প্রচ্ছদগদ্যসব্যসাচী শান্তা

লিখেছেন : সাজ্জাদ বিপ্লব

সব্যসাচী শান্তা

সাজ্জাদ বিপ্লব

আমাদের কালের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি, লেখক ও চিন্তক শান্তা মারিয়া। তিনি বহুভাষাবিদ, অনুবাদক, ভ্রমণ গদ্যকার, জীবনীকার, গাল্পিক, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার। অর্থাৎ সব্যসাচী। নব্বইয়ের দশকে কবিদের মধ্যে এমন বহুগুণে গুণান্বিতা কবি বিরল। তিনি যেদিকেই হাত দিয়েছেন সফল হয়েছেন। কাজ করেছেন সংবাদমাধ্যমে। চীন দেশে করছেন শিক্ষকতা। শান্তা মারিয়া’র সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় বাংলা একাডেমি’র তরুণ লেখক প্রকল্প প্রকাশিত তার ‘সকল দোকান বন্ধ ছিল ‘ (১৯৯৬) কাব্যগ্রন্থ পাঠের মধ্য দিয়ে। উল্লেখ্য এ প্রকল্পের পরের পর্বে আমার অংশগ্রহণের আগ্রহ থাকলেও ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে আমার বিয়ের অনুষ্ঠান ধার্য এবং সম্পন্ন হওয়ায় সেই প্রোগ্রামে আর যোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এর পরের বছর থেকে সম্ভবত প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে গেলেও ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পে অংশ গ্রহণকারী কবি-সাহিত্যিকদের অনেকের বই বের হয়ে যায়–যাদের মধ্যে আমার কিঞ্চিত অগ্রজ এবং সমসাময়িক অনেক কবিবন্ধুই ছিলেন। সেটি ছিলো নব্বইয়ের মধ্য গগন। লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের একজন কর্মী ও সম্পাদক হিসেবে তখন সারাদেশের কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে যোগাযোগ ও লেখা /বইপত্র /লিটল ম্যাগাজিন আদান-প্রদান চলছে তুমুল ভাবে। আমরা বগুড়া থেকে ঢাকা যাওয়া-আসার মধ্যে আছি। ঢাকা গেলেই আড্ডা দিচ্ছি শাহবাগের আজিজ মার্কেটে। পাঠক সমাবেশ, বইপত্র, তক্ষশীলা, ম্যারিয়েটা, উলুখড় কতসব বইয়ের দোকানে পৌঁছে দিচ্ছি আমাদের প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনগুলো। কবি ইশারফ হোসেন এর নেতৃত্বে চলছে, টরেন্ট চত্ত্বর সাহিত্য আড্ডা, আজিজ মার্কেটের পিছনে। উত্তাল সেই দিনগুলোতে ঢাকা-চট্টগ্রাম-বগুড়া-সিলেট-দিনাজপুর-রাজশাহী-কুমিল্লা-বরিশাল তথা সমগ্র বাংলাদেশ থেকে নিত্যনতুন প্রকাশিত হচ্ছে অসংখ্য লিটল ম্যাগাজিন /পত্র-পত্রিকা /সংকলন ইত্যাদি।
আমাদের আড্ডাকেন্দ্র বগুড়ার বইয়ের দোকান ‘পার্বণ’ তখন বগুড়ার কবিদের তীর্থভূমি। কে আসছে না সেখানে? প্রবীণ-নবীন সব কবি-সাহিত্যিকদের আনাগোনায় মুখরিত আমাদের এ প্রাঙ্গণ। তখন বগুড়া থেকে প্রকাশিত হচ্ছে অনেক লিটল ম্যাগাজিন ও বইপত্র। সারাদেশ থেকে আসছে সদ্য প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিন এবং বইগুলো। প্রকাশিত সেসব বইপত্র নিয়ে চলছে, প্রচুর পাঠ। বিশ্লেষণ। তর্ক-বিতর্ক। পরবর্তী পরিকল্পনা। ইত্যাদি।

নব্বই দশক মানে আমাদের দশকের কবিদের প্রকাশিত বই নিয়ে সারাদেশে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন করছে নব্বই দশক নিয়ে নানান আয়োজন। বিভিন্ন জন বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে। নব্বইয়ের কবিদের নিয়ে কবিতার সংকলন বের হচ্ছে একটি, দু’টি। আমরাও থেমে নেই। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, সাধ্যমতো আমরাও করছি, আমাদের লিটল ম্যাগাজিন সংখ্যা এবং সংকলন। এর ধারাবাহিকতায় প্রথম আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়, ‘ বিকেল’ এর ‘নব্বইয়ের নয় নায়কের নন্দননামা’। তারপর ‘স্বল্পদৈর্ঘ্য’ ‘নব্বই দশক সংখ্যা’। পরে, নব্বইয়ের বাছাইকৃত কবিদের গুচ্ছ কবিতা নিয়ে ‘নব্বইয়ের কবিতা : অন্য আকাশ’।

এই সংকলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি ছিলেন শান্তা মারিয়া। তখনো (এবং এখনো) তার সঙ্গে আমার চাক্ষুষ দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। সংকলনের জন্য তার কাছ থেকে কবিতা সংগ্রহ করে দেন আমাদের কবিবন্ধু তৌফিক জহুর।

এরপর ২০০৮ সাল থেকে প্রবাস যাপন। অন্য দেশ। অন্য পরিবেশ। আবারো পথ চলা শুরু। নতুন করে। ভিন্ন ভাবে।

ভিন্ন দেশে এসেও সাহিত্যের পোকা মাথা থেকে যায় না। চলতে থাকে পঠন-পাঠন। বইপত্র সংগ্রহ ও সামান্য লেখালেখি। ফেসবুক হয়ে ওঠে শ্বাস নেওয়ার যায়গা। যোগাযোগ গড়ে ওঠে দেশের পরিচিত বন্ধুবান্ধব ও প্রবাসী লেখকদের সঙ্গে। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে ‘বাংলা রিভিউ’ যাত্রা শুরু করে অনলাইন প্লাটফর্ম হিসেবে। ছাপা সংখ্যা প্রথম প্রকাশের মুখ দেখে একই বছরে। নিউইয়র্ক বইমেলা ২০১৬ উপলক্ষে প্রকাশিত হয়, আটলান্টা, জর্জিয়া, যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এরপর অনিবার্য বিরতি। নেট দুনিয়া থেকে।

আবার ফিরে আসি ২০২৩ সালে। শুরু হয় পুনঃ খনন। পুনর্যাত্রা। বাংলা রিভিউ এবং আমি ফিরে পাই নতুন জীবন। শুরু হয় নতুন মাত্রা। পুরনোদের সঙ্গে নিয়ে। নতুনদের আলিঙ্গন করে। লেখালেখির সূত্রে যোগাযোগ শুরু হয় অনেকের সঙ্গে। যোগাযোগ গড়ে ওঠে কবি শান্তা মারিয়া’র সঙ্গেও। তাকে লেখা পাঠানোর আমন্ত্রণ এবং অনুরোধ জানালে তিনি দ্রুত সাড়া দিয়ে বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন লেখা পাঠিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করতে থাকেন।

জুলাই ২০২৪। শুরু হয় দ্বিতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। ভয়ঙ্কর ফ্যাসিস্ট শেখ হাছিনার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে সারা দেশ। থেমে থাকে না প্রবাসী যোদ্ধারাও। গুরুত্বপূর্ণ রেমিট্যান্স শাট ডাউন থেকে শুরু করে রাস্তায় মিছিল-প্রতিবাদ ও কলমযুদ্ধে শরিক হন প্রবাসী/অভিবাসী সকলে। অন্য অনেকের মতো আমিও জড়িয়ে যাই এ যুদ্ধে/আন্দোলনে। ‘বাংলা রিভিউ’ হয়ে ওঠে প্রতিবাদের হাতিয়ার। সকল ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে একের পর এক আমরা প্রকাশ করতে থাকি ফ্যাসিবাদবিরোধী কবিতা ও গদ্য। কবি ও বুদ্ধিজীবী শান্তা মারিয়া যোগ দেন এ আন্দোলনে। তার খুরধার প্রতিবাদী কবিতা ও যৌক্তিক প্রবন্ধগুলো ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয় পাঠক মহলে। এরপর আসে ৫ আগস্ট তথা জনগণের বিজয়ের দিন। খুনি হাছিনা হেলিকপ্টার করে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
সরকারবিহীন কয়েকদিন বাংলাদেশ কাটে নানা শংকা গুজব ও আতঙ্কের মধ্য দিয়ে। মোকাবিলা করতে হয় একের পর এক দেশ-বিদেশের চক্রান্ত। বিশেষ করে ভারতীয় গদী মিডিয়ার গুজব ও উস্কানিতে টালমাটাল হয়ে ওঠে দেশ। এ সময়ে ঝলসে ওঠে শান্তা মারিয়া’র কলম। তিনি দাতভাঙ্গা জবাব দিতে থাকেন ফ্যাসিবাদের দেশ-বিদেশের দোসরদের। ভারতীয় লেখক বন্ধুদের অনেকেই নাখোশ হন। তাদের মুজিব-হাছিনা-আওয়ামী লীগের প্রতি অন্ধপ্রেমে তারা মত্ত থেকে আমাদের আনফ্রেন্ড করে দেন। সে সময়ে হাতে গোণা ২/১ জন বাদে ভারতের কবি-সাহিত্যিকদের কাউকেই হাছিনার গণ হত্যার প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি। শান্তা মারিয়া’র বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে দেশকে সঠিক পথের নির্দেশনা দেয়। দেশে যখনই কোন সংকট বা ইস্যু এসে যায়, শান্তা মারিয়া চুপ থাকেন না, অন্যান্য বিক্রিত/বিকৃত বুদ্ধিজীবীদের মতো। তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন কলম হাতে। জুলাই গণ অভ্যুত্থানসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তার এই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই, তার এই অসামান্য ভূমিকা ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা