দুই বছরে মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীকে যেভাবে দেখেছি
রেজা তানভীর
১.
মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ইন্টেরিম সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা হওয়ায় জুলাইয়ের পক্ষের বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। তবে, জনাব ফারুকী সেসব সমালোচনাকে তার কাজের মাধ্যমে ভুল প্রমাণিত করেছেন। ইন্টেরিম আমলে আমরা দেখেছি, প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেইজ হতে বিভিন্ন ধরনের কন্টেন্ট পাবলিশড হতো। সেসব কন্টেন্ট ছিলো, পনের বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনামলের গুম খুনের তথ্যসংবলিত ডকুমেন্ট। লক্ষ লক্ষ মানুষ সেসব কন্টেন্ট দেখে ফ্যাসিস্ট শাসনের ভয়াবহতা সম্পর্কে জেনেছিল।
আমরা ধারণা করতে পারি, সেসবের পেছনে মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর বিশাল অবদান আছে। ফারুকী ছাড়া এ কাজ করার সামর্থ্য ইন্টেরিমের অন্য কারো ছিলো না।
মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক নাট্য নির্মাতা ও প্রযোজক।
ইন্টেরিম আমলে জুলাই জাদুঘর নির্মাণে তার যে মেধা ও শ্রম দিয়েছেন সেজন্য তিনি ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছেন।
২.
মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী ২০২৪ এর ১০ ই নভেম্বর সংস্কৃতি উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
শপথ গ্রহণের দুই দিন পর জনাব ফারুকী গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘এর মধ্যে আমাকে মুখোমুখি হতে হয়েছে এক অবিশ্বাস্য অভিযোগের– আমি নাকি ফ্যাসিস্টের দোসর! যেই ফ্যাসিস্টকে তাড়ানোর জন্য জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি নিয়ে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পাশে দাঁড়ালাম ১৬ জুলাই থেকে, অল আউট অ্যাটাকে গেলাম এটা জেনে যে ফ্যাসিস্ট হাসিনা টিকে গেলে আমার জন্য অপেক্ষা করছে মৃত্যু অথবা জেল, আমি তারই সহযোগী?’
‘আমি আমার চেয়ারের জন্য কোনো সাফাই দেয়ার প্রয়োজন মনে করছি না। কিন্তু শিল্পী হিসাবে অপমানিত বোধ করেছি বলেই কয়টা কথা বলছি। শাহবাগ আন্দোলন যখন শুরু হয় আর সবার মত আমিও ভেবেছিলাম এটা নির্দলীয়। যে কারনে আমার সব পোস্টে এটাকে ঠেলে ‘রাষ্ট্র মেরামতে’ এজেন্ডার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কিছুদিন পরেই যখন বুঝে যাই, তখনই লিখি ‘কিন্তু এবং যদির খোঁজে’। যে কিন্তু এবং যদি শাহবাগ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলো। বাঙালী জাতীয়তাবাদ আর ইসলামকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে আজকের যে ফ্যাসিবাদের সুচনা করা হয়েছিলো তার প্রতিবাদে লিখি, ‘এই চেতনা লইয়া আমরা কি করিবো’।
‘আমি ঘটনাচক্রে একজন পরিচিত মুখ, ভাই ও বোনেরা। একজন লেখক যতোটা স্বাধীন ভাবে লিখতে পারেন, ফ্যাসিবাদের কালে আমার সেই স্বাধীনতা পাওয়ার সুযোগ ছিলো না। তার মধ্যেও যতোটুকু করেছি তার ফলও আমাকে ভোগ করতে হয়েছে। ২০১৫ সালে সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন সেলের হেনস্তার শিকার হওয়ার মধ্যে যে দীর্ঘ অত্যাচারের শুরু। সেই বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে আমার সিমপ্যাথি পাওয়ার ইচ্ছা এবং প্রয়োজন নাই।’
৩.
মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন,
‘অনেকে বলছে, আমি ভারতীয় হেজেমনির অংশ। যে লোককে বাংলাদেশের কালচারাল এস্টাবলিশমেন্ট ঘৃণা করে আমি কোলকাতা কেন্দ্রিক ভাষার হেজেমনি ভেঙ্গে দিয়েছি বলে, সেই কিনা এই হেজেমনির অংশ!!! আমি পৃথিবীর কোনো দেশেরই ঢালাও নিন্দা করি না। কারন দেশে নানা চিন্তার মানুষ থাকে। আমি সবার সাথেই কথা বলতে চাই, কাজ করতে চাই। কিন্তু আমার দেশের ক্ষতি হলে, আমি তার বিরুদ্ধে বলতে কুন্ঠা করি না। ফেলানীর মৃত্যুর পর কি পোস্ট দিয়েছিলাম ২০১৩ সালে সেটা দেখতে পারেন নীচে।’
মোস্তফা সরোয়ার ফারুকি কিছৃদিন আগে দৈনিক যুগান্তরে দুই পর্বে কালচারাল রোডম্যপ নামে কলাম লিখেছেন। ওই কলাম দুটোতে আগামীর কালচারাল রোডম্যাপ কেমন হওয়া উচিত সেসব সম্পর্কে তিনি আলোকপাত করেছেন।
ফারুকি তাঁর কলামের এক জায়গায় লিখেছেন,
“যে কোনো দেশকে কলোনি বানাতে হলে প্রথমে তাকে কালচারাল কলোনি বানাতে হয়। এতে বাকি সব কাজ সহজ হয়ে যায়। কোনো দেশকে কালচারাল কলোনি বানানোর প্রথম ধাপ হচ্ছে, তার ইতিহাস দখলে নেওয়া। অর্থাৎ ইতিহাসের গল্পটা আধিপত্যবাদী প্রভুর সুবিধামতো সাজিয়ে নেওয়া। আওয়ামীপন্থি ও হেজেমনিক চিন্তা লালন করা বুদ্ধিজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে এ কাজটা করে আসছেন। তারা এমনভাবে ইতিহাস রচনা করে আসছেন, যা পাঠ করলে একটা বিশেষ শক্তি বা দলকেই ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বলে মনে হয়। তাদের বর্ণনায় আওয়ামী কালচারাল ন্যারেটিভকে প্রায় ধর্মের মতো পবিত্র এবং দৈব মনে হয়। এটা করতে গিয়ে ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশকে তারা অবলীলায় বাদ দিয়ে দেয়।”
তিনি আরো লিখেছিলেন,
আপনি দেখবেন, আমাদের দেশে আওয়ামীপন্থি বুদ্ধিজীবীদের ইতিহাসের আলোচনা শুরুই হয় বায়ান্ন থেকে। যেন রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসাবে আমাদের মুক্তির সংগ্রাম বায়ান্ন থেকে শুরু। যেন এর আগে আমরা ছিলাম না, আমাদের ওপর হওয়া কোনো শোষণের ইতিহাস ছিল না। সুতরাং ছিল না শোষণমুক্তির কোনো আকাঙ্ক্ষাও।
অবশ্যই বায়ান্ন ভাষার উসিলায় পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আমাদের বিদ্রোহের প্রথম ধাপ। জমিদারি আর ব্রিটিশ কলোনি থেকে বের হয়ে আমরা আরেক জাঁতাকলে পড়তে চাইনি। ফলে ভাষা আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ বটেই। কিন্তু এটাকে সূচনাবিন্দু দেখাতে গিয়ে আমার ওপর হওয়া এত শত বছরের শোষণ আর তার প্রতিক্রিয়ায় আমার লড়াইয়ের ইতিহাস মুছে ফেললে তো মুশকিল।”
তিনি আরো লিখেছিলেন,
“এই ‘প্রগতি’, ‘প্রতিক্রিয়া’ সমাজে হাই কালচার আর লো কালচারের পারসেপশনের জন্ম দেয়। এ পারসেপশনই কাউকে কাউকে আপনার কাছে সাবহিউমান বানিয়ে তোলে। এই পারসেপশনই আপনাকে বলে দেয় আপনি কার জন্য কাঁদবেন, কার জন্য কাঁদবেন না। যে কারণে ইলিয়াস আলী বা আরমান গুম হলে আপনার মধ্যবিত্ত কালচার্ড মন কাঁদে নাই। বিএনপির শত শত কর্মী খুন হলেও আপনার মন কাঁদে নাই। কারণ কালচারাল পারসেপশন তো তাদের সাবহিউমান বানিয়ে ফেলেছে। সো ইউ ডোন্ট রিয়েলি কেয়ার ফর দেম। এভাবেই ১৬ বছর অত্যাচার করেও আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে রাখতে পেরেছিল।
‘চব্বিশের জুলাইতে বিএনপি ও জামায়াত যদি এ আন্দোলনের সঙ্গে বাহ্যিক দূরত্ব রক্ষা করতে না পারত, তাহলে এ আন্দোলনকেও জামায়াত-শিবির বলে ট্যাগ দিয়ে শেষ করে দেওয়া হতো।’
‘আপনি দেখবেন, বাংলাদেশের মানুষের মতো নিজেদের ভাষা, নিজেদের পোশাক, নিজেদের দর্শন, নিজেদের ধর্মপরিচয় ইত্যাদি নিয়ে এমন হীনম্মন্যতায় খুব কম মানুষই ভোগে। আপনি কেরালায় যান, দেখবেন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে তাদের ঐতিহ্যবাহী লুঙ্গি পরে স্বচ্ছন্দে বসে আছে। আর আমরা নিজেদের লুঙ্গি লুকানোর জায়গা খুঁজে মরি। ভাষার ক্ষেত্রে-আমাদের এ দেশের কলোকুইয়াল ভাষা টেলিভিশন ও সিনেমায় ব্যবহারের অপরাধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল হেজেমনিক কালচারকে প্রায় ঐশ্বরিক ভাবা কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি। যাই হোক, তারা আজকে পরাজিত।’
আমি ২০১৪ সালে ‘এই চেতনা লইয়া আমরা কি করিবো’ শিরোনামে ফেসবুকে এক লেখায় লিখেছিলেন,
“নব্বইয়ের শুরুতে শাহবাগে সংস্কৃতি করতে গিয়া দেখলাম ওখানে ঈদের জামাত বা শবেবরাত উদ্যাপন করাটা ‘খ্যাত’। কিন্তু পূজা বা বড়দিনে যাওয়া প্রগ্রেসিভ। আমার কিশোরমন কিছুতেই বুঝতে পারল না এক যাত্রায় ভিন্ন ফল কেন! ওই লেখাতেই বলেছিলাম, এর বিপরীত দিকও আছে, যারা পহেলা বৈশাখকে মনে করে হারাম। এরা নারীদের কাজ করাকে আটকাতে চায়, নারী ফুটবল আটকাতে চায়, কেউ কেউ আবার সিনেমা দেখা বন্ধ করতে চায়। যাই হোক, সেই আলোচনা আরেকদিন। আজকের আলোচনা ফোকাস রাখতে চাই কীভাবে আমরা কালচারালি ফ্যাসিবাদের খাঁচায় আটকা পড়লাম।”
মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী এই লেখার মাধ্যমে কালচারাল ফ্যাসিস্টদের স্বরূপ চিনিয়েছেন। তিনি যে কালচারাল ফ্যাসিস্টদের প্রত্যক্ষ শিকার সেটা অকপটে স্বীকার করেছেন। তার মতো অন্য কোনো চলচ্চিত্র নির্মাতা সেটা বলতে পেরেছে কি না আমার জানা নেই।
৪.
১০ অক্টোবর ২০২৫ মোস্তফা সরোয়ার ফারুকি ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন,
“গুমের ডকুমেন্টারিটা আরেকবার দেখতে দেখতে মাথায় কয়টা কথা আসলো। টুকে রাখি। হাই কালচার আর লো কালচারের ধারনা যেভাবে দেশে নৃশংস ফ্যাসিবাদ কায়েমে হেল্প করলো।
মিডিয়া, একপেশে ইতিহাসের বয়ান, এবং আর হাই কালচার-লো কালচারের ধারণা আমাদেরকে শিখাইছে বিএনপি মিলিটারি থেকে এসেছে। ওদের কোনো কালচার নাই। ওরা বাঙালী সংস্কৃতি বিরোধী। ওদের জন্য বরাদ্দ ‘ছ্যা’!
জামাত বা অন্য ইসলামি দল? ওরা তো আরো ‘ছ্যা, ছ্যা’। ওরা কেবল বাঙালি সংস্কৃতি বিরোধী না, ওরা মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি নিয়ে আসে। ছ্যা, ছ্যা।
এই যে কালচারাল ন্যারেটিভ বানানো হইলো, এটার মাধ্যমে বিএনপি কিংবা জামাত কিংবা এরকম অন্যদের হত্যাযোগ্য করে তোলা হইলো। শুধু হত্যাযোগ্য না শোকের অযোগ্যও করে তোলা হইলো। এটার কারনেই ইলিয়াস আলী- সুমন- আরমানরা গুম হইলে মধ্যবিত্তের মন কাঁদে না। শত শত বিএনপি বা জামাত বা হেফাজতের কর্মী বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার হইলেও তাই মধ্যবিত্তের মন কাঁদে না।কারণ মিডিয়া এবং কালচারাল ন্যারেটিভ আমাদের শিখাইছে কাদের মৃত্যুতে কাঁদতে হবে, কাদের মৃত্যুতে কাঁদার প্রয়োজন নাই। জুলাইতে যদি বিএনপি কিংবা জামাত স্বীকার করতো তারা আন্দোলনের সাথে আছে, তাহলে আমার অনুমান ন্যারেটিভের করাত কলে এই আন্দোলনও চিরে ফেলা হতো।”
শহুরে মধ্যবিত্তকে বুঝানো হয়েছিল, বিএনপি জামায়াত বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধী, সেজন্য তাদের উপর গুম জায়েয। কাদের মৃত্যুতে কাঁদতে হবে, আর কাদের মৃত্যুতে কাঁদতে হবে না, সেটা মিডিয়াই ঠিক করে দিতো। এই যে মিডিয়া ও কালচারাল ফ্যাসিস্টদের ন্যারেটিভ সম্পর্কে ফারুকী তার বিশাল দর্শককে জানিয়েছেন, এতে করে জনগণ আরো সতর্ক হবে বলে আমরা আশা করতে পারি।”
৫.
জুলাই জাদুঘর নির্মাণের অন্যতম কারিগর ছিলেন মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী। জুলাই জাদুঘর সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন,
এই জাদুঘর সব সময়ই একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে থাকবে। জুলাই এবং গত ১৬ বছরের ঘটনাপ্রবাহ একটি বিশাল সমুদ্রের মতো, যা একবারে পুরোপুরি ধারণ করা সম্ভব নয়। তিনি জানান, ৮৩৫ জন গেজেটভুক্ত শহীদের প্রত্যেককে নিয়ে পৃথক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করতেই কয়েক বছর সময় লেগে যাবে এবং ভবিষ্যতে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও উপাদান এখানে যুক্ত হবে। কেবল জুলাই আন্দোলন নয়, ভবিষ্যতে এই জাদুঘর বাংলাদেশের ইতিহান ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা, সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী গত দুই বছরে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে অনেক কাজ করেছেন। তাঁর এসব কাজের মূল্য অপরিসীম। ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে আগামী প্রজন্মের কাছে উপস্থাপনের জন্য তিনি যেসব কাজ করে গেছেন সেসবের জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতা।
তথ্যসূত্র
……….
১.
মন্ত্রিত্ব কোনো অর্জন না, পাবলিক সারভেন্টের দায়িত্ব মাত্র: উপদেষ্টা ফারুকী, ইত্তেফাক ডিজিটাল, ১২ নভেম্বর ২০২৪
২.জুলাই জাদুঘর নির্মাণের স্মৃতিচারণ করে যা বললেন সাবেক উপদেষ্টা, যুগান্তর, ৫ আগস্ট, ২০২৬
৩. মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী, কালচারাল রোডম্যাপ, যুগান্তর, ১৭ ই জুলাই, ২০২৬







