প্রচ্ছদগদ্যশহীদুল জহিরের মতো লেখককে 'তৃতীয় শ্রেণির' মর্যাদা দেওয়া সলিমুল্লাহ খানের বড় উদারতা...

লিখেছেন : মাহমুদ মেঘ

শহীদুল জহিরের মতো লেখককে ‘তৃতীয় শ্রেণির’ মর্যাদা দেওয়া সলিমুল্লাহ খানের বড় উদারতা বা দয়া

মাহমুদ মেঘ

​কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহিরকে নিয়ে প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও তাত্ত্বিক সলিমুল্লাহ খানের বিতর্কিত মন্তব্যের সূত্রপাত ঘটেছিল মূলত একটি সাহিত্যিক আলোচনা ও পরবর্তী সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে। সেখানে তিনি জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’ কিংবা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড’-এর মতো বিশ্বমানের উপন্যাসের কাঠামোগত ও দার্শনিক ভিত্তির সাথে শহীদুল জহিরের লেখার তুলনা করছিলেন। সেই তুলনামূলক ব্যবচ্ছেদের এক পর্যায়ে সলিমুল্লাহ খান মন্তব্য করেন যে, বিশ্বসাহিত্যের সর্বোচ্চ মানদণ্ডে শহীদুল জহির আসলে একজন ‘তৃতীয় শ্রেণির লেখক’। এই মন্তব্যটি বাংলা সাহিত্যজগতে তীব্র আলোড়ন ও বিতর্কের সৃষ্টি করে। আপাতদৃষ্টিতে একে চরম রূঢ় মনে হলেও, গভীর সাহিত্যতাত্ত্বিক ও কাঠামোগত বিশ্লেষণে সলিমুল্লাহ খানের এই যুক্তিটি অত্যন্ত অকাট্য এবং সঠিক হিসেবে প্রতিপন্ন হয়। বরং সাহিত্যের কঠোর বৈশ্বিক মানদণ্ড বিবেচনা করলে বলতে হয়, সলিমুল্লাহ খান তাঁকে ‘তৃতীয় শ্রেণি’র লেখক বলে এক ধরনের দয়াই করেছেন; কারণ গভীরতর ব্যবচ্ছেদে অনুকরণ সংস্কৃতির স্থান আরও নিচে হওয়ার কথা।

​একটি সাহিত্যকর্মের সার্থকতা এবং তার স্রষ্টার অবস্থান কোথায়—তা কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের আবেগ বা সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী চেতনার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হতে পারে না। কোনো সাহিত্যিক যদি বৈশ্বিক সাহিত্যের মানচিত্রে নিজের আসন দাবি করতে চান, তবে তাঁর সাহিত্যকে অবশ্যই বিশ্বসাহিত্যের সর্বোচ্চ কাঠামোগত এবং দার্শনিক মানদণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে। একটি কালজয়ী সাহিত্যের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো তার রূপ ও কাঠামোর মৌলিকত্ব। যখন কোনো ভাষার লেখক অন্য একটি ভিন্ন সংস্কৃতি, ভূগোল ও দর্শনের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া সাহিত্যিক ধারাকে নিজের বলে চালিয়ে দিতে চান, তখন তা বিশ্বসাহিত্যের দরবারে কেবলই একটি ‘অনুকরণ’ বা ‘প্রতিনিধিত্বমূলক’ সৃষ্টি হিসেবে গণ্য হয়। লাতিন আমেরিকার ভূখণ্ডে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, হোর্হে লুইস বোর্হেস কিংবা কার্লোস ফুয়েন্তেসরা যে ‘জাদুকরী বাস্তবতাবাদ’ বা ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ সৃষ্টি করেছিলেন, তা ছিল তাঁদের নিজস্ব রাজনৈতিক সংকট, ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং এক ধরনের ঐতিহাসিক ট্রমার অবিকল্প শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। মার্কেস যখন ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড’ লিখছেন, তখন তা লাতিন আমেরিকার যূথবদ্ধ অবচেতনের খাঁটি রূপ। কিন্তু শহীদুল জহির যখন তাঁর ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ কিংবা ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ উপন্যাসে হুবহু সেই একই আখ্যানশৈলী, অতিপ্রাকৃতিক উপাদানের বাস্তবসম্মত উপস্থাপন এবং দীর্ঘ বাক্যের বুনন তৈরি করেন, তখন তা কোনো মৌলিক দর্শনের জন্ম দেয় না। এটি আসলে লাতিন মার্কিন জাদুর ওপর ঢাকাই মসলিনের একটা প্রলেপ মাত্র।

​বিশ্বসাহিত্যের একটি নির্দিষ্ট স্তরবিন্যাস বা হায়ারার্কি রয়েছে, যা কোনো জাতিগত পক্ষপাতদুষ্ট নয়, বরং তা শৈল্পিক বিপ্লবের ওপর নির্ভরশীল। এই মানদণ্ডের প্রথম শ্রেণিতে বা সর্বোচ্চ চূড়ায় বসেন তাঁরা, যাঁরা সাহিত্যের রূপ, ভাষা এবং চেতনাকে সম্পূর্ণ নতুন একটি স্তরে নিয়ে যান—যেমন ফিওদর দস্তয়েভস্কি, লিও তলস্তয়, জেমস জয়েস কিংবা ফ্রান্ৎস কাফকা। জয়েস যখন ‘ইউলিসিস’ লেখেন বা কাফকা যখন মানুষের আধুনিক অস্তিত্বের সংকটকে অবাস্তব রূপকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন, তখন তাঁরা বৈশ্বিক চিন্তার জগতে এক একটি নতুন যুগের সূচনা করেন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে আসেন তাঁরা, যাঁরা এই অগ্রগামীদের পথ ধরে নিজেদের আঞ্চলিক ইতিহাসকে এক নতুন বৈশ্বিক মহাকাব্যিক রূপ দিতে পারেন—যেমন মার্কেস বা মিলান কুন্ডেরা। এখন প্রশ্ন ওঠে, শহীদুল জহিরের স্থান কোথায়? তিনি যে শৈলী ও বাক্যগঠন ব্যবহার করেছেন, তা জেমস জয়েসের ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’ এবং মার্কেসের ম্যাজিক রিয়ালিজমের একটি মিশ্রিত প্রতিধ্বনি। সলিমুল্লাহ খানের যুক্তির মূল ভিত্তিটি এখানেই। তিনি বিশ্বসাহিত্যের এই সর্বোচ্চ স্কেলটি ধরেছিলেন। সেই স্কেলে জহির কোনো নতুন ঘরানার স্রষ্টা নন, বরং ধার করা ঘরানার একজন দক্ষ কারিগর মাত্র। একজন কারিগর যতই দক্ষ হোন না কেন, তিনি কখনো মূল স্থপতির সমকক্ষ হতে পারেন না। এই কাঠামোগত অনুকরণশীলতার কারণে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে শহীদুল জহিরকে প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্থান দেওয়া তাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব। সলিমুল্লাহ খান যে তাঁকে তৃতীয় শ্রেণিতে স্থান দিয়েছেন, তা তাঁর দক্ষতার প্রতি এক ধরনের নমনীয়তা বা দয়া প্রদর্শন ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ সাহিত্যের কঠোর নিয়ম বলে, যা মৌলিক নয়, যা মূলের দূরবর্তী প্রতিধ্বনি, তার স্থান মূলত আরও অনেক নিচে হওয়া উচিত।

​শহীদুল জহিরের সমর্থকেরা প্রায়শই দাবি করেন যে, তিনি পুরান ঢাকা কিংবা সিরাজগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষা ও আবহকে ম্যাজিক রিয়ালিজমের ফ্রেমে বেঁধেছেন। কিন্তু গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই ফ্রেমটি এ অঞ্চলের মানুষের মনস্তত্ত্বের সাথে কতটা সংগতিপূর্ণ, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকে যায়। বাংলার মানুষের নিজস্ব গল্প বলার হাজার বছরের ঐতিহ্য রয়েছে—যেমন পাঁচালী, পুঁথি, মঙ্গলকাব্য বা মৈমনসিংহ গীতিকা। এই লোকজ ঐতিহ্যের নিজস্ব একটি অবাস্তব ও বাস্তবতার মিশ্রণ ছিল। শহীদুল জহির যদি বাংলার নিজস্ব এই ‘ওরাল ট্র্যাডিশন’ থেকে তাঁর রূপকাঠামো তৈরি করতেন, তবে তা হতো প্রথম শ্রেণির মৌলিক সাহিত্য। কিন্তু তিনি তা না করে পশ্চিমাদের দ্বারা স্বীকৃত লাতিন আমেরিকার আধুনিক সাহিত্যের ফর্মুলাকে বেছে নিয়েছেন। একে বলা যেতে পারে এক ধরনের ‘অভিজাত বুদ্ধিবৃত্তিক অনুকরণশীলতা’। সলিমুল্লাহ খান এই ফাঁকিটি ধরতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, জহিরের সাহিত্যে যে জাদু বা পরাবাস্তবতা রয়েছে, তা বাংলার মাটি থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ওঠেনি, বরং তা ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা এক ধরনের কৃত্রিম সাহিত্যিক ফর্মুলা।

​এখানেই শেষ নয়, শহীদুল জহিরের উপন্যাসের ক্যানভাস ও চরিত্রের গভীরতা বিশ্বসাহিত্যের প্রথম সারির লেখকদের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। দস্তয়েভস্কির উপন্যাসে মানুষের ভেতরের যে ঈশ্বর ও শয়তানের চিরন্তন দ্বন্দ্ব দেখা যায়, কিংবা তলস্তয়ের লেখায় মানব ইতিহাসের যে মহাকাব্যিক বিস্তার পাওয়া যায়, জহিরের লেখায় তার অভাব স্পষ্ট। তাঁর ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি বিশাল ক্যানভাসকে স্পর্শ করলেও, তা শেষ পর্যন্ত আখ্যানের জাদুকরী মারপ্যাঁচ এবং ভাষার কারুকার্যের ভেতরেই বন্দি থেকে যায়। ঘটনার ঐতিহাসিক গভীরতা সেখানে ভাষার চমৎকারিত্বের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। বিশ্বসাহিত্য সেই সাহিত্যকেই শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃতি দেয়, যা ভাষার কারিগরিকে ছাপিয়ে মানুষের চিরন্তন ও সার্বজনীন সত্যকে উন্মোচিত করতে পারে। জহির যেখানে ভাষা ও শৈলীর এক্সপেরিমেন্ট বা পরীক্ষানিরীক্ষাকেই প্রধান করে তুলেছেন, সেখানে গভীর জীবনদর্শনের চেয়ে আঙ্গিকের প্রাধান্য বেশি দৃশ্যমান।

​অনেকে সলিমুল্লাহ খানের এই সমালোচনাকে অতি-کঠোর বলে মনে করতে পারেন, কিন্তু সাহিত্য সমালোচনার কাজ সস্তা praise বা প্রশংসা বিলানো নয়। উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বে ‘অনুকরণ’ একটি বড় ব্যাধি। ঔপনিবেশিক প্রভুরা চলে গেলেও আমাদের ভেতরের যে দাসত্ব রয়ে গেছে, তা প্রমাণ হয় তখনই, যখন আমরা আমাদের ঘরের লেখককে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিতে গিয়ে পশ্চিমাদের তৈরি করা কোনো থিওরি বা ফর্মুলার সাথে মিলিয়ে দেখতে পছন্দ করি। আমরা যখন বলি ‘শহীদুল জহির বাংলার মার্কেস’, তখনই মূলত আমরা জহিরকে মার্কেসের নিচে স্থান দিয়ে দিই। সলিমুল্লাহ খান এই ঔপনিবেশিক মানসিকতার মূলে আঘাত করেছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে, যতক্ষণ আমরা অন্যের তৈরি করা ছাঁচে নিজেদের ঢালতে থাকব, ততক্ষণ আমরা বিশ্বসাহিত্যের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে পারব না।

​পরিশেষে বলা যায়, সলিমুল্লাহ খানের এই মূল্যায়ন শহীদুল জহিরের প্রতি কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষপ্রসূত নয়, বরং তা বিশ্বসাহিত্যের কঠোর ও আপসহীন মানদণ্ডের এক বস্তুনিষ্ঠ প্রতিফলন। জহির নিঃসন্দেহে একজন প্রতিভাবান লেখক ছিলেন এবং বাংলা সাহিত্যের ছোট পরিসরে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু যখনই বিচারালয়টি বিশ্বসাহিত্যের হয়, তখন নিয়মগুলো বদলে যায়। সেখানে অনুকরণ বা প্রভাবকে কোনো ছাড় দেওয়া হয় না। সেই কঠোর আদালতে দাঁড়িয়ে শহীদুল জহিরের মতো একজন প্রভাবিত লেখককে ‘তৃতীয় শ্রেণি’র মর্যাদা দেওয়া এবং বিশ্বসাহিত্যের মহানায়কদের সাথে একই পৃষ্ঠায় তাঁর নাম উচ্চারণ করাই এক প্রকার বড় উদারতা বা দয়া। কারণ সাহিত্যের খাঁটি সত্য এটাই—অনুকরণ যতই নিখুঁত হোক না কেন, তা কখনো আসল সৃষ্টির বিকল্প হতে পারে না এবং তার প্রকৃত শ্রেণি বা স্তর আরও অনেক নিচে হওয়াই যুক্তিযুক্ত।

…………………
লেখক : কবি ও সমালোচক

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা