আবু তাহের সরফরাজ
সত্তরের দশকের উচ্চকিত রাজনৈতিক স্লোগান এবং আশির দশকের রূপকনির্ভর কাব্যশৈলী—এ দুইয়ের সমন্বয় সাধন করে নব্বইয়ের দশকের কবিরা এক স্বতন্ত্র ভাষাশৈলীতে কবিতা লিখতে শুরু করেন। এই সময়ের কবিরা কেবল বাইরের জগৎ নয়, বরং ব্যক্তির অন্তর্জগৎ এবং যৌথ অবচেতনের সন্ধানে মিথ, পুরাণ ও আবহমান বাংলার ঐতিহ্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তাদের কবিতায় মিথ-পুরাণ কিংবা ঐতিহ্যের ব্যবহার কেবল অলংকার হিসেবে নয়, বরং আধুনিক মানুষের জটিল মনস্তত্ত্ব ও অস্তিত্বের সংকট প্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়। লক্ষ্যণীয় যে, সত্তর ও আশির দশকের তুলনায় নব্বইয়ের কবিরা অনেক বেশি ব্যক্তিনিষ্ঠ ও বিস্ময়ধর্মী আঙ্গিকে এই অনুষঙ্গগুলোকে সার্থক কৌশলে ব্যবহার করেছেন। এ যাত্রায় তারা অন্তর্মুখী ও রূপমধর্মী হওয়ার চেষ্টা করেন, যা নব্বইয়ের কবিতাকে বহু বর্ণিল শৈল্পিক সৌন্দর্যে রাঙিয়ে তোলে। গ্রিক, রোমান কিংবা ভারতীয় পুরাণকে নব্বইয়ের কবিরা সরাসরি কপি করেননি, বরং সেগুলোকে সমকালীন প্রেক্ষাপটে নতুন রূপে চিত্রিত করেছেন। দেখা গেছে, মিথের জগৎ থেকে পৌরাণিক চরিত্রগুলো নব্বইয়ের কবিতায় নতুন সময়ের প্রতিনিধি হয়ে রক্ত-মাংসের চরিত্র হয়ে আবির্ভূত হয়। আবহমান বাংলার লোকজ ঐতিহ্য তাদের কবিতায় ইতিহাস হয়ে নয়, এসেছে যাপিত জীবনের মাটির সোঁদা গন্ধ হয়ে।
নব্বইয়ের দশকের যেসব কবির কবিতায় মিথের শৈল্পিক প্রয়োগ দেখা যায়, সেসব কবির মধ্যে শান্তা মারিয়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উল্লেখযোগ্য এ কারণে যে, যাপিত সময়ের নানা মুহূর্তের দার্শনিক উপলব্ধি তার কবিতায় ব্যক্ত হয় পৌরাণিক অনুষঙ্গে। যা তার কবিতার শিল্প আস্বাদনে পাঠককে অনন্য অনুভূতি এনে দেয়। চমৎকার কৌশলে তিনি আত্মকেন্দ্রিক উপলব্ধিকে মিথের উপাদানের সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়েছেন। নব্বইয়ের দশকের কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য ব্যক্তির অন্তর্লীন আত্ম-উপলব্ধি, যা কবির একাকিত্ব থেকে উৎসারিত। নিঃসঙ্গতাকে শিল্পের ভাষা দিতে ওই দশকের কবিরা নানা উপায় বেছে নিয়েছেন। কিন্তু শান্তা মারিয়া খুব সচেতনভাবেই মিথকে উপজীব্য করেছেন তার অন্তর্গহনের হাহাকার ব্যক্ত করতে। মূলত নিজের একাকিত্বকে বিশেষ মহিমা দিতেই তিনি ঐতিহ্যের দ্বারস্থ হন, এবং ঐতিহ্যের উপাদানকে যাপিত সময়ের প্রয়োজনে নতুনভাবে রূপায়ণ করেন। নব্বই দশকের কবিতায় এ ধরনের কৃৎকৌশল শান্তা মারিয়ার কবিতাতেই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। আর এ কারণে পাঠকের মনে হতেই পারে, শান্তা মারিয়ার কবিতা যেন ঐতিহ্যের বার্তাবহ। তবে সেই বার্তায় থাকে সমসাময়িক সমাজ, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির অন্তর্জগতের প্রচ্ছন্ন প্রকাশ। তার রচিত ‘তারাখসা রাতের সিম্ফনি’ কবিতার ওপর চোখ রাখা যাক—
মোমের নরম আলো
দুরাগত নক্ষত্রের উষ্ণতায়
মৃত্যুকে আবৃত করে।
উন্মোচিত হয় জীবনের অনন্ত আকৃতি।
সময়ের মৃদুল প্রবাহে ভেসে যায়
সেইসব তারাখসা রাত, ফাগুন পূর্ণিমা, দোলের আবির।
যজ্ঞের আগুন ছেড়ে উঠে আসে স্বাহা
চোখ মেলে ভস্মীভূত প্রেম।
চন্দ্রজ সংগীত বাজে
দূর, বহু দূরবর্তী জীবনের প্রাচীন মন্দিরে।
তখন কেবল রাত, সুবর্ণ রোদ্দুর তখন কেবল স্মৃতি
হরিকেলে অচেনা বন্দরে তখনও নোঙর করে
দুধসাদা ডিঙা মধুকর।
পার্বতীর কেশ থেকে ঝরে পড়ে অনার্য কুসুম।
ধান, দূর্বা, সুপারিতে গৃহকোণে আলো দেয়
মহালক্ষ্মী, ঢাকেশ্বরী।
সেইসব নিবিড় নিশীথে
নিমগ্ন, নিভৃত নক্ষত্রের মরাল সংগীতে,
কাঁসার থালায় মাটির প্রদীপে
রয়ে গেছে আমাদের যাবতীয় বিনিময়
শব্দহীন দৃষ্টির অক্ষরে।
দেখা যাচ্ছে, পৌরাণিক অনুষঙ্গে নিজের গভীরতর মনোজাগতিক উপলব্ধির শৈল্পিক প্রকাশ ঘটিয়েছেন শান্তা মারিয়া। নব্বইয়ের দশকের কবিতার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এখানে মিথ কেবল ঐতিহ্য হিসেবে আসেনি, এসেছে আধুনিক মানুষের একাকিত্ব ও অস্তিত্ব অবলোকনের আয়না হিসেবে। যজ্ঞ ও স্বাহা শব্দ দুটি ধ্বংস ও পুনরুত্থানের রূপক হিসেবে আমরা দেখতে পাচ্ছি। কবিতার শুরুতে মৃত্যু ও জীবনকে যজ্ঞের আগুনের সাথে তুলনা করা হয়েছে। হিন্দু পুরাণে স্বাহা হলেন অগ্নির স্ত্রী, যার মাধ্যমে যজ্ঞ সম্পন্ন হয়। কবি লিখছেন, ‘যজ্ঞের আগুন ছেড়ে উঠে আসে স্বাহা/চোখ মেলে ভস্মীভূত প্রেম।’ এখানে স্বাহা কেবল দেবি নন, বরং দীর্ঘদিনের দগ্ধ প্রেমের পুনরুত্থানের প্রতীক হিসেবে তিনি আবির্ভূত হন। যজ্ঞের আগুনের মতো দহন শেষে প্রেম যখন ভস্মীভূত হয়, তখন সেখান থেকেই এক প্রকার দিব্য উপলব্ধির জন্ম হয়—এটাই কবির অন্তর্গহনের সত্য। প্রাচীন বাংলার ভৌগোলিক ও বাণিজ্যিক ঐতিহ্যের আবহে কবি যাপিত একাকিত্বকে শৈল্পিক সৌন্দর্যে ব্যক্ত করেছেন। হরিকেল (প্রাচীন পূর্ববঙ্গ) ও মধুকর ডিঙা (চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙার প্রধান নৌকা) শব্দ দুটি ব্যবহারের মাধ্যমে কবি নস্টালজিক দৃশ্যপট এঁকে দিয়েছেন। আধুনিক জীবনের জটিল বন্দরে ব্যক্তির আত্মা যখন নোঙর করে, তখন সেই দুধসাদা ডিঙা আসলে এক হারানো শুদ্ধতার প্রতীক হয়ে ওঠে। এটি ঐতিহ্যের আধারে ব্যক্তির হাহাকার প্রকাশের এক ধরনের জাদুকরী কৌশল। যে কৌশল শান্তা মারিয়ার সহজাত শিল্পগুণ।
পৌরাণিক দেবি পার্বতীর কেশ থেকে ‘অনার্য কুসুম’ ঝরে পড়ার চিত্রকল্পটির শৈল্পিক গভীরতা আমাদেরকে মুগ্ধ করে। আর্য সংস্কৃতির উচ্চমার্গীয় দেবি পার্বতী, কিন্তু তার চুলে ‘অনার্য কুসুম’ (লোকজ ফুল) আশ্চর্য মেলবন্ধন তৈরি করে। পাঠক হিসেবে আমরা ধরে নিতে পারি, এটার মাধ্যমে কবি তার ভেতরের দ্বান্দ্বিকতাকে প্রকাশ করেছেন—যেখানে আভিজাত্য ও সাধারণত্ব কিংবা জাঁকজমক ও সররলতা মিলেমিশে একীভূত হয়ে গেছে। মহালক্ষ্মী বা ঢাকেশ্বরীর উল্লেখ কবিতায় এসেছে ধর্মীয় আচার হিসেবে নয়, বরং গৃহকোণের শান্তি শেকড়ের টানে ফিরে আসার ব্যাকুলতা হিসেবে। ধান, দূর্বা, সুপারি, কাঁসার থালা—অনুষঙ্গগুলো বাঙালির হাজার বছরের পারিবারিক ঐতিহ্য। কবি তার ব্যক্তিগত ‘বিনিময়’ বা প্রেমের মৌনতাকে পবিত্র এই আবহমণ্ডলে নির্মাণ করেছেন। মানে, ব্যক্তিগত প্রেম বা বিরহকে তিনি একটি সামষ্টিক ঐতিহ্যের মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। কবিতার শেষাংশে ‘মরাল সংগীত’ (রাজহংসের ডাক কিংবা সৌন্দর্য) এবং ‘শব্দহীন দৃষ্টির অক্ষর’ এক ধরনের বিমূর্ত ব্যঞ্জনা তৈরি করে। কবি এখানে শব্দের অতীত এক জগতের কথা বলছেন। পুরাণে হংস বা মরাল শুদ্ধতা ও জ্ঞানের প্রতীক। কবি নিজের মনের নিভৃত কথোপকথনকে সেই নাক্ষত্রিক সংগীতের সাথে তুলনা করে প্রমাণ করেছেন যে, আধুনিক মানুষের প্রকৃত যোগাযোগ আজ ভাষায় নয়, ঐতিহ্যের স্মৃতিমাখা নীরবতায় নিহিত। লক্ষ্যণীয় যে, পৌরাণিক নামগুলো (স্বাহা, পার্বতী, মধুকর) বর্তমানের বিষণ্ণতা ও একাকিত্বের ছাঁচে নতুন রূপে নির্মাণ করেছেন। ঐতিহ্য এখানে পুরোনো কংকাল নয়, বরং কবির বর্তমান উপলব্ধিকে ধারণ করার রক্ত-মাংসের জীবন্ত অবয়ব।
শান্তা মারিয়া তার কবিতায় পুরাণের গাম্ভীর্য বজায় রাখতে একদিকে যেমন সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করেছেন, পাশাপাশি গ্রামীণ ঐতিহ্যের সহজ শব্দগুলোকেও নতুন মর্যাদায় বিন্যাস্ত করেছেন। তার বেশির ভাগ কবিতার উপজীব্য বিষয় চিত্রকল্পময় ও প্রতীকী। এই কৃৎকৌশল তার কবিতাকে নব্বইয়ের দশকের অন্যসব কবির কবিতা থেকে ভিন্নরূপে পাঠকের সামনে উপস্থিত করে। আমরা দেখতে পাই, অতীত ঐতিহ্যকে তিনি বর্তমানের রুক্ষ বাস্তবতার বিপরীতে এক স্বপ্লীল আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করেন। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে ‘না ভাসাইয়ো জলে’ কবিতাটি।
লখিন্দর দিয়েছিল প্রথম চুম্বন
আদিম কুমারী নাগিনীর ওষ্ঠপুটে।
কথা ছিল পাড়ি দেব দূর রেলপথ
ঈাহাড় চূড়ায় গড়ে নেব নিজস্ব নগর
তাহিতির নীল জলে ঝিনুক প্রাসাদ
আফ্রিকার উপকূলে অরণ্য বসতি
কথা ছিল হাতের মুঠোয় পুরে নেব
নৈনিতাল, বারানসী, আগ্রার মহল।
এৃত মাছ হয়ে ভেসে ওঠে সব গোপন বাসনা
বারো হাত কাঁকুড়ের জীবন খাঁচায়
শ্বাসরুদ্ধ আমাদের বিস্মৃত কামনা।
আগামী জন্মের জন্য তুলে রাখি এসো
যৌথ বৃষ্টি স্নান, কালো ড্রাগনের ঘর
মেঘমগ্ন নিবিড় দুপুর, সীতাহার,
আশ্বিনের ভোরবেলা, সেতার সংলাপ।
এক জীবনের যাবতীয় ঋণ শোধ করে
মৃত্যু অভিমুখে হেঁটে চলে নিষাদ কাফেলা।
মৃত্যু নয় চূড়ান্ত কখনো
মৃত্যু নয় বিচ্ছেদ নগর
দেখা হবে অন্য কোনো গ্রহে
অন্য কোনো সময়ের বাঁকে।
হয় আরেকবার ধরা যাবে হাত
শোনা যাবে নাবিকের জাহাজি সংগীত
দেখা হবে রেশমপথের ধারে
দীপজ্বলা সরাইখানায়, ভক্তপুরে, সিয়ান নগরে।
এ জন্মের মতো শেষ হোক রাসলীলা
শেষ হোক পূর্ণিমার মোহন উৎসব
ক্লান্ত চোখে নেমে এসো ঘুম, এসো প্রেম,
এসো মৃত্যু, মৃণ্ময় আবাস, আচ্ছাদন
সর্বশেষ আলিঙ্গনে বিদায় সুপ্রিয়।
লোকজ পুরাণ, বিশ্বভূগোল, যাপিত সময়ের যন্ত্রণাক্লিষ্ট হাহাকার এবং পরাবাস্তব চেতনা একীভূত হয়ে গড়ে উঠেছে ওপরের কবিতাটি। কবি এখানে প্রেম, অপ্রাপ্তি ও মৃত্যুকে এক মহাজাগতিক ক্যানভাসে চিত্রিত করেছেন। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, কবি এমন কিছু দৃশ্যকল্প তৈরি করেছেন যা পাঠকের চোখের সামনে চলচ্চিত্রের এক একটি ফ্রেমের মতো একটার পর আরেকটা প্রদর্শিত হতে থাকে। তাহিতির নীল জল, ঝিনুক প্রাসাদ, আফ্রিকার অরণ্য বসতি কিংবা বারানসী-আগ্রার মহল চিত্রকল্পগুলো মানুষের বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় উচ্চাকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটায়। ‘মৃত মাছ হয়ে ভেসে ওঠে সব গোপন বাসনা’ একটি শক্তিশালী পরাবাস্তব চিত্রকল্প। অতৃপ্ত ইচ্ছাকে পচনশীল মাছের সাথে তুলনা করে এক ধরনের বীভৎস অথচ যাপিত একাকিত্বের বাস্তবতাকে প্রকাশ করা হয়েছে। এরই পাশাপাশি আমরা দেখি যে, ‘মেঘমগ্ন নিবিড় দুপুর’, ‘সেতার সংলাপ’ কিংবা ‘আশ্বিনের ভোরবেলা’ এক ধরনের বিষণ্ণ অথচ স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের জন্ম দেয়। ‘বারো হাত কাঁকুরের জীবন খাঁচা’ বলতে কবি জীবনকে একটি খাঁচা বা সীমাবদ্ধ পরিসর বোঝাতে চেয়েছেন। লোকজ প্রবাদ ‘বারো হাত কাঁকুড়ের তের হাত বিচি’র একটি বিষণ্ণ রূপান্তর এখানে আমরা লক্ষ্য করি, যা জীবনের অর্থহীনতার দিকে আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। জীবন অর্থহীন জেনেও মানুষ জীবনকে যাপন করে যায়, এটাই মানুষের চরম বাস্তবতা। এই জীবন শেষে মানুষ ফিরে যায় তার প্রকৃত আশ্রয়ে, যাকে কবি ‘মৃন্ময়ী আবাস’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এটি মৃত্যুর চমৎকার একটি রূপক। মাটির তৈরি ঘর বা কবরকে এখানে ‘আচ্ছাদন’ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা জীবনের সকল ক্লান্তি শেষে পরম আশ্রয়। একটু মনোযোগ দিয়ে কবিতাটি পড়লে লক্ষ্য করা যাবে, শৈল্পিক মাধুর্যে শক্তিশালী বেশ কিছু প্রতীক কবি ব্যবহার করেছেন, যেসব প্রতীক নানা ব্যঞ্জনা ছড়িয়ে কবিতাটিকে বহুমাত্রিক রূপ দিয়েছে। লখিন্দর ও নাগিনী মনসামঙ্গল কাব্যের চিরন্তন প্রেমের প্রতীক। লখিন্দরের মৃতদেহ জলে ভাসিয়ে দেয়ার যে পুরাণ, তার বিপরীতে কবি এখানে জীবন ও মৃত্যুর নতুন এক ভাষ্য তৈরি করেছেন। শব্দের অর্থকে ছাড়িয়ে ভিন্ন কোনো অর্থ উদ্ঘাটন করা শান্তা মারিয়ার বিশেষ কাব্যগুণ। ‘নিষাদ কাফেলা’ এমনই দুটি শব্দ। নিষাদ মানে ব্যাধ বা শিকারি। কবিতায় নিষাদ কাফেলা বলতে মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের দলকে বোঝানো হয়েছে, যারা জীবনের ঋণ শোধ করে অজানার পথে পাড়ি দিচ্ছে।
কবিতাটির শিরোনাম ও প্রথম পঙক্তিতে লখিন্দরের উল্লেখ থাকলেও এটি প্রচলিত ধর্মীয় কোনো কবিতা নয়। এই কবিতায় পুরাণকে ব্যক্তিমানুষের প্রেম ও বিচ্ছেদেও সমান্তরালে দাঁড় করানো হয়েছে। বেহুলার মতো লখিন্দরকে জলে না ভাসিয়ে কবি তাকে এক ভিন্ন গ্রহে বা সময়ের বাঁকে খুঁজে পাওয়ার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছেন প্রতীকী রূপকল্পে। আমরা দেখি যে, কবিতাটির প্রথমার্ধে হারানোর বেদনা ও অপ্রাপ্তির হাহাকার থাকলেও পরের অংশে আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে। ‘মৃত্যু নয় চূড়ান্ত কখনোই’ এই বোধ থেকে কবি পুনর্জন্মের মহাজাগতিক যাত্রাপথকে ইঙ্গিত করেন। উপজীব্য বিষয়কে যথার্থ শৈল্পিক রূপ দিতে শান্তা মারিয়া পুরো কবিতায় এক ধরনের ধ্রæপদী গাম্ভীর্য সৃষ্টি করে রেখেছেন। ‘যৌথ বৃষ্টি স্নান’, ‘সীতাহার’, ‘রাসলীলা’ শব্দগুলো কোমল ও স্নিগ্ধ। এসব শব্দের পাশাপাশি ‘শ্বাসরুদ্ধ বিস্মৃত কামনা’ বা ‘মৃত্যু অভিমুখে’ শব্দগুলো কবিতার মেজাজকে গম্ভীর করে তোলে। বোঝাই যায়, এই কৃৎকৌশল শান্তা মারিয়া সচেতনভাবেই প্রয়োগ করেন।
স্বীকার করতেই হবে, নব্বইয়ের দশকের বেশির ভাগ কবিতা অদরকারি শব্দের ভারে ন্যূব্জ। কারও কারও কবিতা পড়লে মনে হয়, শব্দগুলো যেন রাবারের মতো টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শান্তা মারিয়ার কবিতায় শব্দেরা সেনাবাহিনীর মতো সুশৃঙ্খল। অযৌক্তিক কিংবা অদরকারি কোনো শব্দের অনুপ্রবেশ কোথাও ঘটে না। এই বৈশিষ্ট্যই মূলত তার কবিতার শৈল্পিক সৌন্দর্য। তিনি যা বলেন তার প্রকাশভঙ্গি খুবই সহজ ও সাবলীল। বলার কথাকে শব্দের জালে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে নিজের পাণ্ডিত্য প্রকাশের হীন শঠতা তিনি কখনোই পাঠকের সাথে করেন না। ফলে তার কবিতা পাঠকের জীবনের ভেতর ঢুকে গভীর দার্শনিক উপলব্ধির প্রেরণা জোগায়। এই প্রেরণাই শান্তা মারিয়ার কবিতাকে বেগবান করেছে নব্বইয়ের দশক ছাড়িয়ে, এখনও।







