প্রচ্ছদগদ্যচলে গেলেন মৃত্তিকার কবি আল মুজাহিদী

লিখেছেন : শান্তা মারিয়া

চলে গেলেন মৃত্তিকার কবি আল মুজাহিদী

শান্তা মারিয়া

কবি আল মুজাহিদীর প্রয়াণে যেন শেষ হয়ে গেল একটি যুগ। সেই যুগ হলো ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতায় কবিতা প্রকাশের সাফল্য, সাহিত্য সম্পাদকের টেবিল ঘিরে তরুণ কবিদের আড্ডা, কবিতা পাঠের আসর, নতুন নামকরণ, মতিঝিলে ডিম পরোটা খাওয়া আর বাংলা একাডেমিতে কবিতা পাঠের সুযোগ পাওয়ার জন্য প্রবীণ কবিদের পাশে থাকার প্রেরণা।
কবি আল মুজাহিদীর সঙ্গে আমার আলাপ অনেক অনেক বছর আগে। আমার বাবা তখন ইত্তেফাকে প্রায়ই বিভিন্ন বিষয়ে লেখা দিতেন। তার হাত ধরেই কিশোরবেলায় আলাপ হলো কবি আল মুজাহিদীর সঙ্গে। বাবার সূত্রে আলাপ তাই সারজীবন তাঁকে ‘মুজাহিদী চাচা’ সম্বোধনেই অভ্যস্ত ছিলাম। কবি শাহিন রিজভির সঙ্গে আমার বিয়ের পর জানলাম তিনি আমার শ্বশুর সৈয়দ মেরাজুল হকের সঙ্গেও অতি ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত করটিয়া সাদত কলেজের সূত্রে। আমি ও শাহিন আল মুজাহিদী চাচার অনেক স্নেহ লাভ করেছি।

মনে পড়ছে ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতায় প্রথম কবিতা প্রকাশের স্মৃতি। ১৯৮৮ সালের কথা। উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রী তখন আমি। হাটখোলার মোড়ে ইত্তেফাক ভবন। এর আগে কচিকাঁচার আসরে কিশোর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এবার দাদাভাই বললেন এই কবিতা সাহিত্যপাতায় যেতে পারে।

বাবার সঙ্গেই গিয়েছিলাম কবি আল মুজাহিদীর কক্ষে। ছোট একটি ঘরে বসতেন তিনি। চারিদিকে কাগজপত্র। টেবিলের উপর বই ও কাগজের স্তূপ। তিনি কবিতাটি দেখে চোখ বুলিয়ে বললেন, ‘ছন্দে লিখে আনো’। আমি তখন ছন্দ বুঝি না। মনে করলাম অন্তঃমিল দিতে হবে বোধহয়। অনেক কবিতায় তো দেখেছি আজকাল তেমন অন্তঃমিলের ব্যবহার নেই। কিন্তু সাহস করে এসব কথা বলতে পারলাম না। আমাকে ছন্দ বিষয়ে প্রথম পাঠদান করেন কবি আসাদ চৌধুরী। যাই হোক সেটা অন্য প্রসঙ্গ।
ওই কবিতাটি আবার অক্ষরবৃত্তে সাজিয়ে ঠিকঠাক করে নিয়ে যাওয়ার তিন সপ্তাহ পরে প্রকাশ হয়েছিল। এরপরে যতবারই কবিতা নিয়ে গিয়েছি দেখেছি তাঁর টেবিলের সামনে একদল কবি বসে আছেন। বেশিরভাগই তরুণ। সেই সময়ে অনেক তরুণ কবির নাম তিনি বদলে দিয়ে ‘সাহিত্যিক নামকরণ’ করেছিলেন। মনে পড়ে আমার নাম প্রথমবার শুনে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন ‘এই নাম কে দিয়েছে? কবে?’ বলেছিলাম, ‘আমার বাবা নামকরণ করেছেন। আমার জন্মের সাতদিনের মাথায়। আকিকাও হয়েছে এই নামে।’ বাবা আমার সঙ্গেই ছিলেন। মৃদু হেসে কথার সত্যতা নিশ্চিত করেছিলেন।

অনেক বছর পরে, তখন আমি জনকণ্ঠে চাকরি করি এবং মুজাহিদী চাচার সঙ্গে বেশ সহজ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘চাচা , আপনি মানুষের নাম বদলে দেন কেন?’ তিনি বলেছিলেন, ‘সব নামে কি কবিতা লেখা যায়? কবির নাম শুনে পাঠকের মনে একটি ছবি ভেসে ওঠে। তাই নামটি স্মার্ট ও কাব্যিক হওয়া জরুরি।’ তিনি খুব মজা করে বলেছিলেন ‘ধরো, ফেকু মিয়া নামে কেউ বনলতা সেন কবিতা লিখেছে, তোমার তো কবির নাম শুনেই কবিতা পড়ার উৎসাহ চলে যাবে। কিংবা ধরো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম যদি হতো পাঁচু ঠাকুর তাহলে তাকেও নাম বদলাতে হতো। সাহিত্যের একটা দাবী আছে, একটা পরিশীলিত ভাষার চাহিদা আছে।’ তিনি নিজেও সবসময় প্রমিত বাংলায় কথা বলতেন। পরতেন, ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি পায়জামা।শীতকালে চাদর। তার ফর্সা রং আর দীর্ঘ অবয়বে দারুণ মানাতো সেই পোশাক।

প্রেসক্লাবে বেশ আড্ডা হতো তাঁর সঙ্গে। চমৎকার করে হাসতেন। গুছিয়ে কথা বলতেন। কবিতা পড়েও শোনাতেন। আমার তর্ক করার স্বভাব অনুযায়ী তাঁর অনেক কথায় অনেকবার দ্বিমত করেছি। কিন্তু কখনও রাগ করেননি। অনেক সময় বলতেন‘ শহীদুল্লাহর নাতনি কবিতা হলো গুরুমুখী বিদ্যা, গুরুর সঙ্গে তর্ক করলে হবে না। ’

অনেক তরুণ কবিকে তিনি বিভিন্ন কবিতা পাঠের আসরে নিয়ে গিয়েছেন। তাদের কবিতা পাঠের জন্য অনুষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের অনুরোধ করে হলেও সুযোগ করে দিয়েছেন। আজকাল এমনটা আর দেখি না। তিনি প্রেসক্লাবেও অনেক তরুণ কবিকে জীবনে প্রথমবারের মতো প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছেন। বাংলা একাডেমিতে কবিতা পাঠের সুযোগ অনেক তরুণ কবি তাঁর সুবাদেই প্রথমবারের মতো পেয়েছেন।
কবি ফজল শাহাবুদ্দীন ভাই কবিকণ্ঠে আমার জন্মদিন উদযাপন করেছিলেন একবার। তখন কবি আল মুজাহিদী এসছিলেন এবং আমাকে ‘গুলিস্তা’ বইটি উপহার দিয়েছিলেন।

তিনি থাকতেন রামকৃষ্ণ মিশন রোডে। আমাদের স্বামীবাগের বাড়িতে বহুবার তিনি এসেছেন, বাবার সঙ্গে অনেক বিষয় নিয়ে আলাপ করেছেন।
শাহিন একবার ওঁকে ‘মুজাহিদীভাই’ বলায় ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি তোমার বাপের বন্ধু, শ্বশুরেরও বন্ধু, চাচা বলবা’।
বিটিভি থেকে শুরু করে কত যে কবিতা পাঠের আসরে এক মঞ্চে অংশগ্রহণ করেছি। মাঝেমধ্যেই ফোন দিয়ে বলতেন, অমুক বিষয়ে একটা কবিতা পাঠাও। বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধও লিখিয়ে নিয়েছেন রীতিমতো ধমক দিয়ে।

তাঁর কবিতায় এদেশের মাটি ও জনগণের কথা বলেছেন পরম মমতায়। তিনি সত্যিই ছিলেন মৃত্তিকার কবি।
কবি আল মুজাহিদীর প্রয়াণে আন্তরিক শোক জানাই। তিনি বাংলা কবিতায় এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে থাকবেন চিরদিন। কেবলি মনে হচ্ছে, মাথার উপর থেকে প্রবীণ কবিদের ছায়াগুলো সরে যাচ্ছে। বিশেষ করে আমাকে ধমক দিয়ে কথা বলার এবং স্নেহ ও আশীর্বাদ করার মানুষগুলো চলে যাচ্ছেন। শ্রদ্ধা রইলো চাচা।

আল্লাহ আপনাকে বেহশত নসিব করুন।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা