শান্তা মারিয়া
‘বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়।’ কথাটা যে কত সত্যি তা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফর প্রমাণ করেছে। কোনো চাপাবাজি, গলাবাজি, চেতনাবাজি ছাড়াই তারেক রহমান তাঁর সদ্য সমাপ্ত চীন সফরে প্রমাণ করেছেন একটি বিদেশ সফর দেশের জন্য কতটা অর্থবহ হতে পারে।
প্রথমেই জানিয়ে রাখি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনে বিপুল সম্মান পেয়েছেন যা ইতোপূর্বে এশিয়ার খুব কম দেশের নেতাই লাভ করেছেন। চীনের গণমাধ্যমে এই ক’দিন শিরোনাম ছিলেন তারেক রহমান। চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আন্তরিক সম্মান প্রদান করেছেন।
এখন অনেকেই প্রশ্ন করবেন, দেশের জন্য কী এমন সুখবর বয়ে আনলেন প্রধানমন্ত্রী? জবাবে জানাচ্ছি, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আসার জন্য যে পথ সুগম হয়েছে তা সবচেয়ে ইতিবাচক খবর। খোদ বেইজিংয়ে আয়োজিত ‘ইনভেস্ট ইন বাংলাদেশ’ সেমিনার চীনা ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিপুল সাড়া ফেলেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুলভ শ্রম আকৃষ্ট করেছে বিনিযোগকারীদের। চীন এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদক দেশ। তারা ক্রমশ ক্ষুদ্র উৎপাদন থেকে ভারী শিল্পের দিকে মন দিচ্ছে। হালকা শিল্প উৎপাদন তারা বিভিন্ন বন্ধুদেশে সরিয়ে দিতে চাচ্ছে। এই সুযোগটি কাজে লাগানোর পথ প্রশস্ত হয়েছে এবারের ইনভেস্ট ইন বাংলাদেশ সেমিনারের মাধ্যমে। বাংলাদেশ যদি তার সুবিধাজনক ভূপ্রকৃতি ও জনসম্পদের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগকারীদের এই আগ্রহকে ধরে রাখতে পারে তাহলে অদূর ভবিষ্যতেই বাংলাদেশে প্রচুর বিনিয়োগ আসবে, তৈরি হবে কর্মসংস্থান। আমাদের নাগরিকরা দেশেই কাজের সুযোগ পাবেন।
‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক কোরিডর’ নিয়ে আলোচনা ভালো এগিয়েছে। এই করিডরের প্রস্তাব ছিল অনেক আগেই। কিন্তু এতদিন ভারতের ‘নাখোশ’ হওয়ার ভয়ে হাসিনা সরকার এটি বাস্তবায়নে কোন আগ্রহ দেখায়নি। প্রশ্ন করতে পারেন এই কোরিডরের মাধ্যমে বাংলাদেশের কী এমন লাভ হবে? বলছি। ধীরে বন্ধু ধীরে।
সোজাভাষায় বলি এর মাধ্যমে চীনের কুনমিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম তথা ঢাকার সরাসরি স্থলপথে যোগাযোগ সম্ভব হবে। চীনে যাওয়ার জন্য রেল ও সড়কপথ খুলে যাওয়ার ফলে পণ্য পরিবহণ খরচ কমে যাবে, যাতায়াত সহজ হবে। দুই দেশের মানুষ অনেক কম অর্থ ব্যয়ে যাতায়াত করতে পারবেন। ইউননান প্রদেশ থেকে অল্প খরচে কৃষিপণ্য আসতে পারবে। ফলে অনেক কৃষিপণ্যের জন্য আপনাকে নগদ টাকা দিয়ে পণ্য কিনেও অন্য কোন দেশের মুখ ঝামটা খেতে হবে না। বাংলাদেশী শিক্ষার্থী এবং রোগীরা অনেক কম খরচে চীনে যেতে পারবেন।
এবারের সফরে বাংলাদেশের পণ্য চীনে রপ্তানির বিষয়েও আলোচনা অনেক অগ্রসর হয়েছে। বিশেষ করে কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। কুনমিংয়ের মানুষকে দেখেছি কাঁঠাল খুব পছন্দ করে। তারা আশপাশের দেশ থেকে ডুরিয়ানও আমদানি করে। ইউননানেও অবশ্য কাঁঠাল হয়। তবে বাংলাদেশের ফলন আর মান আরও উন্নত। আহা, আমাদের গাজীপুরের কাঁঠালের স্বাদ যদি চীনের মানুষ পায় তাহলে কোথায় ভেসে যাবে তাদের ডুরিয়ান-প্রীতি । চীন থেকে বাংলাদেশ কৃষিপ্রযুক্তি আনতে পারবে আরও বেশি করে।
চীনের কৃষি যে এখন কত উন্নতি করেছে তা নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছি। বাজারে কোন ফসলের, শাকসবজির, কোন ফলে বা অন্য কোন পণ্যের কোন কমতি নেই। ফসলের বাম্পার ফলন চীনের নিয়মিত সাফল্য। এই সাফল্যের অংশীদার যদি বাংলাদেশ হতে পারে তাহলে আমাদের উর্বর ভূমির সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের কৃষকের অবস্থা যে কত উন্নত হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি ভালো খবর হলো চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরে উন্নয়ন ঘটাতে চীনা সহযোগিতার সম্ভাবনা। অবকাঠামো থেকে শুরু করে প্রযুক্তিগত সব ক্ষেত্রেই চীনের সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
এবারের সফরে দুইদেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা দুইদিকেই চীনের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য শুভ ফল বয়ে আনবে।
বাণিজ্যে ১০০ শতাংশ শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে চীন। বাংলাদেশ যদি আমাদের সোনালি ফসল পাটের অতীত গৌরবের দিন ফিরিয়ে আনতে পারে তাহলে পাটের ব্যাগ ও অন্যান্য সামগ্রী রপ্তানি করে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নকে সুগম করতে পারবে বিশ্বের জন্য।
আর তিস্তা প্রকল্প? সেদিকেও ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে।
পতনের আগে শেখ হাসিনার সর্বশেষ বিদেশ সফরে চীনের অভিজ্ঞতা ছিল এক কথায় একটি ‘ডিজাস্টার’। এর কারণ হলো, হাসিনা সরকারের ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ দ্বিমুখী নীতি। একদিকে ভারতের প্রায় পকেটের ভিতর বসে থেকে অন্যদিকে চীনের প্রতি মিষ্টি হাসায় কোন ফল হয়নি।
বাংলাদেশের বর্তমান বিএনপি সরকার এই ভারততোষণ নতজানু নীতি থেকে আপাতত কিছুটা মুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি বিশ্বে সকলের শ্রদ্ধা আকর্ষণকরেছে। চীন এবার তারেক রহমানকে বিপুল ও আন্তরিক সম্মান দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধুত্ব কত গভীর।
তবে একটা কথা একটু অশোভন হলেও বলছি। আফশোস লীগ, আহাজারি লীগ, গেল গেল সংস্কৃতি গেল, চেতনা গেল লীগের মুখে যে চপেটাঘাতটি পড়েছে সেটা কিন্তু দারুণ বেদনাদায়ক। প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের অনেক কিছুতেই তাদের বুকটা ফাইট্টা যায় অবস্থা। তা কি আর করা যাবে। সবাইকে খুশি করা তো আর কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
আপাতত আমার কথাটি ফুরালো, কিন্তু নোটে গাছটি মুড়ায়নি। বরং আশার বৃক্ষ নতুন ডালপালা মেলেছে। সেখানে বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধুত্বের সুরভিত ফুল চোখ জুড়াচ্ছে।
…………………..
সরাসরি চীন থেকে







