প্রচ্ছদসাম্প্রতিকবিপ্লবের ঘরে সিঁদেল চোরেরা ঢুকে পড়েছে

লিখেছেন : ফারুক ওয়াসিফ

বিপ্লবের ঘরে সিঁদেল চোরেরা ঢুকে পড়েছে

ফারুক ওয়াসিফ

জুলাইয়ের আগে আপনি হয়তো সাবঅল্টার্ন ছিলেন, কিন্তু গণঅভ্যুত্থান বিজয়ী হবার পরে আপনি আর সাবঅল্টার্ন নাই। যদি বলতেই হয় তাহলে বলবো জুলাইয়ে অংশ নেওয়া, প্রাণ দেওয়া লাখ-লাখ তরুণ-তরুণী, তাদের বাবা-মা-ভাই-বোন সাধারণেরাই এখনকার সাবঅল্টার্ন। তারা ভাষ্যহীন, মুখপত্রহীন নীরব জনতা হয়ে গুমরে মরছে যার যার নিজস্ব জুলাইয়ের ময়দানে।

যখন সরকারে কার কতটা ভাগ নিয়ে কাড়াকাড়ি চলছিল, তারা তখন মন্দির পাহারা দিচ্ছিল। জনতার জমায়েতে যখন কালো-সাদা পতাকা ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, ওরা তখন ডাকাত তাড়াচ্ছিল। আপনারা যখন অক্ষম ছিলেন তারা তখন রাস্তাঘাট সামলাচ্ছিল। আপনারা যখন নিরাপদ, ওরা তখন শহীদ ও আহতদের নিয়ে চূড়ান্ত বেদিশায়। দয়া করে জনগণের বীরগাথা ও যন্ত্রণার মর্সিয়াকে তত্ত্ব দিয়ে ঢেকে দেবেন না।

সমাজতন্ত্রের নামে আমরা বাকশাল পেয়েছি, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে নৈরাজ্য পেয়েছি—‘বামপন্থা’র নামে ইতিহাসের খোঁয়ারি পেয়েছি। এখন সাবঅল্টার্নের নামে অযোগ্যদের ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের জোগালি খাটিয়েন না।
জুলাই কোনো সাবঅল্টার্ন বিদ্রোহ না, এটা দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর মাল্টিক্লাস, মাল্টিপলিটিকাল চরিত্রের গণঅভ্যুত্থান। জুলাইকে সাবঅল্টার্ন বানাতে গেলে বিপদ। সাবঅল্টার্ন লড়াই কখনো জয়ী হয় না, তাদের কোনো রাষ্ট্রপ্রকল্প থাকে না। তারা ওলট-পালট করে দিয়ে চলে যায় শুধু।

যারা রণজিত্‌ গুহের নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চা বুঝেছেন, তাঁরা প্রথমেই জানবেন যে, এই তত্ত্ব আজ অবধি কোনো মুসলমান ফ্যাক্টরকে ডিল করেনি, বা করতে চায় নি। দুই নম্বরে, সাবঅল্টার্ন কখনো বিপ্লব করে না। তারা দেশজোড়া সার্বজনীন কোনো লড়াইও সংগঠিত করতে পারে না। সেরকম লড়াইয়ের কোনো কর্মসূচী বা পার্টিও তাদের থাকে না। আপনার পার্টি, মতবাদ, সাংগাঠনিক জাল ইত্যাদি থাকা মানে, আপনি নিম্নবর্গ থেকে ডমিন্যান্ট হতে চাচ্ছেন, মানে উচ্চবর্গ হয়ে উঠতে চাচ্ছেন।

নিম্নবর্গীয়রা লড়াই করে পরিণতির ওপর নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই। তাদের লড়াইয়ের কিছু বৈশিষ্ঠ্যের কথা বলেছিলেন রণজিত্‌ গুহ। নিম্নবর্গীয় লড়াই হবে আঞ্চলিক, তারা ক্রিয়া করবে না বরং প্রতিক্রিয়া করবে জ্বালাও-পোড়াও-ভাংচুর দিয়ে, তাদের ভাষাভঙ্গী উচ্চবর্গীয় নীতিনৈতিকতার ধারধারবে না। আইনী কাঠামো উল্টে দেবে, লুট করবে, ভোজ করবে ইত্যাদি। তারা সুবোধ হবে না, তারা হবে দুর্বোধ।

মব ইঞ্জিনিয়ারিং দিয়ে ভদ্রলোকেরা তাদের মুখ ঢেকে যাওয়া দেখবে, কিন্তু গোড়ায় হাত দেবে না। তাদের মুখ খারাপের মধ্যে তারা সুগৌল রুচি খুঁজবে, প্রজন্মের পরে প্রজন্মের জ্বালাপোড়া বুঝবে না। হাদির ভাষা আর সীমান্তের মাটিতে পা শক্ত করে গেঁথে দাঁড়ানো বিজিবি সৈনিকের ভাষা কেন ও কখন এক হয়ে যায়, তা এরা বুঝতেও চাইবে না। এদের চোখে খোয়াবনামার তমিজের বাপ বণ্যবর্বর কুসংস্কারাচ্ছন্ন চাষা মাত্র।

নিম্নবর্গীয় কৃষক বিদ্রোহের বৈশিষ্ঠ্য আলবত্‌ জুলাইয়ের ধমনীতে ছিল। এই শহুরে প্রলেতারিয়েত বা প্রিক্যারিয়েতকে চাইলে নিম্নবর্গও বলতে পারেন, কিন্তু ফ্যাসিবাদী শাসনে নির্যাতিত বিএনপি, জামায়াত, হেফাজতকে নিম্নবর্গ বলবো কেমন করে? এঁরা সবাই সংগঠিত, মতাদর্শভিত্তিক, শিক্ষিত এবং রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে উচ্চাভিলাষী—যা নিম্নবর্গীয় চৈতন্যের বিপরীত।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রধান শক্তি ছিল উঠতি মধ্যবিত্তভুক্ত শহর-নগর-মফস্বলের ছাত্র-তরুণ। এরা বনেদি মধ্যবিত্তের প্রতি হতাশ ও বিরূপ ছিল। এই ছাত্রতরুণদের আরেক কথায় বলা যায় প্রিক্যারিয়েত অর্থাত্‌ জীবন-জীবিকা ও মর্যাদা নিয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী। এদের সাথে জড়িয়ে পড়েছিল শহুরে প্রলেতারিয়েত অর্থাত্‌ খেটে খাওয়া রিকশাচালক, মজুর, হকার, হোটেল শ্রমিকেরা। একেবারে শেষ দিকে বনেদি অটোক্র্যাটিক মধ্যবিত্তের বিপরীত ছোটো র‍্যাডিকেল গণতন্ত্রী মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীরা যোগ দিলে গণঅভ্যুত্থান নৈতিক বৈধতা পেয়ে যায় যে, এটা কোনো জঙ্গিবাদী বা ইসলামপন্থী আন্দোলন না। খুবই ছোটো আকারের হলেও এই র‍্যাডিক্যাল গণতন্ত্রী তথা আনু মুহাম্মদ, সলিমুল্লাহ খান, সামিনা লুত্‌ফা, তানজীমউদ্দীন খান, মোশাররফ করিম, দীপক গোস্বামী, দেবাশীষ চক্রবর্তী, আজমেরী হকদের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ (কারো নাম বাদ পড়লে মাফ করবেন)। এর অর্থ আবার এই না যে, এনারাই ছিলেন গণঅভ্যুত্থানের নিশানধারী। ওই ৩৬ দিনে সেই নিশান ধরবার গরিমা আমি ছাত্রসমন্বয়কদেরই দেব।

জুলাই শত্রু চিনেছিল কিন্তু মিত্র চিনতে পারেনি। মাহফুজ আলম ঠিকই বলেছেন যে, মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে সন্দিহান করে তুলেছিল জুলাইয়ের অংশীদারদের কারো কারো কাজকর্ম। এর সঙ্গে যোগ করে বলবো, অন্তর্বর্তী সরকার জুলাইয়ের প্রধান শক্তি উঠতি মধ্যবিত্তকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা এবং মধ্যবিত্তকে মিত্র বানাতে ব্যর্থ হয়েছিল।

জুলাই ছিল আন্তোনিও গ্রামসির ভাষায় (সাবঅল্টার্ন তত্ত্বের আদি জনক) এক হিস্টরিক ব্লক তথা ঐতিহাসিক জোটের গণঅভ্যুত্থান। এটা মাল্টিক্লাস, মাল্টিভার্স (ভাষা), মাল্টিপলিটিকালের প্রতিরোধী জনতা হয়ে ওঠার ঘটনা। গণঅভ্যুত্থানের তত্ত্ব ছাড়া এখানে আর কোনো তত্ত্বই কাজ করেনি। এই তত্ত্ব মার্কস-মাও-শরিয়তিদের থেকে আসেনি। এসেছে বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিসূত্র থেকে।
বেশি সাবঅল্টার্ন করার বিপদও আছে। সাবঅল্টার্ন তত্ত্ববিদেরা সুকৌশলে ব্রিটিশ আমলের মুসলমান কৃষকদের বিদ্রোহকে এড়িয়ে গেছেন। ফারায়েজী আন্দোলন, পাবনার কৃষক আন্দোলন ইত্যাদি। ময়মনসিংহের পাগলাই ধুমকে নিয়ে গৌতম ভদ্র কাজ করলেও এর ভেতরকার ইসলামের সাম্য ও প্রতিরোধের শাঁসকে ভদ্র একরকম ছেঁকে বের করে দিয়েছিলেন। আসলে রণজিত্‌ গুহের সাবঅল্টার্ন তত্ত্বকাঠামোতে মুসলমান কৃষকদের জান-জমি-জবানের সংগ্রামকে আঁটানো যায় না। সুতরাং বেশি সাবঅল্টার্ন হবার বিপদও আছে, ইতিহাসের ছেঁড়া কাঁথা আর জোড়া লাগাতে পারবেন না।

বিপ্লব হবে না আর। মতবাদ মেপে মেপে বিদ্রোহও করে না মানুষ। লেনিন-মাওয়ের পরে বিপ্লব একমাত্র করতে পেরেছিলেন ইরানের খোমেনী। আজকের বিশ্বায়িত অর্থনীতি, ডিজিটাল ভোগবাসনার জগতে আঞ্চলিক বিপ্লব প্রায় অসম্ভব। জুলাইয়ে কোনো মতবাদ না থাকাই তাই স্বাভাবিক ও সুন্দর ছিল।
একদল লোক, যাদের জুলাই পূর্ববর্তী এবং জুলাইকালীন ভূমিকা রহস্যজনক, তারাই জুলাইয়ের বিজয়ের পরে খেলাফত, কালেমার পতাকা ইত্যাদি জিনিসের আমদানি করে। অন্যদিকে জুলাইপন্থীদের কারো কারো দ্বিতীয় বিপ্লব, গঠনতন্ত্র, দ্বিতীয় মুক্তযুদ্ধ করা; আরেকপক্ষের মুক্তিযুদ্ধ, সেকুলারিজম বাঁচাবার নামে জুলাইকে ইসলামপন্থীদের ষড়যন্ত্র ভাবার হীনম্মন্যতাও জুলাইয়ের স্পিরিটকে উবিয়ে দিয়েছে। উভয় তরফের পারস্পরিক অবিশ্বাস বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক বিষাক্ত গরল।

জুলাই ফ্যাসিবাদের দর্প চূর্ণ করায় সফল। বাদবাকি বিষয়ে কী ঘটে তা দেখার জন্য ইতিহাসকে আরো সময় দিতে হবে। তবে যারা অন্তবর্তী সরকারের গুরুতর কয়েকটি জায়গায় অসফল হওয়াকে জুলাইয়ের ব্যর্থতা ভাবছেন, তাঁরা বন না দেখে কেবল গাছ দেখছেন। তারপরও অসফলতা বিষয়ে আমাকে এককথায় বললে আমি দুই বাক্যে বলবো: জুলাইয়ের নেতৃত্ব পুরনো বন্দোবস্তের দল-গোষ্ঠী-আমলাতন্ত্র, অলিগার্ক, বাহিনীগুলোর তুলনায় খুবই অপর্যাপ্ত ছিল। দ্বিতীয়ত, সাংস্কারের বাস্তব রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্মসূচীর বদলে অহেতুক মতবাদের ঝাণ্ডা উড়িয়ে ঐক্যটাকে ভাঙ্গার অপরিণামদর্শিতাও ছিল। মব-টব যা দেখেছেন, সেসব বিরাট এক ষড়যন্ত্রেরই অংশ—সেটা এখনও চলছে। আরেকটা ছিল পরিস্থিতি সামাল দেবার সক্ষমতার ও অভিজ্ঞতার অভাব। তাই অন্তর্বর্তী সরকার গণঅভ্যুত্থানের সরকার না হয়ে হয়ে পড়ে দেড় বছরের তত্ত্বাবধায়কী সরকার। কারণ, এই সরকারের রাজনৈতিক ভিত্তিতে বড় কোনো দল ছিল না। এই সরকারকে সবাই যার যার দিকে টেনেছে বটে, কিন্তু বড় শক্তিগুলি কখনোই চায়নি, এই সরকার সফল হোক। এসব করতে করতেই জুলাইয়ে গড়ে ওঠা মাল্টিক্লাস, মাল্টিসেন্ট্রিক জনতার এজমালী ঐতিহাসিক জোট ভেঙ্গে পড়ছিল।

শেষ কথা এই, ফ্যাসিবাদ ও আগ্রাসন মোকাবিলায় বাংলাদেশকে মাল্টিপার্টি, মাল্টিক্লাস ও মাল্টিআইডিওলজির দল, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে নিয়ে ঐতিহাসিক জোট হিসেবে কাজ করতে হবে। পাকিস্তান আন্দোলন, বাংলাদেশ আন্দোলন দুটিতেই ছিল সেসময়ের ঐতিহাসিক জোট। এই জোট মানে সরকারি কোয়ালিশন না, একটা বাংলাদেশপন্থী নতুন মিনিমাম রাজনৈতিক বন্দোবস্ত দরকার। তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব হবে মৈত্রীর দ্বন্দ্ব, আওয়ামী লীগের মতো বিনাশের দ্বন্দ্ব না। নাহলে সরকার ও রাষ্ট্র কোনোটাই স্থিতিশীল ও নিরাপদ হবে না। নাহলে বাংলাদেশ আবারো গাড্ডায় পড়বে

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা