প্রচ্ছদকবিতাগুচ্ছ কবিতা

লিখেছেন : মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন

গুচ্ছ কবিতা

মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন 

বিষাদের অন্ধকার 
…………………

একটি প্রকাণ্ড পাহাড়ের চূড়ায় অবতরণ করি 
খরস্রোতা ঝরণার জলে তপ্ত আগুন নিবারণ করব ভেবে। পাহাড় বলে, ঝরণার বিলাপ শেষ হয়েছে সেই কবে– 
এখন আমার বুকে শুধুই পাথরের আয়েশি ওম । 

দিনের ক্লান্তির আবেশে গোধূলীর সাজসজ্জায় 
স্রোতস্বিনী নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে 
নদীর নিনাদস্রোতে ভুলিয়ে রাখব শূন্যতার আর্তনাদ
নদীর উত্তর– আমার বুকে ঢেউগুলো শান্ত আমেজে এখন বিশ্রামে। 

রাতের বিবরে সবুজ গালিচায় খানিক এলিয়ে দিই– 
একটি মধুচন্দ্রিমার মধুক্ষণগুলো 
অতি যত্নে মনের আল্পনায় গুছিয়ে রাখব বলে, 
মুহূর্তেই ঘোর অমানিশা নেমে পড়ে 
যেন, দৈত্যাকার অমাবস্যার এক বিভৎস মুখচ্ছবি ! 
এ যেন অমাবস্যার সাথে পূর্ণিমার প্রাগৈতিহাসিক চুক্তির ভাববিনিময়! 
বিষাদের অন্ধকার যেন কাটে না– অলস এক বর্ষের মত দীর্ঘ রাত । 

ভোরের আঁচলে চোখ মেলে হর্ষোৎফুল্লে আসন গেড়ে চেয়ে থাকি 
একটি সুবাসিত গোলাপ দর্শন লাভের শেষ নজরানার আকাংখায় 
সেখানেও নেই কোন গোলাপ, পড়ে আছে শুধুই শুকনো ঝরা পাতা । 

প্রবল তৃষ্ণার্ত মননে শিশিরে রাখি দু’ঠোঁট, 
পুবাকাশ ভেদ করে নেমে পড়ে প্রখর রোদের উদাসিস্নান দিয়ে যায় আর একটি প্রত্যাখ্যানের উপাখ্যানময় দিবসের সূচনা। 

০৪-০৮-২০২৬ ইং 
০২:৪৮ এ এম 

শোকের ফুল 
……………

মনের ভেতর দুঃখ নদী চোখের ভেতর জল 
রাতের বুকে আকাশ কাঁদে, বৃষ্টি টলোমল 
শূন্যালোকে নিয়ন বাতি ডাগর চোখে চায় 
আরণ্যকে হিমেল হাওয়া দুঃখ খুঁজে পায় ।

ছিন্নমূলের রিক্ত থালে ক্ষুধার নোনাজল 
মানুষ বাঁচার স্বপ্নটুকু, আজও অবিচল।
নদীর বুকে অশ্রুস্রোতে ভাসে শোকের ফুল 
দুঃখগুলো ঢেউয়ের ছলে ভাঙ্গে মনের কূল ।

জলের ভেতর আলোর ছটা, পালে সিনার ভাঁজ 
কূলের খোঁজে দিশেহারা স্বপ্ন ভাঙার লাজ 
পদ্মফুলের খোপার ভাঁজে শিশির খোঁজে ওম 
খুঁজছি যারে ডুবসাঁতারে সেইতো দিলো ঘুম । 

তারার হাটে জোনাক-প্রদীপ ফিরে ফিরে চায় 
ভোরের ডাকে একলা ঘুরে, দুঃখ কি লুকায়? 

৩০-০৭-২০২৬ ইং 
০১:০৯ এ এম 

অব্যক্ত আওয়াজ 
………………….

রথপানে ঘুরে ঘুরে এক মহাকাল কাটিয়ে দিলাম 
সহস্র পর্বতমালার চূড়ায় নামিয়ে এনেছি বজ্রধ্বনি
অনাগত বৃষ্টির ধারাপাতে লিখে দিয়েছি 
নিভৃতে ঝরে পড়া জলফোঁটা 

পেঁচার ঠোঁটের ডগায় তুলে দিয়েছি অব্যক্ত কথামালা 
আটলান্টার ভূগর্ভে দিয়ে এসেছি নিঃশব্দের ঢেউগুলো
কোথাও কেউ ভ্রুক্ষেপ করেনি সেই অব্যক্ত আওয়াজ 
ভ্রুকুচকে এড়িয়ে চলে যায় সকলে । 

আর কত আরশফাটা চিৎকারে– 
তোমাদের কর্ণকুহুরে পৌঁছাবে– ব্যথার ধ্বনি 

কেউ কি আছো– 
শুনবে কি এই মজলুমের আর্তচিৎকার! 
কেউ কি আছো– 
সহস্রকাল ধরে এই তপ্ত মরুকায় 
দাঁড়িয়ে থাকা একাকিত্বের প্রাণে– 
নিবেদন করবে একফোঁটা মানবিক জল !। 

২৭.০৭.২০২৬ ইং 
০১:৩৬ এ এম 

একলা পাখি 
……………

একটা পাখি একা একা ডাকছে দেখ ডালে 
আকাশ হতে বৃষ্টিগুলো পড়ছে করুণ তালে 
ঝড় তুফানে দুলছে তরু আপন খুশির টানে 
একলা পাখি নীরব থাকে – কার প্রহরার পানে !

সঙ্গী ছাড়া রোজ পাখিটি থাকে উদাস মনে 
এই জগতে ডাকটি শোনার নেইতো কোনো জনে 
নীরব মনে কষ্ট পুষে সকাল- দুপুর কাটে
কার পানে যে থাকে চেয়ে — গোধূলির ওই বাঁকে।

বেলা গেল শত শত, রাতের আঁধার কত! 
এই জীবনে দেয়নি তো কেউ– ভুলিয়ে তার ক্ষত 
জোড়ায় জোড়ায় সব পাখিরা চলে আপন মনে 
সুখের গন্ধ মেখে সবাই ওড়ে আকাশ পানে ।

সেই পাখিটি আজো তবু কাটায় প্রহর গুণে 
সঙ্গীহীনা সেই সঙ্গীটি– কষ্ট যদি শুনে । 

০২.০৮.২০২৬ ইং 
০২:৩৭ এ এম 

স্মৃতির ফটোগ্রাফখানা 
…………………….

যদি রাতগুলো আবার ফিরে আসে 
এইখানে এই রাতের বিবরে ঠিক চন্দ্রিমার মত 
লাজ-অপযশ উপেক্ষা করে পুরনো সুরত মেখে 
তবে, এলবামের পাতা খুলে কুড়িয়ে নেব 
সেই ঝলমলে স্মৃতির ফটোগ্রাফখানা ।

পূর্ণিমার ঝলসানো প্রদীপে চোখ রেখে 
মরচে ধরা পুরনো সানগ্লাসখানা জড়াবো 
অপলক চেয়ে থাকার পুরনো অভ্যাসে । 

অনুভবে ভেবে নেব, 
টেমসনদীর পাড়ে রাত্রিগুলো জড়ো হবে আর —
পুরনো এলবামের চকচকে ফটোগ্রাফখানা, 
নদীর নিনাদ স্রোতে নিয়ে যাবে– কল্পনার অতীতাড্ডায়
মনে হবে খুনশুটিগুলো বুঝি ফিরে এলো । 

বর্ষার সাথে ঝর্ণার মিলনময় ঘোর লাগার মত 
পোকার আঁচড়ে ভুলে থাকব মোহময় আলাপনে 
অপেক্ষার প্রতিবিম্ব হয়ে ঝুলে থাকব পাহাড়ের দেয়ালে আবার চোখ রেখে ঝুলে থাকব 
অনন্তকাল ধরে তোমাকে ফিরে পেতে । 

হিমশীতল বাতাসের গন্ধ মেখে জড়াবো 
তোমার সজ্জিত আঁচলে, 
গুঁজে দেব ভালোবাসার তীব্র আঁচড় তিলক 
যেন সময়ের মত কখনো অতীত হয়ে হারিয়ে না যাও । 

১৫.০৭.২০২৬ ইং 
০২:৩৩ এ এম 

আলেখ্য উপঢৌকন 
………………….

আমি তো চেয়েছি দিনান্তে দুমুঠো ভাত– আধখানা রুটি 
চেয়েছি একখানা দেহ ঢাকার প্রাগৈতিহাসিক চাদর 
রাতের বিছানায় খানিক প্রশান্তির ডাকে 
গুণে নেব দুঃখের অনলফোঁটা

আর কোন আলোড়ন চাইনি , 
চাইনি কোন নয়া বাহানা — 
পিতলের থাল অথবা সরাবের মাস্তিখানা 
যশ খ্যাতি অথবা কোন আলেখ্য উপঢৌকন 

মহাকালের এই খেল-তামাশার ঘেরাটোপে 
কত কিছুইতো ঢেলে দাও– 
ঢেলে দাও দেমাগের জৌলুস দম্ভের পেশিটানে 

তবু, আমার পদার্পনে তোমাদের এ কেমন আক্রোশের চাবুক!
বিদ্ধ কর তোমাদের হেয়ালি বুলেট 
সমুদ্রের তেজস্বি ঢেউগুলো যেমন আঘাত হানে দুকূলের নাভিশ্বাসে 
তোমাদের আয়েশি আবেশে গড়ে তোলা স্নাইপার অথবা মিসাইলের আঘাত হানো আমার চিলেকোঠায়, 
মানব সুরত মেখে এসে দেখ– 
এখানে নেই কোন প্রাণের সরোবর, হলক শুকিয়ে চৌচির 
নেই সড়কের বুকে খাবারের কোন আতিশয্য
নেই বাঁচার অনাদৃত উপকরণ 
তবু, কেন বারবার আঘাত হানো আমার অস্তিত্বে শেকড়ে 
যেখানে প্রজন্মের প্রজনন উঠে দাঁড়ায়– অস্তিত্বের উপস্থিতি দেয় জানান– আর তোমরা কেঁপে ওঠো ভয়-ডরে। 

১৪.০৭.২০২৬ ইং 
০৭:৫০ এ এম

একাকিত্বের আলপথ 
…………………….

কোন কালেই আমি তোমার প্রথম ভালোবাসার 
সেই আরাধ্য কেউ হয়ে উঠিনি 
হয়তোবা শেষেরও নই– 
তা অবশ্য সময়ের কাঠগড়ায় বন্ধক রইল । 
কোন কালেই তোমার মস্তিষ্কের সংরক্ষিত ফোল্ডারে
ছিলাম না প্রথম ভালোলাগার কেউ । 

তুমি’তো হর্ষোৎফুল্লে সর্বস্ব দিয়ে এসেছ– 
গচ্ছিত সব হীরে, জহরত
আজ, কি ভুলে ক্লান্তির রেখা টেনে খানিক বিরতির আবেশে জড়ালে আমার এই একাকিত্বের আলপথে? 

প্রণয়ের রাতে তোমার দেয়া প্রতিজ্ঞার প্রতিশ্রুতি ছিলো প্রগলভ-প্রলাপ 
আমায় আস্তিনে জড়িয়ে তোমার সেদিনের বায়না ছিলো আর একটি শঠতার সুকৌশলী ফাঁদ , 
রাতের বিবরে ঝিঝিপোকার চিৎকার–শোরগোল–
আমাকে সেই অনুভূতির বার্তা প্রেরণ করেছে রাতভর, দেয়ালে উঁকি দিয়ে ঝিমিয়ে থাকা রাতের টিকটিকি– 
দিয়ে গেছে মিথ্যের আওয়াজ 

এই সুবিশাল শূন্যতার গহ্বরে 
তোমার পূর্ণতা দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি , 
অনেকটা অমাবস্যার রাতের কাছে জোনাকির
রাতভর আলো দানের শঠময় আশ্বাসের মতোই । 

১৫.০৭.২০২৬ ইং 
০২:০৯ এ এম 

অদেখা আলিঙ্গন
…………………

তোমার অবয়ব দেখে—
অনায়াসে কেটে গেল একটি ভোর ও একটি মিশ্রিত বিকেল;
দুঃখের বিনয়ী স্পর্শ ছাড়াই তেজোদীপ্ত দুপুর 
চটজলদি পেরিয়ে গেল গোধূলির আড়ালে।

সেই যে তোমার দেখা—
আদৌ কি দেখা,
নাকি অদেখা আলিঙ্গনের এক মোহময় টান?

এখন তোমার খোঁজে রাতগুলোও হয় দীর্ঘতর;
রাতের বিবরে আত্মার ডুব, তোমার অস্তিত্বের সন্ধানে।
আবার খানিক মিলনের আহ্বানে উতলা হয়ে ওঠে মন।

দেহের হামাগুড়ি
অনলস হাহাকারে ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস;
রাতের নিস্তব্ধতায় ঠিকই ঘটে যায়
শুনশান শব্দের এক অদৃশ্য মিলন।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা