প্রচ্ছদগদ্য'হেলমেট বাহিনী' কর্তৃক প্রাণনাশের হুমকি ও একজন মাবরুর রশিদ বান্নাহ

লিখেছেন : তাজ ইসলাম

‘হেলমেট বাহিনী’ কর্তৃক প্রাণনাশের হুমকি ও একজন মাবরুর রশিদ বান্নাহ

তাজ ইসলাম 

জুলাই বিপ্লবের আগে দীর্ঘ ষোল বছর ছিল ফ্যাসিবাদের দুঃশাসনকাল। ফ্যাসিস্ট হাসিনার যাঁতাকলে পিষ্ট ছিল তখন গণতন্ত্র ও এদেশের গণতন্ত্রকামী জনতা, বাক স্বাধীনতা, ভোটাধিকার, জননিরাপত্তা ছিল বন্দুকের নলের সামনে ভীত সন্ত্রস্ত। জনগণের জীবনে নেমে এসেছিল ভোট ডাকাতি, খুন, গুমের নির্মমতা। আয়নাঘর, শাপলা ম্যাসাকার, বিডিআর ট্রাজেডি ছিল হাসিনা শাসনের বড় ক্ষত, যা শুরু হয়েছিল পল্টনে “লগি বৈঠা’র তাণ্ডব” দিয়ে। অবশেষে ক্ষোভ- বিক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটল জুলাই বিপ্লবে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা দানবীয় কায়দায় ঝাঁপিয়ে পড়ল দেশের নিরীহ জনতার উপর। নিজের দেশের নিরস্ত্র জনতার বিরুদ্ধে ঘোষণা করল যুদ্ধ।  হেলিকপ্টার থেকে গুলি করতে, আগুনে পুড়িয়ে মানুষ মারতেও বুক কাঁপেনি স্বৈরাচার হাসিনা ও তার দোসরদের। তবু শেষ রক্ষা হয়নি। দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাঁচে হাসিনা ও তার মন্ত্রী এমপিরা। হাজার বছরের ইতিহাসে লজ্জাজনক রেকর্ড করে পলাতক হাসিনা। বাংলা মুলুক  ও বাংলাদেশের ইতিহাসে হাজার বছরে এমন পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা খুব কম। সদলবলে তারা পালিয়ে গেল। হাসিনা পালিয়ে গেলেও তার তৃণমূল রয়ে গেছে এদেশের আনাচে কানাচে। রয়ে গেছে দাসানুদাসেরা। 

রাজনীতির মাঠে হাসিনা বাহিনী নিষ্প্রভ ও নিস্ক্রিয়। জুলাই পরবর্তী সময়ে ফ্যাসিস্টদের আলোচনায় রাখছে কেবল লীগের নিবেদিত কালচারাল গুণ্ডারা। এ অবস্থায় কালচারাল প্রতিরোধ, জুলাইকে জাগ্রত রাখা এবং জুলাই বিপ্লবের পক্ষের কালচারাল শক্তিকে সক্রিয় থাকা আবশ্যিক। 

মূলত একটি বিপ্লবকে পরবর্তী সময়ে সচল রাখতে, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তার বার্তা পৌছাতে পারে কালচারাল শক্তিই। জুলাইকে কবিতা, গল্পে, প্রবন্ধে, নাটকে, সিনেমায় ধারণ করতে হবে। জুলাই পক্ষের শিল্পী সাহিত্যিকদের স্বতঃস্ফূর্ত কাজ করতে হবে। এতে নানা বাঁধা বিপত্তি আসতে পারে। বিপ্লবীরা এসবের পরোয়া করে না। আসে প্রাণ নাশের হুমকিও। 

মাবরুর রশিদ বান্নাহ একজন বাংলাদেশপন্থী সাংস্কৃতিকজন। তিনি নাটক-সিনেমা অঙ্গনের লোক। জুলাই পরবর্তী সময়ে হাসিনার দুঃশাসন, জুলাইয়ে হাসিনার ভয়াবহতা চিত্রিত করেছেন তার নাটক-চলচ্চিত্রে।  বিনিময়ে পেয়েছেন ফ্যাসিস্টের দোসরদের পক্ষ থেকে বহুরকমের হুমকি। প্রাণ নাশের হুমকি পেয়েছেন হাসিনার মনোনীত রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের পুত্র আরশাদ আদনান কর্তৃক। এসব বিষয় আলোচনার আগে আমরা স্বল্প পরিসরে জেনে নিই একজন মাবরুর রশিদ বান্নার বিষয়ে। 

মাবরুর রশিদ বান্নাহ একজন সৃজনশীল মানুষ।

তিনি নাটক ও ওটিটি চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার এবং অভিনেতা। একজন এক্টিভিস্টও। তার বুদ্ধিবৃত্তিক এক্টিভিজমে প্রতিপক্ষ সহজে কুপোকাত হয়।

তার জন্ম ২৩ অক্টোবর ১৯৮৮ সালে। বর্তমান বয়স ৩৭ বছর।

ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন বান্না। পরিবারের তিন সন্তানের মধ্যে সবার বড় তিনি ।  

 সানিয়া আফরিনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সানিয়া আফরিন আন্ডারগ্রাউন্ড ক্রিয়েটিভ ফ্যাক্টরির (UCF) ফিন্যান্স ডিরেক্টর এবং ২০২০ সালে লকডাউন চলাকালীন বান্নাহর নির্দেশিত ভাই ব্রাদার্স সিরিজের মাধ্যমে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে হিসেবে স্ত্রী তার শুধু সহধর্মিণীই নন, তিনি একজন সহযোদ্ধাও।

বান্নার আম্মা অক্টোবর ২০২৩ সালে ইন্তেকাল করেন।

২০১১ সালে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি একজন পরিচালক হিসেবে। এরপর গত দেড় দশকে তিন শতাধিক একক নাটক, ধারাবাহিক ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করে শিল্পাঙ্গনে নিজের অবস্থান মজবুত করেন। শুরুতে রোমান্টিক ও পারিবারিক টানাপোড়েনের গল্প নির্ভর কাজ করে পরিচিতি লাভ করলেও, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং সমসাময়িক সামাজিক সংকটনির্ভর ইস্যুতে রাজনৈতিক ফিকশন নির্মাণের জন্য বিশেষভাবে আলোচিত হন।

আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেন  ২০০৯ সালের দিকে। জাতীয় দৈনিকেও কাজ করেন কিছুকাল ।

সহকারী পরিচালক হিসেবে তিন বছর কাজ করে নিজের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করেন। 

 এনটিভিতে তাঁর প্রথম নির্দেশিত টেলিফিল্ম ‘ফ্ল্যাশব্যাক’ প্রচারিত হয় ২০১১ সালের ডিসেম্বরে।

প্রবীণ অভিনেতা আলী যাকের ও আবুল হায়াত এর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন।

ফ্ল্যাশব্যাক এর পর তার উল্লেখযোগ্য কাজ: 

নাইন অ্যান্ড আ হাফ (২০১৫)

আশ্রয় (২০১৯)

মায়ের ডাক (২০২১)

সুইপার ম্যান (২০২১)

নাস্তা (২০২৫)

লাঞ্চ (২০২৫)

হেলমেট বাহিনী (২০২৬)।

আশ্রয়, মায়ের ডাক, সুইপার ম্যান তার ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। নেক্সজেন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল (The Nexgen International Film Festival) এবং প্যারাডক্স ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-এ (Paradox International Film Festival) তাঁর নির্দেশিত আশ্রয়, সুইপার ম্যান এবং মায়ের ডাক নাটক তিনটি বিভিন্ন বিভাগে মোট ২৮টি পুরস্কার লাভ করে।

নাইন অ্যান্ড আ হাফ (Nine & a Half) প্রচারিত হয় ২০১৫ সালে দেশ টিভিতে। এটি বান্না পরিচালিত তুহিন রাসেলের রচনার একটি ধারাবাহিক নাটক

 যা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একদল তরুণের জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত। ২০২১ সালের ঈদুল আজহায় তাঁর পরিচালিত এবং আকবর হায়দার মুন্নার প্রযোজনায় তারকাবহুল বিশেষ নাটক মায়ের ডাক ঐ সময়েই ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং তা  ইউটিউবে কয়েক মিলিয়ন ভিউ অতিক্রম করে।

 ২০২০ সালের অক্টোবরে তাঁর পরিচালিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আমার অপরাধ কি’? এবং তৌহিদ আশরাফ-এর পরিচালনায় তাঁর অভিনীত ম্যাডবয়-রিলঞ্চড আন্তর্জাতিক ওটিটি প্ল্যাটফর্ম অ্যামাজন প্রাই্ম-এ মুক্তি লাভ করে।

২০২৪ এ জুলাই বিপ্লবের পর তিনি নাটক চলচ্চিত্রে জুলাইকে চিত্রিত করতে চেষ্টা করেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনার দুঃশাসন,জুলাইয়ে ফ্যাসিস্টের জুলুম, বিগত ষোল বছরে হাসিনাশাহীর অত্যাচারের চিত্র তুলে ধরেন তার এসব নাটক চলচ্চিত্রে। 

হাসিনার বিশেষ বাহিনী ছিল ‘হেলমেট বাহিনী’। সেই হেলমেট বাহিনী জুলাইয়েও সশস্ত্র লাঠিয়াল হয়ে ভয়ংকর ভাবে তৎপর ছিল মাঠে।

জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে হেলমেট বাহিনী নামক একটি নাটক নির্মাণ ও প্রযোজনা করেন, যেখানে অভিনয় করেন তিনি নিজেও একটি চরিত্রে।

হেলমেট বাহিনী নির্মাণ করায় ক্ষিপ্ত হয় ফ্যাসিস্টের দোসররা।

বান্নাকে হুমকি দিতে থাকে। হুমকি দেয় আওয়ামীলীগ মনোনীত রাষ্ট্রপতি সাহাব উদ্দীন চুপ্পুর পুত্র আরশাদ আদনান।

 ক্রমাগত হুমকি পেতে থাকেন তিনি, এমনকি তাকে প্রাণ নাশের হুমকিও দেয়। যা বান্না প্রকাশ করেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। এই নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। জুলাইয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনা তার মন্ত্রী সান্ত্রীসহ পালিয়ে যায়। তবু থেমে থাকেনি দেশে থেকে যাওয়া ফ্যাসিস্টের দোসররা। জুলাইয়ের পক্ষে যারা তাদের এখনো তারা হুমকি দেয়।

বান্নারা থেমে যাওয়ার পাত্র নন। তারা নিজের কাজ চালিয়ে যান। 

বান্নাও নিজের পরবর্তী কাজের

ঘোষণা দেন। 

 আবু সাঈদ ও আবরার ফাহাদের স্মৃতিকে ধারণ করে ও  অনুপ্রাণিত হয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করার আশা ব্যাক্ত করেন । বর্তমানে তা প্রি-প্রোডাকশন পর্যায়ে রয়েছে।

বান্না স্নাতক সম্পন্ন করেন ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউডা)-র যোগাযোগ ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ থেকে। জাতি তার কাজ থেকে আরও ভাল কিছু আশা করে। দেশপ্রেমিক জনতা বান্নার পাশে আছে। তিনি সোশ্যাল মিডিয়াতেও দারুণ এক্টিভ। আমরা তার সফলতা কামনা করি। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী তার প্রতিটা কাজে অন্তরজ্বালা সৃষ্টি হোক প্রতিটি ফ্যাসিস্ট প্রাণে।

হেলমেটবাহিনী নিপাত যাক, ইনকিলাব জিন্দাবাদ।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা