প্রচ্ছদসাম্প্রতিকজুলাইয়ের শক্তি

লিখেছেন : পিনাকী ভট্টাচার্য

জুলাইয়ের শক্তি


পিনাকী ভট্টাচার্য

জুলাই অভ্যুত্থানের পুরো আখ্যান এখনো লিখিত হয়নি, এবং সম্ভবত এর কিছু অংশ দীর্ঘকাল অলিখিতই থাইক্যা যাবে, কিছু তথ্য হয়তো কখনোই প্রকাশযোগ্য হবে না, আবার কিছু কেবল উপযুক্ত সময়ের ব্যবধানে প্রকাশ করা যাবে। আমি অন্তত কিছু ঘটনা ঘনিষ্ঠ জনের কাছে সাক্ষ্য দিয়ে যাবো যেন তা আমার মৃত্যুর পরে প্রকাশ করা হয়। ওই অংশটা জরুরী। আর এইটা এখন প্রকাশ করাটা মোটেই উচিৎ হবেনা। তবে একটি বিষয় বুঝা সবার জন্য জরুরি: হাসিনার বাহিনীর পরাজয় কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বা অনিবার্য পরিণতি ছিল না; বরং ছিল সংগঠিত প্রচেষ্টা ও সম্মিলিত ঝুঁকি-গ্রহণের অনিবার্য ফল। হাসিনার বাহিনী এমনি এমনি পরাজিত হয় নাই।

এই প্রেক্ষাপটে আমি যে ভূমিকাটি সম্পর্কে প্রকাশ্যে সাক্ষ্য দিতে পারি, তা হলো মাদ্রাসা-শিক্ষার্থীদের রাজপথে সমবেত হতে উদ্বুদ্ধ করা, যোগাযোগ স্থাপন এবং সমন্বয়ের কাজ। জুলাইয়ের উত্তাল সময়ে বাম, সেক্যুলার, লিবারাল এমনকি বিএনপি-ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন মহল থেকে বারবার আমার কাছে একই অনুরোধ আসতেছিল, তা হচ্ছে, মাদ্রাসা-শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামার আহ্বান জানাতে। যদিও তারা রাজপথেই ছিলো কিন্তু নানা জায়গায় আওয়ামী আক্রমণ মাদ্রাসা ছাত্ররা ছাড়া প্রতিরোধ করা যাচ্ছিলোনা। এই বারবার অনুরোধ এইটাই প্রতিষ্ঠা করে যে আন্দোলনের ডিসাইসিভ মুহূর্তে এই অংশগ্রহণকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ গণ্য করা হচ্ছিল।

তবে আমার মূল্যায়ন হলো, মাদ্রাসা-শিক্ষার্থীরা মূলত নিজস্ব তাগিদেই রাজপথে নেমেছিল। সম্ভবত নির্দিষ্ট কিছু স্ট্রাটেজিক অবস্থানে তাদের উপস্থিতি পরিস্থিতির গতিপথ পরিবর্তনে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। যেমন যাত্রাবাড়ী, বসিলা, মিরপুর পল্লবি কাফরুল, পুরান ঢাকা, মতিঝিল, ফকুরাপুল, শান্তিনগর। যাত্রাবাড়ী বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি একইসাথে ঘন মাদ্রাসা-অধ্যুষিত, এবং ঢাকার দক্ষিণ-পূর্ব প্রবেশদ্বার ও মহাসড়ক-সংযোগস্থল অর্থাৎ একটা স্ট্রাটেজিক চোকপয়েন্ট। জুলাইয়ে যাত্রাবাড়ী যে তীব্র সংঘর্ষের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, তার পেছনে এই দ্বৈত বৈশিষ্ট্যই কাজ করেছে। মাদ্রাসা না থাকলে যাত্রাবাড়ীর প্রতিরোধ সম্ভব ছিলোনা। একই ঘটনা ঘটছে ঢাকার অন্যান্য অঞ্চলে।

ইসলামপন্থী ও মাদ্রাসা-শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগের প্রস্তুতি নিয়ে রাজপথে নামাটাই ছিল জুলাইয়ের ডিসাইসিভ ঘটনা। এই শাহাদাত-প্রস্তুতিই ছিল অভ্যুত্থানের প্রাণশক্তি।

ইসলামপন্থীদের “ভিলেন” হিসেবে নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয় ঠিক তখন থেকে, যখন জুলাই তার আন্দোলনগত গতিবেগ হারাতে শুরু করে। রক্ত দেওয়ার পর্যায়ে যাদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য গণ্য করা হয়েছিল, কৃতিত্ব বণ্টনের পর্যায়ে সেই একই অংশগ্রহণকে প্রান্তিক করা হয়।

আমি জুলাইয়ে বাম ও সেক্যুলার শক্তিগুলোর উপস্থিতি অস্বীকার করি না। তারা নিঃসন্দেহে জুলাইয়ে সক্রিয় ছিল। কিন্ত জুলাই যে রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করেছিল, যেখানে ইসলামপন্থী ও সেক্যুলার বিভাজন সাময়িকভাবে অতিক্রান্ত হয়েছিল সেই অতিক্রমণের সম্ভাবনা ইসলামপন্থীদের পক্ষ থেকে বিনষ্ট হয়নি।

এই সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের এখনো করা সম্ভব। এবং বাংলাদেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমি মনে করি এটা প্রয়োজনীয়। জুলাইয়ের পক্ষের শক্তির ন্যুনতম একটা আলোচনার স্পেইস থাকাটা জরুরী।

বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা জুলাইয়ে সেল্ফলেস স্যাক্রিফাইস করেছে। তাদের বীরত্বের জন্য সশ্রদ্ধ সেলাম।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা