখনও ছিলেন অমায়িক। এরপর বিভিন্ন সাহিত্য সভা সমাবেশে অগণিতবার দেখা সাক্ষাৎ। একবার লেখকদের কোন এক ভ্রমণ সভায় সারাদিন আমরা অনেকের সাথে একত্রে ছিলাম। তিনি (কুমিল্লা) চাঁদপুরের সন্তান।থাকতেন ঢাকার গোড়ান এলাকায়।

মানসুর মুজাম্মিলের বাবার নাম
মোঃ মনছুর আহমেদ
মা হালিমা বেগম।
জন্ম: ৩০ জুলাই ১৯৬৬ তার
ঢাকার ঠিকানা
গোড়ান, খিলগাঁও, ঢাকা

দশনাপাড়া, রাইপুর, শাহরাস্তি, চাঁদপুর হল তার গ্রামের ঠিকানা
একাডেমিক
বি.কম (সম্মান), এম.কম (হিসাব বিজ্ঞান), এলএল.বি অর্জন করেছিলেন।

অসুস্থ হওয়ার আগে কোর্টে আইনপেশায় নিজেকে নিয়োজিত করার চেষ্টা হয়তো করেছিলেন। ফেসবুকে এমন কিছু পোস্ট থেকে ধারণা করা যায় এ বিষয়টি, তবে শেষ পর্যন্ত সফল হননি । শেষ জীবনে সাংসারিক মোহমুক্তি ঘটেছিল তার। আধ্যাতিকতায় ডুবতে চেয়েছিলেন। তারপর হঠাৎ অসুস্থ। সেই থেকে মৃত্যু শেষ মুক্তি দিল তাকে । আমরা একবার কবি আমিন আল আসাদের নেতৃত্বে তার বাসায় গিয়েছিলাম।লালকুঠির পীর আহসানুল হাদীসহ অনেকেই ছিলেন। আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুসারে কবির হাত ধরতে চেষ্টা করেছিলাম।
মানসুর মুজাম্মিল প্রকাশনা জগতে পা রেখেছিলেন। লেখালেখি ছিল তার সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে। তিনি লিখতেন পত্র পত্রিকায়, সাহিত্যের বিভিন্ন কাগজে। তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে প্রকাশিত ছড়াগ্রন্থ তাওয়ায় জ্বলা রুটি, সোনার বরণ মেয়ে, চাঁদের হাসি, তাজা খুন, এক ব্যাগ অফিসার, হারিয়ে যাবার দিন, সবার সাথে আছি, পা চালিয়ে যাও, দশ আকাশ, সুগন্ধি গাছের কাছে উল্লেখযোগ্য। ফেসবুকেও সরব ছিলেন। শেষ দু বছর শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আর তেমন কাজ করত না। একদম আড়ালে চলে গিয়ে ছিলেন। আমরা ফেসবুক থেকে তার কয়েকটি ছড়া পাঠ করতে পারি।

শান্তি সুখে থাকতে চাই
পাখির মতো ডাকতে চাই
নদীর মতো চলতে চাই
ন্যায্য কথা বলতে চাই
খেয়ে পরে বাঁচতে চাই
মন-খুশিতে নাচতে চাই
ফুলের মতো গন্ধ চাই
অন্তমিলের ছন্দ চাই
মেঘের মতো ভাসতে চাই
পরান খুলে হাসতে চাই
সত্য-সুপথ ধরতে চাই
ভালো কাজে মরতে চাই।
(চাই ‘এক ব্যাগ অফিসার’ বই থেকে।
প্রকাশকাল 1997)।

টাকা- কড়ি আনাচ্ছ
উদ্বোধনী দিনে তুমি
কতো লোককে খানাচ্ছ।

এই যে দালান বানাচ্ছ
এই শহরের ধনী তুমি
সাইনবোর্ডটা টানাচ্ছ।
তুমি অনেক বড়ো বলে
মনে মনে যা নাচ্ছো!

এই যে দালান বানাচ্ছ।
টাকা কড়ি আনাচ্ছ ।

এতো টাকা আনতে যেয়ে
কার বাড়িতে হানাচ্ছ?
এই যে বাড়ি বানাচ্ছ?

(এই যে দালান বানাচ্ছ। মানসুর মুজাম্মিল)

কূটুম পাখি কুটুম
সুযোগ পেলে ছুটুম
শালি ধানের চিড়ে পেলে
একটুখানি খুটুম।

কুটুম পাখি কুটুম
আমি তুমি ওরা মিলে
সংঘ হবে জুটুম।

কুটুম পাখি কুটুম
কারো ভালো সোহাগ পেলে
মানুষ হয়ে ফুটুম।
(কুটুম পাখি)

মিথ্যা কথা বল্লি কা
না বলে তুই পরের জিনিস
ধল্লিকা

একটু দাঁড়া
কীসের তাড়া

আমার কথা না শুনে তুই
এমন করে চল্রি কা

উচিত কথা একটু শুনে
অমোন করে জল্লি কা
মল্লিকা?
(মল্লিকা ) এই লেখাগুলো এখনও তার আইডিতেই আছে ।

১৯৬৬ থেকে ২০২৬ তার জীবনকাল। সাহিত্য চর্চা করেছেন দীর্ঘ সময়। এই দীর্ঘকাল সাহিত্য চর্চাকালে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা অতি নগণ্য। তার প্রকাশিত অপ্রকাশিত বইয়ের সমন্বয়ে মানসুর মুজাম্মিলের লেখার সমগ্র প্রকাশ হওয়ার দাবি রাখে। পত্র পত্রিকায় ছড়ানো ছিটানো লেখাগুলো একত্র করে বই আকারে প্রকাশ করা জরুরি। না হয় এক সময় কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে চিরতরে। কে নিবে এই দায়িত্ব? কিন্ত নেওয়া কর্তব্য। একটি লেখার অন্তমিল,তাল মাত্রা, বিষয় ছন্দ, বক্তব্য চিন্তা চেতনায় মানসুর মুজাম্মিল ছিলেন অন্য অনেকের তুলনায় অনন্য। বানানের বিষয়ে ছিলেন সবসময় সতর্ক। ব্যক্তি মানসুর মুজাম্মিল ছিলেন প্রিয় মানুষদের কাতারের একজন।
গভীর জীবনবোধ , প্রতিবাদ ও সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরার মোক্ষম হাতিয়ার ছিল মানসুর মুজাম্মিলের ছড়া। ছড়াতেই তিনি তার যাবতীয় কথা, উদ্দেশ্য প্রকাশ করার চেষ্টা করতেন। ছড়ার বিষয়, বক্তব্য কলাকৌশল নিয়ে পৃথক আলোচনা হতে পারে। সমাজ গুণী মানুষদের জীবনকালে যথাযথ মূল্যায়ন করতে প্রায়শই ব্যর্থ হয়। জীবনাবসানে নড়েচড়ে বসে। জীবিত মানসুর মুজাম্মিল যথাযথ মূল্যায়ন পাননি। মৃত্যুর পরও যদি কেউ না জাগে তাহলে তার সৃষ্টিকর্ম হারিয়ে যাবে। মানসুর মুজাম্মিল ছিলেন নিভৃতচারী লেখক। জীবতকালে বহুজনের প্রিয় ও পরিচিত জন ছিলেন। ঢাকার সাহিত্যাঙ্গনে হরহামেশাই দেখা মেলত তার। আজ তিনি অতীত। তার সৃষ্টি সমুহ জনসমক্ষে নিয়ে আসার দায়িত্ব আমাদেরই। আশা করি কেউ একজন এগিয়ে আসবেন।তাকে নিয়ে কাজ করার জোর আশাবাদ রইল। মানসুর মুজাম্মিলের জীবন সত্যই তার লেখার মতোই একটি বাস্তব বোঝা হয়েছিল দীর্ঘকাল! আফসোস আমরা সহজ করতে এগিয়ে যেতে পারিনি।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা