গাউসুর রহমান
বিস্ময়ের অমোঘ অনুভব
………………………..
মানুষের জীবনে নরকের আগুনের মতো ঘটে
অহরহ রক্তপাত
জীবনের অন্ধকারেও দুহিতারা গাইতে থাকে
নীলিমার গান।
মানুষের জীবনকে টিটকারি দেয়
আগুনের রঙ,
মানুষ সখেদে পরিধান করে
আগুনের থান।
মানুষের হাত কখনো কখনো জানি
কাঁচিছাটা জামার মতো মুক্ত।
মানুষের নগ্নতা জ্বলতে থাকে আগুনে
কখনো কখনো মানুষের হৃদয় নীরব হয়ে যায়।
মানুষের হাতের রেখা নিয়ে করা যাক আলাপ-
মানুষ হাতের আয়ুর রেখা নাকি
ভৌতিক মুখের মতো জ্বলতে থাকে।
জীব আর নক্ষত্রের অনাদি বিবরণ সম্পর্কে
আমার ধারণা নেই,
ভাস্বর আগুনে বনের সিংহকে মনে হয়
ফিকে মরুভূমি।
এ পৃথিবীতে বিচিত্র সব ঘটনা ঘটে
হংসী রেখে যায় সোনার ডিম
খড়ের ভিতর এক এক প্রভাতে।
গৃহস্থের মন নাকি দৃঢ় হতে থাকে
পরিচিত বিস্ময়ের অমোঘ অনুভবে।
লোহা ও পাথরের গল্প
……………………..
একদিন লোহা ছিলো পাথর
লোহা ছিলো অন্ধকারের ভিতর দাঁড়িয়ে,
এখন লোহা মেশিন খায় –
এখন লোহা সময়ের স্তম্ভ ভাঙে।
মানুষ মেশিনকে বশ করে খেতে চায়
লোহার বুকে অনন্ত রাত নামে,
লোহা এখন মানুষের-
আশার আকাশকুসুম।
লোহার ঘুম আছে, মৃত্যু আছে
পাথরেরও ঘুম আছে, মৃত্যু আছে
মেশিনেরও ঘুম আছে, মৃত্যু আছে-
মানুষেরও ঘুম আছে, মৃত্যু আছে।
লোহা নীলিমার, না প্রকৃতির
পাথর নীলিমার, না-প্রকৃতির
মানুষ নীলিমার, না প্রকৃতির
পাথর ও লোহা মানুষ বিধৌত হয়।
একদিন লোহা ও পাথর মিশে যাবে
অনাদির বাষ্পলোকে,
লোহা ও পাথরে একদিন হবে জলস্ফুলিঙ্গ-
মানুষ হবে পাথরের সেতুলোকে মানব।
কঙ্কালের হাতে প্রেমিকা
………………………
মানুষ ধুলো হয়ে ভেসে যাচ্ছে
মানুষের সব কিছু এখন অনাদি, স্থবির;
কুয়াশা-ঘোড়ায় তুলে নিচ্ছে মানুষ-
যার যার প্রেম।
মানুষের মনের আগুন এখন
যখন তখন হয়ে যায় শুয়োরের মাংস,
মানুষ তার প্রেমিকাকে তুলে দিচ্ছে-
কঙ্কালের হাতে সজ্ঞানে।
কোকিলের গান স্তব্ধ হয়ে যায়
চুম্বক পাহাড়ে,
কতো কতো বীরের অবয়বে দেখা যায়
সার্কাসের ব্যথিত সিংহের অবয়ব।
রাজকর্মচারীকে মনে হয়
অন্ধ হুতোম পেঁচা
চুরি হয়ে যাচ্ছে গরিবের-
ফুটো ঘটি, ভাঙা বাটি।
কুয়াশার পাখার হাওয়া
প্রদীপ নিভিয়ে দেয়
কুয়াশা ওড়ে যায় দূর কুয়াশায়,
চিতাবাঘের গায়ের ঘ্রাণ শুঁকে শুঁকে
মানুষের মন হরিণ হয়ে যায়।
লোকটি ঝিনুকের মতো চুপ করে থাকে
……………………………………..
লোকটি ঝিনুকের মতো চুপ করে থাকে
অথচ এই লোকটি একদিন
গাইতো গান জলের উল্লাসে–
যেমন গায় গান পৃথিবীর কানে
মানবের প্রিয় শস্যদানা।
এক সময় লোকটি সমুদ্রের হাওয়ায়
ভেসে যেতে চাইতো
এখন লোকটি জেনেছে কেবল বিষাদ–
পেয়েছে কেবল রক্ত আর মাটির কর্কশ স্বাদ।
লোকটি পেয়েছে কেবল যন্ত্রণার বিষ
লোকটি গায় না আর বিরহের গান,
লোকটি জেনে গেছে মানুষের বেঁচে থাকা
পথে পথে থাকা আহত মাছির মতো।
লোকটি কহে না আর উৎসবের কথা
নিঃসঙ্গ বুকের গান গেয়ে গেয়ে
রাত্রির বাতাসের মতো চলে যায়।
পৃথিবী তাকে দিয়েছে তা
একরাত্রি দিতে পারে যা।
আহ্নিক গতির নিয়ম
……………………
পৃথিবীর আহ্নিক গতির নিয়ম আমি
স্পষ্ট করে বুঝি না,
সূর্যকে ঘিরে পৃথিবী ঘুরে গেলেও যেতে পারে–
তখন হয়তো আলোকিত হতে পারে দিন।
আহ্নিক গতির নিয়মেই নাকি রাত
অন্ধকার হয়ে আসে,
এর মধ্যে দিয়ে সময় নাকি মানবীয় হয়।
সময় প্রতি মুহূর্তেই রূপান্তরিত সময়।
কেন জানি মনে হয়
পৃথিবী বলয়িত মরুভূমি,
মানুষ কাজ করে কলের নিয়মে।
হৃদযন্ত্রের ভয়াবহতার জন্যে
পৃথিবী নিরাপদ, সুস্থ, সুন্দর নয়।
দিনের রাত, রাতের পরদিন
মেঘের ভিতরে লুকিয়ে থাকা
বিদ্যুতের মতো,
মানুষ আসলে অবসন্ন, রণক্লান্ত নাবিক
আমরা মানুষ বলেই
আজকের এই অন্ধকার জগৎ,
নিদর্শনের এই সূর্যবলয়–
জয় থেকেই মানুষের হয় ক্ষয়।
প্রাচীন ঋষির সঙ্গে মানুষ
………………………..
পাখি আর ফুলে ঘটতে পারে
পার্থিব জীবনের মধ্যস্থতা
ফুলের বন যখন জ্যোৎস্নায় মিশে
তখনো মানুষ বেদনার মতো হয়ে
একা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
মানুষ পৃথিবীতে পিরামিড গড়ে
মানুষ পৃথিবীতে পিরামিড ভাঙে,
মানুষ পর্বত কাটতে থাকে
আপন মনে ডিনামাইট দিয়ে।
মানুষ জানে না মানুষের
রহস্যময় ভুলে কুননি,
মানুষ কখনো প্রাচীন ঋষির সঙ্গে
উড়ে যায় আকাশে নক্ষত্রে।
মানুষের চোখের সামনে ধুলো হয়ে যায়
জ্যোৎস্না আর কোকিল,
মানুষ চিনে না দেবদারু-দ্বীপের নক্ষত্রের ছায়া।
পৃথিবীর মানুষীয় রূপ–
পৃথিবীর মানুষ দেখে না।
তবুও মাছির মতো কামনা মিশে থাকে
মানুষের রক্তে,
পাখির পাখার হাওয়া
প্রদীপ নিভিয়ে দেয়।
…………..
ময়মনসিংহ







