মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত
রবীন্দ্রনাথ একটি হাইব্রিড কাঠামো দিয়েছিলেন; কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমান মানুষের অভিজ্ঞতা সেই কাঠামোতে পুরোপুরি ধরা পড়েনি। নজরুল একটি সংশ্লেষণের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন; কিন্তু নির্বাক হয়ে গেছেন। ছফা এই প্রশ্নটি তুলেছিলেন; কিন্তু উত্তর দিতে পারেননি। মজহার প্রশ্নটি তীব্র করেছিলেন; কিন্তু বিকল্প কাঠামো নির্মাণ করেননি। এই দীর্ঘ যাত্রার শেষে আল মাহমুদ দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি উত্তর দেননি — কিন্তু তিনি দেখিয়েছেন উত্তরের দিকটা কোনদিকে। এটুকুই যথেষ্ট — কারণ বাংলাদেশের সাহিত্যিক ইতিহাসে এটুকুও কেউ এত স্পষ্টভাবে দেখাতে পারেননি।
দুই. প্রথম আল মাহমুদ: যে কবিকে ঢাকা লুফে নিয়েছিল:
আল মাহমুদের প্রথম জীবনের গল্পটি শুরু হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে — নদী, মাঠ, লোকজীবন, গ্রামীণ বাংলার গন্ধমাটির ভেতর থেকে। ঢাকায় আসার পর তিনি বামপন্থী সাংস্কৃতিক পরিসরে প্রবেশ করলেন, সত্তরের দশকে গণকণ্ঠে কাজ করলেন, কারাবরণ করলেন। তার প্রথম দিকের কবিতা — লোক লোকান্তর, কালের কলস — ঢাকার সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠান লুফে নিয়েছিল।
এই গ্রহণযোগ্যতার কারণটি বোঝা দরকার। প্রথম দিকের আল মাহমুদ ছিলেন ঢাকার সেকুলার-বামপন্থী কাঠামোর ভেতরে — প্রতিষ্ঠানবিরোধী, গ্রামীণ মানুষের পক্ষে, উপনিবেশ ও শোষণের বিরুদ্ধে। এই অবস্থানটি চেনা ছিল, গ্রহণযোগ্য ছিল। তার কবিতার গ্রামীণ ইমেজারি ও লোকজ ভাষা সেকুলার সংস্কৃতির কাছে “খাঁটি বাঙালিত্বের” প্রকাশ হিসেবে দেখা গেল।
কিন্তু তখনও — এই প্রথম পর্বেও — আল মাহমুদের কবিতায় এমন কিছু ছিল যা ঢাকার সেকুলার পাঠ সম্পূর্ণভাবে ধরতে পারেনি। তার গ্রামীণ বাংলা শুধু নস্টালজিয়ার বাংলা নয় — এটি একটি ইসলামি সভ্যতার বাংলা। সেখানে আজানের শব্দ আছে, পীরের দরগাহ আছে, মুসলমান কৃষকের বিশ্বদৃষ্টি আছে। সেকুলার পাঠ এই মাত্রাটিকে “লোকজ রঙ” বলে পাশ কাটিয়ে গেছে।
তিন. সোনালী কাবিন: যে কবিতা দুটি জগতকে এক করেছিল:
১৯৭৩ সালে প্রকাশিত সোনালী কাবিন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি অসাধারণ ঘটনা। চৌদ্দটি সনেটের এই সংকলনে আল মাহমুদ এমন কিছু করলেন যা বাংলা কবিতায় আগে হয়নি এবং পরেও হয়নি — তিনি শরীরী প্রেম ও ইসলামি আধ্যাত্মিকতাকে একটি অখণ্ড কাব্যিক অভিজ্ঞতায় মিলিয়ে দিলেন।
সোনালী কাবিনের সনেটে এই মিলনের ঘোষণা:
সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিণী
যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দু’টি
[রেফারেন্স: সোনালী কাবিন, কবিতা ১, কাব্যগ্রন্থ: সোনালী কাবিন, প্রথম প্রকাশ অক্টোবর ১৯৭৩]
গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল, কবুল।
[রেফারেন্স: সোনালী কাবিন, কবিতা ১৩, কাব্যগ্রন্থ: সোনালী কাবিন, প্রথম প্রকাশ অক্টোবর ১৯৭৩]
হৃদয়ের ধর্ম নিয়ে কোন কবি করে না কসুর।
এবং:
ভাষার শপথ আর প্রেমময় কাব্যের শপথ।
[রেফারেন্স: সোনালী কাবিন, কবিতা ১৪, কাব্যগ্রন্থ: সোনালী কাবিন, প্রথম প্রকাশ অক্টোবর ১৯৭৩]
মাৎস্যন্যায়ে সায় নেই, আমি কৌম সমাজের লোক
সরল সাম্যের ধ্বনি তুলি নারী তোমার নগরে
[রেফারেন্স: সোনালী কাবিন, কবিতা ৬, কাব্যগ্রন্থ: সোনালী কাবিন, প্রথম প্রকাশ অক্টোবর ১৯৭৩]
এই কবিতামালায় প্রেমিকা একজন মানবী — কিন্তু তার মধ্য দিয়ে একটি সম্পূর্ণ সভ্যতার স্বপ্ন দেখা যাচ্ছে। পদ্মার চর, বাংলার মাটি, ইসলামি বিবাহের রূপক — “কাবিন” শব্দটিই একটি ইসলামি প্রতিষ্ঠানের নাম — এই সবকিছু মিলে একটি বিশ্বদৃষ্টি তৈরি হয় যেখানে প্রেম, ধর্ম, মাটি ও ভাষা আলাদা নয়।
রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের আলোয় প্রকৃতিতে ঈশ্বর দেখতেন। নজরুল হাফিজ ও রুমির আলোয় প্রেমে ঈশ্বর দেখতেন। আল মাহমুদ এই দুটি পথের বাইরে একটি তৃতীয় পথ নিলেন — তিনি বাংলার মাটি ও মানুষের ভেতরে ইসলামের সভ্যতামূলক উপস্থিতি দেখাতে চাইলেন। এটি ধর্মপ্রচার নয়, এটি একটি কাব্যিক দর্শন।
সোনালী কাবিনে পশ্চিমা সনেটের ফর্ম ব্যবহার করা হয়েছে — শেক্সপিয়রীয় ঐতিহ্যের কাঠামো। কিন্তু সেই কাঠামোর ভেতরে যা আছে তা সম্পূর্ণ বাংলাদেশি ও ইসলামি। এই কাজটি রবীন্দ্রনাথের হাইব্রিডিটির চেয়ে আলাদা — রবীন্দ্রনাথ পশ্চিমা ফর্মে উপনিষদীয় আত্মাকে ঢেলেছিলেন পশ্চিমা পাঠকের কাছে পৌঁছানোর জন্য। আল মাহমুদ পশ্চিমা ফর্ম নিয়েছেন নিজের মাটির কথা নিজের মানুষকে বলার জন্য — পশ্চিমের অনুমোদনের প্রয়োজন ছাড়াই।
চার. দ্বিতীয় আল মাহমুদ: যে মোড়ে ঢাকা পিছিয়ে গেল:
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে আল মাহমুদের কবিতায় একটি স্পষ্ট পরিবর্তন আসতে থাকে। ইসলামি চেতনা ক্রমশ কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে — শুধু সাংস্কৃতিক রঙ হিসেবে নয়, একটি সক্রিয় দার্শনিক অবস্থান হিসেবে। ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’, ‘আরব্য রজনীর রাজহাঁস’, এবং পরবর্তী সংকলনগুলোতে এই পরিবর্তন আরো স্পষ্ট হয়।
ঢাকার সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠান এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আল মাহমুদকে ধীরে ধীরে প্রান্তিক করতে শুরু করল। এই প্রান্তিকীকরণের ভাষাটি লক্ষ করার মতো। সরাসরি বলা হলো না “তুমি ইসলামপন্থী হয়ে গেছ তাই তোমাকে আমরা গ্রহণ করব না।” বরং বলা হলো তার পরবর্তী কবিতা “মানসম্পন্ন নয়”, তিনি “প্রথম দিকের উচ্চতা ধরে রাখতে পারেননি”, তার “রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন” হয়েছে।
এই সাহিত্যিক রায়গুলোর আড়ালে একটি আদর্শগত বিচার লুকিয়ে আছে: যে কবি ইসলামকে তার কবিতার কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে নেন, তিনি “মূলধারার” বাংলাদেশি সাহিত্যের বাইরে। এই বিচারটি সাহিত্যিক নয়, রাজনৈতিক।
কিন্তু এখানে একটি জরুরি প্রশ্ন: আল মাহমুদের পরবর্তী কবিতা কি সত্যিই দুর্বল? সোনালী কাবিনের পর তার কাব্যমান কমেছে — এই মূল্যায়নে কিছুটা সত্য আছে। কিন্তু এই দুর্বলতার কারণ কি শুধু ব্যক্তিগত? নাকি এর পেছনে একটি কাঠামোগত সমস্যা আছে?
আল মাহমুদ যে প্রকল্পটি নিয়েছিলেন — বাংলা কবিতায় একটি ইসলামি সভ্যতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করা — সেই প্রকল্পের জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ দরকার তা বাংলাদেশে ছিল না। ইসলামি দর্শনের গভীর চর্চা নেই, সুফি ঐতিহ্যের সমসাময়িক পুনর্মূল্যায়ন নেই, আরবি-ফারসি কাব্যের সঙ্গে বাংলা কবিতার সক্রিয় সংলাপ নেই। একজন কবি একা একটি সভ্যতামূলক প্রকল্প বহন করতে পারেন না — তার চারদিকে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ দরকার। সেই পরিবেশের অনুপস্থিতিটিও আল মাহমুদের পরবর্তী কবিতার অসমতার একটি কারণ।
পাঁচ. ঢাকাই আল মাহমুদ পাঠ: একটি বিভক্ত আয়না:
বাংলাদেশে আল মাহমুদকে দুটি শিবির দুটি বিপরীত কারণে পড়ে — এবং দুটি পাঠই অসম্পূর্ণ।
সেকুলার-বামপন্থী শিবির মূলত সোনালী কাবিন পড়ে। এই পাঠে সোনালী কাবিনের শরীরী প্রেম ও গ্রামীণ ইমেজারি নেওয়া হয়, কিন্তু তার ইসলামি মাত্রাটি এড়িয়ে যাওয়া হয়। “কাবিন” শব্দটির ইসলামি অর্থ আলোচিত হয় না। পদ্মার চরের মুসলমান কৃষকের জীবনদর্শন যে কবিতার ভিত্তি — এই কথাটি বলা হয় না। সোনালী কাবিনকে একটি সেকুলার প্রেমকাব্য হিসেবে পড়া হয়, একটি ইসলামি সভ্যতামূলক কাব্য হিসেবে নয়।
ইসলামপন্থী শিবির আল মাহমুদের পরবর্তী ইসলামি কবিতাগুলো পড়ে। কিন্তু এই পাঠে সোনালী কাবিনের জটিলতা ও গভীরতা এড়িয়ে যাওয়া হয় — কারণ সেই কবিতার শরীরী প্রেম এই শিবিরের কাছে অস্বস্তিকর। আল মাহমুদকে শুধু “ইসলামি কবি” হিসেবে পড়া হয়, “বাংলাদেশি কবি যিনি ইসলামকে তার কাব্যের কেন্দ্রে রেখেছেন” হিসেবে নয়।
দুটি পাঠই আল মাহমুদের মৌলিক অবদানকে মিস করে। তার অবদান এই দুটি শিবিরের বাইরে — তিনি দেখিয়েছেন যে বাংলার মাটি ও ইসলামি চেতনা আলাদা নয়, এবং এই অখণ্ডতাকে কাব্যে ধারণ করা সম্ভব।
ছয়. আল মাহমুদের কবিতায় ইসলামি সৌন্দর্যতত্ত্ব: একটি নতুন পথের ইঙ্গিত:
আল মাহমুদের কবিতায় একটি বিশেষ সৌন্দর্যতত্ত্ব কাজ করে যা বাংলাদেশে প্রায় আলোচিত হয়নি। এই সৌন্দর্যতত্ত্বের মূল কথাটি হলো: সৌন্দর্য ঈশ্বরের একটি গুণ, এবং পৃথিবীর সৌন্দর্য সেই ঈশ্বরীয় সৌন্দর্যেরই প্রকাশ।
ইসলামি ঐতিহ্যে একটি বিখ্যাত হাদিস আছে — “ইন্নাল্লাহা জামিলুন ইউহিব্বুল জামাল” — আল্লাহ সুন্দর এবং সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রকৃতির সৌন্দর্য, মানুষের প্রেম, শিল্পের সৌন্দর্য — সবকিছু ঈশ্বরের দিকে যাওয়ার পথ। এটি রবীন্দ্রনাথের উপনিষদীয় সৌন্দর্যদর্শনের সঙ্গে কিছুটা মেলে, কিন্তু মূলগতভাবে আলাদা — কারণ এখানে সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টি এক নয়, সৃষ্টি সৃষ্টিকর্তার দিকে ইশারা করে।
আল মাহমুদের কবিতায় পদ্মার ঢেউ, বাংলার মাঠ, একজন কিশোরীর মুখ — এগুলো এই ইশারার বাহন। সোনালী কাবিনে যখন তিনি লেখেন প্রেমিকার রূপের কথা, তখন সেই রূপ শুধু শরীরী নয় — এটি একটি ঈশ্বরীয় সৌন্দর্যের পার্থিব প্রকাশ। এই সৌন্দর্যতত্ত্বটি বাংলা কবিতায় আগে ছিল না।
এই সৌন্দর্যতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মাত্রাও আছে। বাংলাদেশের সেকুলার সংস্কৃতিতে সৌন্দর্যের ধারণা মূলত ইউরোপীয় রোমান্টিক ঐতিহ্য অথবা রবীন্দ্রানুসারী উপনিষদীয় ঐতিহ্য থেকে আসে। আল মাহমুদ একটি তৃতীয় সৌন্দর্যতত্ত্বের ইঙ্গিত দিয়েছেন — যা ইসলামি ঐতিহ্য থেকে আসে এবং বাংলার মাটিতে শিকড় গাড়ে।
সাত. আল মাহমুদ ও ঢাকার সাহিত্যিক রাজনীতি: বহিষ্করণের শারীরবৃত্ত:
আল মাহমুদকে ঢাকার সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে প্রান্তিক করেছে — এই প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজনীতির একটি উন্মোচনকারী নজির।
প্রান্তিকীকরণটি হয়েছে তিনটি উপায়ে। প্রথমত পুরস্কার ও স্বীকৃতির রাজনীতিতে। সোনালী কাবিনের পর আল মাহমুদের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ও সাহিত্যিক স্বীকৃতি ক্রমশ কমেছে — এবং এই হ্রাসের সঙ্গে তার ইসলামি মোড়ের সম্পর্ক আছে। দ্বিতীয়ত পাঠ্যক্রমে অনুপস্থিতিতে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আল মাহমুদের পরবর্তী কবিতা পড়ানো হয় না বললেই চলে। তৃতীয়ত সমালোচনামূলক ভাষ্যের অনুপস্থিতিতে। তার পরবর্তী কবিতার গভীর সমালোচনামূলক আলোচনা বাংলাদেশের মূলধারার সাহিত্য পত্রিকায় প্রায় নেই।
এই তিনটি বহিষ্করণ মিলে একটি বার্তা দেয়: বাংলাদেশের সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠান ঠিক করে দেয় কোন কবিতা “সাহিত্য” এবং কোন কবিতা “ধর্মীয় প্রচার”। এই বিভাজনটি সাহিত্যিক নয়, আদর্শগত — এবং এই আদর্শগত বিভাজন বাংলাদেশের কবিতাকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে রেখেছে।
আট. যে প্রশ্নগুলো আল মাহমুদ রেখে গেছেন:
আল মাহমুদ ২০১৯ সালে মারা গেছেন। তার মৃত্যুর পর বাংলাদেশের সাহিত্যিক পরিসরে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। যে প্রতিষ্ঠান তাকে প্রান্তিক করেছিল, সে প্রতিষ্ঠান তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করল। “সোনালী কাবিনের কবি” বলে স্মরণ করল — শুধু প্রথম জীবনের আল মাহমুদকে, পুরো আল মাহমুদকে নয়।
এই মৃত্যু-পরবর্তী স্বীকৃতিটি একটি সাংস্কৃতিক ভণ্ডামির নজির। জীবিত থাকতে যে কবিকে প্রান্তিক করা হয়েছে, মৃত্যুর পর তাকে “মহান কবি” বলা — এটি আসলে তাকে নিষ্ক্রিয় করার আরেকটি উপায়। কারণ মৃত কবি আর নতুন কবিতা লেখেন না, নতুন প্রশ্ন তোলেন না।
আল মাহমুদ যে প্রশ্নগুলো তুলে গেছেন সেগুলো এখনো জীবন্ত। প্রথমত: বাংলার মাটি ও ইসলামি চেতনার মিলনে কি একটি মৌলিক বাংলাদেশি কাব্যভাষা তৈরি সম্ভব? দ্বিতীয়ত: পশ্চিমা ফর্ম ব্যবহার করে পশ্চিমের অনুমোদন ছাড়াই নিজের সভ্যতামূলক অভিজ্ঞতা প্রকাশ করা সম্ভব কিনা? তৃতীয়ত: ইসলামের সৌন্দর্যতত্ত্ব কি বাংলা কবিতার একটি স্বাধীন ভিত্তি হতে পারে?
এই প্রশ্নগুলো আল মাহমুদের একার নয়। এগুলো বাংলাদেশের কবিতার সামনের প্রশ্ন।
নয়. অনুত্তরিত প্রশ্নের উত্তরাধিকার: পরবর্তী প্রজন্মের দায়:
এই সিরিজের শুরুতে বলা হয়েছিল বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে একটি অনুপস্থিত প্যারাডাইমের কথা। নয়টি পর্ব পেরিয়ে এখন বলা যায় সেই অনুপস্থিত প্যারাডাইমটি কেমন হতে পারত এবং হতে পারে।
নজরুল এই প্যারাডাইমের কাব্যিক শক্তি দেখিয়েছিলেন — বিদ্রোহ ও ভক্তির, ইসলামি প্রেম ও রাজনৈতিক সংগ্রামের সংশ্লেষণ। আল মাহমুদ এই প্যারাডাইমের সৌন্দর্যতাত্ত্বিক ভিত্তি দেখিয়েছেন — বাংলার মাটি ও ইসলামি চেতনার অখণ্ডতা। কিন্তু দুজনের কেউই এই প্যারাডাইমের পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক কাঠামো তৈরি করেননি।
পরবর্তী প্রজন্মের কাজটি তাই শুধু কবিতা লেখা নয়। কাজটি হলো একটি সম্পূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ তৈরি করা — যেখানে ইসলামি দার্শনিক ঐতিহ্য বাংলায় কথা বলবে, যেখানে লালনের মানুষতত্ত্ব ও ইবনে আরাবির ইনসানুল কামিলের মধ্যে সংলাপ হবে, যেখানে নজরুলের হাফিজ-প্রভাবিত প্রেমের কবিতা ও আল মাহমুদের ইসলামি সৌন্দর্যতত্ত্ব মিলে একটি নতুন কাব্যতত্ত্ব তৈরি হবে।
এই কাজটি একজন কবির নয়, একটি প্রজন্মের।
দশ. ক্রিসেন্ডোর পর: যে নীরবতায় সম্ভাবনা থাকে:
এই সিরিজ শুরু হয়েছিল একটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে: ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর একটি বিশেষ প্যারাডাইমের আধিপত্যে আছে — পশ্চিমা লিবারেল-লেফট ও রাবীন্দ্রিক বাঙালিত্বের সংমিশ্রণে তৈরি একটি কাঠামো।
নয়টি পর্বে দেখা গেছে এই কাঠামোটি কীভাবে কাজ করে। ছফা থেকে মজহার, গুণ থেকে রাইসু, হুমায়ূন থেকে সলিমুল্লাহ — প্রতিটি বড় কণ্ঠস্বর এই কাঠামোর ভেতরে কাজ করেছেন, বা এই কাঠামোকে প্রশ্ন করতে গিয়ে অসম্পূর্ণ থেকে গেছেন। রবীন্দ্রনাথকে আচারে পরিণত করা হয়েছে, নজরুলকে ছাঁটাই করা হয়েছে, এবং আল মাহমুদকে প্রান্তিক করা হয়েছে।
কিন্তু এই পর্যবেক্ষণ হতাশার জায়গায় শেষ করার জন্য নয়। বরং একটি সম্ভাবনার দিকে আঙুল তোলার জন্য।
বাংলাদেশের কবিতার সামনে এমন একটি কাজ পড়ে আছে যা এখনো কেউ সম্পন্ন করেননি — একটি সম্পূর্ণ বাংলাদেশি-ইসলামি কাব্যভাষা তৈরি করা। এই কাব্যভাষায় থাকবে নজরুলের বিদ্রোহী শক্তি, আল মাহমুদের মাটির ঘ্রাণ, লালনের মানুষতত্ত্ব, এবং ইসলামের সভ্যতামূলক দৃষ্টিভঙ্গির দার্শনিক গভীরতা। এটি পশ্চিমের অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করবে না, কলকাতার মানদণ্ডে নিজেকে মাপবে না — এটি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসবে।
আল মাহমুদ এই কাজের শুরুটা করেছিলেন। সেই শুরুটাকে সামনে নিয়ে যাওয়া পরবর্তী প্রজন্মের দায় — এবং সম্ভাবনা।
ক্রিসেন্ডোর পর যে নীরবতা আসে, সেই নীরবতা শূন্যতার নয়। সেই নীরবতায় পরের সুরের জন্ম হয়।







