জুবায়ের ইবনে কামাল
‘আজাদি’ উপন্যাস জুলাই আন্দোলনকে দেখিয়েছে জনতার মিছিল থেকে। গল্পের প্রয়োজনেই আবার তা গিয়ে ঠেকেছে গণভবনের ভয়ঙ্কর শীতল আবহে। বৈপ্লবিক দৃষ্টির পরিবর্তে ‘আজাদি’ জুলাই আন্দোলনকে নিয়ে গেছে ভিন্ন এক স্তরে।
গণঅভ্যুত্থান নামের মধ্যেই ‘গণ’ অংশটি এর ব্যাপকতা প্রকাশ করে। গণঅভ্যুত্থানকে দেখানো যায়, নেতৃত্বদানকারী চরিত্রের চোখে। আবার দেখানো যায়, ভিলেনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। কিন্তু ‘আজাদি’ উপন্যাস লিখতে গিয়ে লেখক জুলাই অভ্যুত্থানকে নিয়ে গেলেন কাঁচাবাজারের ব্যাগ হাতে এক বুক ধুকপুক করা মানুষের কাছে।
উপন্যাসটি শুরু হচ্ছে আন্দোলনে ভুক্তভোগী এমন একটি চরিত্র দিয়ে, যিনি এক ঘন্টা কারফিউ শিথিল থাকা অবস্থায় বাজার করতে গেছেন। তিনি রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় বারবার ভাবছেন এই মুহুর্তেই যদি গোলাগোলি শুরু হয় তবে কীভাবে তিনি নিরাপদে আশ্রয় নেবেন। কীভাবেই বা বাজারের ব্যাগগুলো নিয়ে বাসায় পৌঁছবেন।
তার এই ধরণের পুঁজিবাদি মানসিকতার সঙ্গে মিল পাই কাফকার গ্রেগর সামসার সঙ্গে। যিনি কি-না ঘুম থেকে উঠে নিজেকে পোকা হিসেবে আবিস্কার করার পরেও কীভাবে অফিসে যাবেন সেই চিন্তায় বিভোর থাকেন।
আজাদি উপন্যাসে গল্প যত এগোতে থাকে তত এর ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায়। আমরা আবার দেখি স্বৈরাচারের পক্ষের একজন সাংবাদিককে। যিনি একদিকে সরকারের দলের প্রতি দুর্বল এবং একইসাথে সরকারের ছাত্র খুনের ভয়াবহতা তাকে ভীত করে তোলে। একদমই ‘বাইনারি’ চরিত্র গঠনে না গিয়ে লেখক আমাদেরকে নিয়ে গেলেন মানুষের ভেতরের দোদুল্যমান অবস্থায়। যা সমাজের সাথে ব্যক্তির দ্বন্দ্বের বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করে।
সালাহ উদ্দিন শুভ্রর লেখা ‘আজাদি’ উপন্যাসটি পড়া শুরু করলে প্রথমদিকে মনে হবে এ যেন জুলাই আন্দোলনের দিনলিপি। কিন্তু ক্রমেই এই গল্প আন্দোলনের বিভিন্ন অলিগলি পেরিয়ে গিয়ে একসময় ঠেকেছে শেখ হাসিনার ঘরের ভেতর। শুধুমাত্র নেতৃবৃন্দ বা ভুক্তভোগীর চোখে না দেখিয়ে; আজাদি হয়ে উঠল বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের গল্প। যা প্রকৃতপক্ষেই অন্তর্ভুক্তিমূলক এক অভ্যুত্থানের গল্প শোনায়।
বইটির সংলাপের স্বল্প উপস্থিতি বর্ণনামূলক আবহ তৈরি করেছে। লাতিন আমেরিকার উপন্যাসগুলোতে এই ধরণের বর্ণনামূলক লেখার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। কিন্তু উপনিবেশের প্রভাবে বেড়ে ওঠা দেশগুলোর সাহিত্যে সংলাপের যে ব্যাপক প্রভাব, তা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসগুলোতে দেখতে পাওয়া যায়। তবে ‘আজাদি’ উপন্যাস সেই ঘরানার বাইরের।
তবে এই বর্ণনা প্রচলিত পাঠকের কাছে খানিকটা কম আরামদায়ক। অনুচ্ছেদের কমতি মাঝে মাঝে বইপাঠকে এক প্রকার কষ্টদায়ক বলেই মনে হয়। যদিও সেই ‘ডিস্টার্বিং’ অনুভূতি আমাদের নিয়ে যায় জুলাই অভ্যুত্থানের অনিশ্চিত সময়গুলোতে, যখন স্বৈরাচার সরকার সবকিছু স্বাভাবিক বলে প্রচার করলেও মানুষের ভেতরে ছিল শূণ্যতা।
‘আজাদি’ উপন্যাসের ভাষা অনেকটাই এই সময়ের ভাষার অনুরূপ। গল্পের শেষের দিকে শেখ হাসিনার অবস্থা উপস্থাপন করতে গিয়ে লেখা হয়েছে এভাবে, ‘শেখ হাসিনা বুঝতে পারছে কিন্তু মানতে পারছে না। আর কোনো অপশন তার সামনে নাই। একটাই অপশন, আরও মানুষ মেরে ফেলা। মারতে মারতে সব সাফা করে দিলে টিকে যেতে পারে সে’। শেখ হাসিনা চরিত্রের জন্য মানুষ খুন করার সহজলভ্যতা বোঝাতে লেখক বেছে নিয়েছেন এই সময়ের ঢাকার প্রচলিত ভাষা।
উপন্যাসের সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং দিক হলো, প্রায় প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে পাঠক পূর্ব পরিচিত হলেও সেগুলো এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সত্য ঘটনাগুলোকে ফিকশনের এমন মোড়কে বসানো হয়েছে, আপনার জানতে ইচ্ছে করবে বাজারের ব্যাগ হাতে দোলা চরিত্র আসলেই বাড়ি ফিরতে পারল কিনা। এমনকি শেখ হাসিনার পরিণতি জানার পরেও পৃষ্ঠা উল্টে দেখতে ইচ্ছে করবে হাসিনার কর্মকাণ্ডের প্রতিটি মুহুর্ত।
প্রকাশনা সংস্থা আদর্শ অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশ করেছে সালাহ উদ্দিন শুভ্রর লেখা ‘আজাদি’ উপন্যাসটি। বলা হচ্ছে, জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে লেখা এটিই পূর্ণাঙ্গ প্রথম উপন্যাস। মেদহীন এই উপন্যাস আপনাকে বারবার মনে করিয়ে দিবে জুলাই অভ্যুত্থানের আগুনঝড়া দিন, রাগিয়ে তুলবে পুলিশের কাজে, শেষমেষ ঠোঁটের কোনে হাসি ফোটাবে এই ভেবে যে– আমরা ঘটিয়েছিলাম একটা আস্ত মনসুন রেভ্যুলুশন।







